- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- খুলাফায়ে রাশেদিন
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
খলিফা হযরত উসমান (রা.) (৬৪৪-৬৫৬ খ্রি.)
হযরত উসমান (রা.)-এর জন্ম ও ইসলাম-পূর্ব জীবন আবরাহা বাদশাহর কাবা শরিফ আক্রমণের ছয় বছর পর এবং হিজরতের ৪৭ বছর পূর্বে অর্থাৎ ৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে উসমান (রা.) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আফফান। তাঁর পুত্রের নাম আব্দুল্লাহ হওয়ায় তাঁকে আবু আব্দুল্লাহও বলা হতো। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কন্যা রুকাইয়া (রা.)-এর গর্ভে আব্দুল্লাহর জন্ম হয়। বুকাইয়ার মৃত্যুর পরে উম্মে কুলসুমের সাথে তাঁর বিবাহ দেওয়া হয়। এজন্য তাকে 'যুনুরাইন' বলা হয়। তাঁর বংশধারা পঞ্চম পুরুষে এসে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর পিতৃপুরুষ আবদে মান্নাফের সাথে মিশে যায়। তাঁর নানী রাইজা ছিলেন আব্দুল মুত্তালিবের কন্যা এবং রাসুলুল্লাহ (স.)-এর পিতা আব্দুল্লাহর ভগ্নি।
অন্যান্য সাহাবিদের মতো তাঁর প্রাথমিক জীবন সম্বন্ধে বেশি কিছু জানা যায় না। তবে এটুকু জানা যায় যে, ব্যবসায়-বাণিজ্য করে তাঁদের পরিবার প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিল বলে গনি বা ধনী নামে পরিচিত হন। ধনী সম্পদশালী হওয়ায় তাকে হযরত উসমান গনি বলা হতো। মকার বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর প্রভাব ছিল গুরুত্বের দিক দিয়ে বনু হাশিমের পরই ছিল তাঁদের স্থান। তিনি নিজে লেখাপড়া শিখেছিলেন এবং সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করতেন।
ইসলাম গ্রহণ: মহানবি (স.) নবুয়ত প্রাপ্তি সময় হযরত উসমান (রা)-এর বয়স হয়েছিল ৩৪ বছর। এক রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেন, "জেগে ওঠ, ওহে ঘুমন্ত ব্যক্তি... আহমদ আগমন করেছেন।" এ স্বপ্ন তাকে ইসলামের প্রতি আবেগাপ্লুত ও আগ্রহী করে তোলে। তিনি কালবিলম্ব না করে হযরত আবু বকর (রা.)-এর দাওয়াত গ্রহণ করে দ্রুত গতিতে মহানবি (স.)-এর নিকট গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর চাচা হাকাম ছিলেন ইসলামের ভীষণ শত্রু। তাঁর অত্যাচারে উসমান (রা.) ইসলাম ত্যাগ করেন নি বরং ইসলাম গ্রহণের পর হতে ইসলামের খেদমতে দু'হাতে অকাতরে অর্থ খরচ করেন। খলিফা হওয়ার পূর্বে তিনি ইসলামের প্রচারে আবিসিনিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে হিযরত করেন।
খিলাফত লাভ: খলিফা নির্বাচনের জটিলতা এড়াতে হযরত ওমর (রা.) মৃত্যুর পূর্বে একটি নির্বাচনি পরিষদ গঠন করেন। হযরত উসমান (রা.), হযরত আলী (রা.), তালহা, যুবাইর, সাদ ও বিন আবি ওয়াক্কাস ও আবদুর রহমান এ নির্বাচনি পরিষদের সদস্য ছিলেন। ইসলামের খেদমতে এ সাহাবাদের প্রত্যেকেরই অসামন্য অবদান ছিল। তালহা এ সময় মদিনায় উপস্থিত ছিলেন না। আবদুর রহমান খিলাফতের গুরুভার নিতে সক্ষম ছিলেন না। আবদুর রহমান, যুবাইর, উসমান ও আলীকে সমর্থন করেন। সাদ উসমানকে, উসমান আলীকে এবং আলী উসমানকে সমর্থন করেন। ফলে এক ভোট বেশি পেয়ে হযরত উসমান (রা.) ৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম বিশ্বের তৃতীয় খলিফা নির্বাচিত হন। আবদুর রহমান তাঁকে খলিফা হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলে সকলে তাঁর আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করে।
উসমান (রা.)-এর বিজয়াভিযান সমূহ: হযরত উসমান (রা.)-এর বিজয়াভিযানসমূহ ছিল দুধরনের- ১. সম্পূর্ণ নতুন বিজিত এলাকা। ২. যেগুলো হযরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে বিজিত হয়েছিল, কিন্তু পরে বিদ্রোহী হয়ে যায়; কিংবা সেগুলোর ওপর শত্রুরা হামলা করে, যা হযরত উসমান (রা.) পুনর্দখল করতে সক্ষম হন। নিম্নে উভয় ধরনের বিজয় অভিযানের বিবরণ তুলে ধরা হলো-
পূর্বাঞ্চল বিজয়: হযরত উসমান (রা.) খেলাফতে অধিষ্ঠিত হওয়ার সাথে সাথেই পারস্য সাম্রাজ্যের শেষ পলাতক সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদেগরদ হৃত সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য বিদ্রোহ আরম্ভ করে। খলিফার আদেশে বসরার শাসনকর্তা আবদুল্লাহ ইবনে আমীর তার বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে নিসাপুর, মার্চ, বলখ, তাবারিস্তান প্রবৃতি বিদ্রোহী অঞ্চলসমূহ দখল করে পরাস্যরাজ্যের দুরভিসন্দি নস্যাৎ করে দেন। ৬৫১ খ্রিস্টাব্দে ইয়াজদেগরদ হীনভাবে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর মুসলিম সৈন্যদল কিরমান, মাকরান, সিজিন্তান, হেরাত কাবুল, গজনী, খাওয়ারেজম প্রভৃতি স্থানে তাঁদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। হযরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতে মুসলিম আধিপত্য শুধু প্রাচ্যেই বিস্তৃতি লাভ করেনি, পাশ্চাত্যেও মুসলিম অধিপত্য বিস্তৃতি লাভ করেছিল।
পশ্চিমাঞ্চল বিজয়: মিশরে মুসলমানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলেও হযরত ওমর (রা.)-এর মৃত্যুর পর রোমান সম্রাট এটি পুনরুদ্ধারের জন্য ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে এক বিরাট নৌবাহিনী প্রেরণ করে আলেকজান্দ্রিয়া দখল করে নেয়। মিশরের শাসনকর্তা আমর বিন আল আস (রা.) রোমান নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে তাদের পরাজিত করে আলেকজান্দ্রিয়া পুনরুদ্ধার করেন। এ ঘটনার পর আমর (রা.) মিশরের গভর্নর পদ থেকে অপসারিত হন এবং খলিফার দুধ ভাই আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবি সারহে মিশসের গভর্নর পদে বহাল হন।
আমর (রা.)-এর অপসারণে ত্রিপোলীর রোমান শাসনকর্তা গ্রেগরি আবার মিশরে হানা দিতে শুরু করেন। ফলে আবদুল্লাহ তার বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং কার্থেজে রোমানদের সাথে মুসলমানদের এক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে লক্ষাধিক রোমান সৈন্য থাকলেও তারা পরাজিত হয় এবং তাদের শাসনকর্তা গ্রেগরি নিহত হন। ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিপোলী মুসলমানদের করতলগত হয়। অন্যদিকে রোমান নৌবহর সিরিয়ার উপকূলে নানাভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে হবে। নৌপথে রোমানদের মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে খলিফার পরামর্শক্রমে মিশরের শাসনকর্তা আবদুল্লাহ এবং সিরিয়ার শাসনকর্তা মুয়াবিয়া মুসলিম নৌবাহিনী গঠনে তৎপর হন। এ নবগঠিত নৌবাহিনীর সাহায্যে মুয়াবিয়া (রা.) সাইপ্রাস দ্বীপ অধিকার করেন। এর পর মুসলমানরা রোডস দ্বীপ: দখল এবং সিসিল দ্বীপে আক্রমণ পরিচালনা করেন।
ইতোমধ্যে ৬৪৭ খ্রিষ্টাব্দে এশিয়া মাইনর থেকে রোমানরা এক বিরাট বাহিনীসহ সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। সিরিয়ার প্রাদেশিক গভর্নর মুয়াবিয়া (রা.) খলিফা প্রেরিত ৮,০০০ সৈন্য এবং সিরিয়ার নিয়মিত বাহিনীর সাহায্যে রোমানদের আক্রমণ-প্রতিহত করেন। অতঃপর মুসলিম বাহিনী আর্মেনিয়া, তাজিকিস্তান ও তিকলিস অধিকার করে কাম্পিয়ান সাগরের পূর্ব তীর: এবং উত্তরে কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত পদানত করে। দ্বিতীয় দফা সাইপ্রাস অভিযানের সময় রোমান নৌবাহিনীর সাথে মুসলমানদের ৫০টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রতিটি যুদ্ধে মুসলমানরা জয়যুক্ত হয়। একই বছর আমীরে মুয়াবিয়া (রা.) রোম ভূখণ্ডের 'হিসনুর: বুয়াত' নামক স্থানটিও দখল করেন। অপরদিকে খোরাসানের জনগণ বিদ্রোহ করলে আহনাফ বিন কায়সের নেতৃত্বে সে বিদ্রোহ দমন করা হয়।
হযরত উসমান (রা.)-এর শাসন কার্যাবলি [Administration of Hazrat Osman (R)]
ইসলামের কল্যাণে হযরত উসমান (রা.) অবদান অনস্বীকার্য। খিলাফতের দায়িত্ব প্রাপ্ত হবার পরে প্রশাসনে শৃঙ্খলা আনয়নের জন্য রাষ্ট্রীয় নীতি ঘোষণা করেন। অরাজক পরিস্থিতির সুযোগে অনভিপ্রেত অবস্থার সৃষ্টি যাতে না হতে পারে সে জন্য অত্যন্ত কঠোরতার সাথে গভর্নর ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশ প্রদান করেন।
দয়া, ন্যায়পরায়ণতা ও. বিশ্বস্ততা অক্ষুণ্ণ রেখে অভিভাবক হিসেবে জাতীয় দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করেন। রাষ্ট্রের প্রাপ্য এবং.. জিম্মিদের প্রাপ্য যাতে যথাবিহিত হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করে দেন। এমনকি শত্রুরাও যাতে অন্যায় ও অসদাচরণের শিকার' না হয় সে দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রয়োজনে ন্যায়পরায়ণতা ও চুক্তিবলির মাধ্যমে তাদেরকে জয় করবার পরামর্শ দেন। সীমান্ত নিরাপত্তা ও কর সংগ্রহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সহনশীলতা প্রদর্শন করে আস্থা সৃষ্টিতে যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ দেন। নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের মাঝে একটি রাষ্ট্রের সফলতা ও খ্যাতি নিহিত আছে। আর্থিক অপচয়, নৈতিক মান সংরক্ষণের লক্ষ্যে হযরত উসমান (রা.) বিলাস ও ক্রীতদাসীদের সঙ্গে অধিক দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। সং ও উদ্যমশীল জাতির সংগঠক হিসেবে এগুলো ছিল তাঁর সৃজনী প্রতিভার স্বাক্ষর।
রাজ্য সম্প্রসারণসহ বিজিত অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার লক্ষ্যে নৌবাহিনী গঠন তাঁর অন্যতম কীর্তি। খলিফা হযরত উসমান (রা.) তাঁর পূর্ববর্তী খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর প্রবর্তিত শাসন ব্যবস্থার কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন করেননি। মজলিস-উস-সূরার পরামর্শ অনুযায়ী খলিফা খিলাফতের গুরুত্বপূর্ণ নীতিসমূহ নির্ধারণ করতেন। রাষ্ট্রের অন্যান্য দফতরও অপরিবর্তিত ছিল। তবে খলিফা নিজে রাজস্ব বিভাগের প্রভূত উন্নতি সাধন করেন এবং বর্ধিত আয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সৈন্যবাহিনীর বেতন ও ভাতা বৃদ্ধি করেন। চারণভূমির পশুর সংখ্যা বৃদ্ধিসহ নানা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণমূলক কাজ আর্থিক' সচ্ছলতা বৃদ্ধির ফলে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছিল।
অভিযোগসমূহ (Charges)
খুলাফায়ে রাশেদিনের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.)-এর হত্যা ইতিহাসে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। তিনি ৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ হতে ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বারো বছর রাজত্ব করেন। তাঁর রাজত্বের প্রথম ছয় বছর সুখ্যাতির সাথে কেটেছিল। পরবর্তী ছয় বছর অশান্তি, বিদ্রোহ ও অরাজকতায় পরিপূর্ণ ছিল। যা পরবর্তীকালে চরম আকার ধারণ করে এবং ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে হযরত উসমান (রা.) বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন। তাঁর হত্যার কারণ সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ একমত নন। তবে আয যুহরীর ভাষায়, "উসমান (রা.) কুরাইশদের মধ্যে হযরত ওমর (রা.) অপেক্ষা অধিকতর প্রীতিভাজন হয়েছেন।" অনেক ঐতিহাসিক হযরত উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোকে তাঁর হত্যার কারণ মনে করেন।।
হযরত উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলো হলো:
(ক) স্বজনপ্রীতি।
(খ) কুরআন শরিফ দঙ্গীভূতকরণ।
(গ) বায়তুলমালের অর্থ আত্মীয়স্বজনকে দান।
(ঘ) সরকারি চারণভূমি নিজস্ব কার্যে ব্যবহার।
(ঙ) আবু যর আল-গিফারীকে নির্বাসন।
(চ) কাবাগৃহ সম্প্রসারণ।
(ছ) ইবাদত প্রসঙ্গ।
হযরত উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো:
স্বজনপ্রীতি: খুলাফায়ের রাশেদিনের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে দুর্ধর্ষ আরব বেদুইন এবং অনারব মুসলমানদের প্রধান অভিযোগ যে, উসমান (রা.) রসুলে করিম (স.)-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও অনুসারীদের অপসারণ করে স্বীয় গোত্রীয় ও আত্মীয়স্বজনকে বিভিন্ন সরকারি পদে নিযুক্ত করেন। ঐতিহাসিক হিট্টি, আমীর আলী, উইলিয়াম মুইর, মাসুদী, ভনক্রেমার প্রমুখ এ মতের সমর্থক। তাঁরা মনে করেন যে, খলিফা উসমান (রা.) তাঁর আত্মীয়স্বজনকে এবং উমাইয়া বংশের লোকজনকে সাম্রাজ্যের সকল প্রকার উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত করেন এবং সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন। কুফা, বসরা এবং মিশরের লোকেরা এ ব্যাপারে খলিফার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। যাহোক, খলিফা যেসব পদে যাদেরকে নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং যেসব পদ থেকে যাদেরকে অপসারণ করেছিলেন তা নিম্নে তুলে ধরা হলো:
কুফায় গভর্নর নিয়োগ: হযরত ওমর (রা.)-এর মৃত্যুকালীন অছিয়ত অনুযায়ী উসমান (রা.) মুগীরার পরিবর্তে সাদ-বিন-আবি-ওয়াক্কাসকে কুফার গভর্নর নিয়োগ করেন। পরবর্তীতে সাদ কিছুটা গর্হিত কাজ করলে খলিফা নিজেই সাদকে অপসারণ করে ওয়ালিদ-বিন-আবি ওয়াকাসকে কুফার শাসক নিযুক্ত করেন। ঘটনাটি ৬৪৬ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত হয়। ওয়ালিদ ছিলেন খলিফার দুধভাই। কিন্তু ওয়ালিদ যখন মদ্যপায়ী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হন তখন তাঁকে পদচ্যুত ও ইসলামের বিধান মতে বেত্রাঘাত করেন। ওয়ালিদের পর সাঈদ আল-আসকে খলিফা কুফার গভর্নর নিয়োগ করেন। তিনিও খলিফার আত্মীয় ছিলেন বিধায় কুফাবাসীর বিরাগভাজন হন।
বসরার শাসক নিয়োগ: ৩০ হিজরিতে সামান্য অপরাধের জন্য আবু মুসা আল আসারীকে বসরার গভর্নর পদ হতে বরখাস্ত করে যুবক আব্দুল্লাহ ইবনে আমিরকে বসরার শাসক নিয়োগ করেন। আব্দুল্লাহ সুযোগ্য শাসক তথাপি তিনি খলিফার পিতৃব্য পুত্র ছিলেন বিধায় বিদ্রোহীরা তাকে সুনজরে দেখেন নি।
মিশরের গভর্নর অপসারণ: মিশর বিজয়ী আমর-ইবনে-আল-আস উসমান (রা.)-এর সময় ৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মিশরের গভর্নর ছিলেন। তাঁর সঙ্গে মিশরের রাজস্ব কর্মকর্তার বিরোধ দেখা দিলে খলিফা আমরকে পদচ্যুত করে তাঁর দুধভাই আব্দুল্লাহকে মিশরের গভর্নর নিয়োগ করেন। তিনি অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে শাসনকার্য পরিচালনা ও বৈদেশিক আক্রমণ প্রতিহত করলেও বিদ্রোহীরা তার অপসারণ দাবি করেন। বিদ্রোহীদের দাবি অনুযায়ী খলিফা আব্দুল্লাহকে অপসারণ করে মুহম্মদ-বিন-আবু বকরকে মিশরের খলিফা নিয়োগ করেন।
সিরিয়ার গভর্নর সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া ওমর (রা.) কর্তৃক নিযুক্ত। তিনি উসমান (রা.)-এর সময় উক্ত পদে বহাল ছিলেন। মুয়াবিয়া একজন সুযোগ্য শাসক ছিলেন। যেহেতু তিনি খলিফার আত্মীয় ছিলেন সেহেতু বিদ্রোহীরা এ ব্যাপারেও খলিফাকে স্বজনপ্রীতির অভিযোগে অভিযুক্ত করেন।
মূল্যায়ন: খলিফা উসমান (রা.) যদিও কয়েকটি প্রদেশের গভর্নর পরিবর্তন করে নতুন গভর্নর নিয়োগ করেন কিন্তু তিনি অযোগ্য আত্মীয়কে নিয়োগ দেন নি। তিনি যোগ্যদেরকে গভর্নর নিয়োগ করেন এর মধ্যে দুএকজন আত্মীয় ছিল। কিন্তু জনগণ দাবি এবং অভিযোগ করলে তাদের বরখাস্ত করতেন। আর তিনি যখন জনপ্রিয় শাসক ছিলেন তখন এসব নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং তাও মাত্র কুফা, বসরা ও মিশরে- অন্যান্য প্রদেশে নয়।
কুরআন শরিফ দধীভূতকরণ হযরত উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম কুরআন শরিফ দখীভূতকরণ। তাদের অভিযোগ, হযরত উসমান কুরআন শরিফ পুড়িয়ে ফেলেছেন। তাদের এ অভিযোগ অসত্য ও অযৌক্তিক। কারণ ওমর (রা.)-এর আমলে মুসলিম সাম্রাজ্য সম্প্রসারিত হয়। উসমান (রা.)-এর সময় বৃহৎ সাম্রাজ্যের মধ্য হতে বিভিন্ন ভাষায় কুরআন শরিফ পাঠ, উচ্চারণ ও আবৃত্তিতে মতপার্থক্য দেখতে পান। উসমান (রা.) বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে যায়েদ-বিন-সাবেত-এর নেতৃত্বে কুরআন সংরক্ষণ ও সংস্করণ কমিটি গঠন করেন। এ কমিটি বিবি হাফসার নিকট রক্ষিত কুরআনের মূল পাণ্ডুলিপির সঙ্গে মিলিয়ে কুরআন তৈরি করেন। অপ্রামাণ্য ও সামঞ্জস্যহীন কপিগুলো ভস্মীভূত করেন। কিন্তু সকলেই তার এ কার্যের প্রশংসা করলেও কিছু স্বার্থান্বেষী মহল হযরত উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে কুরআন অপমানের অভিযোগ এনে বিদ্রোহ করেন। কিন্তু তাদের এ অভিযোগ সত্য নয়, কারণ কুরআন বিশুদ্ধকরণ অভিযান ছিল সঠিক।
বায়তুলমালের অর্থ আত্মীয়স্বজনকে দান হযরত উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, তিনি রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিলিয়েছেন। বিশেষ করে উমাইয়াদের রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি দিয়ে দেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ সঠিক বলে ঐতিহাসিক হিট্টি, মাসুদী, মুইর মন্তব্য করেন। নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করলে হযরত উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও মিথ্যা, কারণ হযরত উসমান (রা.) অত্যন্ত সরল প্রকৃতির ছিলেন। তাঁর নিজের অর্থই তিনি বিলিয়ে দিতেন। ইসলামের খেদমতে ব্যক্তিগত সম্পদ দুহাতে বিলিয়ে দেন। তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদের এক দিরহামও গ্রহণ করেন নি। ব্যক্তিগত কার্যে রাষ্ট্রীয় সম্পদকে হালাল মনে করেন নি। তাই তাঁর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ সত্য নয়। তবে উমাইয়ারা কিছু কিছু রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগত করেন- যা হযরত উসমান (রা.)-এর অজ্ঞাতসারে। আর এর জন্য খলিফাকে দোষারোপ করা যায় না।
সরকারি চারণভূমি নিজস্ব কার্যে ব্যবহার: খলিফার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ ছিল চারণভূমি নিজস্ব পশুপালনের কার্যে ব্যবহার এবং সরকারের চারণভূমিতে জনসাধারণের উট ও ঘোড়া চরানো নিযেধ করেছিলেন। বস্তুত এ অভিযোগও মিথ্যা। কারণ এ ব্যবস্থা পূর্ববর্তী দুই খলিফার আমলে ছিল। সরকারি চারণভূমিতে সরকারি কার্যে ব্যবহৃত উট ও ঘোড়া চারণের জন্য সংরক্ষণ করা হতো। খলিফা শুধু তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র। তিনি ব্যক্তিগত কার্যে কোনোদিনই সরকারি ভূমি ব্যবহার করেননি।
আবু যার আল-গিফারীকে নির্বাসন: আবু যার আল-গিফারী ছিলেন একজন সাধক পুরুষ এবং হযরত মুহম্মদ (স.)-এর প্রিয়তম সাহাবি। তিনি মুসলমানদের জাঁকজমক ও বিলাসবহুল জীবনযাপন পছন্দ করতেন না। তাঁর মতে, মুসলমানগণ সাদাসিধা ও অনাড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন করবে। ধন-সম্পদ সঞ্চয় করার জন্য নয়, এটি জনহিতকর কার্যে ব্যয় করার জন্য। যারা সম্পদ জমা করবে তারা দোযখে যাবে, তাদের স্থান দোযখ। কিন্তু কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে যাকাত দেওয়ার'পর সম্পদ জমা করা বৈধ। আবু যার প্রথমে সিরিয়াতে তাঁর মতবাদ প্রচার করে খলিফার বিরুদ্ধে জনগণকে উত্তেজিত করে তোলেন। সিরিয়ার গোলযোগ এড়ানোর জন্য মুয়াবিয়া কৌশলে তাঁকে মদিনায় খলিফার নিকট প্রেরণ করেন। খলিফা উসমান (রা.) আবু যারকে বুঝাতে চেষ্টা করেন যে জাকাত প্রদানের পর ধন সঞ্চয় বৈধ কিন্তু তিনি খলিফার উপদেশ উপেক্ষা করে মদিনাতে তাঁর মতবাদ প্রচার করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে খলিফা আবু যারকে রাবাযাতে নির্বাসন দেন। দুর্ভাগ্যবশত নির্বাসিত থাকাকালে আবু যার মৃত্যুবরণ করেন। বিদ্রোহীরা এটাকে একটা সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং জনগণকে খলিফার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলেন। নিরপেক্ষ বিচারে খলিফা কর্তৃক আবু যরের নির্বাসন ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
কাবাগৃহ সম্প্রসারণ: খলিফা ওমর (রা)-এর সময় কাবাগৃহ সম্প্রসারণের কাজ আরম্ভ হয় এবং খলিফা উসমান (রা.)-এর সময় ৬৪৭ খ্রিষ্টাব্দে তা সমাপ্ত হয়। কাবাগৃহ সম্প্রসারণের সময় যে লোকের গৃহ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল তারা ইসলামি আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ওমর (রা.)-এর কাছে কোনোরূপ ক্ষতিপূরণ দাবি করে নি। খলিফা উসমান (রা.)-এর সরলতার সুযোগে ঐসব লোক বিদ্রোহ করে কিন্তু খলিফা তাদের দাবি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিতে স্বীকার করলেও পরবর্তীতে তারা ক্ষতিপূরণ নিতে অস্বীকার করে সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য খলিফা তাদেরকে বন্দী করেন।
ইবাদত প্রসঙ্গ: হজের সময় ইয়েমেনের মানুষ মিনা ও আরাফাতে কয়েক রাকাত নামাজ বেশি করে পড়তেন। ইতিপূর্বে এ ধরনের অতিরিক্ত নামাজ পড়ার চল ছিল না। খলিফা ওসমান (রা.) ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অতিরিক্ত নামাজ পড়া দেখে আকৃষ্ট হন এবং সকলকে পড়তে অনুরোধ করেন। এ কারণে কিছু সংখ্যক সাহাবা খলিফার বিরুদ্ধাচারণ করেন। এতে খলিফা এতটুকু দোষের কিছু করছেন বলে মনে হয় না। কেননা মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে অর্থ ব্যয় করে হজ করতে যান ইবাদতের জন্য। তাতে বেশি হলে দোষের কিছু নেই।
হযরত ওসমান (রা.) মক্কায় গিয়ে কসর (সংক্ষিপ্ত) নামাজ পড়তেন না। তিনি পুরা নামাজ পড়তেন। এ বিষয়ে তিনি জিজ্ঞাসিত হলে, উত্তরে বলেছিলেন, "আমি মক্কাতে নিজকে প্রবাসী মনে করি না। তাই পুরা নামাজ পড়ি।" এতে কিছু :: মানুষ অকারণে তার উপর অসন্তুষ্ট হন। বস্তুত খলিফার এ ব্যাপারে কোনো অন্যায় দেখা যায় না। বরং এতে তাঁর ধার্মিকতার পরিচয় মেলে।
বিভিন্ন প্রদেশের শাসনকর্তাগণের বিরুদ্ধে অভিযোগ খলিফার নিকট বিভিন্ন প্রদেশ হতে প্রাদেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে। খলিফা পরবর্তী হজের সময় অভিযোগকারীদের অভিযোগসহ তাদেরকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। কারণ হজের সময় সকল শাসনকর্তা হাজির হন। কিন্তু অভিযোগকারীরা কেউই উপস্থিত হন নি। এতেই প্রমাণ হয় অভিযোগকারীদের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। সরলমতি খলিফার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো ছিল ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক। জনসাধারণ বৃদ্ধ খলিফাকে ভুল বুঝে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং তাঁকে নির্মমভাবে শহিদ করে।
"হযরত উসমান (রা.)-এর হত্যার কারণ [Causes of Murder of Hazrat Osman (R)]
হযরত উসমান (রা.)-এর হত্যার কারণগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো:
হাশেমী ও উমাইয়া গোত্রের বিরোধ: এক শতাব্দীকাল প্রায় বনু হাশেমী ও বনু উমাইয়া গোত্রের মধ্যকার বিরোধ সুপ্ত ছিল।
হযরত মুহম্মদ (স.), আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-এর রাজত্বকালে ইসলামের সাম্যের বাণীতে তারা একতাবদ্ধ ছিল। খলিফা উসমান (রা.)-এর আমলে কুফা, বসরা ও মিশরে কতিপয় বিদ্রোহী উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এ গোত্রীয় প্রতিহিংসা ** হযরত উসমান (রা.)-এর হত্যাকে ত্বরান্বিত করে।
হযরত আলী (রা.)-এর সমর্থকদের প্ররোচনা: খুলাফায়ের তৃতীয় খলিফা গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত হলেও হযরত আলী (রা.)-এর সমর্থকগণ এ নিয়োগকে অবৈধ বলে। তাদের দাবি হযরত আলী (রা.) মহানবি (স.)-এর স্বগোত্রীয় এবং জামাতা, তাই খিলাফতের যুক্তিসঙ্গত দাবিদার হযরত আলী (রা.)। ফলে হযরত উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহ করে।
"আনসার-মুহাজেরদের মধ্যে বৈষম্য: হযরত ওমর (রা.)-এর আমলে আনসার ও মুহাজেরদের মধ্যে সদ্ভাব ছিল। কিন্তু হযরত উসমান (রা.)-এর আমলে মুহাজেররা অবহেলিত হতে থাকে, এমনকি মজলিস-উস-সুরার সদস্য পদ হতে তাদের বাদ দেয়া হতো- যা পরবর্তীকালে হযরত উসমান (রা.) হত্যায় ইন্ধন যোগায়।
গণতান্ত্রিক শাসন: মদিনায় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ায় জনসাধারণকে তা মেনে চলতে হতো। মহানবি (স.)- এর ও খলিফা আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা)-এর আমলে এ ব্যবস্থা চালু ছিল। অবাধ মেলামেশা, বাক-স্বাধীনতা, সমালোচনার পূর্ণ অধিকার থাকায় বিদ্রোহীরা উসমান (রা.)-এর খিলাফতে নিজ নিজ স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সাম্রাজ্যের সর্বত্র অশান্তির অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করে তোলে।
ইবনে সাবার অপপ্রচার: মুনাফেক ইবনে সাবাহ নিজের স্বার্থে অন্ধ হয়ে হযরত আলী (রা.)-এর পক্ষে এবং উসমান (রা.)-এর বিপক্ষে অপপ্রচার চালাতে থাকে। তাঁর মতে হযরত মুহম্মদ (স.)-এর জামাতা আলী (রা.) খিলাফতের একমাত্র দাবিদার। অপর তিনজন আলীকে অবৈধভাবে বঞ্চিত করে খলিফা নিযুক্ত হয়েছে। ইবনে সাবার অপপ্রচারের ফলে কুফা ও বসরায় উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষিত হয়।
খলিফার সরলতা: খলিফা উসমান (রা.) একজন উদার ও সরল প্রকৃতির লোক ছিলেন। বিদ্রোহীরা খলিফার সরলতাকে তাঁর দুর্বলতা ধরে নিয়ে বিদ্রোহ করে। তারা অল্প কিছুতেই বিদ্রোহ করতে সাহস পায় কিন্তু ইসলামের এই সংকটময় মুহূর্তে হযরত উসমান (রা)-এর বলিষ্ঠ ও কঠোর প্রকৃতির হওয়া প্রয়োজন ছিল।
অমুসলিমদের অসন্তোষ: মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিক- ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ম্যাজিয়ান সম্প্রদায়ের লোকেরা পূর্ণ ধর্মীয় ও নাগরিক স্বাধীনতা ভোগ করেন। কিন্তু মুসলিম শাসন তাদের কাছে যন্ত্রণাস্বরূপ মনে হতো। তাই তারা উসমান (রা.)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সাহায্য ও সহযোগিতা করে।
কুরাইশ-অকুরাইশ দ্বন্দ্ব: ইসলামের বিজয়াভিযানে কুরাইশগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অকুরাইশ মুসলমানগণ যুদ্ধ করেন। কিন্তু হযরত উসমান (রা.) কুরাইশদের মক্কার পরিবর্তে ইরাকের ভূমি দান করেন। অমুসলিম প্রজারাও ইরাকি ভূমির দাবিদার ছিল কিন্তু তারা কেউ উক্ত ভূমি পায়নি। ফলে অকুরাইশরা খলিফা উসমান (রা.)-কে পক্ষপাতিত্বের দোষে অভিযুক্ত করেন।
কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে যাযাবর আরববাসীরা কেন্দ্রীয় শাসনে অভ্যস্ত ছিল না। তারা সব সময় স্বাধীনভাবে কার্য পরিচালনা করত কিন্তু খিলাফতকালে ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক কেন্দ্রীয় শাসন মেনে চলতে হতো। অনভ্যস্ত যাযাবরদের বিরোধই ছিল তাঁর হত্যার অন্যতম কারণ।
উমাইয়াদের প্রাধান্য ও মারওয়ানের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ খলিফা উসমান (রা.)-এর রাজত্বকালে প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন মারওয়ান। তাঁর স্বার্থপর কার্যকলাপের জন্য সাম্রাজ্যের সর্বত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। খলিফার সরলতার সুযোগে তিনি উমাইয়াদের সকল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসান। হাশেমীদের ধনে-মনে দুর্বল করে উমাইয়াদের সুপ্রতিষ্ঠিত করা মারওয়ানের নীতি ছিল।
উসমান (রা.) হত্যার ঘটনা বিদ্রোহীরা কুফা ও মিশরের গভর্নরের পরিবর্তনের জন্য হযরত উসমান (রা.)-কে চাপ দিলে খলিফা উসমান তাদের দাবি মেনে নেন এবং স্ব স্ব স্থানে ফিরে যেতে নির্দেশ দেন, কিন্তু ফেরার পথে বিদ্রোহীরা মারওয়ানের জাল করা খলিফার পত্র উদ্ধার করেন। সেখানে লেখা ছিল বিদ্রোহীরা স্ব স্ব স্থানে ফিরে গেলে প্রাদেশিক গভর্নরগণ তাদেরকে হত্যা করবে। তাই বিদ্রোহীরা ক্ষিপ্ত হয়ে পুনরায় মদিনাতে ফিরে আসেন এবং ইবনে সাবাহ্ হযরত আবু বকর (রা.)-এর পুত্র মুহাম্মদের নেতৃত্বে উসমান (রা.)-এর গৃহে জোরপূর্বক প্রবেশ করে উসমান (রা.)-কে হত্যা করেন। খলিফাকে রক্ষা করতে গিয়ে তাঁর স্ত্রী লায়লা হাতের আঙুল হারান। পি. কে. হিট্টি বলেন, অর্থাৎ "Thus fell the first Khalifa whose blood was shed by Moslem hands." "ইতিহাসে এভাবে মুসলমানদের দ্বারা রক্তপাতে নিহত তিনিই প্রথম খলিফা।"
হযরত উসমান (রা.) হত্যার ফলাফল [Effects of Murder of Hazrat Osman (R)]
হযরত উসমান (রা.) হত্যার ফলাফল ইসলামের ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী ঘটনা। জার্মান ঐতিহাসিক ওয়েল হাওসেন বলেন, "The murder of Uthman was more epoch-making than almost any other event of Islamic History." অর্থাৎ "হযরত উসমান (রা.)-এর হত্যা ইসলামের ইতিহাসে যে কোনো ঘটনা অপেক্ষা অধিকতর যুগান্তকারী।"
খিলাফতের পবিত্রতা নষ্ট হযরত উসমান (রা.)-এর শাহাদাত বরণের ফলে খিলাফতের প্রতি জনসাধারণের শ্রদ্ধাবোধ ক্রমশ শিথিল হয়ে পড়ে। খোদাবক্সের ভাষায়, "উসমান (রা.)-এর নৃশংস হত্যা সর্বকালের জন্য একটা পবিত্রতা বিনষ্ট করে।"
গৃহযুদ্ধের সূচনা: জোসেফ হেলের মতে, "The murder of Uthmon was a signal of civil war", অর্থাৎ "উসমান হত্যা ছিল গৃহযুদ্ধের সংকেতস্বরূপ।" এর ফলে মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট হয়। পরবর্তীকালে সিফফিনের যুদ্ধ, উষ্ট্রের যুদ্ধ ও কারবালা হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। ওয়েল হাওসেন আরও বলেন, উসমান (রা.)-এর হত্যার জন্য গৃহযুদ্ধের কপাট খুলে যায় এবং তা কখনো বন্ধ হয়নি। হাসেমী ও উমাইয়া বিরোধ চরম আকার ধারণ করে।
মদিনার প্রাধান্য লোপ: ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু মদিনার প্রাধান্য ও গৌরব লোপ পায়। মক্কা-মদিনার পরিবর্তে প্রাধান্য পায় কুফা, দামেস্ক, ফুসতাত, বসরা, বাগদাদ প্রভৃতি শহরসমূহ। পরবর্তী কালে উমাইয়া খলিফাগণ বনু হাশেম গোত্রকে বিকৃতভাবে চিত্রিত করে, কালচক্রে হাশেম বা আব্বাসীয় খলিফাগণও অনুরূপভাবেই উমাইয়াদের চিত্রিত করে। এজন্য গর্হিত কাজের পালা বদলের মূলে ছিল খলিফা ওসমান (রা.) হত্যা।
গণতন্ত্রের সমাধি ও রাজতন্ত্রের সূচনা: হযরত উসমান (রা.)-এর হত্যার ফলে গণতন্ত্র ধ্বংসের পথ সুপ্রশস্ত হয়। হযরত আলী (রা.) খিলাফতে এসে গণতন্ত্র বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু মুয়াবিয়া ক্ষমতায় এসে রাজতন্ত্রের প্রবর্তন করেন। ঐতিহাসিক খোদাবক্সের ভাষায়, "ঈশ্বরতন্ত্রকে রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত করে।"
মুসলিম সমাজ বিভক্তি: উসমান (রা.)-এর হত্যার ফলে মুসলিম ঐক্য বিনষ্ট হয়, মুসলমানরা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ খারেজি, শিয়া-সুন্নি ইত্যাদি।
হযরত উসমান (রা.) হত্যা ইসলামের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা কলঙ্কজনক ঘটনা। হযরত উসমান (রা.) হত্যার জন্য তিনি নিজে দায়ী ছিলেন না। কারণ তিনি সরল ও উদার প্রকৃতির ছিলেন। তাঁর সরলতার জন্য বিদ্রোহীগণ তাঁর বিরুদ্ধে সহজে বিদ্রোহ করতে সাহস পেয়েছে। তাঁর হত্যার পর মুসলমানগণ উমাইয়া-হাশেমী গোত্রে বিভক্ত হয়ে দীর্ঘ দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটায় 'এবং মুসলিম জাহান বহুযুগ পিছনে পড়ে।
হযরত উসমান (রা.)-এর চরিত্র ও কৃতিত্ব [Character and Achievements of Hazrat Osman (R)]
ইসলামের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ সাহাবি হযরত উসমান (রা.) ছিলেন সৎ ও সুন্দর চরিত্রের অধিকারী। তাঁর আশৈশব চারিত্রিক মাধুর্য, মহানুভবতা ও ন্যায়নিষ্ঠা অবিচল ছিল। সরলতা, কোমলতা, ধৈর্য, বিনয়, ধর্মভীতি, দানশীলতা ও সহনশীলতা ছিল তাঁর চরিত্রের ভূষণ। হযরত উসমান (রা.) ব্যক্তিগত জীবনে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনযাত্রাকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসরণ করে চলতেন। ধর্মপরায়ণতার দিক দিয়ে তিনি ছিলেন মহানবি (স.)-এর প্রতিচ্ছবি। বৃদ্ধবয়সেও নামাজের ইমামতি করতেন ও গভীর রাত পর্যন্ত আল্লাহর আরাধনায় মগ্ন থাকতেন। স্বীয় মহৎ চরিত্রের গুণে তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর) খুবই প্রিয়পাত্র ছিলেন। বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও খলিফা উসমান (রা.) নিরহঙ্কার ও অনাড়ম্বরপ্রিয় ছিলেন। বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের খলিফা হয়েও তিনি দরিদ্রের ন্যায় জীবনযাপন করতেন।
পূর্বেই উক্ত হয়েছে যে, হযরত উসমান (রা.) অত্যন্ত বিনয়ী, সরল ও কোমল প্রকৃতির লোক ছিলেন। এটাই ছিল তাঁর ব্যর্থতার প্রধান কারণ। খিলাফতের সংকটময় মুহূর্তে নেতৃত্বদানের চারিত্রিক দৃঢ়তা বৃদ্ধ বয়সে প্রায় লোপ পেয়েছিল। মাত্রাতিরিক্ত কোমলতা ও পারলৌকিক ভাবনায় বিহ্বল খলিফা দয়াপরবশ হয়ে প্রায়ই কঠিন অপরাধীকেও ক্ষমা প্রদর্শন করতেন। খলিফার দুর্বলতা, উদারতা ও বার্ধক্যের সুযোগ গ্রহণ করে দুষ্কৃতিকারীরা খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সাহস পায়।
খলিফা নিজেও অহেতুক রক্তপাত ও বিড়ম্বনার পক্ষপাতী ছিলেন না। ইসলামের বৃহত্তর ঐক্য ও সংহতির স্বার্থে বৃথা রক্তপাতকে উপেক্ষা করে স্বীয় জীবনকে উৎসর্গ করে খলিফা এক মহান ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
খলিফার সুদীর্ঘ এক যুগের শাসনকাল ইসলামের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা করে। ত্যাগ ও সাহসের মহিমায় ভাস্বর ইসলামি সাম্রাজ্য দ্রুত বিস্তার লাভ করে। তাঁর খিলাফতে আফগানিস্তান, তুর্কিস্তান, নিশাপুর, মার্ভ, সাইপ্রাস, রোম প্রভৃতি অঞ্চল মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। সাইপ্রাস ও আলেকজান্দ্রিয়ার নৌ-যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। খলিফার সুযোগ্য নেতৃত্বে রোমান, সিরিয়া ও মিশর আক্রমণ প্রতিহত হয়। এসব বিজয়ের ফলে মুসলিম সাম্রাজ্যের পরিসীমা উত্তরে কৃষ্ণসাগর ও পূর্বে গজনী পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে।
রাজ্য বিস্তারেই শুধু তাঁর কৃতিত্ব নিহিত ছিল না; শাসনে ও লালনে ততোধিক কৃতিত্বের দাবিদার ছিলেন। প্রজাদের মঙ্গল সাধনই ছিল এ মহান খলিফার একমাত্র কর্তব্য। তিনি কাবাগৃহের সম্প্রসারণ ও মদিনা মসজিদের সংস্কার সাধন করেন। তিনি মদিনার মসজিদটিকে পুনঃনির্মাণ করে তাতে কাঠের ছাদ ও প্রস্তরের স্তম্ভ সংযোজিত করেন।
মদিনা নগরীকে রক্ষা করার জন্য তিনি এক বিশাল বাঁধ নির্মাণ করেন। ইতিহাসে এটি মাহজুব বাঁধ নামে খ্যাত। মসজিদ, খাল, সরাইখানা ইত্যাদি নির্মাণ ছিল তার অসামান্য অবদান। মদিনায় অবস্থিত বনাত না-ইলাহ নামক খাল হতে আরসায় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করে তিনি উক্ত স্থানকে চাষের উপযোগী করে তোলেন। কাবাগৃহের পার্শ্ববর্তী কতকগুলো বাড়ি-ঘর ক্রয় করে তা সম্প্রসারণ করেন। ফিদকের রাজস্ব পথচারীদের জন্য ব্যয় ও জিম্মিদের রাজস্ব হ্রাস তাঁর অসামান্য কীর্তি। খলিফা দুহু ও গরিবদের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। অনাথ-আতুর, বিধবা, দরিদ্র ও অসহায়দের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতেন এবং অকাতরে তাদের মধ্যে স্বীয় অর্জিত অর্থ বিতরণ করতেন। তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে যে, তাঁরই প্রচেষ্টায় কুরআনের ধারাবাহিক সংকলন প্রথম প্রকাশিত হয়। তিনি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে কুরআন শরিফ পাঠ, আবৃত্তি ও উচ্চারণে অসামঞ্জস্য ও পার্থক্য লক্ষ করে জায়েদ-বিন-সাবিতের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ বোর্ড গঠন করেন এবং তাঁদের দ্বারা একটি নির্ভুল সংস্করণ প্রকাশ করে সাম্রাজ্যের সর্বত্র বিতরণ করেন। তিনি এ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে হয়তোবা অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের ন্যায় কুরআন বিকৃত হয়ে যেত। উম্মতে মুহম্মদীও বিভেদ-বৈষম্যের বেড়াজালে নিপতিত হতো। পবিত্র কুরআনের সংকলন ও রক্ষায় হযরত উসমান (রা.)-এর অবদান ইসলামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
খুলাফায়ে রাশেদিন - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

