• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • খুলাফায়ে রাশেদিন
খুলাফায়ে রাশেদিন

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

খলিফা হযরত আলী (রা.) (৬৫৬-৬৬১ খ্রি.)

হযরত আলী (রা.)-এর জন্ম ও ইসলামি জীবন: ৬০০ খ্রিষ্টাব্দে হযরত আলী (রা.) মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশের হাশেমী গোত্রে জন্মলাভ করেন। তাঁর পিতা আবু তালেব এবং মাতা ফাতিমা উভয়েই বনু হাশিম গোত্রের লোক ছিলেন। তাঁর ডাক নাম ছিল আবুল হাসান এবং আবু তোরাব। এই গোত্রের উপর কাবাগৃহের তত্ত্বাবধানের ভার ন্যস্ত ছিল। কুরাইশদের মধ্যে আবু তালিব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন এবং তাদের বিভিন্ন বিষয়ে যথেষ্ট প্রভাব ছিল। কিন্তু একটা বিরাট পরিবার প্রতিপালন করার কারণে কালক্রমে তিনি আর্থিক সংকটে পতিত হন। তাঁকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে তাঁর ভাই আব্বাস জাফর (রা.) এবং রাসুলুল্লাহ (স.) আলী (রা.)-এর লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর একান্ত সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। সুঠাম দেহের অধিকারী হযরত আলী (রা.) বীরত্বের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। হযরত মুহম্মদ (স.)-এর নবুয়ত প্রাপ্তির পর ইসলাম প্রচার শুরু করলে ১০ বছর বয়সে ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে হযরত আলী (রা.) ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। যুবকদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

হযরত আলী (রা.) ও মুয়াবিয়ার মধ্যকার গৃহযুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। এই গৃহযুদ্ধ শুধু মুসলিম 'সমাজকেই কলঙ্কিত করেনি, মুসলিম শাসন ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটায়। হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে সংঘটিত গৃহযুদ্ধ সিফফিনের যুদ্ধ নামে পরিচিত।

হযরত আলী (রা.)-এর খিলাফত লাভ হযরত উসমান (রা.) হত্যার পর ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে হযরত আলী (রা.) মুসলিম জাহানের খলিফা নির্বাচিত হন। তাঁর সিংহাসন লাভের পর খুলাফায়ের শাসন ব্যবস্থায় কতিপয় পরিবর্তন সংঘটিত হয়। তিনি কুফায় রাজধানী স্থানান্তর করেন। অতঃপর বিশৃঙ্খলাপূর্ণ সাম্রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন কিন্তু তাঁর ঐ সকল পদক্ষেপে বাধ সাধেন সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া (রা.)। ঐতিহাসিক ক্রেমার বলেন, "যদি আলী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে কোনো সংঘর্য না হতো তাহলে মুসলমানদের ভবিষ্যৎ ভাগ্য আরও প্রীতিকর এবং সম্ভবত অধিকতর সাফল্যমণ্ডিত হতো।"

উসমান হত্যাকারীদের বিচারের সম্মুখীন এবং এর পরিমাণ হযরত আলী (রা.) খিলাফতে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের অনুসন্ধান করে বের করা এবং তাদের থেকে কেসাস আদায় করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তাঁর এ উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। হযরত আলী (রা.)-এর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না। তবুও এক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়। উপযুক্ত সাক্ষীর অভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে অভিযুক্ত করা যাচ্ছিল না। কিন্তু সাধারণ সাহাবীদের ন্যায় অনেক বিশিষ্ট সাহাবীও খলিফা ও খেলাফতের চলমান পরিস্থিতি বিবেচনা না করে তাৎক্ষণিকভাবে হযরত উসমান হত্যার কেসাস গ্রহনের জন্য খলিফাকে চাপ দিতে থাকেন। আবেগের আতিশয্যে হযরত আলী (রা.)-এর এ অক্ষমতার প্রতি কারো দৃষ্টি ছিল না। হযরত তালহা ও যোবায়ের (রা.) এবং আরও কতিপয় সাহাবী হযরত আলী (রা.)-এর খেদমতে আরজ করলেন, উসমান হত্যার সাথে যে দলটি জড়িত তাদের থেকে কেসাস গ্রহণ করা আবশ্যক। তিনি বলেন, তোমরা যা বলছ সে ব্যাপারে আমিও নিশ্চিত। এমন একটি দলের ব্যাপারে আমি কী করতে পারি, যাদের ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই? খলিফার এ কথা বলার পরও ঐসকল সাহাবি কেসাসের জন্য খলিফাকে চাপ দিতে থাকে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।

মুয়াবিয়ার পদচ্যুতি এবং তাঁর বিদ্রোহ: হযরত উসমান (রা.)-এর হত্যার ঘটনাটি পরীক্ষা নিরীক্ষা ও তদন্তের পর্যায়ে রেখে - হযরত আলী (রা.) দেশে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দিকে মনোনিবেশ করেন। উসমান (রা.)-এর সময়কার কয়েকজন বিশেষ প্রাদেশিক শাসনকর্তার কারণে দেশে যোগাযোগ চলছিল। এজন্য তিনি হযরত ওমর (রা.)-এর অনুসরণে কয়েকজন প্রাদেশিক গভর্নরকে অপসারণের আদেশ জারি করেন। সিরিয়ার নবনিযুক্ত গভর্নর হযরত সাহল বিন হোনায়ফ তাবুক পর্যন্ত গিয়ে জানতে পারেন, সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া (রা.) তাঁর আমীর পদ ছাড়তে এবং হযরত আলী (রা.)-কে খলিফা হিসাবে স্বীকার করে নিতে রাজি নন; বরং তিনি উসমান হত্যার প্রতিশোধ নিতে দৃঢ়সংকল্প। তিনি হযরত ওসমানের রক্তাক্ত জামা ....এবং নায়েলার কর্তিত আঙুলসমূহ জনগণকে দেখিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাদের উত্তেজিত করছেন। হাজার হাজার ... সিরিয়াবাসী শপথ নিয়েছে, উসমান হত্যার পরিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত তারা তলোয়ার কোষবদ্ধ করবে না। সাহল (রা.) ফিরে এসে হযরত আলী (রা.)-কে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন।

হযরত আলী (রা.) বাইয়াত সম্পর্কে মুয়াবিয়ার সাথে চিঠিপত্র আদান প্রদান শুরু করেন। কিন্তু ফল কিছুই হলো না; বরং ... জানতে পারেন, মুয়াবিয়া (রা.) বিরাট ফৌজ গঠন করে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। হযরত আলী (রা.) ও .... তাঁর পুত্র মুহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়ার নেতৃত্বে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুতি গ্রহণের আদেশ দেন। ইমাম হাসান (রা.) তখন কেন্দ্র * থেকে বাইরে গিয়ে কোনো গভর্নরের সাথে যুদ্ধ করার পক্ষপাতী ছিলেন না, কিন্তু হযরত আলী (রা.) তাঁর এ পরামর্শ গ্রহণ করেননি।

গৃহবিবাদ: খলিফা আলী (রা.) মদিনার ইবনে আব্বাসকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে ৩৬ হিজরিতে সিরিয়ার পথে বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হন। কয়েকজন দূরদর্শী সাবধানী সাহাবী ছাড়া অধিকাংশ মদিনাবাসী তাঁর সাথি হন। পথিমধ্যে তিনি সংবাদ পেলেন হযরত আয়েশা, তালহা ও যোবায়ের (রা.) এর নেতৃত্বে মক্কাবাসী উসমান হত্যার প্রতিশোধ দাবি করেছেন। সুতরাং হযরত ...আলী (রা.) মক্কা শরীফ যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

উষ্ট্রের যুদ্ধ ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ: হযরত আয়শা (রা.) মারওয়ান ও তার সহযোগীদের দ্বারা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে খলিফার প্রতি রাগন্বিত হন। অতঃপর হযরত আয়েশ (রা.), তালহা ও যোবায়ের (রা.) সহ দেড় হাজার সৈন্য নিয়ে খলিফা আলী (রা.)-এর মোকাবেলায় রওয়ানা হন। তাঁরা বসরা থেকে রসদ ও ফৌজ সংগ্রহ করা ভালো মনে করলেন। হযরত আয়েশা (রা.) ৩৬ হিজরীর রবিউস সানি মাসে বসরা পৌঁছেন। বসরায় আলী (রা.)-এর নিযুক্ত গভর্নর (আমেল) ওসমান ইবনে হোনায়ফ হযরত আয়েশা (রা.)-এর বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করেন, কিন্তু তিনি বন্দি হন।

এদিকে আলী (রা.) রসদ ও ফৌজ সপ্তাহের জন্য মক্কা শরীফে যাওয়ার পরিবর্তে বসরা অভিযানে রওয়ানা হন। তিনি কুফায় পৌঁছলে সেখানকার গভর্নর আবু মুসা আশয়ারী (রা.) হযরত আলী (রা.)-এর সাথে যোগদানে অস্বীকৃতি জানান। অবশ্য কাকা ও অন্যান্যের প্রচেষ্টায় নয় হাজার কুফাবাসী হযরত আলী (রা.)-এর সাথি হন। হযরত আলী (রা.)-এর বাহিনী বসরার নিকটবর্তী হলে তিনি জানতে পারেন, বসরা পূর্বেই হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)-এর বাহিনী দখল করে নিয়েছে। তখন আমীরুল মুমিনীন হযরত আলী (রা.) যীকারে শিবির স্থাপন করেন। সেখানে কাকার মধ্যস্থতায় মীমাংসার কথাবার্তা চলতে থাকে। কিন্তু মুনাফিক ইবনে সাবার সমর্থকরা যারা কপটভাবে আলী (রা.)-এর বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তারা আলোচনা ফলপ্রসূ হতে দেয়নি। তাই উভয় পক্ষ খায়বার নিকটবর্তী ময়দানে পরস্পরের মুখোমুখি হয়। যুদ্ধের ময়দানে আলী (রা.)-এর বিভিন্ন কথায় তালহা, যোবায়ের ও আয়েশা সিদ্দীকা (রা.)-এর ইচ্ছা হয়েছিল, তাঁরা যুদ্ধ করবেন না। তাঁদের মধ্যে সন্ধির বিশ্বাসও জন্মেছিল, কিন্তু এ সন্ধি ছিল ওসমান হত্যার ঘটনার নেপথ্য নায়ক মুনাফিক ইবনে সাবার অনুসারীদের জন্য বিপজ্জনক। তাই তারা রাতের অন্ধকারে হযরত আয়েশা (রা.)-এর সৈন্যদের ওপর আক্রমণ চালায়। হযরত তালহা ও যোবায়ের (রা.) সৈন্য শিবিরের বাইরে এসে জিজ্ঞেস করেন, গোলযোগ কিসের? সিপাহীদের পক্ষ থেকে বলা হলো, আলীর সৈন্যরা আক্রমণ করেছে। তখন উভয়েই বলেন, আফসোস। আলী (রা.) মুসলমানদের রক্তারক্তি থেকে বিরত হলেন না। অন্যদিকে হযরত আলী (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, গোলযোগ কীসের? কয়েকজন সাহাবী উত্তর দিল, তালহা ও যোবায়েরর সৈন্যরা আক্রমণ করেছে। হযরত আলী (রা.) বলেন, আফসোস। তালহা ও যোবায়ের মুসলমানদের রক্তারক্তি থেকে বিরত হলো না। উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হয়। হযরত যোবায়ের (রা.) যুদ্ধের প্রথমেই রণাঙ্গন ত্যাগ করে বসরার দিকে চলে যান। পথিমেধ্য ওমর ইবনে হরমুযান তাঁকে হত্যা করে। হযরত তালহাও আত্মঘাতী যুদ্ধ থেকে পিছু হটছেন দেখে মারওয়ান তাঁকে তীরবিদ্ধ করে হত্যা করে।

তখন মাঠে একমাত্র হযরত আয়েশা (রা.) উটের পিঠে উপবিষ্ট ছিলেন। উটের রশি ছিল হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যোবায়েরের হাতে, তিনিও আহত হন। সাত দিন পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকে। কাব ইবনে যুর হযরত আয়েশা (রা.)-কে বলেন, "না-হক যুদ্ধ হচ্ছে, যুদ্ধ বন্ধের আদেশ দিন।" হযরত আয়েশা (রা.) যুদ্ধ মুলতবির আদেশ দেন। ঘোষক যখন এ আদেশ ঘোষণার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিলেন তখন জনৈক সাবঈ তীর নিপেক্ষ করে তাঁকে হত্যা করে। যুদ্ধ চলতেই থাকে। হযরত আলী (রা.) দেখলেন, হযরত আয়েশার উট বসানো না গেলে যুদ্ধ বন্ধ করা যাবে না। তাই তিনি হযরত আয়েশার উটের পা কেটে দেওয়ার আদেশ দেন। তা-ই করা হয়। আমীরুল মুমিনীনের অনুসারীরা সসম্মানে উম্মুল মুমিনীনের গদি তুলে নেন, কিন্তু তাঁর শরীরে কোনো আঘাত লাগেনি। এ যুদ্ধে দশ হাজারের মতো মুসলমানের প্রাণহানি ঘটে। এ সময় হযরত আলী (রা.) ঘোষণা করেন, "পলায়নপর কারো ওপর আক্রমণ করবে না, কোনো আহতকে হত্যা করবে না, কাউকে বন্দি করবে না, কারো কোনো জিনিস ছিনতাই করবে না, কারো সম্পদ লুট করবে না। অস্ত্র সংবরণকারী এবং গৃহের দরজা বন্ধকারীরা নিরাপদ।:" এ ঘোষণার সাথে সাথে হযরত আলী (রা.)-এর সৈন্যরা যুদ্ধবিরতি করে। কেউ কেউ এসে হযরত আলী (রা.)- কে জিজ্ঞেস করল, "আমীরুল মুমিনীন, তাদের সম্পদই যদি আমাদের জন্য বৈধ না হয়, তাহলে তাদের সাথে লড়াই করাটা কি করে বৈধ হলো? তিনি বললেন, "মুসলমানদের না বন্দি করা যায়, আর না তাদের মাল গনীমত হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তবে যেসব অস্ত্র দ্বারা তারা যুদ্ধ করেছে সেসব আটক করবে। তোমাদের যা নির্দেশ করা হলো তা পালন করবে। যা থেকে নিষেধ করা হয়েছে তা থেকে বিরত থাকবে।"

ভুল বোঝাবুঝির সমাধান: খলিফা হযরত আলী (রা.) হযরত আয়েশা (রা.)-এর অবস্থা জানার জন্য আবদুল্লাহ বিন খালক খোযায়ীর বাসগৃহে উপস্থিত হন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, "আম্মা, আপনার শরীর কেমন আছে? হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, ভালোই আছি।" হযরত আলী (রা.) বললেন, আল্লাহ আমাদের উভয়কে মাফ করুন। উত্তরে হযরত আয়েশা (রা.)-ও একই শব্দে জবাব দেন।

কিছুদিন হযরত আয়েশা (রা.) বিশ্রাম গ্রহণের পর হযরত আলী (রা.) মুহাম্মদ বিন আবু বকরকে হুকুম দিলেন, সম্মানের সাথে তাঁকে যেন মক্কা শরীফে পৌঁছে দেয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে সওয়ারী, পথখরচ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীও তাঁর খেদমতে হাজির করা হয়। হযরত আয়েশা (রা.)-এর যেসব সাথি তাঁর সাথে যেতে চান, তাঁদেরও যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। বসরার পুলিশদের সম্মানিত মহিলাদের সাথে দেয়া হয়। বিদায়কালে আমীরুল মুমিনীন স্বয়ং তাঁদের কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে আসেন।

বিদায়কালে হযরত আয়েশা (রা.) জনগণের উদ্দেশ্যে বললেন, "আমার সন্তানেরা, সম্পূর্ণ ভুল বুঝাবুঝির ওপর ভিত্তি করে মূলত এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলাম। সুতরাং এখন আমাদের একের ওপর অপরের জুলুম করা ও প্রতিশোধ নেয়া ঠিক হবে না। আমার এবং আলী (রা.)-এর মধ্যে যা ঘটেছে তা সাধারণত কোনো ব্যাপারে ভুল বুঝাবুঝিতে যা হয় তাই। এছাড়া আমাদের মাঝে কোনো বিরোধ ছিল না। সর্বোপরি এখনো তিনি আমার নিকট অন্যতম মহৎ ব্যক্তিত্ব।"

উম্মুল মুমিনীনের এ ভাষণের পর হযরত আলী (রা.) বললেন, "উম্মুল মুমিনীন যথার্থই বলেছেন। আল্লাহর কসম, তাঁর এবং আমার মধ্যে এছাড়া মর্মবেদনার আর কিছুই ছিল না। তিনি দুনিয়া আখেরাত উভয় স্থানেই মহানবী (স.)-এর সম্মানিত পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এ সন্তোষজনক খোলামেলা আলোচনার পরই একে অপরের নিকট থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। আলী (রা.) হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথে হাসান এবং হোসাইন (রা.)-কেও প্রেরণ করেন।

সিফফিনের যুদ্ধ: সিফফিনের যুদ্ধের কারণগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো:

সিফফিনের যুদ্ধের কারণ:

হযরত আলী (রা.)-এর অদূরদর্শিতা খলিফা হওয়ার পরই হযরত আলী (রা.) সাম্রাজ্যের মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য কুফা, বসরা, মিশর ও সিরিয়ার অত্যাচারী শাসকদের পদচ্যুত করে নতুন গভর্নর নিয়োগ করেন। তবে সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া (রা.) খলিফার এ নীতির বিরোধিতা করেন।

বায়তুলমাল প্রথার পরিবর্তন হযরত উসমান (রা.)-এর সময় হযরত মুয়াবিয়া (রা.) ও উমাইয়াদের অনেকেই বিভিন্ন পন্থায় সরকারি সম্পত্তি ও জায়গির লাভ করেছিল। খলিফা হয়ে হযরত আলী (রা.) আইন জারি করে তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে নিলে উমাইয়াদের স্বার্থে আঘাত লাগে।

হাশেমী-উমাইয়া জঘ উমাইয়াগণ হাশেমী গোত্রের লোক হযরত আলী (রা.)-এর শাসন মেনে না নিয়ে আলী (রা.)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। উমাইয়ারা হযরত আলী (রা.)-কে পরাজিত করার জন্য হযরত মুয়াবিয়া (রা)-এর পক্ষাবলম্বন করেন।

মুয়াবিয়া (রা.)-এর উচ্চাভিলাষ: মুয়াবিয়া (রা.) ছিলেন উচ্চাভিলাষী। তিনি স্বীয় স্বার্থ হাসিল করার জন্য প্রচার করেন যে, হযরত উসমান (রা.) হত্যায় আলী (রা.) জড়িত আছেন। এ ব্যাপারে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য মুয়াবিয়া উসমান (রা.)-এর রক্তে রঞ্জিত পোশাক ও তাঁর স্ত্রীর খন্ডিত আঙ্গুল জনসম্মুখে প্রদর্শন করতে থাকেন এবং উসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের শাস্তি দাবি করেন।

সিফফিনের যুদ্ধের ঘটনা হযরত মুয়াবিয়া (রা.) পদত্যাগ করা তো দূরের কথা হযরত আলী (রা.)-কে খলিফা বলে স্বীকার করতে নারাজ। হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর এহেন আচরণের জন্য হযরত আলী (রা.) ৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ৫০,০০০ সৈন্য নিয়ে হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-কে শাস্তি দানের জন্য সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হন। সংবাদ শুনে হযরত মুয়াবিয়া (রা.) ৬০,০০০ সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হলে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে সিফফিন নামক স্থানে পরস্পর মুখোমুখী হন। উভয়ের মধ্যে কয়েকদিন তুমুল যুদ্ধ চলে।

মুয়াবিয়ার সন্ধির প্রস্তাব: কয়েকদিনের তুমুল যুদ্ধে উভয় দলের বিপুল সংখ্যক লোক ক্ষয় হয়। অবশেষে পরাজয় নিশ্চিত জেনে হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর বাহিনী পিছু হঠতে থাকে। হযরত মুয়াবিয়া (রা.) চিন্তিত হয়ে পড়েন। ঠিক এ মুহূর্তে আমর-বিন-আল-আসের পরামর্শে হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর সৈন্যগণ বর্ণা ও পতাকার অগ্রভাগে কুরআন শরিফ ঝুলিয়ে সন্ধি প্রার্থনা করেন।

কুরআন শরিফের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা: হযরত আলী (রা.)-এর সৈন্যবাহিনীতে অনেক কুরআনে হাফেজ ছিল। তারা কুরআনের মীমাংসার বিষয়টি চিন্তা করেন এবং যুদ্ধ বন্ধ করার পক্ষে মত পোষণ করেন। কিন্তু ১২,০০০ জন হযরত আলী (রা.)-এর অনুগামী সৈন্য মীমাংসার বিরোধিতা করেন। সকল দিক বিবেচনা করে হযরত আলী (রা.) অবশেষে মীমাংসায় রাজি হন।

দুমাতুল জন্দল মীমাংসা: যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা হয়। সালিসি করার জন্য দুমাতুল জন্দল উভয় পক্ষের বারো শত লোক একত্রিত হয়। হযরত আলী (রা.)-এর পক্ষে হযরত আবু মুসা-আল-আসারী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়া-এর পক্ষে হযরত আমর-বিন-আল-আস (রা.)-কে সালিসি নিয়োগ করা হলো। কুরআন-এর বিধান অনুসারে মীমাংসা করা হবে। হযরত আমর-বিন-আস (রা.) কৌশল অবলম্বন করে হযরত আবু মুসা (রা.)-কে বুঝায় যে, হযরত আলী (রা.) এবং হযরত মুয়াবিয়া (রা.) উভয়েই শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্টকারী, তাই তাদের উভয়কেই ক্ষমতা থেকে অপসারণের ঘোষণা দেন। এরপর হযরত আমর (রা.) দাঁড়িয়ে বলেন, হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-কেও সিরিয়ার গভর্নর পদ হতে বরখাস্ত করা হলো এবং হযরত আলী (রা.)-এর পদচ্যুতির মূলে হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-কে খলিফা নিযুক্ত করলাম।

রায়ের প্রতিক্রিয়া: হযরত আমর (রা.)-এর কূটকৌশলের নিকট হযরত আলী (রা.) পরাজিত হলে জনগণ ক্রোধে উন্মাদ হয়ে পড়ে। হযরত আলী (রা.)-এর পক্ষের যে ১২,০০০ সৈন্য মীমাংসার বিরোধিতা করেছিল তারা হযরত আলী (রা.)-এর দল ত্যাগ করে। ইসলামের ইতিহাসে এরা খারেজি নামে পরিচিত। খারেজিরা সমগ্র সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে হযরত আলী (রা.) নাহরাওয়ানের যুদ্ধে তাদের পরাজিত করেন। হযরত মুয়াবিয়া (রা.) মিশর দখল করে নেন, ফলে বাধ্য হয়ে হযরত আলী (রা.) তাঁর সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হন। সন্ধি অনুসারে মিশর ও সিরিয়ার উপর হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। হযরত আলী (রা.) বাকি সাম্রাজ্য শাসন করবেন। ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে হযরত আলী (রা.) খারেজিদের হাতে নিহত হলে খুলাফায়ে রাশেদিন যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে।

সিফফিনের যুদ্ধের ফলাফল: সিফফিনের যুদ্ধের ফলাফল নিম্নে আলোচনা করা হলো:

ইসলামের ঐক্য বিনষ্ট: হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যকার গৃহযুদ্ধের ফলে মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতি বিপন্ন হয়। ফলে মুসলমানগণ পরবর্তীকালে বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যার জন্য মুসলমানদের ভবিষ্যৎ ভাগ্য আরও অনিশ্চয়তার দিকে অগ্রসর হয়। মুসলিম ঐক্য বিনষ্ট হলে আর কোনোদিন মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে ওঠেনি।

সাম্রাজ্য বিভক্তকরণ: মুসলিম সাম্রাজ্য দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মিশর ও সিরিয়া খিলাফত হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনাধীনে শাসিত হতে থাকে। এ ধরনের বিভক্তি ও বিচ্ছেদের কারণে- ইসলামি খিলাফতের প্রতি মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। থাকে।

খারেজিদের উদ্ভব: মুসলমানদের মধ্য হতে একদল লোক হযরত আলী (রা.)-এর পক্ষ ত্যাগ করেন। তারা বলেন, "লাহুকমা ইল্লাহলিল্লাহ" অর্থাৎ মীমাংসা করার ক্ষমতা, একমাত্র আল্লাহর। তাদের কথা হযরত আলী (রা.) না মেনে নিলে তারা হযরত আলী (রা.)-এর দল ত্যাগ করেন। ইতিহাসে তারা খারেজি বা দলত্যাগী নামে পরিচিত।

খিলাফতের সমাপ্তি: হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যকার যুদ্ধের ফলে সাম্রাজ্যের মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। ৬৬২ খ্রিষ্টাব্দে খারেজিদের হাতে হযরত আলী (রা.) নিহত হলে ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটে।

বায়তুলমাল বণ্টন ব্যবস্থার পরিবর্তন হযরত আলী (রা.)-এর মৃত্যুর পর হযরত মুয়াবিয়া (রা.) ক্ষমতা দখল করলে ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে। যেখানে খিলাফতের সময় বায়তুলমাল ছিল জনগণের সম্পদ, সেখানে উমাইয়া যুগে তা খলিফার পরিবার ও উমাইয়াদের ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হয়।

হাশেমী. ও উমাইয়া দ্বন্দ্ব হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যকার গৃহযুদ্ধ পুরাতন দ্বন্দ্ব-কলহকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলে। ফলে হাশেমী ও উমাইয়াদের মধ্যে যে সম্প্রীতি গড়ে উঠেছিল তা ধ্বংস হয়ে পড়ে। ফলে পরবর্তীতে তাদের মধ্যে কারবালার যুদ্ধের মতো কলঙ্কজনক যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

ইসলামি আদর্শ বিনষ্ট: হযরত আলী (রা.) এবং মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যকার গৃহযুদ্ধের পর হযরত আলী (রা.) খারেজিদের হাতে নিহত হন। ফলে হযরত মুয়াবিয়া (রা.) কর্তৃক উমাইয়া বংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। উমাইয়াগণ ইসলামি আদর্শচ্যুত হয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকে।

হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর সাফল্যের কারণ

যুদ্ধে মুয়াবিয়ার সাফল্যের কারণগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো:

উষ্ট্রের যুদ্ধ: উষ্ট্রের যুদ্ধে তালহা ও যুবায়ের মৃত্যুবরণ করলে আলী (রা.)-এর শক্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং মুয়াবিয়ার শক্তিকে বৃদ্ধি করে। হযরত আলী (রা.)-এর প্রতি হযরত আয়শা (রা.)-এর অসন্তুষ্টি খিলাফতের পর হযরত আলী (রা.) গৃহীত নীতিতে হযরত আয়শা (রা.) অসন্তুষ্ট হন এবং উষ্ট্রের যুদ্ধে হযরত আলী (রা.)-এর বিপক্ষে হযরত তালহা (রা.) ও হযরত যুবায়ের (রা.)-কে সহযোগিতা করেন। ফলে কিছু মুসলমান হযরত আলী (রা.)-এর প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করেন।

সমরবিদ ও রাজনীতিবিদ হিসেবে হযরত আলী (রা.) বীরযোদ্ধা ছিলেন বটে কিন্তু হযরত মুয়াবিয়া (রা.) কূটকৌশলী ও দক্ষ রাজনীতিবিদ ছিলেন। হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর রাজনৈতিক কৌশলের নিকট হযরত আলী (রা.) পরাজিত হন।

রাজধানী পরিবর্তন: হযরত আলী (রা.) মদিনা হতে কুফায় রাজধানী পরিবর্তন করেন- যা সাধারণ মুসলমানদের মনে মারাত্মক আঘাত হানে।

আমার ইবনুল আস-এর কূটকৌশল: আমরের কূটকৌশল দুমাতুল জন্দল মীমাংসায় হযরত আলী (রা.)-কে পরাজিত ও দুর্বল করে। অপরদিকে, হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-কে সাফল্য এনে দেয়। হিটি আমরকে "আরব কূটনৈতিক মেধা" বলে অভিহিত করেন।

খারেজিদের বিদ্রোহ: দুমাতুল জন্দল মীমাংসায় হযরত আলী (রা.)-এর ১২,০০০ অনুসারী দল ত্যাগ করলে হযরত আলী (রা.) দুর্বল হয়ে পড়েন। অপরদিকে, হযরত মুয়াবিয়া (রা.) শক্তি লাভ করেন।

হযরত আলী (রা.)-এর অদূরদর্শী নীতি: হযরত আলী (রা.) ক্ষমতা লাভের পর সাম্রাজ্যের শৃঙ্খলা বিধান না করে বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নরদের বরখাস্ত করে অদূরদর্শিতার পরিচয় দেন। তাঁর এ নীতি তাঁর পতনের জন্য দায়ী। তাছাড়া সমঝোতা এবং আপসের মাধ্যমে সকল সমস্যার সমাধান করতে চেয়ে তিনি মারাত্মক ভুল করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক মুইর বলেন, "In compromise, indeed, and in procrastination lay the failure of his (Alis') Khilafar" অর্থাৎ "সমঝোতা এবং দীর্ঘসূত্রতা তাঁর পতনের অনিবার্য কারণ হয়েছে।"
হযরত আলী (রা.) এবং মুয়াবিয়া (রা.)-এর গৃহযুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায়। এ যুদ্ধের ফলে মুসলিম জাহান বিভক্ত হয়ে পড়ে। যদি স্বার্থপর হযরত মুয়াবিয়া (রা.) খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করত তা হলে তিনি খলিফা হিসেবে আরও সফলতা অর্জন করতে পারতেন। কিন্তু তাদের মধ্যকার গৃহযুদ্ধের ফলে গণতন্ত্রের পরিবর্তে রাজতন্ত্র, ইসলামি শাসন ব্যবহার পরিবর্তে স্বেচ্ছাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

হযরত আলী (রা.)-এর পরাজয়ের কারণ হযরত আলী একজন খ্যাতনামা যোদ্ধা হয়েও শেষ পর্যন্ত মুয়াবিয়ার (রা.) নিকট পরাজয় বরণ করেন। এ পরাজয় ও ব্যর্থতার পশ্চাতে কতিপয় কারণ ছিল।

হযরত মুয়াবিয়ার কর্তৃত্ব: হযরত ওসমানের (রা.) হত্যার পর রাজ্যে যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল, সে আগুনে হযরত আলী (রা.) দখ হলেন। হযরত ওসমানের হত্যাকান্ডের পরেই আলী খিলাফত লাভ করেছিলেন। এ হত্যাকান্ডের প্রতিক্রিয়ার ফলে সাম্রাজ্যের যে গোলযোগ, অরাজকতা ও বিদ্রোহের মনোভাব দেখা দিয়েছিল তার মোকাবিলা করে স্বীয় শক্তিকে সুসংহত করা খুব সহজসাধ্য ছিল না।

খিলাফত লাভের সামান্য পরেই তাঁকে বিভিন্ন গৃহযুদ্ধে ও অন্তবিপ্লবের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, যা তাঁর জনপ্রিয়তা ও শক্তিকে দুর্বল করেছিল। অন্যদিকে হযরত আলী (রা.) প্রতিপক্ষ হিসেবে সিরিয়ার শাসনকর্তা মুয়াবিয়া ছিলেন যোগ্য, জনপ্রিয়, বিচক্ষণ ও সুচতুর। তিনি স্বীয় শক্তিতে সুসংহত করে সিরিয়াবাসীকে নিজের সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। তাই ঐতিহাসিক মুরের মতে, "আলী অপেক্ষা মুয়াবিয়ার কর্তৃত্ব অধিকতর দৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। মনোভাব কঠিন ও প্রত্যয়পূর্ণ এবং প্রকৃত অবস্থা অধিকতর স্থির ও সংহত।"

কৌমচেতনার তারতম্য: হযরত ওসমানের (রা.) ভূমি সম্বন্ধীয় নীতি সাম্রাজ্যে কৌম চেতনায় তারতম্য সৃষ্টি করেছিল। এ সময়ে উমাইয়ারা প্রচুর ভূসম্পদের মালিক হয়েছিল। মুয়াবিয়ার আর্থিক সমৃদ্ধি উমাইয়াদের মধ্যে তাঁর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। হযরত আলী হযরত ওসমানের ভূমি সম্বন্ধীয় নীতির পরিবর্তন ঘোষণা করলে উমাইয়াদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং তারা হাশেমীয় শাসক হযরত আলীর বিরুদ্ধে মুয়াবিয়ার নেতৃত্বে বংশের মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ় সংকল্প ঘোষণা করে। অন্যদিকে হাশেমীয়গণ আলীর পক্ষে জোরালো ও ঐক্যবন্ধ সমর্থন জানাতে ব্যর্থ হয়েছিল। হযরত আলীর নিজের ভ্রাতা এবং হযরত আবু বকর ও হযরত ওমরের পুত্রগণও তার বিপক্ষে ছিলেন।

তালহা যুবায়েরের হত্যা: এক সাধারণ উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তালহা যুবাইর ও আয়েশার (রা.) বিরুদ্ধে আলীকে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। তালহা ও যুবায়ের আলোচনার শর্তানুযায়ী হযরত আলীর দলভুক্ত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করলে দুষ্কৃতকারীদের চক্রান্তে নিহত হন। তাদের মৃত্যু আলীকে দুর্বল করে এবং মুয়াবিয়ার শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ দেয়।

হযরত আয়েশার অবস্থান: হযরত আবু বকরের কন্যা ও মহানবির (স.) প্রিয়তমা পত্নী উম্মাহাতুল মুমেনিনা হযরত আয়েশা (রা.) সাথে দুর্ভাগ্যবশত হযরত আলীর সম্ভাব গড়ে ওঠেনি। বিবি আয়েশা হযরত আলীর বিরুদ্ধে উষ্ট্রের যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। হযরত আলী ও আয়েশার (রা.) মধ্যে বিরোধ মক্কা ও মদিনার ধর্মভীরু মুসলমানদের ব্যথিত করেছিল এবং তারা আলীর (রা.) প্রতি তাদের সাহায্য, সমর্থন ও সহযোগিতা প্রত্যাহার করেছিলেন। এ পরিস্থিতি মুয়াবিয়ার জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করেছিল।

প্রশাসনিক রদবদল: হযরত আলী তাঁর হিতাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শ উপেক্ষা করে প্রশাসনিক রদবদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মুয়াবিয়ার প্রতি পদত্যাগের নির্দেশ আলীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবকে স্পষ্ট করে তুলেছিল। মুয়াবিয়ার মতো দূরদর্শী, বিচক্ষণ, শক্তিশালী ও উচ্চাভিলাষী ব্যক্তির সাথে সৌহার্দ্য রক্ষা করলে হযরত আলী তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দুর্যোগ এড়াতে ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হতেন। কিন্তু তার বিপরীতমুখী কার্যাবলি মুয়াবিয়াকে সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে শক্তি সঞ্চয়ে উৎসাহিত করেছিল। মুইর যথার্থই বলেছিল, "হযরত ওসমানের ঘাতকের উপর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ক্রোধোম্মত্ত সিরীয়দের ব্যবহার করে আরব গোষ্ঠীসমূহের উদ্দীপ্ত বিদ্রোহ নির্মূল করলেই তিনি প্রতিভার পরিচয় দিতেন। কিন্তু তৎপরিবর্তে সরলপথ ধরে তিনি যে রাজনৈতিক ভুল করেন তার মাশুলস্বরূপ তাঁকে খিলাফত ও নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয়।

আমর বিন আল আসের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা: মুয়াবিয়ার অনুচরগণও মুয়াবিয়ার মতো ধূর্ত, বিচক্ষণ, অভিজ্ঞ ও যোগ্যতা সম্পন্ন ছিলেন। হিট্টির ভাষায়, "আমর বিন আল আস ছিলেন আরবের কুটনৈতিক মেধা।" মুয়বিয়ার সমর্থক হিসেবে মুগিরা ইবনে সুবা ও জিয়াদ ইবনে আবিই যথেষ্ট কর্তৃত্বের পরিচয় দেন। অন্যদিকে হযরত আলীর সমর্থক আবু মুসা আল আশয়ারী, ইব্রাহিম আল আসতার ও মুহম্মদ বিন আবু বকর তৎকালীন পরিস্থিতির তুলনায় দুর্বল ছিলেন। এসব ব্যক্তির উপর নির্ভরশীলতা হযরত আলীর পতনকে সুনিশ্চিত করেছিল।

কুফাবাসীদের অদূরদর্শিতা সিফফিনের যুদ্ধে হযরত আলীর অবধারিত বিজয়ের মুখে আমর বিন আসের চক্রান্তে মুয়াবিয়ার সৈন্য দল বর্ণাগ্রে কুরআন শরীফ ঝুলিয়ে যুদ্ধ বন্ধের আবেদন জানিয়েছিলেন। হযরত আলী (রা.) আমরের এ দুরভিসন্ধিমূলক মনোভাব বুঝতে পেরে যুদ্ধ বন্ধ করতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু কুফাবাসীদের জন্য তিনি যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মাওলানা মুহাম্মদ আলী বলেন, "হযরত আলী (রা.) যুদ্ধ বন্ধের পক্ষপাতি ছিলেন না। তিনি তার যোদ্ধাদের বলেন যে, "এটা মুয়াবিয়ার ষড়যন্ত্র ব্যতীত কিছুই না।" তবুও কুফাবাসীরা মানেনি। ফলে সিফফিনের যুদ্ধে জয়লাভ করেও তিনি শেষপর্যন্ত মুয়াবিয়ার প্রতিনিধি আমরের কূটনৈতিক চালের কাছে পরাজিত হন। তার দুর্বল মনোবল এজন্য দায়ী ছিল।
অপরাধী গোষ্ঠীর উপর নির্ভরশীলতা এ সময়ের পরিস্থিতিকে মুয়াবিয়া তার অনুকূলে প্রয়োগ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। হযরত আলীর সেনাবাহিনীতে হযরত ওসমানের হত্যাকারীদের অবস্থিতি হযরত আলীর জন্য ক্ষতিকর হয়েছিল।

উটের যুদ্ধের মর্মান্তিক পরিণতির জন্য মূলত দায়ী ছিল ওসমান হত্যার অপরাধীরাই। কিন্তু আলীর দুর্ভাগ্য এই যে, মহৎ উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও তাঁকে পরিস্থিতির চাপে এসব অপরাধীর উপর নির্ভরশীল হতে হয়েছিল।

ওসমান হত্যার অপরাধীরা হযরত আলীর প্রধান সমর্থক হওয়ায় মুয়াবিয়ার পক্ষে আলীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে জনমনকে বিক্ষুদ্ধ করা সহজ হয়েছিল।

রাজধানী স্থানান্তর: কুফায় রাজধানী স্থানান্তর করে আলী নিজের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিলেন। রাজধানী স্থানান্তরের ফলে মদিনার প্রাধান্য হ্রাস পায়। বিভিন্ন স্থানের জনগণ এটাকে সমর্থন করেননি উপরন্তু কুফাবাসী ছিল কুরাইশ আভিজাত্যের পরিপন্থি। তাই মক্কা ও মদিনার প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ হযরত আলীর প্রতি তাদের সাহায্য ও সমর্থন প্রত্যাহার করেছিলেন।

কুফাবাসীর অসহযোগিতা: হযরত আলী (রা.) কুফাবাসীকে তাঁর আশা-ভরসার আশ্রয়স্থল বলে মনে করতেন। কিন্তু কুফায় জনগণের কোনো চারিত্রিক দৃঢ়তা ছিল না। তারা ছিল বঞ্চক মাত্র অনির্ভরশীল ও আবেগ প্রবণ। তাদের সম্বন্দ্বে জনৈক ঐতিহাসিক বলেন, "তারা (কুফাবাসীরা) দিন হতে দিনান্তরে নিজের অন্তরের সন্ধান করত না। কোনো ব্যক্তি বিশেষ অথবা উদ্দেশ্যের সমর্থনে তারা এ মুহূর্তে জ্বলন্ত অগ্নিবৎ উত্তেজিত হয়ে উঠত। আবার পরক্ষণেই বরফের মতো শীতল ও মৃত ব্যক্তির ন্যায় নিস্পন্দ হয়ে উঠত।" পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা হযরত আলীকে আশানুরূপ সাহায্য ও সমর্থন দেয়নি; পক্ষান্তরে মুয়াবিয়ার শক্তির উৎস সিরিয় জনগণ মুয়াবিয়ার পক্ষে সকল অবস্থায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছিল।

অনিবার্য পরিণতি: সর্বশেষে বলা যায় যে, হযরত আলীর চরিত্র তার ব্যর্থতার জন্য বহুলাংশে দায়ী ছিল। তিনি বিদ্বান ও সাহসী যোদ্ধা সন্দেহ নেই কিন্তু যোগ্য সংগঠক ছিলেন না। সমঝোতা ও আপসের মাধ্যমে সকল সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তিনি মারাত্মক ভুল করেছিলেন। খিলাফতে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে শাসনকর্তাদের রদবদলের ব্যবস্থা তার রাজনৈতিক অদূরদর্শীতার পরিচায়ক। এ রদবদলে তাঁর অনেক হিতৈষী এমনকি নিজ পুত্র ইমাম হাসান ও ঐ সময় ঐ কাজে হাত দিতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি তাদের কোনো কথা শোনেননি। ফলে মুয়াবিয়ার ন্যায় কপট ধূর্ত ও চক্রান্তকারীর কাছে সরল ও অকপট আলীকে পরাজয় বরণ করতে হয়। ঐতিহাসিক মুইর বলেন, হযরত আলীর অদূরদর্শীতা ব্যবহার করে আরব গোষ্ঠীসমূহের বিদ্রোহ নির্মূল করলেই তিনি দূরদর্শিতার পরিচয় দিতেন। কিন্তু তৎপরিবর্তে সরলপথ ধরে তিনি যে রাজনৈতিক ভুল করেন তার মাশুলস্বরূপ তাঁকে খিলাফত ও নিজের জীবন বিসর্জন দিতে হয়। জনৈক ঐতিহাসিক বলেন, "In compromise, indeed, and in procratination lay the failure his caliphate", অর্থাৎ আপোষ এবং দীর্ঘ সূত্রতার জন্য তাঁর খিলাফতের ব্যর্থতা।

শিয়া ও খারেজি সম্প্রদায়ের উৎপত্তি (Rise of the Sh'ites and the Kharijites)

শিয়াদের উদ্ভব: প্রাক-ইসলামি যুগের গোত্রীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক মতানৈক্যের কারণে মুসলমানদের মধ্যে নানা মতভেদ ও ধর্মীয়-রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে। এদের মধ্যে শিয়া সম্প্রদায় অন্যতম। হযরত আলী (রা.)-এর সমর্থক দলকে সাধারণত শিয়া নামে অভিহিত করা হয়। শিয়া সম্প্রদায় রাজনৈতিক দল হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীকালে ধর্মীয় সম্প্রদায়ে পরিণত হয়।

খিলাফত লাভের প্রশ্নে হযরত আলী (রা.)-এর সমর্থক গোষ্ঠীর প্রচারণাই শিয়া মতবাদের সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মহানবির (স.) ইন্তেকালের পর হযরত আবু বকর (রা.)-কে খলিফা পদে নির্বাচন করা হয়। এই নির্বাচনই শিয়া সম্প্রদায় উন্মেষের বীজ হিসেবে পরিগণিত হয়। অনেকের বদ্ধমূলধারণা ছিল যে হযরত মুহম্মদ (স.)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর জামাতা ও অন্যতম প্রভাবশালী হাশেমী গোত্রীয় বীরযোদ্ধা হযরত আলী (রা.) খিলাফতের পদ অলঙ্কৃত করবেন। কিন্তু তারা হযরত আবু বকর (রা.)-এর নির্বাচনে আশাহত হন। শুধু একবার নয় উপর্যুপরি তিন তিনবার তাদের নিরাশ হতে হয়। এতে তাঁর বিক্ষুদ্ধ অনুসারীরা প্রচারণা চালাতে থাকে এবং সমর্থকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

হযরত আলী (রা.)-এর খিলাফতকালে মুয়াবিয়া (রা.)-এর সাথে সিফফিনে রণাঙ্গনের এক তুমুল যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। যুদ্ধে হযরত আলী (রাঃ)-এর বিজয়ের চূড়ান্তক্ষণে মুয়াবিয়ার ধূর্ততায় সালিস অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রতারণার মাধ্যমে হযরত আলী (রা.)-এর পরাজয় ঘটে। তারা এ পরাজয় ও হত্যা বিরোধের নিষ্পত্তি না করে বিরোধকে তীব্রতর করে তোলে এবং হযরত আলী (রা.)-এর (রা.) সমর্থকদের রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে সাহায্য করে। ফলে প্রচলিত ইসলামি গণতন্ত্রের বিপরীতে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তখন এ সম্প্রদায় শিয়া নামে ধর্মীয়-রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হয়।

মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামি রাজনীতির আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা দেখা দেয়। ইমাম হাসান-হোসেন এজিদের আনুগত্য অস্বীকার করলে মর্মান্তিক পরিণতির সম্মুখীন হন। ইমাম হাসানকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয় এবং ইমাম হোসেনকে চক্রান্ত করে কারবালার মরু প্রান্তরে সপরিবারে মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য করা হয়। ইমাম হোসেনের পুণ্য রক্তে স্নাত হয়ে শিয়া সম্প্রদায় সুষ্ঠু ও পরিণত রূপ লাভ করে। তাঁর পিতার রক্ত অপেক্ষা আল হোসাইনের রক্ত শিয়া সম্প্রদায়ের বীজ বলে প্রমাণিত হয় এবং ১০ মহরম শিয়া মতবাদ (প্রকাশ্যরূপে) জন্মলাভ করে।

শিয়া মতবাদ পারস্যে যথেষ্ট প্রতিপত্তি লাভ' করে। উমাইয়া শাসনে রুষ্ট পারসিকরা শিয়াদের সাথে যোগদান করে। পারসিকগণ ঐশী নিযুক্ত ইমাম ও অবতারবাদ ইসলামের অন্তর্ভুক্তকরণে সহায়তা দেয়। ক্রমশ ইরাক ও পারস্যে শিয়া মতবাদ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে তারা উমাইয়াদের পতনে আব্বাসীয়রা সহযোগিতা দেয়। উমাইয়াদের পতনের পর শিয়াদের কর্মতৎপরতা খাঁটি ইসলামের সহায়ক বিবেচিত না হওয়ায় আব্বাসীয়গণ শিয়াদের দমনে সচেষ্ট হয়। কিছুদিনের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর উত্তর আফ্রিকায় আশ্রয় নিয়ে ইমাম হোসাইনের অন্যতম বংশধর ইদরিসের নেতৃত্বে একটি আলাদা রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়। এই রাজবংশ ইদরিসীয় রাজবংশ নামে পরিচিত। মরক্কোতে এখনও এ বংশের শাসন প্রচলিত আছে।

খারেজিদের উদ্ভব: খারেজি সম্প্রদায় ইসলামের ইতিহাসে একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। খারেজি শব্দটির অর্থ দলত্যাগী। একটি সূত্রে জানা যায় যে, উমাইয়াদের বিলাসিতা ও আর্থিক লালসার বিরোধিতা থেকে খারেজিদের সৃষ্টি। এমতাবস্থায় সূরা আল নিসার ১০০নং আয়াতের আলোকে এ সম্প্রদায়ের সৃষ্টি। "আল্লাহর ওয়াস্তে অথবা ধর্ম রক্ষার্থে যে হিজরত করে সে পৃথিবীতে অনেক আশ্রয়স্থান ও সচ্ছলতা খুঁজে পায়। যদি কেহ আল্লাহ ও রসুলের পথে ঘরবাড়ি পরিত্যাগ করে হিজরত করে, অতঃপর প্রবাসেই মৃত্যুবরণ করে তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট নিশ্চিতরূপে পাওনা হয়ে পড়ে। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও ন্যায়পরায়ণ।" [৪: ১০০] খারেজিরা নিজেদের আল্লাহ ও তাঁর রাসুলুল্লাহ (স.)-এর পথে বিচরণকারী বলে দাবি করে থাকেন।

প্রকৃত প্রস্তাবে খারেজিদের উৎপত্তি প্রসঙ্গে দুমাতুল জন্দলের প্রতারণাপূর্ণ রায় অমান্যকারী ১২০০০ দলত্যাগকারীদের নির্দেশ করে। তারা মানুষের বিচার মেনে নিতে অস্বীকার জানিয়ে স্লোগান তুলে যে, 'লা হুকমাহ ইল্লালিল্লাহ' অর্থাৎ আল্লাহ ভিন্ন কারো মীমাংসার অধিকার নেই। হযরত আলী (রা.)-এর এই ১২,০০০ সৈন্য ও সমর্থক দলত্যাগ করে হারুরা নামক গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। এজন্য অনেকে তাদের 'হারুরী' নামে অভিহিত করে থাকেন। তাঁরা আব্দুল্লাহ-বিন-ওহাবকে নেতা নির্বাচিত করেন।

দুর্ভাগ্যবশত দুমাতুল জন্দলের সালিস প্রতারণায় পর্যবসিত হলে খারেজিগণ তাদের সমর্থনে যৌক্তিকতা খুঁজে পায় এবং আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সালিসের সিদ্ধান্ত কুরআন বিরোধী বিবেচনায় তা বাতিলের জন্য হযরত আলী (রা.)-কে চাপ সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে হযরত আলী (রা.)-এর বিরুদ্ধে প্রচারণাও শুরু করে। জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি ও শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় নাহরাওয়ান প্রান্তরে অনুষ্ঠিত যুদ্ধে খারেজি নেতা ওহাবসহ বহুসংখ্যক খারেজি নিহত হয়।

হযরত আলী (রা.)-এর শাহদাত বরণ

৪০ হিজরীতে হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি ছিল এরূপ খারিজী সম্প্রদায়ের তিন ব্যক্তি-আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম, মার্ক ইবনে আবদুল্লাহ এবং আমর ইবনে বকর তারা হযরত আলী (রা.), মুয়াবিয়া (রা.) ও আমর ইবনুল আস (রা.)-কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইবনে মুলজিম এবং শাবীব বিন বাজরা হযরত আলী (রা.)-এর গমন পথে ওঁত পেতে বসেছিল। আলী (রা.) ফজরের নামাযে গমন কালে আততায়ীরা তাঁর ওপর হামলা করে। হামলার সাথে সাথে তিনি চিৎকার করলে লোকজন ছুটে আসে। শাবীব পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম জনতার হাতে ধরা পড়ে। নামাযান্তে ইবনে মুলজিমকে হযরত আলীর সামনে হাজির করা হয়। কতিপয় প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার পর হযরত আলী (রা.) তাকে আরামে রাখার নির্দেশ দেন। উপস্থিত জনতাকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, এ আঘাতে যদি তাঁর মৃত্যু ঘটে তবে আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক এর কেসাস স্বরূপ আততায়ীকে যেন হত্যা করা হয়। আর যদি তিনি বেঁচে যান তাহলে পরে তার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করা হবে।

আহত হওয়ার তৃতীয় দিনে ৪০ হিজরীর ২০ রমযান রবিবার রাতে হযরত আলী (রা.) পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। হযরত হাসান এবং হোসাইন (রা.) তাঁকে গোসল করান। হযরত হাসান (রা.) জানাযার নামায পড়ান। হেদায়াতের এ উজ্জ্বল সূর্যকে অবশেষে কুফার 'আযা' নামক স্থানে দাফন করা হয়। বিশুদ্ধ রেওয়ায়াত মোতাবেক মৃত্যুকালে হযরত আলী (রা.)-এর বয়স ছিল ৬৩ বছর। তাঁর খেলাফতকাল ছিল ৪ বছর ৮ মাস ২৩ দিন।

হযরত আলী (রা.)-এর চরিত্র [Character of Hazrat Ali (R)]

হযরত আলী (রা.) অত্যন্ত কোমলহৃদয় ও দয়ালু ছিলেন। তিনি ছিলেন অনাড়ম্বর, সরল ও আত্মত্যাগের মূর্ত প্রতীক। তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ও সংযমী জীবনযাপন করতেন। কায়িক শ্রম অথবা সেবাকার্যের জন্য পানি উত্তোলন করে জীবনযাত্রা নির্বাহ করতেন। খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণের পরে তার সংযমী জীবনযাপনের কোনো পরিবর্তন ঘটে নি। অত্যন্ত সাদাসিধা পোশাক পরিধান ও সাধারণ খাদ্য গ্রহণ অব্যাহত রাখেন। তিনি তাঁর ক্ষুদ্র গৃহেই বসবাস করতেন। নিজের জন্য কোনো ইমারত নির্মাণ করেন নি।

সরলতা ছিল তাঁর জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। খলিফা হওয়ার পর তিনি কায়িক পরিশ্রম যেমন- মাটি কাটা, পানি তোলা, এমনকি নিজ হাতে জুতা সেলাই করতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। তিনি মাটির উপর বসে পড়তেন এমন কি খালি মেঝের উপর ঘুমাতেন। তিনি পাগড়ি, ছোট আস্তিনের কোর্তা ও তহবন্দ পরিধান করতেন। তাঁর উদারতা ছিল অসামান্য। কোনো ব্যক্তি তাঁর দ্বার থেকে বিমুখ হয়ে ফিরে যায় নি।

হযরত আলী (রা.) ছিলেন সৌম্য, সদাচারী ও উদারতার ধারক ও বাহক। চরম মুহূর্তেও শত্রুদের প্রতি সদাচরণ করে নজির সৃষ্টি করেন। তিনি অনেক প্রতিদ্বন্দ্বীর গর্বকে ভূলুণ্ঠিত করেছেন, কিন্তু কখনো শত্রুর সাথে দুর্ব্যবহার করেন নি। হযরত আলী সূক্ষ্ম বিচার এবং সদ্ব্যবহারের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। বায়তুলমালে যে অর্থ জমা হতো হযরত আলী (রা.) তা সকলের মাঝে সমভাবে বণ্টন করে দিতেন। এ ব্যাপারে তার সহোদর আকিলকে পরিমাণে কিছুটা বেশি দেওয়ার অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করে ন্যায় প্রতিষ্ঠার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

তার বীরত্বের জন্য তিনি 'সিংহ' এবং বিদ্যার জন্য 'জ্ঞানের দ্বার' উপাধি লাভ করেছিলেন। সাহসিকতা, মানবতাবোধ এবং সহিষ্ণুতার মূর্ত প্রতীক আলী (রা.) দুর্বলকে সাহায্য এবং অত্যাচারিতের কষ্ট লাঘব করার জন্য সদা প্রস্তুত থাকতেন। চরিত্রের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্যের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে তাঁর আত্মত্যাগ, ন্যায়বিচার, সততা, আন্তরিকতা ও সত্যপ্রিয়তা।

হযরত আলী (রা.)-এর কৃতিত্ব [Achievements of Hazrat Ali (R)]

হযরত আলী (রা.)-এর স্বল্পকালস্থায়ী বিড়ম্বিত খিলাফত বিভিন্ন রকমের গোলযোগে পূর্ণ ছিল। হযরত উসমান (রা.)-এর (রা.) হত্যার পর হতেই এ গোলযোগ শুরু হয়। উষ্ট্রের যুদ্ধ, সিফফিনের যুদ্ধ, তালহা ও যুবায়েরের মৃত্যু এবং নানা স্থানে বিদ্রোহ প্রভৃতি আলী (রা.)-এর খিলাফতকে দুবির্ষহ করে তুলেছিল। তাঁর সময়েই মুসলিম রাষ্ট্রে একই সময়ে দুটি খিলাফতের অস্তিত্ব দৃষ্টিগোচর হয়। প্রথম দিকে উমাইয়া-হাশিমী গোত্রের মধ্যে কলহ সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা খিলাফত লাভের জন্য এক অসাধারণ অন্তর্দ্বন্দ্বে পরিণত হয়। হযরত আলী (রা.) অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে সেসব মোকাবেলায় ব্রতী হন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস ও যুগের দাবি অনুসারে তার প্রচেষ্টা সফলতা লাভ করেনি। এতদসত্ত্বেও অদম্য সাহসিকতা, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও বিদ্যাবত্তার গুণে অনেক সমস্যার উত্তরণ তাঁর কৃতিত্বের স্মারক হিসেবে টিকে আছে।

অভ্যন্তরীণ কলহ ও যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্য আলী (রা.)-এর শাসনকালে মুসলিম রাষ্ট্রের পক্ষে নতুন নতুন দেশ জয় সম্ভব হয়নি। তথাপি সিসতান, কাবুল প্রভৃতি স্থানে প্রেরিত সফল অভিযান তার সামরিক কৃতিত্বের পরিচায়ক। খারেজিদের হঠকারিতা আলী (রা.)-এর খিলাফতকে প্রায় পর্যুদস্ত করে তুলেছিল। তিনি তাদের কাছে মাথা নত না করে মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে পুনরায় অন্তধারণ করেন। তাঁর এ সঠিক সিদ্ধান্তের ফলে উম্মতে মুসলিমা দ্বিতীয়বারের মতো বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যায়। ইসলামের ইতিহাসে এটি তাঁর অনন্য কৃতিত্ব।

সকলের সাথে বন্ধুত্ব, শত্রুতা কারও সাথে নয়- এ আপ্তবাক্যে বিশ্বাসী হযরত আলী (রা.) কারো সাথে বিদ্বেষ পোষণ করতেন না। এমনকি মুয়াবিয়া (রা.)-এর সঙ্গে তিনি বহুবার আপস মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু রাজনীতির অজানে মুয়াবিয়া (রা.)-এর কূটনীতির নিকট বার বার পরাজিত হয়েছিলেন। মুইর সাহেব বলেন, "His career must be characterised a failure." তাঁর পাণ্ডিত্য খ্যাতি ছিল। তিনি সূরাগুলো অবতীর্ণ হওয়ার সময় অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তাঁর সঠিক নির্দেশনায় আবুল আসওয়াদ-উদ-দুয়ালী কর্তৃক প্রথম আরবি ব্যাকরণ প্রণীত হয়। বিচারক হিসেবে তার সূক্ষ্ম বুদ্ধির খ্যাতি বিশ্বজোড়া। তিনি প্রথম তিন খলিফার অন্যতম পরামর্শদাতা ছিলেন।

পরিশেষে বলা যায় যে, বিনয়ী, দয়ালু, দানবীর এবং গরিব-দুঃখীকে সাহায্য করতে সদা তৎপর আলী (রা.) তাঁর জীবন ইসলামের স্বার্থে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। খলিফা ওমর (রা)-এর মতো কঠোর প্রকৃতির লোক হলে তিনি অনায়াসে দুর্ধর্ষ ও শৃঙ্খলাবিহীন আরবদিগকে সার্থকভাবে শাসন করতে সক্ষম হতেন। তাঁর সহনশীলতা, মহানুভবতা, মানবিক বৃত্তি এবং সত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁর অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে তুলেছিল।

খুলাফায়ে রাশেদিন - অন্যান্য প্রশ্ন

খুলাফায়ে রাশেদিনখুলাফায়ে রাশেদিন-এর নির্বাচন নীতিখলিফা হযরত আবু বকর (রা.) (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.) (৬৩৪-৬৪৪ খ্রি.)খলিফা হযরত উসমান (রা.) (৬৪৪-৬৫৬ খ্রি.)খলিফা হযরত আলী (রা.) (৬৫৬-৬৬১ খ্রি.)খুলাফায়ে রাশেদিনের শাসন ও আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্যবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে কে প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন?হযরত আলী (রা.)-এর পিতার নাম কী?'আসাদুল্লাহ' শব্দের অর্থ কী?ইসলামের প্রথম গৃহযুদ্ধ কোনটি?হযরত ওমর (রা.)-এর উপাধি কী ছিল?হযরত ওমর (রা.) তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যকে কতটি প্রদেশে বিভক্ত করেন?কত খ্রিষ্টাব্দে উষ্ট্রের যুদ্ধ সংঘটিত হয়?'যুন্নুরাইন' শব্দের অর্থ কী?ইসলামি রাষ্ট্রের প্রথম রাজধানী কোথায় স্থাপিত হয়?'সিদ্দিক' কোন খলিফার উপাধি?খিলাফত কী?মহানবি (স.)-এর চারজন প্রতিনিধি কত বছর মুসলিম জাহানের খিলাফতের দায়িত্বভার পালন করেন?খুলাফায়ে রাশেদিন অর্থ কী?'খিলাফত' শব্দের অর্থ কী?খুলাফায়ে রাশেদিন কারা?খলিফা নির্বাচনের উদ্দেশ্যে মুসলমানগণ কোন স্থানে মিলিত হন?কাকে ইসলামের ত্রাণকর্তা বলা হয়?গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম খলিফা কে ছিলেন?প্রথম ভণ্ডনবি কে?ভন্ডনবিদের বিরুদ্ধে হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুদ্ধ কী নামে পরিচিত?'রিদ্দা' শব্দের অর্থ কী?সর্বপ্রথম, 'বায়তুল মাল' প্রতিষ্ঠা করেন কে?কত খ্রিষ্টাব্দে হযরত ওমর (রা.) খলিফা নির্বাচিত হন?মজলিশ-উশ-শূরা কী?বায়তুল মাল কী?মহানবি (স.) কাকে 'সাইফুল্লাহ' উপাধিতে ভূষিত করেন?'আল্লাহর সিংহ' উপাধিটি কার?পুরুষদের মধ্যে কে ১০ বছর বয়সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন?কীভাবে হযরত ওসমান (রা.) খিলাফত লাভ করেন?হযরত ওমর (রা.)-এর দিউয়ান বা রাজস্বব্যবস্থা ব্যাখ্যা কর।মহানবি (স.) কাকে এবং কেন সিদ্দিক উপাধি দিয়েছিলেন? ব্যাখ্যা কর।দুমার মীমাংসা কী? ব্যাখ্যা কর।হযরত ওমর (রা.) হযরত আবু বকর (রা.)-কে প্রথম খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করতে চাইলেন কেন? ব্যাখ্যা কর।জিজিয়া কী? ব্যাখ্যা কর।'খুলাফায়ে রাশেদিন' বলতে কী বোঝায়?হযরত ওসমান (রা.)-কে আল কুরআনের সংকলক বলা হয় কেন?

সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ