- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- খুলাফায়ে রাশেদিন
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
খুলাফায়ে রাশেদিনের শাসন ও আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্য
মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.) মদিনায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা দ্বারা কলহরত আরব গোত্র ও গোষ্ঠীগুলোকে একীভূত করে এক মহান জাতিতে পরিণত করেন। সৈয়দ আমীর আলীর ভাষায়, "এই অল্প (দশ বছর) সময়ের মধ্যে তিনি যে কাজ সমাধা করেন তা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ অত্যাশ্চর্য কীর্তিসমূহের অন্যতম বলে চিরকাল অম্লান থাকবে।" তিনি শুধু একটি কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠাই করেননি; বরং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং বিচার বিভাগীয় সমস্ত ক্ষমতার প্রকৃত রূপরেখা প্রণয়ন করেন। ইসলামি শরিয়তের উপর ভিত্তি করে রচিত তাঁর এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরবর্তীকালে খুলাফায়ে রাশেদিনের সময় অনুসৃত হয়। খুলাফায়ে রাশেদিনের চার খলিফার শাসনামলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়।
খিলাফত ও খলিফা খিলাফত ইসলামি শাসনব্যবস্থার একটি প্রশাসনিক কাঠামো। এটি একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ইবনে খালদুনের মতে, "খিলাফত হচ্ছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা মহানবি (স.)-এর মিশনের প্রতিনিধিত্ব করে।" মজীদ খাদ্দুবীর ভাষায়, "খিলাফত হচ্ছে ধর্মীয় ভিত্তিতে রাষ্ট্রের পার্থিব শাসন কাঠামো।" অন্যদিকে 'খলিফা' শব্দের অর্থ প্রতিনিধি, অর্থাৎ মহানবি (স.)-এর স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তিকে বলা হয় খলিফা। খলিফাগণ আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারী না হলেও আল্লাহ ও রাসুলের নির্দেশিকা পথ আনুগত্যের সাথে অনুসরণ করতেন। তাঁরা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হতেন। ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবুবকর (রা.) থেকে হজরত আলী (রা.) পর্যন্ত চার খলিফার শাসনামলকেই বলা হয় খুলাফায়ে রাশেদিন। প্রায় ত্রিশ বছর স্থায়ী এই শাসনকাল ইসলামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় বা স্বর্ণযুগ।
শাসনব্যবস্থা
খুলাফায়ে রাশেদিনের শাসনব্যবস্থা মূলত হজরত ওমর (রা.) কর্তৃক প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা। তিনিই ছিলেন ইসলামের রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা। সৈয়দ আমীর আলী বলেন, "মদিনায় ত্রিশ বছর ধরে যে সাধারণতন্ত্র স্থায়ী হয়, তার রাষ্ট্রনীতি প্রণীত হয় হজরত ওমর (রা.)-এর জীবদ্দশায় ও তাঁর মৃত্যুর পর তাঁরই প্রণীত নীতি অনুসৃত হয়েছে।"
ক. মজলিস-উশ-শুরার মন্ত্রণা পরিষদ: 'মজলিস-উশ-শূরা' আরবি শব্দ। এর অর্থ পরামর্শ পরিষদ। খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ ও রাষ্ট্রীয় কাজে খলিফাকে সাহায্য করার জন্য একটি উপদেষ্টা পরিষদ ছিল, যা মজলিস-উশ-শূরা নামে পরিচিত। রাষ্ট্রীয় সব কাজে খলিফাগণ এ পরিষদের পরামর্শ নিতেন। হজরত আবুবকর (রা.)-এর সময় মজলিস- উশ-শূরা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ না করলেও তিনি সব ব্যাপারে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। হজরত ওমর (রা.) ঘোষণা করেন, "পরামর্শ ছাড়া কোনো খিলাফত চলতে পারে না।" মূলত খলিফা ওমর (রা.)-এর আমলেই মজলিস-উশ-শূরা সাংগঠনিক রূপ লাভ করে। পরবর্তীকালে হজরত ওসমান (রা.)-এর আমলে দলগত রাজনীতির প্রভাবে এবং হজরত আলী (রা.)-এর শাসনামলে শূরার ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ে। তথাপি মজলিস-উশ-শূরা খোলাফায়ের শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি। খ. শাসন পরিচালনায় সাধারণ নাগরিকের অধিকার খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে শাসন পরিচালনায় সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণের অধিকার ছিল। যেমন: হজরত আবুবকর (রা.)-এর সময় বিচার ও জাকাত বিতরণের ভার হজরত ওমর (রা.)-এর উপর ন্যস্ত ছিল এবং সুশিক্ষিত হজরত আলী (রা.)-এর উপর চিঠিপত্র আদান-প্রদান, যুদ্ধবন্দিদের বিধিব্যবস্থা ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পিত ছিল। এভাবে বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনায় হজরত আবুবকর (রা.)-এর বিশিষ্ট সঙ্গীগণ অংশগ্রহণ করতেন। একক কোনো ব্যক্তির উপর 'খিলাফতের সামগ্রিক দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল না। রাষ্ট্রের শাসন পরিচালনায় সাধারণ নাগরিকও অংশগ্রহণ করতে পারত। কুফা, বসরা ও সিরিয়ার রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারী নিয়োগের সময় সেখানকার সাধারণ নাগরিকদের সাধারণ কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা নেওয়া হতো।
প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা
দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর পূর্বে আরবের প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা ছিল সীমিত। মক্কা ও আরব উপদ্বীপ দখলের পর হজরত মুহাম্মদ (স.) সব প্রধান শহর এবং প্রদেশে আমির নামধারী প্রাদেশিক শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। রাজ্য বিজয়ের পর হজরত ওমর (রা.) সমগ্র সাম্রাজ্যকে ১৪টি প্রদেশে, প্রদেশগুলোকে জেলায় এবং জেলাগুলোকে মহকুমায় বিভক্ত করেন। প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে গভর্নর ও ওয়ালি নিযুক্ত করেন। মজলিস-উশ-শূরার অনুমোদনক্রমে ওয়ালি বা প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ নিযুক্ত হতেন এবং প্রদেশের প্রশাসনিক প্রধানের দায়িত্ব পালন করতেন। খলিফার প্রতিনিধি হিসেবে তাঁরা প্রদেশের আইন, শান্তি-শৃঙ্খলা, সেনাবাহিনী সংরক্ষণ, সামরিক অভিযান ও বিচারকের দায়িত্বও পালন করতেন এবং তাঁদের কার্যাবলির জন্য খলিফার কাছে দায়ী থাকতেন। প্রদেশের মতো জেলায়ও একজন করে শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হতো। জেলার শাসনকর্তাকে বলা হতো আমিল। খারাজ ও জিজিয়া আদায় করা তাঁর কাজ ছিল। তাঁরা প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের অধীনে কাজ করতেন। প্রত্যেক প্রদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কর্মী নিযুক্ত করা হতো। এ ছাড়া সাহিব-উল-খারাজ বা রাজস্বসচিব, সাহিব-উল-বায়তুলমাল বা অর্থসচিব, সাহিব-উল-আহদিস বা পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তাও ছিলেন। প্রত্যেক প্রদেশে একটি প্রশাসনিক ভবন বা 'দিওয়ান' এবং শাসনকর্তার বাসস্থান বা 'দার-উল-আমারা' নির্মাণ করা হয়েছিল।
বিচারব্যবস্থা
খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে খলিফাগণ ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বিচারপতি। হজরত ওমর (রা.) সর্বপ্রথম শাসন বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করে এটিকে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। খলিফাগণ প্রত্যেক প্রদেশে একজন করে কাজি নিযুক্ত করেন। কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী সম্রান্তবংশীয় মুসলমানদের মধ্য থেকে কাজি নিযুক্ত করা হতো। তাঁদের বেতন নির্দিষ্ট ও উচ্চতর ছিল। কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশানুসারে ধনী-দরিদ্র, উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ না করে কাজিগণ বিচারকার্য সম্পন্ন করতেন। বিচারকগণ স্বাধীনভাবে বিচারকার্য সম্পন্ন করার অধিকারী ছিল।
রাজস্বব্যবস্থা
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আমলে আল-কোরাআন ও সুন্নাহ্ ভিত্তিক যে রাজস্বব্যবস্থা প্রচলিত ছিল খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে ইসলামি সাম্রাজ্য বিস্তার ও রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে তার কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ইসলামে অনুমোদিত রাজস্ব আদায়ের উৎসগুলোকে ঠিক রেখে এ সময় আরও কিছু নতুন উৎস সংযুক্ত করা হয়।
খলিফাদের সময়কালে নিম্নলিখিত উৎসগুলো থেকে রাজস্ব আদায় করা হতো: আল-জাকাত: রাসুলুল্লাহ (সা.) জাকাতকে শুধু ইসলামের একটি অন্যতম বিধান হিসেবে কায়েম করেননি; বরং রাষ্ট্রীয় আয়ের উৎস হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। এ জন্য খলিফাগণও জাকাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করে এর কোনো রদবদল করেননি। সব বিত্তশালী মুসলমানদের জন্য জাকাত বাধ্যতামূলক ছিল। এটি স্বর্ণ, রৌপ্য, উট, মেষ ও ছাগলের উপর ধার্য করা হতো। হজরত ওমরের সময় ঘোড়ার ব্যবসায় লাভজনক হওয়ায় ঘোড়ার উপরও জাকাত ধার্য করা হয়।
আল-জিজিয়া: ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলমানদের দেয় করকেই বলে জিজিয়া। অমুসলমান বা জিম্মিরা জানমালের নিরাপত্তার বিনিময়ে এই কর প্রদান করত। তবে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অক্ষম ও সামরিক বিভাগে কর্মরত অমুসলমানদের এই কর থেকে রেহাই দেওয়া হতো। হজরত ওমর (রা.) এ কর আদায়ের একটি বার্ষিক হার নির্ধারণ করে দেন। তদানুসারে স্বল্প আয়ের লোকদের বার্ষিক ১ দিনার, মধ্যম আয়ের লোকদের ২ দিনার এবং ধনীদের ৪ দিনার করে কর প্রদান করতে হতো।
আল-খারাজ: খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে রাজস্ব আদায়ের আরেকটি উৎস ছিল খারাজ বা ভূমিকর। মুসলমানদের দ্বারা বিজিত এলাকায় অমুসলমানদের সব জমির উপর এই কর ধার্য করা হতো। হজরত ওমর (রা.)-এর আমলে জমি জরিপ শেষে জমির গুণগত মান, উৎপাদনের পরিমাণ, অবস্থানের বৈশিষ্ট্য ও সেচ সুবিধার উপর ভিত্তি করে রাজস্ব নির্ধারণ করা হতো।
আল-উশর মুসলিম ভূমি অধিকারীরা কিংবা মুসলিম প্রজারা এ কর প্রদান করত। সেচ সুবিধাভুক্ত জমি থেকে উৎপন্ন ফসলের এক-দশমাংশ উশর হিসেবে গ্রহণ করা হতো। তবে কেবল বৃহৎ ভূসম্পত্তির মালিকদের কাছ থেকে এই কর আদায় করা হতো।
আল-ফে: বেওয়ারিশ, খাসজমি, বিদ্রোহীদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত জমি এবং অনাবাদি ও অন্যান্য ভূমি থেকে যে রাজস্ব আদায় হতো তা আল-ফে নামে পরিচিত ছিল। রাষ্ট্রই ছিল এসব জমির মালিক। ইমাম আবু ইউসুফ বলেন, বিজিত দেশের আবাদি ভূমির কতকাংশ সরাসরি রাষ্ট্রের দখলে নেওয়া হতো। এসব কৃষিভূমিকেই 'আল-ফে' বলা হয়। উক্ত ভূমি মুসলমান বা অমুসলমান যাদের নিকটই থাকুক না কেন, এর দেয় কর সব সময়ই সমান থাকত। উৎপাদিত শস্যের একাংশ কর হিসেবে আদায় করা হতো। তবে আল-ফে ছাড়াও রাষ্ট্রীয় চারণভূমি বা হিমা থেকেও কর আদায় করা হতো।
আল-উশুর ইসলামি রাষ্ট্রের অন্য একটি কর হচ্ছে উশুর বা বাণিজ্য কর। কোনো বিদেশি বণিক ইসলামি রাষ্ট্রে আগমন করলে তাদের শতকরা ১০ দিরহাম হারে কর দিতে হতো। তবে ২০০ দিরহামের কম মূল্যের উপর উন্মুর ধার্য হতো না। অমুসলিম বণিকদের শতকরা ৫ ভাগ এবং মুসলমান বণিকদের শতকরা আড়াই ভাগ হারে এই কর দিতে হতো।
গানিমাহ বা গনিমত: গানিমাহ অর্থ যুদ্ধলব্ধ ধনসম্পদ। এসব লুণ্ঠিত সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ রাষ্ট্রের জন্য রেখে অবশিষ্ট অংশ সৈন্যদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। রাষ্ট্রীয় যে অংশ বায়তুলমালে জমা হতো তাকে খুমুস বলে। হজরত আবুবকর (রা.)-এর সময় গনিমতের সম্পদের এক ভাগ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। ওমর (রা.)-এর. আমলে তা সৈন্যবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জাম ক্রয়ে ব্যবহৃত হতো।
বায়তুলমাল/রাষ্ট্রীয় কোষাগার: হজরত ওমর (রা.)-এর আগে বায়তুলমাল বলতে রাজস্ব বণ্টন ব্যবস্থাকে বুঝাত। তখন এটিকে কোনো প্রতিষ্ঠান বলে গণ্য করা হতো না। রাষ্ট্রের আয়ের পরিমাণ কম থাকায় রাজস্ব প্রাপ্তির সাথে সাথে তা উপস্থিত লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হতো। কিন্তু হজরত ওমর (রা.)-এর সময় ইসলামি রাষ্ট্র বিস্তৃতির ফলে বিজিত অঞ্চল থেকে পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায় হতে থাকলে প্রাপ্ত অর্থসম্পদ নিরাপদে সংরক্ষণের জন্য বায়তুলমাল গঠিত হয় এবং ওয়ালিদ ইবনে হিশামের পরামর্শে আব্দুল্লাহ ইবন উল আরফানকে প্রথম কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করা হয়। মদিনা ও নবগঠিত প্রদেশসমূহেও বায়তুলমাল স্থাপন ও অপরাপর কর্মচারী নিযুক্ত করা হয়।
দিওয়ান-উল-খারাজ: সাম্রাজ্য বিস্তৃতির সাথে সাথে রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলে বায়তুলমালের বণ্টনব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। তখন হজরত ওমর (রা.) রাজস্ব গ্রহণ ও পুনর্বণ্টনে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি রাজস্ব বিভাগ বা 'দিওয়ান' প্রতিষ্ঠা করেন। একে দিওয়ান-উল-খারাজও বলা হতো। রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখাই ছিল এই বিভাগের প্রধান কাজ। বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয়ের পর সরকারের হাতে যে অর্থ উদ্বৃত্ত থাকত তা ভাতা হিসেবে আরব ও অনারব মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। এ ব্যাপারে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিও অনুসরণ করা হতো। ভাতা গ্রহণকারীদের তালিকা প্রণয়ন করে ভাতা প্রদান করা হতো। যেমন:
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিধবা পত্নীগণ
১২,০০০
দিরহাম
বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী
৫,০০০
দিরহাম
উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী
8,000
দিরহাম
মক্কা বিজয়ের পূর্বে ইসলাম গ্রহণকারী
৩,০০০
দিরহাম
হজরত ওমর (রা.)-এর সময়ে রাজ্য বিজয়ে অংশগ্রহণকারী
২০০-৩০০
দিরহাম
এ ছাড়া দাস-দাসী, নবজাত শিশু, মহিলা ও অধীন ব্যক্তিরাও দিওয়ানের অন্তর্ভুক্ত ছিল ও নিয়মিত ভাতা পেত।
সামরিক ব্যবস্থা
দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর সময় ইসলামি সাম্রাজ্য বিস্তৃতির প্রয়োজনে একটি সুসংবদ্ধ সামরিক ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এজন্য তিনি সামরিক শাসনের সুবিধার্থে সমগ্র সাম্রাজ্যকে নয়টি সামরিক এলাকায় (জুনদ) বিভক্ত করেন; যথা- মদিনা, কুফা, বসরা, মসুল, ফুসতাত, মিশর, দামেস্ক, হিমস ও প্যালেস্টাইন। তিনি সৈন্যসংখ্যাও বৃদ্ধি করেন। জরুরি অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য প্রতি জুনদে ৪,০০০ অশ্বারোহী বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত থাকত। প্রত্যেক সামরিক এলাকায় এক বা একাধিক সেনানিবাস ও গ্যারিসন ছিল। এসব সেনানিবাসে স্থায়ীভাবে সৈন্য নিয়োজিত রাখা হতো। সৈন্যবাহিনীর বেতন নির্ধারিত ছিল বার্ষিক ৩০০ থেকে ৬০০ দিরহাম। সৈন্যদের পোশাক, খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বিনামূল্যে সরবরাহ করা হতো। প্রত্যেক সৈনিকের স্ত্রী ও সন্তানরাও ভাতা পেত। সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন খলিফা নিজেই। তবে প্রত্যেক বাহিনীর নিজস্ব অধিনায়ক ছিল। সেনাবাহিনী পদাতিক, অশ্বারোহী, তীরন্দাজ, বাহক, সেবক প্রভৃতি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে তারা অগ্র, পশ্চাৎ, মধ্য ও দুই পাশে সারিবদ্ধ হয়ে শত্রুর মোকাবিলা করত। অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো তরবারি, বর্শা, বল্লম, তীর, ধনুক, ঢাল, বর্ম ও শিরস্ত্রাণ। সেনাবাহিনী ছাড়াও হজরত ওসমান (রা.)-এর আমলে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় ব্যবসায়-বাণিজ্য বিস্তার ও নৌযুদ্ধের কারণে সর্বপ্রথম নৌবাহিনী গঠন করা হয়।
পুলিশ বিভাগ: খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে আলাদা কোনো পুলিশ বিভাগ ছিল না। জনগণই শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকত। হজরত ওমর (রা.) সর্বপ্রথম পাহারা ও টহল দেওয়ার রীতি প্রবর্তন করেন। এ ব্যবস্থাকে 'আস-সুরতা' বলা হতো। হজরত আলী (রা.)-এর সময় নিয়মিত পুলিশ বাহিনী গঠিত হয়। সব ধরনের অপরাধ দমন, বাজার নিয়ন্ত্রণ, বাজার পরিদর্শন এবং ওজন পরীক্ষা করা এ বিভাগের কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ বিভাগের প্রধানকে বলা হতো সাহিব-উস-সুরতা। অপরাধীদের দন্ড প্রদানের জন্য হজরত ওমর (রা.)-এর সময় মুসলিম রাষ্ট্রে সর্বপ্রথম কারাগার স্থাপিত হয়েছিল।
সামাজিক অবস্থা
সামাজিক স্তরবিন্যাস: খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে আনসার, মুহাজির, বিভিন্ন আরব গোত্র ও বিজিত দেশের মুসলমান, অমুসলমান নিয়ে আরব সমাজ গঠিত ছিল। এদের মধ্যে আনসার, মুহাজির ও বিভিন্ন আরব গোত্রীয় মুসলমানরা প্রথম শ্রেণির, বিজিত দেশসমূহের মুসলমানরা দ্বিতীয় শ্রেণির এবং ইহুদি, খ্রিষ্টান, পারসিক প্রভৃতি অমুসলমান তৃতীয় শ্রেণির ! অন্তর্ভুক্ত ছিল। রিজিত দেশের নবদীক্ষিত অনারব মুসলমানগণ মাওয়ালি নামে পরিচিত। এরা আরব গোত্রের সাথে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারত এবং সামরিক বিভাগে যোগ দিয়ে আরবদের সমপর্যায় লাভ করত।
সহজ-সরণ অনাড়ম্বর জীবন খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে খলিফাগণ সততার সাথে সহজ, সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। ড. মফীজুল্লাহ কবীর বলেন, "খুলাফা-ই-রাশিদীনের শাসনামলে জনসাধারণের জীবনযাত্রা সহজ, সরল ও অনাড়ম্বর ছিল।" আল বয়ানে বর্ণিত আছে যে, সুবিশাল রাষ্ট্রের অধীশ্বর হওয়া সত্ত্বেও ধর্মপ্রাণ খলিফাগণ ফকিরের ন্যায় জীবনযাপন করতেন। তবে বিত্তশালী লোকেরা জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন করত।
বাসগৃহ ও পোশাক-পরিচ্ছদ: খলিফাদের বসবাসের জন্য কোনো রাজপ্রাসাদ বা দেহরক্ষী ছিল না। কিংবা দরবারের জন্য কোনো প্রাসাদতুল্য অট্টালিকাও নির্মাণ করা হয়নি। সাধারণত বাসগৃহ ছিল ইটের তৈরি একতলা এবং এর চত্বরে থাকত একটি কূপ। জনসাধারণের ন্যায় খলিফাদের পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল খুবই সাধারণ। বেদুইন আরবদের পোশাক ছিল সাদাসিধা। তারা লম্বা কুর্তা ও ঢিলা পায়জামা পরত এবং মাথায় পাগড়ি পরিধান করত। ধনী ব্যক্তিরা রেশমি কোমরবদ্ধ ব্যবহার করত। আর মহিলারা ঢিলা পায়জামা, পিরহান ও মাথায় দোপাট্টা ব্যবহার করত এবং পর্দাপ্রথা কঠোরভাবে প্রতিপালন করা হতো।
সামাজিক মর্যাদা: খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে প্রত্যেক ব্যক্তি সম-অধিকার ও সমমর্যাদা ভোগ করতে পারত। এ ব্যাপারে খলিফা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান ছিল। অনেক সময় খলিফাকেও স্বয়ং আইনের আশ্রয় নিতে হতো। সমাজে নারীরাও মর্যাদার অধিকারী ছিল। তারা মৃত পিতা বা স্বামীর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হতো এবং স্বামী নির্বাচনের অধিকার তাদের ছিল। এ ছাড়া রুচিপূর্ণভাবে বাইরে চলাফেরা, ধর্মোপদেশ শ্রবণ করা কিংবা যুদ্ধে অংশগ্রহণের অধিকারও তাদের ছিল। সৈয়দ আমীর আলী বলেন, "আরবদের মেয়েরা তখনও সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল এবং আজও আছে। সাধারণতন্ত্রের যুগে মুসলিম রমণীরা স্বাধীনভাবে বাহিরে চলাফেরা করতেন, খলিফাদের ধর্মোপদেশ এবং আলী ইবন আব্বাস এবং অন্যান্যদের বক্তৃতা শ্রবণ করতেন।"
দাসপ্রথা: সমাজে দাসপ্রথা প্রচলিত থাকলেও খলিফাগণ সমাজ থেকে দাসপ্রথা উচ্ছেদের সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন। খলিফা ওমর (রা.) দাসদের ক্রয় করে মুক্তি দেওয়ার জন্য জনগণকে উৎসাহিত করেন। খলিফাগণ দাসদের প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ করতেন এবং জনসাধারণকে সদয় ব্যবহারের জন্য আদেশ প্রদান করেন।
অতিথিপরায়ণতা: প্রাচীনকাল থেকেই আরবরা তাদের অতিথিবাৎসল্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। কোনো মেহমান বাসায় এলে নিজের আর্থিক দৈন্যতা থাকা সত্ত্বেও মেহমানদারি করতে তারা কার্পণ্য করত না। মেহমানকে নিয়ে তারা একত্রে বসে খাবার খেত। মেহমান শত্রু হলেও তারা মেহমানের মর্যাদাহানি করত না।
এ ছাড়া এ আমলে স্থাপত্য ও সংগীতকলারও প্রসার ঘটেছিল। মুসলিম স্থাপত্যশিল্পের বিকাশ ঘটেছিল খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে। মদিনা মসজিদসহ বিভিন্ন স্থানে নির্মিত মসজিদগুলো মুসলিম স্থাপত্যের প্রাথমিক পর্বের স্বাক্ষর বহন করে। আরব সমাজে সংগীতচর্চারও প্রচলন দেখা যায়। বীণা, গিটার, দাফ, তাম্বুর, উদ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে তারা অবসর বিনোদন, করত।
সুতরাং বলা যেতে পারে, ইসলামি জাহানের ইতিহাসে খুলাফায়ে রাশেদিনের যুগ ছিল এক গৌরবময় অধ্যায়।
একক কাজ: ১। খুলাফায়ে রাশেদিনের খলিফাদের আমলের আর্থ-সামাজিক অবস্থা তুলে ধর।
২। ছকটি সঠিকভাবে সাজাও:
খলিফাগণের নাম
অবস্থান
হযরত ওমর (রা.)
তৃতীয় খলিফা
হযরত আলী (রা.)
প্রথম খলিফা
হযরত উসমান (রা.)
চতুর্থ খলিফা
হযরত আবু বকর (রা.)
দ্বিতীয় খলিফা
খুলাফায়ে রাশেদিন - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

