নোবেল পুরস্কার ২০২৬
মিরর মলিকিউলের রহস্য উন্মোচন করে রসায়নে নোবেল পেলেন দুই বিজ্ঞানী
— উড্ডয়ন
সংগৃহিত
বিজ্ঞানের জগতে প্রতি বছরের মতো এবারও নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে, আর এবারের রসায়নের পুরস্কারটি গেছে এমন এক গবেষণার হাত ধরে, যা বহু বছর ধরে রসায়নবিদদের কাছে একটা বড় ধাঁধা ছিল। ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার রসায়ন বিভাগে পেয়েছেন ফ্রান্সের বিজ্ঞানী হেনরি বি কাগান এবং জাপানের বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই। তাদের এই স্বীকৃতি এসেছে "অ্যাসিমেট্রিক অর্গানিক সিন্থেসিসে নন-লিনিয়ার ইফেক্ট ও অটোক্যাটালাইসিস আবিষ্কারের" জন্য।
শুনতে বেশ জটিল লাগলেও, এই গবেষণার পেছনের গল্পটা আসলে খুবই আকর্ষণীয়। এটা মূলত জীবনের গঠন নিয়ে এক গভীর প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা, যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের লেগে গেছে কয়েক দশক।
মিরর মলিকিউল আসলে কী
আমাদের দুই হাতের দিকে তাকালে দেখবেন, দুটো হাত দেখতে প্রায় একই রকম, কিন্তু একটা আরেকটার সঙ্গে ঠিক মিলবে না। ডান হাতের গ্লাভস বাম হাতে পরা যায় না। রসায়নেও ঠিক এমন একটা ব্যাপার আছে। অনেক মলিকিউল এমনভাবে তৈরি হয় যে তাদের দুটো রূপ থাকে, একটা আরেকটার আয়নার প্রতিবিম্বের মতো। রসায়নবিদরা এই বৈশিষ্ট্যকে বলেন কাইরালিটি।
এখন মজার ব্যাপার হলো, জীবজগতের প্রায় সব প্রাণী এবং উদ্ভিদের দেহে এই দুই রূপের মধ্যে শুধু একটা রূপই পাওয়া যায়। যেমন আমাদের শরীরের প্রোটিন তৈরি করে যেসব অ্যামিনো অ্যাসিড, তাদের একটা নির্দিষ্ট রূপই প্রকৃতিতে প্রাধান্য পায়। অন্য রূপটা প্রকৃতিতে প্রায় দেখাই যায় না। রসায়নের ভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় হোমোকাইরালিটি।
কেন এই প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের এত বছর ধরে ভাবিয়েছে
এখানেই আসল সমস্যা। যখন ল্যাবে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এমন মলিকিউল তৈরি করা হয় যার দুটো আয়না-রূপ সম্ভব, তখন সাধারণত দুটো রূপই সমান পরিমাণে তৈরি হয়। অথচ প্রকৃতি কীভাবে যেন শুধু একটা রূপকে বেছে নিয়েছে, আরেকটাকে প্রায় বাদ দিয়ে দিয়েছে। এই অসামঞ্জস্য কীভাবে তৈরি হলো, সেটাই বছরের পর বছর ধরে রসায়নবিদদের মাথাব্যথার কারণ ছিল।
এই প্রশ্নের একটা বাস্তব গুরুত্বও আছে। ওষুধ তৈরির সময় এটা খুবই জরুরি একটা বিষয়। কোনো একটা মলিকিউলের দুটো আয়না-রূপের মধ্যে একটা হয়তো শরীরে কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলবে, কিন্তু অন্যটা একেবারেই কাজ করবে না, কিংবা কখনো কখনো ক্ষতিকরও হতে পারে। তাই শুধু একটা নির্দিষ্ট রূপ তৈরি করার পদ্ধতি বের করা ওষুধ শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হেনরি কাগানের প্রথম পদক্ষেপ
এই ধাঁধা সমাধানের পথে প্রথম বড় অগ্রগতি আসে ১৯৮৬ সালে, হেনরি কাগানের হাত ধরে। তিনি এমন একটা পদ্ধতি বের করেন যার মাধ্যমে রাসায়নিক বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে একটা আয়না-রূপের পরিমাণ আরেকটার তুলনায় বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এর আগে পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, এতটা তফাত তৈরি করা বাস্তবে সম্ভব নয়। কাগানের এই কাজ রসায়নবিদদের দেখিয়ে দেয় যে প্রকৃতির মতো অসামঞ্জস্য ল্যাবেও তৈরি করা সম্ভব, শুধু সঠিক পদ্ধতি দরকার।
কেনসো সোয়াইয়ের যুগান্তকারী আবিষ্কার
কাগানের কাজের উপর ভিত্তি করে পরবর্তী বড় পদক্ষেপ নেন কেনসো সোয়াই। ১৯৯৫ সালে তিনি এমন একটা রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা প্রকাশ করেন, যার মধ্যে পুরোপুরি হোমোকাইরাল ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে সেটা তখনো তত্ত্বের পর্যায়ে ছিল।
এরপর ২০০৩ সালে সোয়াই বাস্তবে এই লক্ষ্য অর্জন করেন। তিনি এমন একটা বিক্রিয়া উপস্থাপন করেন, যেখানে দুটো সম্ভাব্য আয়না-রূপের মধ্যে শুধু একটাই তৈরি হয়। এটা ছিল এক অসাধারণ কৃতিত্ব, কারণ জীবনের নিজস্ব প্রক্রিয়া ছাড়া এর আগে কেউ এভাবে একমুখী ফলাফল তৈরি করতে পারেননি। সোয়াইয়ের এই পরীক্ষা পরবর্তীতে রসায়নবিদদের মধ্যে ব্যাপক আলোচিত হয়, কারণ এটা দেখিয়ে দেয় যে খুব সামান্য পরিমাণ অসামঞ্জস্য থেকেও একটা বিক্রিয়া নিজে নিজে সেই অসামঞ্জস্যকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এই আবিষ্কারের বাস্তব প্রয়োগ কোথায়
কাগান আর সোয়াইয়ের এই যৌথ অবদান শুধু তত্ত্বীয় কৌতূহল মেটায়নি, বরং বাস্তব জীবনেও এর প্রভাব অনেক গভীর। আধুনিক ওষুধ শিল্পে যখন কোনো নতুন ওষুধ তৈরি করা হয়, তখন নির্দিষ্ট আয়না-রূপের মলিকিউল তৈরি করতে পারা অত্যন্ত জরুরি। এই দুই বিজ্ঞানীর গবেষণা সেই পথ অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে।
এছাড়া এই কাজ জীববিজ্ঞানের একটা পুরনো প্রশ্নেরও কাছাকাছি নিয়ে যায়, পৃথিবীতে জীবনের শুরুতে কীভাবে হোমোকাইরালিটি তৈরি হয়েছিল। যদিও এটা সরাসরি জীবনের উৎপত্তির উত্তর দেয় না, তবে এটা দেখায় যে প্রকৃতিতে এমন প্রক্রিয়া সম্ভব, যেখানে সামান্য একটা পার্থক্য থেকেই বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।
নোবেল কমিটির মূল্যায়ন
নোবেল কমিটি ফর কেমিস্ট্রির চেয়ারম্যান হাইনার লিংকে এই আবিষ্কারকে একশো বছরেরও পুরনো একটা রাসায়নিক রহস্যের সমাধান বলে বর্ণনা করেছেন। কমিটির সদস্যরা সোয়াইয়ের পরীক্ষাকে জৈব রসায়নের অন্যতম চমকপ্রদ পরীক্ষা হিসেবে অভিহিত করেছেন। সুইডেনের স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস এই পুরস্কার ঘোষণা করে, আর সোয়াই নিজে তার জন্মস্থান হিরোশিমা থেকে ফোনে যুক্ত হয়ে এই খবর শুনে আনন্দ প্রকাশ করেন।
এই বছরের নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমান, যা দুই বিজ্ঞানীর মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে।
কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ
রসায়নের ইতিহাসে এমন খুব কম উদাহরণ আছে, যেখানে একটা তাত্ত্বিক প্রশ্নের সমাধান এতটা সরাসরি শিল্প খাতে প্রভাব ফেলেছে। কাগান ও সোয়াইয়ের গবেষণা আজকের দিনে ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বহু পদ্ধতির ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। নিরাপদ এবং কার্যকর ওষুধ তৈরির জন্য নির্দিষ্ট আয়না-রূপের মলিকিউল আলাদা করে তৈরি করার ক্ষমতা আজ ওষুধ শিল্পের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেষ কথা
হেনরি কাগান ও কেনসো সোয়াইয়ের এই আবিষ্কার শুধু একটা পুরস্কার জেতার গল্প নয়, বরং এটা বিজ্ঞানের ধৈর্য আর অধ্যবসায়ের একটা দৃষ্টান্ত। একটা সাধারণ প্রশ্ন থেকে শুরু করে, কয়েক দশক ধরে নিরলস গবেষণার মধ্য দিয়ে তারা এমন একটা সমাধান বের করেছেন, যা এখন সারা বিশ্বের রসায়নবিদদের কাজে লাগছে। প্রকৃতির এক গভীর রহস্য উন্মোচনের এই যাত্রা আগামী দিনের বিজ্ঞান গবেষণায়ও নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
সম্পর্কিত ব্লগ

অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড

শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথাম পিল্লাই

