• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • সপ্তম শ্রেণি
  • লখার একুশে (গদ্য)
লখার একুশে (গদ্য)

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

লখার একুশে (আবুবকর সিদ্দিক)

লখার রাতের বিছানা ফুটপাতের কঠিন শান। এই শান দিনের বেলায় রোদে পুড়ে গরম হয়। রাতে হিম লেগে বরফের মতো ঠান্ডা হয়। ঠান্ডা শানে শুয়ে লখার বুকে কাশি বসে। গায়ে জ্বর ওঠে।

বাপকে লখা দেখেনি। চেনে না। মা তার ত্যানাখানি পরে দিনভর কেঁদে-কেঁদে ভিখ মেঙে ফেরে। লখার দিন কাটে গুলি খেলে, ছেঁড়া কাগজ কুড়িয়ে, বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি করে আর খাবারের দোকানের এঁটোপাতা চেটে। রাতে মায়ের পাশে লখা খিদের কষ্ট ভুলে যায়।

এই লখা, ছায়া দেখলে বুক কাঁপে যার, সে আজ ভোররাতে মায়ের পাশ থেকে উঠে পড়ল। মা মুখ হাঁ করে ঘুমুচ্ছে। লখা চুপি চুপি পা ফেলে হারিয়ে গেল ধোঁয়া-ধোঁয়া কুয়াশার মধ্যে।
খানিকটা এগিয়ে উঁচু রেললাইন যেন দুটো মরা সাপ। পাশাপাশি শুয়ে আছে চুপচাপ। লখা ইটের টুকরো দিয়ে ইস্পাতের লাইনে ঠুক-ঠুক ঠুকে তার উপর কান পাতল। হ্যাঁ, শব্দ শোনা যাচ্ছে। যেন গানের সুরলহরি বয়ে যাচ্ছে কানের ভিতর দিয়ে। লখা ভারি মজার দুষ্টু ছেলে। গানের মজা ফুরিয়ে গেলে পর এক লাফে লাইন পেরিয়ে ওপারে পৌঁছে গেল। সেখানে মস্ত নিচু খাদ। তার ভিতর গড়িয়ে পড়লে হাত-পা ভাঙবে নির্ঘাত। খুব সাবধানে খাদ পেরিয়ে ওপারের ডাঙায় উঠে এলো সে। ডাঙাটা আসলে বনজঙ্গলে অন্ধকার। ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে আর ধেড়ে ধেড়ে গাছের ঝাঁকড়া ছায়া মাথা নেড়ে নেড়ে ভয় দেখাচ্ছে লখাকে।

খচ করে কাঁটা ঢুকে গেল বাঁ পায়ে। কীসের কাঁটা? হবে হয়তো বাবলা-টাবলার। লখা উবু হয়ে বসে কাঁটাটা খসিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দিলো। কিন্তু বিষ তো যায় না। কী অসহ্য যন্ত্রণা! আঁ আঁ বলে কেঁদে দিল লখা। কিন্তু কাঁদলে তো চলবে না। সময় নেই আর। তাকে যে যেতেই হবে। আবছা অন্ধকার। ফিনফিনে ঠান্ডা।

গাছের পাতা বেয়ে শিশির গড়িয়ে পড়ছে। খুক খুক করে কাশি আসছে লখার। খালি গা শিশিরে ভিজে শীত লাগছে। একটা ছ্যাঁচড়া ডাল লখার হাফপ্যান্টটা টেনে ধরেছে পিছন দিক দিয়ে। প্যান্ট আধখসা অবস্থায় দৌড়াতে লাগল সে।

একটা খেঁকশেয়াল বুঝি তাকিয়ে দেখছিল তাকে। দেখুক গে। এখন ভয় ভয় করলে দেরি হয়ে যাবে। কাজেই এবার চোখ-কান বুজে দৌড় শুরু করতে হলো তাকে। আর শেষটায় সেই অদ্ভুত গাছটার নিচে পৌছে গেল লখা, যার ডালে ডালে রক্তের মতো টুকটুকে লাল ফুল। দিনের বেলায় রেললাইনের উপর দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে থোকা থোকা ফুলের লাল ঝুঁটির পানে তাকিয়ে থাকে সে। এখন ওই উপরের এক থোকা ফুল তার পেড়ে আনা চাই।

হাতের মুঠো পাকিয়ে মনটাকে শক্ত করে নিল লখা। তারপর চড় চড় করে গাছে উঠে গেল। একেবারে কাঠবেড়ালির বাচ্চা যেন। মগডালের কাছাকাছি এসে কয়েকটা তুলোমিঠের মতো বড়ো বড়ো থোকা পেয়ে গেল সে। শিশিরে ভেজা তুলতুলে। তা হোক, তোমরা এখন আমার। নাও সব টুপটাপ নেমে এসো তো আমার মুঠোর মধ্যে। কষ্ট লাগছে। আহা! কীসের কষ্ট? এই তো একটু পরে আমি তোমাদের এমন একটা উঁচু জায়গায় নিয়ে রেখে দেবো, যেখান অবধি তোমরা এই গাছের মগডালে কোনোদিন উঠতে পারবে না। এসো, এসো, লক্ষ্মীসোনারা সব নেমে এসো তো।

ফুল নিয়ে যখন মাটিতে নেমে এলো লখা, তখন সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে তার। কনুই ও বুকে চটচটে ঠান্ডা। হাত দিয়ে টের পায়, টাটকা রক্ত। গাছের ডালপালা কাঁটায় ভর্তি। গা-হাত-পা ছিঁড়ে গেছে আঁচড় লেগে। তাতে কী! জিতে গেছি আমি। গর্বে বুক ফুলে ওঠে লখার।

সেদিন সকাল ছিল বড় আশ্চর্য সুন্দর। আকাশে হালকা কুয়াশা। অল্প অল্প শীত। আর দক্ষিণের সামান্য বাতাস। পথে পথে মিছিলের ঢল নেমেছে। শত শত মানুষ। হাতে ফুলের গুচ্ছ। ঠোঁটে প্রভাতফেরির গান। ধীর পায়ে শহিদ মিনারের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই ভিড়ের মধ্যে ক্ষুদে টোকাই লখাকে ঠিকই দেখা যাচ্ছে। তাকে চিনতে কষ্ট হয় না। কারণ মিছিলের সবার গায়ে চাদর, কোট, সোয়েটার। শুধু তার গা খোলা উদাম, গাঢ় কালো। হাত উপচে পড়ছে রক্তলাল ফুলের গুচ্ছ। মিছিলে পা মিলিয়ে সেও চলেছে শহিদ মিনারে ফুল দিতে। সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়ে চলছে। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি? কিন্তু তার গলা দিয়ে কথা তো ফোটে না, শুধু শব্দ হয় আঁ আঁ আঁ আঁ।

আসলে কথা ফুটবে কী করে! লখা যে জন্মবোবা। বাংলা বুলি তার মুখে ফুটতে পায় না। সে মনে মনে বলে অআকখ। বাইরে শব্দ হয় আঁ আঁ আঁ আঁ।

পূর্ববর্তীপরবর্তী
লখার একুশে (গদ্য) - অন্যান্য প্রশ্ন

লখার একুশে (আবুবকর সিদ্দিক)

সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

লখা কখন তার খিদের কষ্ট ভুলে যায়?

ঘুমুতে গেলে
মাকে কাছে পেলে
খেলার সঙ্গী পেলে
প্রভাতফেরির গান শুনলে

লখাকে চোখ-কান বুজে দৌড় শুরু করতে হলো, কারণ-

সে ভয় পেয়েছিল
বাইরে অন্ধকার ছিল
তাকে ফুল আনতে হবে
মায়ের কাছে ফিরে যেতে হবে

লখা ও দিপুর মধ্যে যে বিষয়ে মিল আছে তা হলো-

শহিদ মিনারে আসা মানুষ দেখার ইচ্ছা
শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আবেগ
প্রতিবন্ধকতা দূর করার অদম্য বাসনা
শহিদ দিবসের গান গওয়ার আগ্রহ

লখার বুকে কাশি আসার কারণ কী?

উদোম থাকায়
ঠান্ডা শানে শোয়ায়
দিনভর ঘুরে বেড়ানোয়
লখা অসুস্থ থাকায়

বন্ধুদের সাথে লখার দিন কাটে কীভাবে?

ভিক্ষা করে
মারামারি করে
চুরি করে
কাগজ কুড়িয়ে ও মারামারি করে

ছায়া দেখে কার বুক কাঁপে?

লখার
লখার মায়ের
লখার বন্ধুর
লখার বাবার

লখার মা ঘুমাচ্ছিল কেমন করে?

নাক ডেকে
মুখ হাঁ করে
মরা সাপের মতো
কুম্ভকর্ণের মতো

কী দেখে লখা ভয় পায়?

অন্ধকার
ছায়া
কাঁটা
ভূত

লখার বাঁ পায়ে কীসের কাঁটা ঢুকল?

hisবালের/বাবলার কাঁটা
বরই
গোলাপ
খেজুর

লখা 'আঁ আঁ' বলে কেঁদে দিলো কেন?

কাঁটার অসহ্য যন্ত্রণায়
কঠিন শানে ঘুম না ধরায়
ফুলগুলো নাগালে না পাওয়ায়
সারা শরীর জ্বলে যাওয়ায়

পিছন দিক দিয়ে লখার হাফপ্যান্টটা টেনে ধরেছে কে?

কাঠবিড়ালি
লখার মা
বাবলার কাঁটা
ছ্যাঁচড়া বাবলা (ঝোপঝাড়)

কোথায় দাঁড়িয়ে লখা থোকা থোকা ফুলের ঝুঁটির দিকে তাকিয়ে ছিল?

গাছের নিচে দাঁড়িয়ে
বড়ো রাস্তার মোড় থেকে
গাছের মগডাল থেকে
রেললাইনের উপর দাঁড়িয়ে

লখা মনকে শক্ত করে নিল কেমন করে?

আঁ আঁ শব্দ করে
হাতের মুঠো পাকিয়ে
প্রভাতফেরি করে
ফুল নিয়ে এসে

লখা কীসের বাচ্চার মতো গাছে উঠল?

কাঠবিড়ালি
খেঁকশেয়াল
বনবিড়াল
চিতাবাঘ

'লখার একুশে' গল্পটিতে 'লক্ষ্মী সোনা' বলে কাদের সম্বোধন করা হয়েছে?

লখাকে
থোকা থোকা ফুলগুলোকে
লখার বন্ধুদের
ভাষা শহিদদের

'জিতে গেছি আমি' লখার এমন কথা বলার কারণ-

শেয়ালকে ভয় না পাওয়া
শীতকে পরোয়া না করা
ফুলের গোছা হাতে পাওয়া
মিছিলে শরিক হতে পারা