- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমি খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
ফাতেমীদের পরিচয়
১০৯ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর আফ্রিকার তিউনিসিয়ায় সর্বপ্রথম ফাতেমীয় খিলাফতের গোড়াপত্তন হয়। ফাতেমীয়রা ছিল হযরত আলীর অনুসারী ও অনুগামী। হযরত আলীর অনুসারী বা সমর্থকগণ ইতিহাসে 'শিয়া' নামে পরিচিত। ফাতেমীয়রা নিজেদেরকে হযরত আলী এবং তাঁর বিবি ফাতেমার বংশধর বলে দাবি করেন এবং ফাতেমার নামানুসারেই তাঁদের প্রতিষ্ঠিত খিলাফত ইসলামের ইতিহাসে 'ফাতেমীয় খিলাফত' নামে পরিচিত।
হযরত আলী (রা.) এবং হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বংশধরগণ ফাতেমী। হযরত ফাতেমা (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর বংশধরগণ প্রথমত, দুভাগে রিভক্ত। প্রথম ভাগ- হযরত আলী ও তাঁর বিবি ফাতেমার গর্ভজাত সন্তান হযরত হোসেনকে ইসলামের ইমাম বলে স্বীকার করে। দ্বিতীয় ভাগ- হযরত আলীর অপর এক পুত্র মুহম্মদ আল-হানাফিয়াকে ইসলামের ইমাম বলে মানেন। এ ভাগ বা দলকে 'কায়সানী' শিয়াও বলা হয়ে থাকে।
হযরত হোসেনের ইমামতিতে বিশ্বাসী প্রথম অংশ আবার দুভাগে বিভক্ত। (ক) ইসনে আসারিয়া অর্থাৎ দ্বাদশ (১২) ইমামে বিশ্বাসী এবং (খ) সা'বিয়া বা ইসমাইলীয়রা অর্থাৎ সাত (৭) ইমামে বিশ্বাসী।
ইসনে আসারিয়াদের প্রথম ইমাম হযরত আলী (রা.) এবং শেষ ইমাম ইসমাইল। সা'বিয়া বা ইসমাইলীয়দের প্রথম ইমাম হযরত আলী (রা.) এবং শেষ ইমাম আল-মাহদী।
উপরিউক্ত দু (২) দলই অর্থাৎ ইসনে আসারিয়া ও সা'বিয়া বা ইসমাইলীয়গণ যষ্ঠ ইমাম জাফর আস-সাদেক পর্যন্ত প্রত্যেককেই সম্মানিত ইমাম বলে স্বীকার করেন। যষ্ঠ ইমাম জাফর-আস-সাদেক তাঁর জ্যৈষ্ঠ পুত্র ইসমাইলকে ইমাম করার জন্য মনোনয়ন দান করেন। কিন্তু পুত্র ইসমাইল পিতা জাফর-আস-সাদেকের পূর্বেই ইন্তেকাল করেন। ফলে জাফর-আস্-সাদেক তাঁর মৃত্যুকালে (৭৬৫) অপর পুত্র মুসা-আল-কাজিমকে ইমামতি করার জন্য উত্তরাধিকারী মনোনয়ন দান করে যান। সা'বিয়া বা ইসমাইলীয়রা এ মুসা-আল-কাজিমকে ইসলামের ইমাম বলে স্বীকার করে না। ইসমাইলীয়দের মতে, হযরত ইসমাইলের মৃত্যুর পর হতে "যাহেরী ইমাম" খতম হয়েছে এবং হযরত ইসমাইলের পুত্র মুহাম্মদ আল-মাকদুম হতে "বাতেনী ইমাম" শুরু হয়েছে। এ কারণে সা'বিয়া বা ইসমাইলীয়দেরকে "বাতেনী শিয়া" ও বলা হয়ে থাকে। যাহোক এ শিয়া বা ফাতেমীয়দের বংশ প্রতিষ্ঠার অনুকূলে গুরুত্বপূর্ণ কারণসমূহ নিম্নে আলোচিত হলো:
খলিফা নির্বাচনে অসমর্থ: মহানবি হযরত মুহম্মদ (স.)-এর ইন্তেকালের পর এবং হযরত আবু বকর (রা.)-এর নির্বাচনের সময় হতেই একদল লোক মনে করতেন যে, যেহেতু মহানবি (স.)-এর কোনো ছেলে বেঁচে ছিল না তাই তাঁর জামাতা হযরত আলী (রা.)-ই খলিফা হবার দাবিদার। কিন্তু প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)-এর পর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় নির্বাচনেও হযরত আলী (রা.)-এর সমর্থকদের ইচ্ছা পূরণ হয়নি। চতুর্থবারে হযরত আলী (রা.) খলিফা নির্বাচিত হলেও অচিরেই (৬৬১) খিলাফত উমাইয়াদের হাতে চলে যায়। অধিকন্তু কারবালার হত্যাকান্ডের পর হযরত আলী (রা.)-এর সমর্থকগণ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। নিজেদের প্রাধান্য বজায় রাখার জন্য তারা খিলাফত হারিয়ে 'ইমামতের উপর জোর দেন'। এ সময় হতেই তাদের (শিয়াদের) আধিপত্য বজায় রাখার প্রচেষ্টা চলতে থাকে।
উমাইয়া ও আব্বাসীয়দের বিরোধিতা হযরত আলী (রা.)-এর বংশীয় ইমামগণ খিলাফত লাভের জন্য সচেষ্ট হলেও উমাইয়া ও আব্বাসীয়দের সাথে তাদের শত্রুতা আরম্ভ হয়। প্রথমত, শিয়ারা উমাইয়াদের উৎখাত করার জন্য আব্বাসীয় আন্দোলনে যোগ দেয়। কারণ আব্বাসীয়গণ তাদেরকে (শিয়াদেরকে) খিলাফত লাভেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর শিয়াদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি এবং অসংখ্য শিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ফলে শিয়ারা সশস্ত্র সগ্রামের মাধ্যমে খেলাফত লাভের জন্য আন্দোলন চালাতে থাকে এবং এ আন্দোলনের গতি দিন দিন তীব্রতর হতে থাকে।
ধর্মীয় আশ্রয়: শিয়ারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য ধর্মীয় আন্দোলনের আশ্রয় নেয়। এ আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও সমর্থক ছিলেন পারস্যবাসী আবদুল্লাহ-বিন-মাইমুন। তিনি নবম শতাব্দীর শেষদিকে ফকির, দরবেশ ও বণিক ছদ্মবেশে মুসলিম জাহানের প্রায় সর্বত্র এমনকি উত্তর আফ্রিকাতেও প্রচারক বা 'দাই' পাঠাতে থাকেন। এ প্রচারকদের মূল কাজ ছিল ইসমাইলীয় মতবাদের বীজ বপন করা। আব্দুল্লাহ-বিন-মাইমুন সিরিয়া ও আহওয়াজ প্রভৃতি অঞ্চলে ইসমাইলীয় মতবাদ প্রচার করতে থাকেন। আব্দুল্লাহ-বিন-মাইমুন ৮৭৪ সালে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর শিষ্য আবু আব্দুল্লাহ আল-শিয়ী ইসমাইলীয় মতবাদ প্রচারে লিপ্ত হন। আল-শিয়ী ছিলেন ইয়েমেনের অন্তর্গত সানার অধিবাসী এবং আব্বাসীয় খিলাফতের আমলে বাগদাদের একজন 'মুহতাসিব'।
ধর্মীয় প্রচারণা: ইতঃপূর্বে আব্দুল্লাহ-বিন-মাইমুন ইবনে হাওসাব ও হুলওয়ানী নামক দুজন বিখ্যাত প্রচারক বা দাইকে উত্তর আফ্রিকাতে প্রেরণ করেছিলেন। ইবনে হাওসাবের পরামর্শ ও নির্দেশে আবু আবদুল্লাহ আল-শিয়ী ৯০০ সালে হজের সময় ইফরিকিয়াতে চলে আসেন এবং কাতামা গোত্রের সাথে শিক্ষক বেশে মধুর সম্পর্ক স্থাপনে সক্ষম হন। আবু আবদুল্লাহ আল-শিয়ী অতি গোপনে তাঁর প্রচারকার্যের মাধ্যমে কাতামা গোত্রকে আব্বাসীয় শাসনের বিরুদ্ধে অতিশয় উত্তেজিত করে তোলেন এবং তিনি আরও প্রচার করেন যে, অতি শীঘ্রই ইমাম মাহদীর আগমন ঘটবে। তিনি আরও প্রচার করেন যে, ধর্মীয় ব্যাপারে অতি জটিল প্রশ্নের সমাধান একমাত্র ইমামগণই দিতে পারেন। এ ধরনের ইমামের সংখ্যা ৭ জন। এদের প্রথম ইমাম হযরত আলী (রা.) এবং শেষ ইমাম হযরত ইসমাইল। এভাবে কাতামা গোত্রের লোকজন তাকে সাধু-দরবেশ বলে গ্রহণ করে এবং ইমাম আল-মাহদীর আগমন হলে তারা তাঁকে সাহায্য দান করবেন বলে আশ্বাস দেন।
উত্তর আফ্রিকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি: উত্তর আফ্রিকায় শাসনকর্তা ছিলেন ইব্রাহিম-বিন-আহমদ আগলাবী। আবু আবদুল্লাহ আল-শিয়ী ইতোমধ্যেই কাতামাদের সাহায্যে অনেকগুলো প্রদেশ দখল করেন এবং সেখানে ইসমাইলীয় মতবাদ প্রচার করেন। ১০৩ খ্রিষ্টাব্দে ইব্রাহিম-বিন-আহমদ আগলাবীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র জিয়াদাত উল্লাহ্ সিংহাসনে বসেন। তিনি তাঁর রাজ্যে ইসমাইলীয় মতবাদ প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি অনুধাবন করে আবু আবদুল্লাহ্ একজন তুখোড় ও ঝানু প্রচারক সাঈদ-ইবনে-হোসেনকে উত্তর আফ্রিকায় প্রেরণ করলে জিয়াদাত উল্লাহ্ তাকে কায়রোয়ানে কন্দী করেন। এ সংবাদে আবু আবদুল্লাহ কাতামাদের সাহায্য নিয়ে মাজানা, সাস ও মেরিদা প্রভৃতি অঞ্চল জয় করে জিয়াদাত উল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। জিয়াদাত উল্লাহ যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে বাগদাদ গমন করেন এবং রামোলা নামক স্থানে মারা যান। আবু আবদুল্লাহ্ জিয়াদাত উল্লাহ আগলাবীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে বিজয়ীর বেশে রাজধানী রাক্কাদায় প্রবেশ করেন এবং স্বহস্তে রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। অতঃপর আবু আবদুল্লাহ আল-শিয়ী সাঈদ-বিন-হোসেনকে একটি অশ্বপৃষ্ঠে বসিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করেন এবং সানন্দে ঘোষণা করতে থাকেন, "ইনিই তোমাদের প্রভু (ইমাম)।" এরপর ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে আবু আবদুল্লাহ কায়রোয়ান মসজিদে সাঈদ-বিন-হোসেনকে 'মাহ্দী' বলে ঘোষণা করেন। সে সময় হতে তিনি "ওবায়দুল্লাহ আল-মাহদী" নাম ধারণ করে মিশরে প্রথম ফাতেমীয় খলিফা হন এবং জনগণকে ইসমাইলীয় মতবাদ গ্রহণের আহ্বান জানান।
উপরিউক্ত আলোচনা হতে এটা প্রতীয়মান হয় যে, শিয়া সম্প্রদায় ছিল একটি রাজনৈতিক দল। তাদের ইচ্ছা ছিল মহানবি (স.)-এর সাথে তাদের আত্মীয়তার যোগসূত্র স্থাপন করে উমাইয়া ও আব্বাসীয়দেরকে খিলাফত হতে বঞ্চিত করা। তাই তারা পর্যায়ক্রমে বিদ্রোহে লিপ্ত হয়। কিন্তু এ বিদ্রোহে টিকতে না পেরেই তারা ফাতেমীয় দাওয়াত দিয়ে ইমামতি করে কৌশলে তাদের মনের রাজনৈতিক বাসনা পূরণ করে।
উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

