- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমি খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
খলিফা আল-আজিজ (৯৭৫-৯৯৬ খ্রি.)
ফাতেমীয় বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ খলিফা আল-মুইজের মৃত্যুর পর তদীয় পুত্র "নিজার আল-ইমাম নিজার আবু মনসুর আল-আজিজ বিল্লাহ" উপাধি গ্রহণ করে ৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে (৩৬৫ হি.), ফাতেমীয় সিংহাসনে আরোহণ করেন। ইতিহাসে তিনি আল-আজিজ নামেই পরিচিত। তার শাসনকাল (৯৭৫- ৯৯৬ খ্রি.) ফাতেমীয় খিলাফতের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
পরিচয় ও সিংহাসনারোহণ
আল-আজিজ ৩৪৪ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আব্দুল্লাহ্-এর মৃত্যুতে তিনি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হন। ৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ২৪ বছর বয়সে যৌবনের পূর্ণ উদ্যম ও প্রতিভা নিয়ে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন।
আল-আজিজের রাজ্যবিস্তার
খলিফা আল-আজিজ একজন সুযোগ্য শাসক ছিলেন। তিনি পিতা আল-মুইজের অসমাপ্ত কার্য সমাপ্ত করার জন্য কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রথমত তিনি সিরিয়া অভিযান পরিচালনা করেন।
সিরিয়া অভিযান: আল-মুইজ শেষ জীবনে সিরিয়া সমস্যাটি সুরাহা করে যেতে পারেননি। ফলে পরবর্তী শাসক আল-আজিজ ক্ষমতা লাভের পর সিরিয়ার বিষয় নিয়ে এক মারাত্মক রাজনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হন। আল-মুইজের মৃত্যু শয্যায় বিজ্ঞ উজির ইবনে কিপ্লিস সিরিয়ার ব্যাপারে তথা গ্রিকদের সাথে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বজায় রাখতে পরামর্শ দেন।
আলেম্পোর হামদানীয়রা যদি জুমার খুতবায় এবং মুদ্রায় খলিফার নাম উল্লেখ করে তবে তাতেই খলিফাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু বারবারই মিশরের উচ্চাভিলাষী শাসকেরা সিরিয়া দখলের কামনা চেপে রাখতে পারেননি।
ঘটনা: হাফতকীন আবার সিরিয়া উপস্থিত হয়ে দামেস্ক থেকে ফাতেমীয় শাসকদের বিতাড়িত করলেন। হাফতকীনের সাথে যোগ দিল কারামাতীয়রা, ফলে হাফতকীন কেবল সিরিয়া নিয়েই সন্তুষ্ট থাকলেন না, খোদ মিশরের দরজায় হানা দেওয়ার
পরিকল্পনা করেন। ফাতেমীয়দের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে খলিফা আল-আজিজ সেনাপতি জওহরকে হাফতকীনের বিরুদ্ধে এক বিশাল সৈন্যবাহিনীসহ পাঠান।
কারামাতীয়রা রামলা থেকে যখন জানতে পারে জওহরের বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে আসছে তখন আতঙ্কিত হয়ে তারা শহর ছেড়ে পালায়। এ সংবাদে হাফতকীন খুবই বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি তাঁর তুর্কি বাহিনীসহ তিবিরিয়ানে ঘাঁটি করলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে যুদ্ধ শুরু হয়। খলিফার সাহায্য প্রেরণে বিলম্ব হওয়ায় জওহর হাফতকীনকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে সন্ধি করতে বাধ্য হন। তাইয়েবা রিরায়ে এক যুদ্ধের পর হাফতকীন পলায়ন করলেন। কিন্তু তিনি ধৃত হয়ে কায়রোতে গমন করেন এবং পরবর্তীতে মর্যাদার সাথে বসবাসের সুযোগ পান।
বার্বারদের দমন: আল-আজিজের রাজত্বকালে বার্বারদের অসন্তোষ বৃদ্ধি পায়। বার্বারদের প্রতি খলিফার কোনো আস্থা ছিল না। এ জন্য খলিফা বার্বারদের পরিবর্তে তুর্কি বন্দিদের মুক্তি দিয়ে তাদের সাহায্যে একটি দেহরক্ষী বাহিনী গঠন করেন। বীরশ্রেষ্ঠ হাফতকীনকে এ বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করেন। এভাবে বিদ্রোহী বার্বারদের বিরুদ্ধে তিনি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ইবনে কিল্লিস এর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করার অভিযোগে তিনি তাকে বিষপান করান বলে কথিত আছে।
আল আজিজের কৃতিত্ব
শাসনব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রেও আল-আজিজ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। শাসক হিসেবে তাঁর বিভিন্নমুখী কার্যাবলি নিম্নরূপ:
১. সুদক্ষ শাসক আল-আজিজ একজন সুযোগ্য শাসক ছিলেন। তিনি জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্য লোকদের রাজকার্যে নিযুক্ত করে যোগ্যতার সঙ্গে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। ইহুদি মন্ত্রী ইয়াকুব-বিন-কিল্লিসের পরামর্শে দক্ষতার সঙ্গে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তিনি সুদীর্ঘ বাইশ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করে দেশে সমৃদ্ধি আনয়ন করেন। প্রধান উজির কিল্লিস ১,০০,০০০ দিনার বেতন পেতেন।
২. রাজস্ব সংস্কার: মিশরের রাজস্ব সংস্কারে আল-আজিজ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি রাজস্ব ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করেন। বিনা রশিদে কর আদায় করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং কঠোর হস্তে উৎকোচ প্রদান ও গ্রহণ কথ করেন। ফলে মিশরে রাজস্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। সম্ভবত এ সময়টি ছিল ফাতেমীয়দের সোনালি যুগ।
৩. সেনাবাহিনীর সংষ্কার: প্রশাসনের ন্যায় সুশৃঙ্খল নিয়মিত এবং দক্ষ একটি সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলেন। সেনাবাহিনীকে মূলে ও নৌপথে শক্তিশালী করেন। নতুন ইউনিট, দুর্গ এবং জাহাজ ও পোতাশ্রয় নির্মাণ করেন। ঈযা বিন নেসতুরিয়াস এর সহযোগিতায় তিন মাসের মধ্যে ছয়টি নতুন নৌবহর সংযোগ করতে সক্ষম হন।
৪. বিচার ব্যবস্থা: আল-আজিজ ফাতেমীয় ইতিহাস প্রণেতা, ধর্মীয় কানুন ও বিচার ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করেন। কদিন নুমান পরিবারকে দাওয়া ও বিচার বিভাগের দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। নুমানের পুত্র আলী-বিন নুমান তার সময় প্রধান কাজির পদ অলংকৃত করেন। আলীর মৃত্যুর পর ভ্রাতা মুহাম্মদ-বিন নুমান উক্ত পদে অধিষ্ঠিত হয়ে বিচারকার্য পরিচালনা করেন।
৫. স্থাপত্যকীর্তি: আল-আজিজের স্থাপত্যকীর্তি অবিস্মরণীয়। সুদক্ষ কারিগর প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদ দ্বারা তিনি অনেকগুলো সুন্দর সুন্দর ইমারত ও মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি স্বর্ণ প্রাসাদ, কারাগার, গোরস্থান, যাতায়াত ও হাকিমের মসজিদ ও আয়নুস শামসের প্রাসাদগুলো নির্মাণ করে স্থাপত্য অবদান রেখে যান। তার সময় জওহর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যানিকেতন।
আব্দুল আজিজের চরিত্র
ঐতিহাসিক লেনপুল আল-আজিজের চরিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন যে, "বিশাল হৃদয়, সহাস্য কমনীয়, লোহিত কেশধারী, নীল চক্ষুবিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আরবদের ভীতির সঞ্চারক, দক্ষ শিকারি, অকুতভয় সেনাপতি, সমঝোতায় বিশ্বাসী, শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা থাকলেও ক্ষমাকারী এবং রক্তপাত এড়িয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী আল-আজিজ। তিনি নিজে জাঁকজমকের সঙ্গে বসবাস পছন্দ করতেন এবং মন্ত্রী ও উজিরবর্গকে জাঁকজমকে রাখতেন। ইবনে কিল্লিস এজন্য ১,০০,০০০ দিনার বেতন পেতেন। খলিফা সর্বদাই অতি আশ্চর্য জীবজন্তু, বিরল মণিমুক্তা ও হীরকখণ্ড সংগ্রহ করতেন। এ জন্য প্রচুর অর্থ তিনি ব্যয় করতেন।
তিনি রমজান মাসে জুমার দিবসে রাষ্ট্রীয় শোভাযাত্রা, জনগণের মাঝে সর্বোচ্চ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে সালাত পরিচালনা, চাকুরে এবং আশ্রিতদের নির্ধারিত বেতন প্রদান করতেন। খলিফা কবিতা পছন্দ করতেন, নিজে কবিতা আবৃত্তিও করতেন।
ফাতেমীয় খিলাফত পতনের জন্য তিনি দায়ী কি না?
বিজ্ঞতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কার্য পরিচালনা করলেও তাঁর কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি লক্ষ করা যায়। ইসমাইলীয় মতবাদে বেশি গুরুত্বারোপ করায় সুন্নি মুসলমানগণ তার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের প্রতি সহনশীল নীতি পরবর্তী শাসনের ক্ষেত্রে কল্যাণকর হয়নি। তুর্কি দাস দ্বারা দেহরক্ষী বাহিনী গঠন করার ফলে ফাতেমীয় খিলাফতের প্রতি অন্যান্যদের বৈরীভাব লক্ষ করা যায়। পরবর্তীতে তার নাবালক পুত্র বিশাল সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। উপরিউক্ত কারণগুলোর জন্য পরবর্তীকালে ফাতেমীয় খিলাফতের পতন ঘটে। তাই কিছু কিছু ঐতিহাসিক বলেন, আল-আজিজ ফাতেমীয় খিলাফতের পতনের জন্য কিছুটা দায়ী।
আল-আজিজ দীর্ঘ বাইশ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করে আফ্রিকার ফাতেমীয় খিলাফতে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর শাসনকার্য পরিচালনার জন্য সুযোগ্য মন্ত্রী কিল্লিস-এর সহযোগিতা পেয়েছিলেন। তিনি দয়ালু ও সদয় প্রকৃতির শাসক ছিলেন। তার রাজত্বকাল মিশরের ফাতেমীয় খিলাফতে স্মরণীয় অধ্যায়।
উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

