- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমি খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
ফাতেমীয় আন্দোলন
কারবালা হত্যাকান্ডের পর হতেই মুসলিম জগৎ হযরত আলী (রা.)-এর বংশধরদের পক্ষে ধর্মান্ধ প্রচারণা আরম্ভকরেছিল। পরবর্তীকালে হযরত আলী (রা.)-এর সমর্থকদের বিদ্রোহ আরেকটি বিশিষ্ট রূপ ধারণ করে এবং একটি রাজবংশ স্থাপনে সহায়তা করে। অধ্যাপক হিট্টি বলেন, "আব্বাসীয় খলিফাদের ইসলাম জগতের আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের প্রতিবাদস্বরূপ ফাতেমীয় খেলাফত ৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে আফ্রিকাতে স্থাপিত হয়েছিল। এটা ছিল শিয়াদের সর্বপ্রথম রাজবংশ যা ইতিহাসে ফাতেমী নামে পরিচিত।"
শিয়া বা ফাতেমীদের প্রাথমিক ইতিহাস: হযরত মুহম্মদ (স.)-এর কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় নিজের উত্তরাধিকারী সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে যাননি। তাঁর ওফাতের পর হযরত আবু বকর (রা.), হযরত উমর (রা.), হযরত উসমান (রা.) খলিফা নির্বাচিত হলেও কতিপয় মুসলমান হযরত মুহম্মদ (স.)-এর জামাতা হযরত আলী (রা.)-কে খিলাফতের বৈধ ওয়ারিশ মনে করেন। হযরত আলী (রা.) চতুর্থ খলিফা নির্বাচিত হলেও সিরিয়ার শাসনকর্তা হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর সাথে বিরোধ বাধে এবং শেষ পর্যন্ত খারেজি বিদ্রোহীদের হাতে শহিদ হন।
আলী ও ফাতেমা (রা.)-এর কনিষ্ঠ পুত্র হোসেন (রা.) এজিদের খিলাফত অস্বীকার করলে কারবালার প্রান্তরে সবংশে শহিদ হন। কিন্তু এতে আলী (রা.)-এর বংশের শক্তি হ্রাস না পেয়ে বরং বৃদ্ধি পায়। হোসাইন (রা.) পারস্যের সম্রাট এয়াজর্দেজদের কন্যা শাহের বানুকে বিয়ে করেন। শাহের বানুর গর্ভজাত সন্তান জয়নুল আবেদীন। কাজেই পারসিকরা জয়নালের পক্ষে দন্ডায়মান হয়ে কারবালার প্রতিশোধ গ্রহণে বদ্ধপরিকর হয়। ইসলামের ইতিহাসে এরাই শিয়া নামে পরিচিত। শিয়ারা প্রথম তিন খলিফাকে বৈধ বলে স্বীকার করে না। তাদের মতে আলী, হাসান, হোসেইন যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ইমাম এবং জয়নুল আবেদীন চতুর্থ ইমাম। জয়নুল আবেদীনের মৃত্যুর পর তাঁর ভক্তদের একদল তৎপুত্র জায়েদকে ও অনেকে তদীয় ভ্রাতা মুহাম্মদ আল-বাকেরকে পঞ্চম ইমাম বলে স্বীকার করে। এভাবে অধিকাংশের মতে মুহাম্মদের পুত্র জাফর সাদেক কিন্তু অন্যান্যদের মতে আবু মনসুর যষ্ঠ ইমাম।
৭৬৫ সালে ইমাম জাফর সাদেকের মৃত্যুর পর শিয়া সম্প্রদায় দুভাগে বিভক্ত হয়। মৃত্যুর পূর্বে ইমাম জাফর সাদেক তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাইলকে ইমামতির উত্তরাধিকার নিযুক্ত করেন। কিন্তু শীঘ্রই ইসমাইলের মৃত্যু হয়। অতঃপর ইমাম জাফর সাদেক তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মুসা আল-কাজিমকে শিয়া সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। শিয়া সম্প্রদায়ের একদল লোক মুসা আল-কাজিমকে দ্বাদশ ইমামের যথার্থ উত্তরাধিকারী মনে করেন। কিন্তু শিয়া সম্প্রদায়ের অপর একদল ইসমাইলের পুত্র মুহাম্মদ আল-মাকতুমকে সপ্তম ইমামের উত্তরাধিকারী মনে করেন। ইসমাইলের নামানুসারে এরা ইসমাইলীয় সম্প্রদায় হিসেবে খ্যাত। এ ইসমাইলীয় সম্প্রদায়ই আফ্রিকায় ফাতেমীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত করেন।
ইসমাইলীয় মতবাদের প্রচার ও ব্যাপকতা নবম শতাব্দীর মধ্যভাগে পারস্যের জনৈক চক্ষু চিকিৎসক মায়মুনের পুত্র আবদুল্লাহর অসাধারণ সংগঠন ও নেতৃত্বে ইসমাইলীয় মতবাদের ব্যাপক প্রচার কাজ শুরু হয়। তিনি পর্যায়ক্রমে পারস্যের আহওয়াজ, ইরাকের বসরা ও সিরিয়ার সালমিয়াতে প্রচার কাজের কেন্দ্র স্থাপন করে বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিধি (দাই) পাঠান। উক্ত দাইরা ছদ্মবেশে রাজনৈতিক মতবাদ প্রচার করতে থাকে। ইবনে মায়মুনের সংবেদনশীল চরিত্র ও তাঁর উদার মতবাদ উত্তর আফ্রিকার বার্বার, কিতামা ও অন্যান্য উপজাতিদের মধ্যে বেশ সাড়া জাগায়। আবদুল্লাহ্-বিন-মায়মুনের পর তাঁর বংশধর হাবিবের পুত্র সাইদ আল-হুসাইন ইসমাইলীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সময় ইতিহাস খ্যাত আবু আবদুল্লাহ আল-শিয়ীর মতো এক অনন্য সাংগঠনিক শক্তি-সম্পন্ন প্রচারক ইসমাইলীয়দের পক্ষে প্রচারণা চালায়। আল-শিয়ী নিজেকে মেহেদীর অগ্রদূত বলে প্রচার করেন।
তিনি তিউনিসিয়াকে তাঁর প্রচারের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি করে সেখানকার শাসনকর্তা জিয়াদাতুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। ইতোমধ্যে সাইদ আল-হুসাইনকে তিনি সালামিয়া হতে আফ্রিকায় আগমনের আমন্ত্রণ করেন। এ আমন্ত্রণ পেয়ে সাইদ আল-হুসাইন সওদাগরের বেশে আফ্রিকার অভিমুখে যাত্রা করেন। সর্তকতা অবলম্বন সত্ত্বেও তিনি সিজিলমাসা নামক স্থানে ধৃত হয়ে বন্দী হন। আবু আবদুল্লাহ্ আল-শিয়ী এ সংবাদ পেয়ে সসৈন্য অগ্রসর হয়ে তাকে শত্রুমুক্ত করেন। পরে ৯০৯ সালে সাইদ আল-হুসাইনকে রাক্কায় "ওবায়দুল্লাহ্ আল-মাহদী" উপাধি প্রদান করে আফ্রিকায় ফাতেমীয় খিলাফত কায়েম করেন।
উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমীয় বংশের উত্থান ও প্রতিষ্ঠা: ইসমাইলীয় সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার জন্য আব্দুল্লাহ-বিন-মায়মুন জোর প্রচার কার্য চালান। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রধান শিষ্য আবু আবদুল্লাহ আল-হুসাইন নবম শতাব্দীর শেষ ভাগে আফ্রিকায় গমন করে উদ্দীপনাপূর্ণ বক্তৃতা দ্বারা তথাকার বার্বার সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রভৃত প্রভাব বিস্তার করেন। উত্তর আফ্রিকার সুন্নি আগলাবীয় সুলতান জিয়াদাত উল্লাহ তাঁর রাজ্যে শিয়া মতবাদ প্রচার নিষিদ্ধ করেন ও সাইদ ইবনে হুসাইনকে বন্দী করেন। আবদুল্লাহ জিয়াদাত উল্লাহকে যুদ্ধে পরাজিত করে আফ্রিকা অধিকার করেন। নিজের ক্ষমতাকে সুরক্ষিত করে তিনি ইসমাইলীয় সম্প্রদায়ের বংশধর সাইদ ইবনে হুসাইনকে আফ্রিকাতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। অনেক দুঃখ-কষ্টের পর তিনি (সাইদ) আফ্রিকায় ফাতেমীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি হযরত মুহম্মদ (স.) এর কন্যা বিবি ফাতেমার বংশধর ছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ ইসলামের ইতিহাসে ফাতেমীয় খিলাফত নামে পরিচিত। তিনি উত্তর আফ্রিকার প্রথম ফাতেমীয় খলিফা। তিনি মোট ছাব্বিশ বছর রাজ্য শাসন করে পরলোকগমন করেন।
উপরিউক্ত আলোচনায় দেখা যায় যে, ওবায়দুল্লাহ আল-মাহদী ফাতেমীয় বংশীয় কিনা সে সম্পর্কে যথেষ্ট মতভেদ আছে। ইবনে খালদুন, আল মাওয়ার্দী এবং আরো অনেকেই তাঁকে ফাতেমীয় বংশের লোক বলে মনে করেন। আবার খাল্লিকান, ইবনে উজারী প্রভৃতি চিন্তাবিদগণ ফাতেমীয় বংশের সাথে তাঁর সম্পর্ককে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। ১০১১ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে ফাতেমীয় শাসকদের বংশ তালিকা সম্বন্ধে বিশেষ কোনো মতানৈক্য দেখা দেয় নি। তাই উত্তর আফ্রিকায় তাঁর খিলাফত ন্যায়সঙ্গতভাবে ফাতেমীয় খিলাফত হিসেবে অভিহিত হয়ে থাকে।
উত্তর আফ্রিকায় ফাতেমি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

