- হোম
- চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি
বিসিএস প্রস্তুতি (প্রিলিমিনারি ও লিখিত)
- বিসিএস ২০২৬
- বাংলাদেশ
বাংলাদেশের সমাজ-সংগঠনে ভৌগোলিক উপাদানের প্রভাব আলোচনা করুন।
উত্তর: মানুষের সাথে প্রকৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য ও অকৃত্রিম সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃতির ছায়াতলে মানুষ জন্মগ্রহণ করে বয়ঃপ্রাপ্ত হয় এবং জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। প্রকৃতির এই নানাবিধ ক্ষেত্রের মধ্যে ভৌগোলিক উপাদান মানুষের জীবনে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে আছে। সমাজব্যবস্থার রূপরেখা প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে তথা সমাজ-সংগঠনের মাধ্যমে বিবর্তিত ও পরিবর্তিত হয়। ফলে মানবজীবনের প্রতিটি পর্বে ভৌগোলিক উপাদান সংশ্লিষ্ট বলে এর প্রভাব মানবজীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। মানুষ সমাজনির্ভর, তাই সামাজিক সংগঠনের প্রভাবগুলোও মানুষের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। তবে এ কথা স্বীকার্য যে, এ প্রভাব ইতিবাচক হলেই মানুষের জীবনকে তা সুন্দর ও মনোহর করে তোলে।
সমাজ-সংগঠন ও ভৌগোলিক উপাদান: সমাজজীবন বহুবিধ উপাদান দ্বারা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। এসব প্রভাব কখনো সমাজজীবনকে সুন্দর ও সাবলীল করে তোলে, কখনো বা এর বিপরীত দিকটিও প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। মানুষের সাথে পরিবেশ তথা প্রাকৃতিক পরিবেশের সমন্বয়সাধনের মাধ্যমেই জীবন হয় সুন্দর ও সুখময়। সমাজবিজ্ঞানীরা চারটি উপাদানকে মৌল উপাদান হিসেবে চিহ্নিত ও পর্যালোচনা করে থাকেন-
- ভৌগোলিক উপাদান (Geographical factor)
- জৈবিক বা বংশগত উপাদান (Biological or hereditary factor)
- উৎপাদন পদ্ধতি বা সংস্কৃতি (Technique of Production or culture)
- গোষ্ঠী বা সামাজিক উপাদান (Group or social factor)
উপর্যুক্ত চারটি উপাদান সমাজজীবনকে এমনভাবে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করে যে, এগুলোর সমন্বয়ে সমাজ ও সভ্যতার বিচার বিশ্লেষণ সম্ভব।
ভৌগোলিক উপাদানের প্রভাব (Influence of Geographical Factor): সমাজজীবনে ভৌগোলিক উপাদানের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ ও সভ্যতার উত্থান, বিকাশ ও লয়ের সব বিষয় এখানে আলোচনা ও পর্যালোচনা সম্ভব। কেননা, ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে বাংলাদেশ অনন্য। বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ অঞ্চল এবং এ দ্বীপটি গড়ে উঠেছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র বয়ে আনা পলিমাটির মাধ্যমে। অন্যদিকে বাংলাদেশে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া বিরাজমান। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। ফলে শস্য-শ্যামলা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক মিলন এখানে মন কেড়ে নেয়।
ভৌগোলিক উপাদান বলতে প্রাকৃতিক জলবায়ু ও তাপমাত্রা, মৃত্তিকা, জলের অবস্থান ও গতি, বনাঞ্চল, পশুপাখি, ঋতু, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, ঝড়-বৃষ্টি, ভূমিকম্প ইত্যাদিকে বোঝায়। গ্রহ, নক্ষত্রপুঞ্জ, নদ-নদী, হাওর, বিল, আবহাওয়া এসবই ভৌগোলিক পরিবেশ সৃষ্টি করে। বস্তুত, জৈব সামাজিক উপাদান এবং মানবসৃষ্ট কৃত্রিম পরিবেশ ব্যতীত প্রায় সব উপাদানই ভৌগোলিক উপাদানযুক্ত। ভৌগোলিক উপাদানের প্রভাবের ধরন প্রকৃতির কয়েকটি সূত্রে দেখানো যেতে পারে-
ক. ভৌগোলিক উপাদানের প্রভাব হতে পারে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ। সমাজজীবনের বিভিন্ন দিক যেমন-ঘরবাড়ি, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদিতে ভৌগোলিক উপাদান সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে থাকে। অন্যদিকে, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ইত্যাদিতে ভৌগোলিক উপাদান পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে।
খ. সম্পর্কের নিবিড়তার ভিত্তিতেও এ উপাদানের প্রভাব বিভাজিত হতে পারে। বাসগৃহ, শস্য উৎপাদন ইত্যাদির ওপর ভৌগোলিক প্রভাব নিবিড়। অন্যদিকে, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন, ধর্মীয় বিশ্বাস ইত্যাদির উপর ভৌগোলিক প্রভাব নিবিড় নয়।
গ. ভৌগোলিক প্রভাবকে নিষ্ক্রিয় করা যেতে পারে ভৌগোলিক কৌশল অবলম্বন করে। বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষ প্রকৃতিকে জয় করতে সচেষ্ট। তাই এককালের মরূদ্যানও কৃত্রিম জলসেচের মাধ্যমে পরিপূর্ণ হয়েছে শস্য-শ্যামলায়।
সমাজজীবনে যেসব ভৌগোলিক উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সেগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. জনসংখ্যার বণ্টন ও সভ্যতার উৎপত্তি: বাংলাদেশের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। এ উষ্ণতা আমাদের দেশের যুবক-যুবতীদের দ্রুত যৌবনপ্রাপ্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণেই জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি পায় এবং মানুষ কৃত্রিম সভ্যতা গড়ে তোলে। কেননা, খাদ্যের যোগান এবং বসবাসের উপযোগী স্থানে বসতি গড়ে তোলা মানুষের স্বাভাবিক একটা ধর্ম। অতিরিক্ত শীতল জলবায়ু সভ্যতার বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এস্কিমোদের উদাহরণ এখানে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
২. অর্থনীতি (Economy): ফসল উৎপাদনের জন্য উপযোগী জলবায়ু, আবহাওয়া তথা পরিমিত বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ধরনের ফসলের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভৌগোলিক পরিবেশ প্রয়োজন। কেননা, মাটি ও জলবায়ুর বৈশিষ্ট্যের ওপর ফসলের ধরন-প্রকৃতি ও গুণগত মান নির্ভর করে। কোনো কোনো ভৌগোলিক পরিবেশ বা অঞ্চল আম, কাঁঠাল ও কলা, আবার কোনো কোনো অঞ্চল বিখ্যাত কমলালেবু বা ধান-পাটের জন্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নিম্নাঞ্চলে আমন ধানের চাষ সম্ভব, ইক্ষুর জন্য প্রয়োজন অপেক্ষাকৃত উঁচু ভূমি। বিশেষ বিশেষ ফসলের ওপর ভিত্তি করে অর্থনৈতিক তথা সামাজিক জীবন গড়ে ওঠে। অঞ্চলভেদে খাদ্য ও পানীয়ের পার্থক্যের কারণও এর মূল কারণ। কেননা, খাদ্য ও পানীয় নির্ভর করে এলাকার উৎপাদিত ফসলের ওপর। শিল্প-কারখানাও ভৌগোলিক উপাদান দ্বারা প্রভাবিত। শিল্পের জন্য কাঁচামাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দেখা যায়, যেসব অঞ্চলে কাঁচামাল সহজলভ্য, অথবা সহজেই কাঁচামাল আমদানি করা যায়, সেসব অঞ্চলে শিল্প গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের চা, চিনি ও পাটশিল্পের সাথে কাঁচামাল প্রাপ্তির সম্পর্ক রয়েছে, আবার কয়লা, পেট্রোলিয়াম, লৌহ ইত্যাদির অভাব থাকার কারণে বাংলাদেশে ভারী শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। অতএব, ভৌগোলিক উপাদানের সাথে অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে।
৩. পোশাক-পরিচ্ছদ (Dress): ভৌগোলিক উপাদানের সাথে পোশাক-পরিচ্ছদের সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, পোশাক-পরিচ্ছদ অনেক সময় ভৌগোলিক উপাদান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। শীতপ্রধান অঞ্চলে মোটা কাপড় বা গরম পশমি কাপড়ের প্রচলন এবং গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে হালকা সুতি কাপড়ের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। আবার একই দেশের ঋতুভেদে গরম ও হালকা সুতি কাপড়ের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। যেমন-শীতকালে আমরা মোটা সুতি কাপড়, কিন্তু গ্রীষ্মকালে হালকা কাপড়-চোপড় পরিধান করি।
৪. ঘরবাড়ির ধরন (Housing Pattern): ভৌগোলিক উপাদানের ওপর ঘরবাড়ির ধরন নির্ভর করে। কেননা, ঘরবাড়ি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন- বাঁশ, কাঠ, ছন, ইট, পাথর ইত্যাদি ভৌগোলিক উপাদান দ্বারা প্রভাবিত। জাপানে প্রায়ই ভূমিকম্প হয় বলে সেখানে অস্থায়ীভাবে ঘর তৈরি করা হয়। আবার বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ নয় বলে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে জনগণ ইদানীং পাকা দালানকোঠার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
৫. যানবাহন (Transport): যানবাহনের ধরন ও প্রকৃতি ভৌগোলিক উপাদান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যেসব অঞ্চল নিম্ন, সেখানে লঞ্চ, স্টিমার, নৌকা, ভেলা ইত্যাদি ব্যবহৃত হয় বেশি। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে এসব যানবাহন বেশি ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গে এসব যানবাহনের অধিকাংশই ব্যবহৃত হয় না। সেখানে ভৌগোলিক পরিবেশের উপযোগী যানবাহন ব্যবহৃত হয়।
৬. মানবপ্রকৃতি ও দক্ষতা (Human Nature and Efficiency): ভৌগোলিক উপাদান মানবপ্রকৃতি ও দক্ষতার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। হান্টিংটনের গবেষণায়, ৪০° ফারেনহাইট তাপমাত্রায় মানসিক দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়।
৭. বিবাহ ও পারিবারিক জীবন (Marriage and Family Life): বিবাহ ও পারিবারিক জীবনে ভৌগোলিক উপাদানের প্রভাব অনস্বীকার্য। গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা অতিদ্রুত যৌবনপ্রাপ্ত হয়। ফলে এসব অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা শীতপ্রধান অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের আগেই বিয়ে করে পরিবার গঠন করে। অল্প বয়সে বিয়ে করার ফলে তারা দ্রুত সন্তানের পিতামাতা হয়। অভাব-অনটনের ফলে তারা মূল পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং যৌথপরিবার ফেলে অণুপরিবার গড়ে তোলে।
৮. নগরায়নের ওপর প্রভাব: নগরায়নে ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আধুনিক যুগের বাণিজ্য ও শিল্পের বিকাশের কারণে শহুরে সমাজের উদ্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজেও এ প্রভাব লক্ষণীয়। সাধারণত বিভিন্ন নদীর তীরেই এ দেশের শহরগুলো গড়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম, খুলনা বা নারায়ণগঞ্জ এ কারণেই বন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
৯. অপরাধ প্রবণতা (Crime Tendency): অপরাধ প্রবণতা কম-বেশি নির্ভর করে ভৌগোলিক উপাদানের ওপর। গবেষণায় দেখা যায়, সমতল অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে অপরাধ প্রবণতা কম। অপরদিকে পাহাড়ি অঞ্চলে অথবা পার্বত্য অঞ্চলে অপরাধ প্রবণতার মাত্রা অনেক গুণ বেশি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অপরাধ বেশি সংঘটিত হয়।
১০. বংশগতির প্রভাব (Influence of Heredity) সমাজ ও সভ্যতার ওপর বংশগতির প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ ও সভ্যতার উদ্ভব এবং বিকাশের ক্ষেত্রে মানুষের জৈবিক গুণাবলী বা বংশগত গুণাবলী মৌলিক প্রভাব বিস্তার করে। কেননা, সভ্য ও সুস্থ সমাজে জন্মগ্রহণ করলে মানুষ সমাজ ও দেশের কল্যাণে নানা কল্যাণসাধন করতে পারে। সমাজ থেকে সে জীবনের যথার্থতা অনুধাবন করতে পারে বিধায় মানবকল্যাণে সে আত্মনিয়োগ করে। অন্যদিকে, অসভ্য ও বর্বর সমাজে জন্মগ্রহণ করলে একজন মানুষ এর বিপরীতে অবস্থান নেয়।
বংশগতি সূত্রে সন্তানরা পিতামাতা থেকে যেসব বৈশিষ্ট্য উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকে, তা হলো লিঙ্গ (স্ত্রী-পুরুষ), চোখ এবং চুলের রং, গায়ের রং, চুলের ধরন এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে তার বণ্টন, আঙ্গুলের ছাপ, হাত-পায়ের গড়ন ও ধরন, জ্ঞান ও পারদর্শিতা, মস্তিষ্কের পারদর্শিতা, রক্তের রাসায়নিক গঠন-প্রকৃতি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ইত্যাদি। বংশগতির এ প্রভাব প্লেটো ও এরিস্টটলও স্বীকার করেছেন। মানুষে মানুষে যে ভেদাভেদ রয়েছে তা প্লেটো এবং এরিস্টটলের চিন্তাধারায় পরিলক্ষিত হয়। প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা বিনির্মাণ মূলত ব্যক্তির জন্মগত গুণাবলীর ওপরই প্রতিষ্ঠিত। বংশগতির এ প্রভাব আমাদের সমাজ জীবনেও বিরল নয়। বংশগতির এ প্রভাবের সাথে ভৌগোলিক উপাদানের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
১১. উৎপাদন কৌশলের ওপর প্রভাব: ভৌগোলিক উপাদান সমাজনির্ভর মানুষের উৎপাদন তথা উৎপাদন কৌশলের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের উৎপাদিত দ্রব্য হলো পাহাড়ে সহজেই উৎপাদনযোগ্য দ্রব্যাদি উৎপাদন। এসব অঞ্চলে উৎপাদন অনেকটা কষ্টসাধ্য। পাহাড়ের ঢালে গাছপালা কেটে অথবা উঁচু-নিচু পাহাড়-পর্বত কেটে তার মাঝে জমি তৈরি করা হয়। পাহাড়ের ঢালে জুম চাষ উৎপাদনই মূলত পাহাড়িদের প্রধান অবলম্বন। অন্যদিকে, সমতল ভূমির লোকজন সহজেই নানাপ্রকার দ্রব্যাদি উৎপাদন করতে পারে। ধান, পাট, গম নানাপ্রকার সবজি ইত্যাদি দ্রব্যাদি ইচ্ছামতো উৎপাদনে তারা সক্ষম। গবেষণায় দেখা যায়, নদীর অববাহিকায় পলি মাটি সমৃদ্ধ অঞ্চলে নদীমাতৃক সভ্যতার বিকাশ ঘটে। মানুষ যাযাবর জীবন ত্যাগ করে এবং স্থানীয়ভাবে বসতি স্থাপন করে কৃষি সভ্যতার বিকাশ ঘটায়। কৃষি উৎপাদন পদ্ধতি সমাজে একটি স্থায়ীরূপ পরিগ্রহ করে। কেননা, যাযাবর সমাজে স্থায়ী সমাজ বা রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়। কৃষি উৎপাদন কৌশলনির্ভর সমাজে উদ্বৃত্ত ফসলের সমাগম ঘটে যার ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয় একটি অবকাশ জীবনযাপনকারী শ্রেণী। এ শ্রেণী উদ্বৃত্ত ফসলের ওপর নির্ভর হয়ে পড়ে, যাদের প্রত্যক্ষভাবে কৃষি কাজের ওপর নির্ভর করতে হয়নি। এদের দ্বারাই মূলত সভ্যতার বিকাশ ঘটে।
১২. সামাজিকীকরণের ওপর প্রভাব: ভৌগোলিক উপাদান একজন ব্যক্তিকে সমাজজীবনে বসবাস উপযোগী নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষাদান করে থাকে। সমাজবদ্ধ একজন মানুষকে পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। ব্যক্তি যে প্রক্রিয়ায় সামাজিক সদস্য হিসেবে গড়ে ওঠে তার নাম সামাজিকীকরণ (Socialization)। এ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি সমাজের মূল্যবোধ, প্রথা, অনুষ্ঠান ইত্যাদির সাথে খাপখাইয়ে নেয়। একজন পূর্ণাঙ্গ সামাজিক সদস্য হিসেবে গড়ে উঠতে হলে ব্যক্তিকে তাই তার নিজস্ব সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের নিয়ম পদ্ধতি মেনে চলতে হয়। পরিবার, খেলার মাঠ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিদ্যালয়, সংঘ-সমিতি ইত্যাদি ব্যক্তির সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। অর্থাৎ সমাজজীবন রূপায়ণে এসবের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
১৩. ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর প্রভাব প্রথা, বিশ্বাস, ধর্মীয় মূল্যবোধ, আচার-অনুষ্ঠান ইত্যাদির ওপর ভৌগোলিক উপাদানের সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এ দেশের প্রায় ৯০.৪% মানুষ মুসলমান। এ ধর্মের পেছনে ঐতিহাসিকভাবে ভৌগোলিক উপাদান মূল্যায়ন করা যায়। ভৌগোলিকভাবে অনুকূল বলে ত্রয়োদশ শতকে বখতিয়ার খলজি বাংলাদেশে আগমন করেন এবং তিনি এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটান। পাহাড়ি ও পার্বত্য অঞ্চলে বৃক্ষপূজা ও তৎসংলগ্ন আচার-অনুষ্ঠান সহজেই সম্পন্ন করা যায় বলে বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী লোকজন পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করে। পবন দেব, মা মনসা প্রভৃতি দেব-দেবীরা উপাসিত হন উপকূলীয়দের দ্বারা। অন্যদিকে পৃথিবীর পরিক্রমণ ও ঋতুবৈচিত্র্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে নানা আচার-বিশ্বাস।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশে ভৌগোলিক উপাদানের গুরুত্ব কম নয়। বাংলাদেশেও এ বিকাশ ভৌগোলিক উপাদান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সাহিত্য, সংস্কৃতি বিকাশে ভৌগোলিক উপাদানের সুস্পষ্ট প্রভাব তাই লক্ষণীয়। উত্তরাঞ্চলে ভাওয়াইয়া ও ভাটি অঞ্চলে ভাটিয়ালী সমাজচিত্রের বর্ণনা পাওয়া যায়।
১৪. খাদ্যাভ্যাসের ওপর প্রভাব: খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভৌগোলিক উপাদানের প্রভাব রয়েছে। মানুষের খাদ্যাভ্যাস (Food habit) নির্ভর করে মূলত ভৌগোলিক অবস্থান, যাতায়াত, আবহাওয়া ইত্যাদির ওপর। কাজেই অঞ্চলভেদে এ খাদ্যের অভ্যাসও পরিবর্তিত হয়। যেমন- এস্কিমোরা প্রচুর পরিমাণে কাঁচা মাছ খায়। কেননা, তাদের বসবাস স্থান হচ্ছে হাওয়াই দ্বীপে। দ্বীপে প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যায় বলে মাছই তাদের প্রধান খাদ্য। অপরদিকে, বাংলাদেশ এরূপ কোনো দ্বীপ নয় বরং কৃষিনির্ভর দেশ বলে অধিকাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত।
উপসংহার: বাংলাদেশের মানুষের সমাজ সংগঠনের ওপর ভৌগোলিক উপাদানের প্রভাব অত্যন্ত তাৎপর্যবাহী। সমাজ ও সভ্যতার বিকাশ ও উত্থানে এসব উপাদান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এসব উপাদান মানুষের ওপর কখনো ইতিবাচক, কখনো বা নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে। কার্ল ইউটফোগেল তার 'Oriental Despotism' গ্রন্থে প্রাচ্যের স্বৈরাচারতন্ত্র তথা ভৌগোলিক পরিবেশ কেন্দ্রীয় শক্তিশালী সরকারের জন্য ভৌগোলিক পরিবেশ তথা জলসেচ অর্থনীতিকে দায়ী করেন। মোটকথা, মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপন প্রণালী, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ভৌগোলিক উপাদানের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য।

