- হোম
- চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি
বিসিএস প্রস্তুতি (প্রিলিমিনারি ও লিখিত)
- বিসিএস ২০২৬
- বাংলাদেশ
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার কতটুকু প্রস্তুত বলে আপনি মনে করেন? বর্তমান অবস্থার উন্নয়নে কি কি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন সুপারিশসহ আলোচনা করুন।
উত্তর: গোটা পৃথিবী আজ এক কঠিন সংকটে নিপতিত। যে সংকট মানুষ নিজেই সৃষ্টি করেছে, প্রতিদিন সে-ই সংকটকে ঘনীভূত করে চলেছে। বন উজাড় করে মাটির তলা থেকে বেশুমার তেল তুলে ও পুড়িয়ে মানুষ বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের মানুষ আরাম-আয়েশী জীবন কাটাচ্ছে। তাতে বেড়ে যাচ্ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা। নদ-নদীর গতিপথ যথেচ্ছভাবে পরিবর্তন করিয়ে চলেছি আমরা। দূষণের মাত্রা এতটা বাড়িয়ে দিয়েছি যে পর্বতশীর্ষে ও মেরু এলাকায় জমে থাকা বরফ গলছে অতি দ্রুততায়। ফলে বেড়ে যাচ্ছে সমুদ্রের পানির উচ্চতা। পরিবেশ বিজ্ঞানীগণ সতর্ক করে আসছেন, এভাবে বিশ্বের উষ্ণতা আর দুই ডিগ্রী সেলসিয়াস বেড়ে গেলে পৃথিবীর বহু ভূ-ভাগ পানির নিচে চলে যাবে। এ তালিকায় আছে বাংলাদেশও। বলা হচ্ছে, বর্তমান হারে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে আর মাত্র ১৫-২০ বছরেই বাংলাদেশের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এলাকা পানির নিচে চলে যাবে। লবণাক্ততা গ্রাস করবে প্রায় সমগ্র বাংলাদেশকে। আর ভূমিকম্প, প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা, নদীভাঙনসহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হবে। এর ফলে বাংলাদেশ হয়তো একদিন বসবাসেরই অযোগ্য হয়ে উঠবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ: মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর প্রতিকূল প্রভাব রয়েছে এমন যে কোনো প্রাকৃতিক ঘটনাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রাকৃতিকভাবে সংঘটিত ঘটনাবলী যা শুধু মানবসৃষ্ট ভৌত ব্যবস্থাদির উপস্থিতির কারণেই ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিস্তার এবং প্রভাব পৃথিবীর সব দেশে সমান নয়। উন্নত দেশের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশসমূহে সৃষ্ট দুর্যোগে জীবন ও সম্পদহানির পরিমাণ অনেক বেশি।
বাংলাদেশের প্রধান প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ: ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, নদীভাঙ্গন, ভূমিকম্প, উপকূলীয় ভাঙ্গন, ভূমিধস, প্রাকৃতিক কারণে ভূগর্ভস্থ পানি দূষণ প্রভৃতি বাংলাদেশের প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভূগর্ভের প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহের মধ্যে এখানে কেবল ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে; অগ্ন্যুৎপাতের সম্ভাবনা কম। নিচে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. ঘূর্ণিঝড়: : বাংলাদেশের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এটি। তীব্র বাতাস, প্রায়শই ভারি বৃষ্টিপাত আর বজ্র বিদ্যুৎ, সমুদ্রে ফুসে ওঠা উঁচু ঢেউয়ের উত্তাল অবস্থা সবমিলে এই হলো ঘূর্ণিঝড়ের চিত্র। বাংলাদেশের চোঙ আকৃতির উপকূলীয় অঞ্চলটি বঙ্গোপসাগরে প্রায়শই ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির ভূগত কারণ হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণ বিস্তৃত নিম্ন সমতল ভূমি, জনসংখ্যার ঘনত্বের উচ্চমাত্রা এবং ঘরবাড়ির দুর্বল নির্মাণ কাঠামো।
২. টর্নেডো ও কালবৈশাখী: টর্নেডো বাংলাদেশে প্রাবর্ষা উষ্ণ মৌসুমে আকস্মিকভাবে ঘটে, বিশেষত এপ্রিল মাসে যখন তাপমাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। একটি টর্নেডোর ব্যাস কয়েক মিটার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটারের মতো হতে পারে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে টর্নেডো তুলনামূলকভাবে অধিক সংঘটিত হয়। সাধারণত এপ্রিল-মে মৌসুমে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যায় উত্তর-পশ্চিমাভিমুখী প্রচণ্ড ঝড়, স্থানীয়ভাবে যা 'কালবৈশাখী' নামে পরিচিত। কালবৈশাখীর সাথে সাধারণভাবে শিলাবৃষ্টি দেখা যায়। বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে কালবৈশাখী শেষ বিকেলে অধিক হারে ঘটে থাকে। কারণ ঐ সময় ভূ-পৃষ্ঠের বিকিরণকৃত তাপপ্রবাহ বায়ুমণ্ডলে সঞ্চালিত হয়। যে কারণে সন্ধ্যাকালে এ ঝড়ের প্রাদুর্ভাব ঘটে।
৩. জলোচ্ছ্বাস: বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়সমূহের সাথে ঝড়ো জলোচ্ছ্বাস এবং জোয়ার জলোচ্ছ্বাসেরও সৃষ্টি হয়, যা ঘূর্ণিঝড়ের প্রচণ্ড শক্তিশালী বাতাস অপেক্ষা অনেক বেশি ধ্বংসলীলা সম্পাদন করে। বাংলাদেশে এপ্রিল-মে মাসে এবং সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মাসের মধ্যে মেঘনা মোহনা ও অন্যান্য দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূল এলাকায় জোয়ার জলোচ্ছ্বাস দেখা যায়।
৪. বন্যা: প্রচুর বৃষ্টিপাত অথবা নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে ভূভাগের প্লাবিত হয়ে পড়াই হচ্ছে বন্যা। সাধারণত ভারি বৃষ্টিপাত, বরফ অথবা তুষার গলা পানি অথবা এদের মিলিত পানি নদী প্রণালীর ধারণক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেলে বন্যা সংঘটিত হয়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, ভূ-কাঠামো, ভূ-প্রকৃতি এবং ভূমিরূপ বন্যা সংঘটনের জন্য দায়ী।
৫. ভূমিকম্প: বাংলাদেশের উত্তরে এবং উত্তর-পূর্বে রয়েছে উচ্চ ভূকম্প সক্রিয় এলাকা। প্রধান ভূমিকম্পসমূহের কিছু এ অঞ্চল থেকে উৎপত্তি হয়েছে এবং দেশের সংলগ্ন এলাকাসমূহ এর প্রভাবাধীন। বাংলাদেশকে তিনটি ভূ-কম্পবলয়ে বিভক্ত করা যায়। যথা- (i) দেশের উত্তরাঞ্চলীয় অংশের আওতায় রয়েছে রংপুর, ময়মনসিংহ এবং সিলেটের শহর এলাকা বলয়- ১ ভুক্ত। (ii) দিনাজপুর, বগুড়া, ঢাকা ও চট্টগ্রামের শহর এলাকা বলয়-২ ভুক্ত। (iii) দেশের দক্ষিণাঞ্চল সর্বনিম্ন ভূমিকম্প সক্রিয় অঞ্চল এবং অঞ্চল বলয়-৩ ভুক্ত।
৬. নদীভাঙন: প্রতিবছর এদেশের লক্ষ লক্ষ অধিবাসী নদীভাঙনের শিকার হয়। মাঠের শস্য, ক্ষেত ও বসতভিটার জমি বিলীন হয়ে যায় নদীভাঙনের মাধ্যমে। এক পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশের সর্বমোট প্লাবনভূমির প্রায় ৫% ভূমি প্রত্যক্ষভাবে নদীভাঙনের কবলে পড়ছে। নদীভাঙনে অধিকমাত্রায় সমর্থ নদীগুলো হলো গঙ্গা, যমুনা, পদ্মা এবং মেঘনা। নদীভাঙনের ফলে একটি বিশাল অঞ্চল নদীগর্ভে হারিয়ে যায়।
৭. ভূমিধস: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় একটি সাধারণ ঘটনা হলো ভূমিধস। বিশেষত বান্দরবান এবং রাঙ্গামাটি জেলায় ভূমিধস একটি বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বর্ষা মৌসুমে প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট উভয়ভাবে ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। খাড়া পাহাড়ি ঢালে জুম চাষ এবং অন্যান্য চাষাবাদ পদ্ধতির প্রভাব ভূমিধস সংঘটনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাহাড় কাটা ভূমিধসের অপর একটি প্রধান কারণ।
দুর্যোগ পর্যায়সমূহ: দুর্যোগের পর্যায় তিনটি। যথা- ১. দুর্যোগ-পূর্ববর্তী সময়, ২. দুর্যোগের সময়, ৩. দুর্যোগ-পরবর্তী সময়। দুর্যোগ-পূর্ববর্তী সময় দুর্যোগের সম্ভাব্য কারণ, প্রকৃতি, আকার এবং গতিপথ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। বন্যা সম্পর্কে মূলত আবহাওয়া বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্ব সতর্কীকরণ দপ্তরই এ কাজটি করে থাকে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর উন্নততর প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্তমানে ঘূর্ণিঝড়সহ বন্যার বিষয়েও আগাম তথ্য দিয়ে থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের দ্বিতীয় পর্যায়ে সরকার সহ বেসরকারি সাহায্য সংস্থাগুলোর খুব একটা কিছু করার থাকে না। তবে পর্যবেক্ষণসহ প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করতে ব্যস্ত থাকতে হয় মাঠ প্রশাসনকে, বিশেষ করে জেলা প্রশাসনকে। প্রথম পর্যায়ে ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার বিষয়টিও জেলা প্রশাসনের প্রধান কাজ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তুতি: ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকার বিআইডিএস (BIDS)-এর অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী এবং বুয়েটের প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদদের নিয়ে তৈরি করে Multipurpose Cyclone Shelter Master Plan। ১৯৮৮ সালের বন্যার পরপরই Flood Action Plan প্রণয়ন করা হয়। ১৯৮৮ সালের শেষদিকে একটি ঘূর্ণিঝড়ে খুলনা অঞ্চল আক্রান্ত হয়েছিল। সেবার বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাসও হয়। এ দুটি বিষয় Flood Action Plan-এর সাত নম্বর কম্পোন্যান্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে উপকূলীয় অঞ্চলের বন্যা ব্যবস্থাপনা, বিশেষত বেড়িবাঁধ সংস্কারের বিষয়টিও ছিল। Flood Action Plan-এর ফাইভের বি-তেও সাইক্লোনের বিষয়টি ছিল। পরবর্তীতে 'সমন্বিত উপকূল ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা' এবং উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন করা হয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য ১৯৯৯ সালের একটি Standing আদেশ আছে যেখানে রাজধানী, জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কে কী করবে তা লেখা আছে।
ক্রমবর্ধমান পরিবেশ বিপর্যয় বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। আদর্শিকভাবে একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় শতকরা ২৫ ভাগ বনাঞ্চল থাকা আবশ্যক। কিন্তু বাংলাদেশ বনাঞ্চলের পরিমাণ মোট আয়তনের শতকরা ১৭.০৮ ভাগ।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এবং বনসম্পদ উন্নয়নে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের মোট ভূমির শতকরা ২০ ভাগ বনায়নের আওতায় আনার লক্ষ্যে সরকার নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় প্রতি বছর কয়েক লাখ বাগান সৃজন এবং উপকারভোগীর মধ্যে কয়েক শত কোটি টাকা বিতরণ করছে সরকার। ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশ ৪টি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে গত কয়েক দশকে অর্ধ লক্ষাধিক স্বেচ্ছাসেবকের বিশাল একটি বাহিনী (CPP) তৈরি করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লোকজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যেতে তারা সাহায্য করেন। এ কর্মসূচির ফলে ঘূর্ণিঝড় 'সিডর', 'আইলা' ও 'মহাসেন'-এর মতো সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়গুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমে আসে।
দুর্যোগ প্রতিরোধে বর্তমান অবস্থার উন্নয়নে আবশ্যক পদক্ষেপসমূহ: দুর্যোগ প্রতিরোধে দুর্যোগের পূর্বে ও পরে নানা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে দুর্যোগের ক্ষতির ভয়াবহতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা যেতে পারে। নিচে এরূপ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ সংক্ষেপে তুলো ধরা হলো:
১. উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী: সমগ্র উপকূল জুড়ে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুললে তা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সুনামির মতো ভয়াবহ দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় জলবায়ু গবেষণা কেন্দ্রের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বর্তমান ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের উপকূলীয় জনসংখ্যা ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে যারা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং সুনামির মতো ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করবে এবং এ দুর্যোগে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।
২. আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি করা: উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের অপ্রতুলতা ও অব্যবস্থা বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান সমস্যা। এলজিইডি'র পরিসংখ্যান মতে- উপকূলীয় ১৪ জেলার ১ হাজার ৮২৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে মাত্র ১২ লাখ লোক দুর্যোগের সময় আশ্রয় নিতে পারে, যা ঐ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশেরও কম।
৩. উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ ও প্রযুক্তি ব্যবহার: বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ে সাধারণত অধিকাংশ লোক নিহত হয় জলোচ্ছ্বাসে ডুবে। উপকূলবর্তী এলাকায় বঙ্গোপসাগরের তলদেশ খুবই অগভীর হওয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা সাধারণত অত্যধিক হয়। বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা গেছে জলোচ্ছ্বাসের প্রাথমিক ধাক্কাটা যদি সাগরেই প্রতিহত করা যায় তবে উপকূলে আছড়ে পড়ার সময় এটা আর তেমন ভয়ঙ্কর থাকে না। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে উপকূল রক্ষার জন্য কৃত্রিম বাঁধ এবং আরও নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় প্রবণতা ও জলোচ্ছ্বাসের ভয়াবহতার কথা বিবেচনা করে অচিরেই এসব উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
৪. বহুমুখী ব্যবহার উপযোগী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ: নতুন করে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে এমন অবকাঠামো তৈরি করতে হবে যা অন্য কাজেও লাগবে। এতে অবকাঠামো ভালো থাকবে। অর্থাৎ এক ধরনের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কমিউনিটি সেন্টারগুলোকে এমনভাবে বানাতে হবে যাতে তা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এ আশ্রয়কেন্দ্রের কাছে গরু-ছাগলের জন্য মাটির কিল্লা বানানোর বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ মানুষ বাঁচানোর পাশাপাশি তাদের পশুসম্পদও রক্ষা করা জরুরি।
৫. উপকূলীয় রাস্তা নির্মাণ: সুন্দরবন থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাগরের তীর ঘেঁষে উচ্চ সুবিস্তৃত ও সুদৃঢ় পাকা বাঁধ বা পাকা রাস্তা যথাযথ ডিজাইন অনুযায়ী নির্মাণ করতে হবে। গতানুগতিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নয় প্রস্তাবিত পাকা রাস্তা থেকে নিকটস্থ সব জেলার সাথে সংযোগ সড়ক থাকতে হবে। প্রস্তাবিত পাকা রাস্তার ফলে স্থলদেশ প্রান্তে কমপক্ষে ১ কিমি প্রশস্ত স্থানে স্বাভাবিক ভূখণ্ডের চেয়ে কিছু উঁচু করে পরিকল্পিতভাবে পাম, নারিকেল গাছ সহ ঝড়ঝাপ্টা সহ্য করতে পারে এমন গাছ রোপণ করে বনাঞ্চল সৃষ্টি করতে হবে।
৬. আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা: পৃথিবীর সবদেশেই যাতে 'গ্রিন হাউস' গ্যাস উদগিরণ নিয়ন্ত্রণসহ পরিবেশ বান্ধব পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যায়, তার জন্য বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। যেমন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তন শীর্ষক আন্তর্জাতিক যে সম্মেলনটি ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে অনুষ্ঠিত হয় তাতে বাংলাদেশের বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা উচিত ছিল কারণ এ সম্মেলনের পূর্বেই বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল সিডরের তাণ্ডবলীলা।
৭. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ: অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যার বিস্ফোরণ বাংলাদেশের একটি প্রধান সমস্যা। বিশেষ করে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি পরিবেশের জন্য বিরাট হুমকিস্বরূপ। ঢাকা শহরের লোকসংখ্যা ও আয়তন আর বাড়তে দেয়া যাবে না। দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৮. সুপরিকল্পিত নির্মাণ কার্যক্রম: ঘরবাড়ি, দালানকোঠা এমন সুপরিকল্পিতভাবে বিন্যাস করে প্রস্তুত করতে হবে যেন দুর্যোগের সময় বা পরে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালাতে কষ্টের মধ্যে পড়তে না হয়। দালানকোঠা, টিনের ঘর এমনকি বাঁশের ঘরও সুদৃঢ়ভাবে স্থাপন করার জন্য দেশবাসীকে কারিগরি পরামর্শ প্রদান করতে হবে। এসব প্রস্তুত করতে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানেরও ব্যবস্থা নিতে হবে।
৯. কমিউনিটিভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ: দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে জনগণের দুর্যোগ মোকাবিলা করার দক্ষতা বাড়াতে কমিউনিটি ভিত্তিক একটি বড় মাপের কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। বিশ্বের বহু দুর্যোগপ্রবণ দেশে বাড়িঘর ও অন্যান্য সম্পদের বীমা ব্যবস্থা আছে। তাই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ এ বাংলাদেশে এ বীমা চালু করতে হবে।
১০. স্থায়ী পদ্ধতি অবলম্বন: বাংলাদেশকে প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য একটি স্থায়ী পদ্ধতি অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. আতিকুর রহমান। তিনি জানান-আরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। আর তা শুধু সরকারিভাবে নয়। এজন্য বেসরকারি উদ্যোগকে এগিয়ে আসতে হবে। এ কথা মনে রাখতে হবে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য ব্যক্তিগত প্রতিরোধই অন্যতম প্রধান কাজ।
১১. চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত প্রয়াস ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বন্যাপ্রবণ এলাকা। কৃষকদের জীবিকা ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বন্যার প্রভাব ভয়াবহ। এজন্য সরকার, ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং উৎপাদন-উপকরণ সরবরাহকারী সরকারি ও বেসরকারি এজেন্সি থেকে সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত প্রয়াসে বন্যাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে হবে।
১২. দুর্যোগ মোকাবিলায় দরকার সঠিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার যেসব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেবে তাদের অবশ্যই দুর্যোগ মোকাবিলায় অঙ্গীকার থাকতে হবে। কিভাবে তারা এ অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে, স্পষ্টভাবে তা উল্লেখ করতে হবে। নির্বাচনের পর যখন জাতীয় সংসদ বসবে, খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের কমিটি ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের ঐ অঙ্গীকার, পূরণে মূল ভূমিকা রাখবে।
১৩. স্থানীয় সরকারের ভূমিকা: দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয়, সবল করে তুলতে হবে। স্থানীয় সরকারের প্রকৃত কর্মসূচি ও সম্পদের মাধ্যমে এটি সম্ভব। দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা নিরাপদ বর্মের মতো হওয়া উচিত। ইরানে ভূমিকম্প হওয়ার পর দুর্গত এলাকায় আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলের চেয়ে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি মানুষ উদ্ধার করে।
১৪. বহুমুখী মুক্ত চিন্তা: বহুমুখী মুক্তচিন্তা এবং বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত ছাড়া দুর্যোগ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের প্রাথমিক জ্ঞান ও সম্পদ থাকতে হবে। সংবাদমাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলায় বিষয়সূচি নির্ধারণ ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সম্ভবত একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। ইথিওপিয়ায় সংবাদমাধ্যম রুদ্ধ বলে সেখানে খাদ্যসংকট বিরাজমান।
১৫. অর্থ সরবরাহ: দুর্যোগের ক্ষতিকর প্রভাব কাটাতে কি করতে হবে, এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত জ্ঞান রয়েছে দুর্গত এলাকার মানুষের। কিন্তু এ জ্ঞানকে কাজে লাগাতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। দুর্গত এলাকার বেশিরভাগ মানুষের আয় থেকে বাড়তি টাকা থাকে না। কাজেই এক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। গৃহ নির্মাণ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এসব পুনর্গঠন কাজের মাধ্যমে মানসম্পন্ন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে দুর্গত মানুষের জীবন।
১৬. Signal System-এ পরিবর্তন দরকার: বাংলাদেশে প্রচলিত Signal System পরিবর্তন করা দরকার। দেখা গেছে বিভিন্ন মাত্রার ঘূর্ণিঝড়ের একই Signal দেখাতে হয়। Signal-গুলোকে মানুষের আরো কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া দরকার। এ বিষয়ে সাংকেতিক ভাষার চেয়ে বেশি বেশি বিবরণমূলক তথ্য কাজে আসবে। একইভাবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস সংক্রান্ত খবরগুলো আরও বেশি সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
১৭. সুন্দরবনের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন: ভূপৃষ্ঠে উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বঙ্গোপসাগর ভবিষ্যতে ঘূর্ণিঝড়ের একটা 'ব্রিডিং সেন্টার'-এ পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন, ফলে বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হবে। প্রাকৃতিক ঐসব দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সুন্দরবনই সবচেয়ে বেশি কার্যকর বর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এ বিবেচনায় সুন্দরবনের সংরক্ষণ ও উন্নয়নই শুধু নয়, উপকূল জুড়ে উল্লম্ব ও আনুভূমিক উভয় দিকে এর পরিকল্পিত বিস্তারের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিকল্পনা নেয়া জরুরি।
উপসংহার: পৌনঃপুনিক ভূমিকম্পের দেশ জাপান, লস্ এঞ্জেলস যদি টিকে থাকতে পারে, সমুদ্রবেষ্টিত নেদারল্যান্ডস, সুনামি-সাইক্লোনের জন্য খ্যাত ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, কঙ্গো যদি টিকে থাকতে পারে তাহলে বাংলাদেশ পারবে না কেন? ইতিহাস বলে আজ বাংলাদেশে ঝড়, বন্যা, খরার যে পৌনঃপুনিক ছোবল তার জন্য কেবল প্রকৃতিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কেননা প্রকৃতির এসব লীলা ও কার্যাবলী মানুষের কৃতকর্মের প্রতিক্রিয়া মাত্র। এ সকল অঘটনের নেপথ্যে রয়েছে মানুষের অবিবেচনা প্রসূত কাজ। আর তাই এখনই এক্ষেত্রে পরিকল্পিত টেকসই ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি সত্যিই যে কোনো দুর্যোগই সম্পূর্ণভাবে প্রতিহত করা সম্ভব নয়, তবে ব্যবস্থাপনা যত ভালো হয় ক্ষয়ক্ষতি তত কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নিশ্চয় এর ব্যতিক্রম হবে না।

