- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
বাংলাদেশে গণআন্দোলন
বাংলাদেশের ইতিহাস গণআন্দোলনের ঘটনায় সমৃদ্ধ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার সংগ্রাম, স্বৈরশাসনবিরোধী নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী জুলাই গণঅভ্যুত্থান- এই গণআন্দোলনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। প্রতিটি গণআন্দোলন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনই আনেনি, বরং ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষাকে অনেক বেশি শক্তিশালী করেছে।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান বা নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এটি ছিল তৎকালীন স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরশাসন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, দুর্নীতি ও জনগণের মৌলিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না। এটি ছিল ১৯৮২ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পর থেকে তার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদ, বিক্ষোভও ধারাবাহিক আন্দোলনের ফল। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিবাদ জানায় ছাত্ররা। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা এরশাদ সরকারের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করলে পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন ছাত্র নিহত হন। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ১৯৮৪ সাল থেকে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের দাবিতে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেনারেল এরশাদ দুই দফায় নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতাকে বৈধ করার চেষ্টা করলেও জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করে। নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচিগুলোতে এরশাদ সরকারের দমন-পীড়নের ফলে আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় এরশাদবিরোধী একটি মিছিলে বুকে ও পিঠে 'স্বৈরাচার নীপাত যাক, গনতন্ত্র মুক্তি পাক' লেখা যুবক নূর হোসেন পুলিশের গুলিতে নিহত হন। শহিদ নূর হোসেন এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হন। ছাত্রসমাজের ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচির পাশাপাশি রাজনৈতিক দলসমূহের আট দলীয় জোট, সাত দলীয় জোট এবং পাঁচ দলীয় জোটের একই ধরনের কর্মসূচি এরশাদবিরোধী আন্দোলনকে জাতীয় রূপ দেয়।
১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনের কর্মসূচিতে ছাত্রনেতা কে. এম. নাজির উদ্দিন জেহাদ ঢাকার পল্টনে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। এই ঘটনা জনগণের ক্ষোভকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গে পরিণত করে। ২৪টি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে 'সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য'। এসময় সরকারবিরোধী তিনটি প্রধান রাজনৈতিক জোট সম্মিলিতভাবে 'তিন জোটের রূপরেখা' প্রকাশ করে। এতে একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি জানানো হয়। ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এরশাদ সমর্থিতদের গুলিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ডা. শামসুল আলম খান মিলন নিহত হলে গণআন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এমতাবস্থায় ঐদিনই এরশাদ সরকার সারাদেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। জনগণ জরুরি অবস্থা উপেক্ষা করে রাজপথে অবস্থান নেয়। বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, এমনকি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও আন্দোলনে যোগ দেয়। সামরিক বাহিনীও এরশাদ সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়। পরিস্থিতি এরশাদ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসক এরশাদ আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এক যুগান্তকারী ঘটনা, যার বহুমাত্রিক তাৎপর্য রয়েছে। এর প্রথম ও প্রধান তাৎপর্য হলো দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন এবং তাঁর স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসান। এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে পুনরায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরশাদের পদত্যাগের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় এবং ১৯৯১ সালে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করে। এই নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের একটি মডেল হিসেবে কাজ করেছে। এই গণআন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ছাত্রসমাজ, রাজনৈতিক দলসমূহ, বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠী ও সাধারণ জনগণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিল, যা জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন - অনন্যা প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

