- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.)
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
হযরত মুহম্মদ (স.)-এর বাল্যকাল ও মক্কা জীবন
'হযরত মুহম্মদ (স.)-এর জন্ম ও বাল্যকাল ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে আগস্ট (১২ই রবিউল আউয়াল) সোমবার প্রত্যুষে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক ও বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহম্মদ (স.) মা আমিনার গর্ভে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতার 'নাম আব্দুল্লাহ (Abdullah)। মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশে তাঁর জন্ম হয়। দাদা আব্দুল মুত্তালিব পিতৃহীন এ নবজাতকের নাম রাখলেন মুহম্মদ (প্রশংসিত) এবং স্নেহময়ী মাতা আমিনা নাম রাখলেন আহমদ (প্রশংসাকারী)। এ দুটি নাম পবিত্র কুরআন শরিফে উল্লেখ আছে।
হযরত মুহম্মদ (স.)-এর পিতা আব্দুল্লাহর মৃত্যু আব্দুল্লাহ বিবি আমিনাকে বিবাহ করে কিছুদিন মক্কায় অবস্থানের পরে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সিরিয়া চলে যান। আমিনা তখন গর্ভবর্তী। সিরিয়া হতে ফেরার পথে মদিনায় পৌঁছে আব্দুল্লাহ অসুস্থ হয়ে 'পড়েন এবং মাত্র ২৫ বছর বয়সে মদিনাতে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তিনি ৫টি উট, কিছু সংখ্যক ছাগল ও ভেড়া এবং উম্মে আয়মন নামক একজন দাসী রেখে যান। আব্দুল্লাহর মৃত্যুতে মুত্তালিব ও আমিনা উভয়েই শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। এ আব্দুল্লাহই ছিলেন মহানবি হযরত মুহম্মদ (স.)-এর পিতা এবং আমিনা ছিলেন তাঁর মাতা।
হালিমার গৃহে প্রতিপালন অভিজাত আরবের প্রথানুসারে জন্মের দুসপ্তাহ পর শিশু মুহম্মদ বনু সাদ গোত্রীয় ধাত্রী বিবি হালিমার নিকট লালন-পালনের জন্য প্রদত্ত হন। হালিমার গৃহে থাকা অবস্থায় নানা অলৌকিক ঘটনা ঘটে। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক ওয়াটসন বলেন, "এ সময়ে দুজন ফেরেশতা মুহম্মদ (স.)-এর বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁর আত্মাকে শুদ্ধিকরণ করেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর অবস্থান করে বনু সাদ গোত্রের তত্ত্বাবধানে বিশুদ্ধ আরবি ভাষায় তিনি মনের ভাব প্রকাশ করার ক্ষমতা অর্জন করেন।"
মাতা আমিনার ক্রোড়ে বালক মুহম্মদ ধাত্রী মাতা হালিয়ার গৃহ হতে ছয় বছর বয়সে মুহম্মদ (স.) মাতা আমিনার নিকট ফিরে আসেন। মাতা আমিনার শিশু পুত্রসহ একবার মদিনায় গিয়ে স্বামীর কবর যিয়ারতের সাধ জাগে। এ উদ্দেশ্যে দাসী উম্মে আয়মনকে সঙ্গে করে মুহম্মদ (স.)-কে নিয়ে মদিনায় যান। মদিনায় স্বামীর কবর জিয়ারত করে মকায় প্রত্যাবর্তনকালে হযরত আমিনা 'আবওয়া' নামক স্থানে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে সেখানেই ইন্তেকাল করেন।
আব্দুল মুত্তালিবের দায়িত্বে মুহম্মদ (স.): মাতৃবিয়োগের পর বিশ্বস্ত পরিচারিকা উম্মে আয়মন অসহায় শিশুকে নিয়ে মকায় ফিরে এলে দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস দাদা আব্দুল মুত্তালিব মাত্র দুবছর পর ৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে অসহায় মুহম্মদকে রেখে চির বিদায় নেন। এভাবে মুহম্মদ (স.) অতি অল্প বয়সে মাতা-পিতা ও পিতামহের স্নেহ হতে বঞ্চিত হয়ে এতিম হিসেবে জীবন যাপন করেন।
আবু তালেবের দায়িত্বে মুহম্মদ (স.): দাদা আব্দুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর মুহম্মদ (স.)-এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন চাচা আবু তালেব। চাচা আবু তালেব দরিদ্র হলেও অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এ গুরুদায়িত্ব পালন করেন। হযরত (স.)-এর প্রতি তাঁর স্নেহানুরাগ এত গভীর ছিল যে, আহারে-বিহারে সর্বদা তিনি তাঁকে সঙ্গে রাখতেন। দরিদ্রতার জন্য মুহম্মদ (স.)-কেও চাচার সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। তাই মুহম্মদ (স.) পার্শ্ববর্তী পর্বত ও উপত্যকায় মেয ও উট চরিয়ে চাচার সংসারে সহযোগিতা করতেন।
মুহম্মদ (স.)-এর শিক্ষা লাভ হযরত মুহম্মদ (স.) বাল্যকালে কোনো লেখাপড়ার সুযোগ পাননি। দরিদ্রতার কারণে তিনি উট ও মেষ চরাতেন। এ সকল কারণে তিনি প্রচলিত বিদ্যা শিক্ষা গ্রহণ হতে বঞ্চিত হলেও মুক্ত প্রকৃতি তাঁকে অনেক মূল্যবান শিক্ষা দিয়েছে, যা পরবর্তীকালে তাঁকে সাহায্য করেছিল।
আল-আমিন উপাধি লাভ: বাল্যকাল হতে মুহম্মদ (স.) চিন্তাশীল ও গুরুগম্ভীর ছিলেন। তিনি সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। কোমল ও অমায়িক ব্যবহারের জন্য সকলেই তাঁকে ভালোবাসত ও শ্রদ্ধা করত। সত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ, কর্তব্যনিষ্ঠা ও অমায়িক ব্যবহারের জন্য আরবের জনগণ তাঁকে 'আল-আমিন' বা বিশ্বাসী উপাধি প্রদান করেছেন।
সিরিয়ায় গমন: ৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে বারো বছর বয়সে হযরত মুহম্মদ (স.) পিতৃব্য আবু তালেবের সঙ্গে ব্যবসায় উপলক্ষে সিরিয়া গমন করেন। সিরিয়ার বাজারে 'বাহিরা' নামক খ্রিষ্টান পাদ্রী বা সাধুর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হলে সাধু মুহম্মদ (স.)-কে আখেরী নবি বলে চিহ্নিত করেন এবং তাঁকে রক্ষা করার জন্য আবু তালেবকে উপদেশ দেন। চাচার সঙ্গে ব্যবসায়-বাণিজ্যে মুহম্মদ (স.) প্রচুর মুনাফা অর্জন করেন। সিরিয়া গমন করায় আরব উপদ্বীপের বাইরে যাবার সুযোগ পেয়ে মুহম্মদ (স.) এক নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করেন।
শান্তি সংঘ গঠন: প্রতি বছর জিলকদ মাসে আরবের বিখ্যাত উকায মেলায় বিভিন্ন উপজাতীয় লোকের সমাগম ঘটত। মেলায় জুয়াখেলা, ঘোড়দৌড় ও কাব্য প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে কুরাইশ ও কায়েস গোত্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম সংঘটিত হয়। পাঁচ বছর কাল স্থায়ী এ যুদ্ধ আরবের ইতিহাসে 'হরব আল-ফুজ্জার' বা 'অন্যায় সমর' নামে পরিচিত। পবিত্র এ মাসে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আরম্ভ হয় বলে একে অপবিত্র যুদ্ধও বলা হয়। হযরত মুহম্মদ (স.) এ যুদ্ধের প্রত্যক্ষ দর্শক। এ যুদ্ধ সম্বন্ধে তিনি বলেন, "আমি আমার পিতৃব্যগণকে শত্রুপক্ষের 'তীর' হতে রক্ষা করতাম।" হযরত মুহম্মদ (স.) স্বয়ং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি। তিনি শত্রু দ্বারা নিক্ষিপ্ত তীরগুলো যুদ্ধক্ষেত্র হতে সগ্রহ করে কুরাইশদের হাতে পৌঁছে দিতেন। অহেতুক এ অন্যায় যুদ্ধের বিভীষিকা, তান্ডবলীলা হযরত মুহম্মদ (স.)-এর কোমল হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে। মানবতার এ অপমান তিনি সহ্য করতে না পেরে যুদ্ধ বন্ধের জন্য কনিষ্ঠ পিতৃব্য যুবাইর ও অন্যান্য কয়েকজন উৎসাহী যুবককে নিয়ে একটি শান্তি সংঘ গঠন করেন। এ সংঘের অন্তর্গত ফজল, ফাজেল, ফাজায়েল ও মোফাজ্জেল-এর নামানুসারে এটি 'হিলফুল ফুজুল'
নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। এ সংঘের সদস্যগণ শপথ গ্রহণ করেন যে, আমরা-
১। অসহায় ও দুর্গতদের সেবা করব;
২। অত্যাচারীকে প্রাণপণে বাধা দান করব;
৩। অত্যাচারিতকে যথাসাধ্য সাহায্য করব;
৪। দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখব;
৫। বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনের চেষ্টা করব এবং
৬। বিদেশি লোকদিগের ধন, মানরক্ষা করব।
হিলফুল ফুজুলের মূলমন্ত্র ছিল, "সমবেত জনগণ আল্লাহর নামে হলফ করে সংঘবদ্ধ হলেন যে, তারা উৎপীড়িত ও অত্যাচারিতের পক্ষ সমর্থন করবেন এবং অত্যাচারীর নিকট হতে জনগণের স্বাধিকার আদায় না করে ক্ষান্ত হবেন না। নবুয়ত প্রাপ্তির পরও এ কমিটির কার্যকারিতা লক্ষ করা গিয়েছিল। বিশ্বশান্তির অগ্রদূত হিসেবে হযরত মুহম্মদ (স.) পৃথিবীর সর্বপ্রথম শান্তি সংঘ বা 'হিলফুল ফুজুল'-এর আত্মপ্রকাশ করেন।"
হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.) - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

