- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.)
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
প্রাথমিক যুদ্ধসমূহ: বদর, উহুদ ও খন্দক
বদরের যুদ্ধ (১৭ মার্চ, ৬২৪ খ্রি.) [Battle of Badar: 17 March, 624 AD]
মক্কা ছেড়ে মদিনায় এসে মদিনা সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন করে মহানবি (স.) রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। এতে মক্কার কুরাইশরা মদিনা আক্রমণ করে মহানবির ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি ধ্বংস করতে মদিনা আক্রমণ করে। হযরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবনে মক্কার কুরাইশসহ বিধর্মীদের সঙ্গে অসংখ্য যুদ্ধ করতে হয়েছে। বদরের যুদ্ধ এগুলোর মধ্যে প্রথম যুদ্ধ।
বদর পরিচিতি: বদর মূলত একটি কূপের নাম। সে সূত্রে তার নিকটবর্তী প্রান্তরকে বদর প্রান্তর বলা হয়। কূপটি খনন করেন বদর ইবনে কুরাইশ ইবনে ইয়াখলুদ, মতান্তরে বদর ইবনুল হাবিছ নামে গিফার গোত্রের জনৈক ব্যক্তি। তারই নামানুসারে এটার নাম রাখা হয় বদর। এটি মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী হিযাযের একটি প্রসিদ্ধ ঝরনা ও স্থান। মদিনা হতে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে আল জার সমুদ্র বন্দর হতে এক রাতের সফর পরিমাণ দূরত্বে অবস্থিত। স্থানটি উঁচু পবর্তমালা দ্বারা বেষ্টিত। প্রান্তরটি ডিম্বাকৃতির প্রায় ৮ কি.মি. দীর্ঘ ও প্রায় ৫ কি.মি. প্রন্থ। শিবলী নুমানীর বর্ণনা মতে, প্রান্তরটি মদিনা হতে ১২৮ কি.মি. দূরে অবস্থিত। এক বর্ণনা মতে, মদিনা বদর হতে চার মনখিল বা ২৮- কাবসাৎ দূরত্বে অবস্থিত।
ঐতিহাসিক হিটির মতে, "The battle of Badar laid the foundation of Muhammd temporal power. Islam had won its first and decisive military victory", অর্থাৎ "বদরের যুদ্ধই মুহম্মদ (স.)-এর পার্থিব ক্ষমতার ভিত্তি স্থাপন করল। ইসলাম তার প্রথম চূড়ান্ত ও সামরিক বিজয় অর্জন করে।" ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে হযরত মুহম্মদ (স.) নবুয়ত প্রাপ্ত হন এবং ইসলাম প্রচারে আদিষ্ট হন। কিন্তু মদিনার কুরাইশদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে আল্লাহর আদেশে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। হিজরতের দুবছর পর ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে হযরত মুহম্মদ (স.) ও কুরাইশদের মধ্যে বদর প্রান্তে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে ইসলামের ইতিহাসে তা বদরের যুদ্ধ নামে পরিচিত।
বদরের যুদ্ধের পটভূমি: পৃথিবীর ইতিহাসে সংঘটিত বড় বড় যুদ্ধ অপেক্ষা এ যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। বদরের যুদ্ধ ছোট যুদ্ধ তথাপি এ যুদ্ধ মুসলমানদের ভাগ্য পরীক্ষার যুদ্ধ। হিজরতের পর মদিনায় মুসলমানদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। মক্কার কুরাইশগণ মক্কা হতে মুসলমানদের বিতাড়িত করেও তাদের ক্ষমতা খর্ব করতে ব্যর্থ হয়। ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্য কুরাইশগণ মরিয়া হয়ে ওঠে এবং হিজরতের মাত্র দুবছর পর ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে মুসলমানদের উপর আক্রমণ করে।
বদরের যুদ্ধের কারণ: নিম্নে বদরের যুদ্ধের কারণগুলো আলোচনা করা হলো:
১. মক্কার কুরাইশদের শত্রুতা ৬২২ খ্রিস্টাব্দে হযরত মুহম্মদ (স.) হিজরত করে মক্কা হতে মদিনা যান ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য। মক্কা হতে মদিনায় যাওয়ার মাত্র দুবছরের মধ্যে ইসলাম ধর্ম প্রসার লাভ করে। ফলে কুরাইশদের অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং মদিনার মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য কুরাইশরা যড়যন্ত্র করতে থাকে।
২. আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইর ষড়যন্ত্র: খাযরাজ বংশীয় নেতা আব্দুল্লাহ্ বিন-উবাইর ছিলেন মদিনার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁর স্বপ্ন ছিল মদিনার ভবিষ্যৎ শাসক হওয়ার। কিন্তু মহানবি (স.)-এর হিজরতের পর তিনি প্রকাশ্যে ইসলামের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলেও ইসলামের প্রতি ক্ষুদ্ধ ছিলেন। কারণ মদিনাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে তার শাসক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা চিরতরে নস্যাৎ হয়ে গেল ভেবে তিনি মহানবি (স.) তথা ইসলামের বিরুদ্ধে এক মুনাফেক দল গঠন করেন এবং মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে গোপন যড়যন্ত্র করেন।
৩. ইহুদিদের বিশ্বাসঘাতকতা: মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিদের ধর্মীয় ও নাগরিক স্বাধীনতা দেওয়া সত্ত্বেও ইহুদিগণ কোনোদিনই মুসলমানদের ভালো চোখে দেখতে পারে নি। উপরন্তু তারা গোপনে মকার কুরাইশদের সঙ্গে নানা প্রকার যড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে মহানবি (স.)-এর রাষ্ট্র ও ধর্মকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেন। ঐতিহাসিক আমির আলী বলেন, "Medina itself was honeycombed by sedition and treachery", অর্থাৎ সমগ্র মদিনা শহর নিজেই বিদ্রোহ ও বিশ্বাসঘাতকতায় ভরে গিয়েছিল।
৪. মদিনায় মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি: মদিনায় মহানবি (স.) 'সনদের' মাধ্যমে একটি ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করেন। মদিনায় সকল ধর্মের লোক ঐক্য ও সৌহার্দ্যে, বসবাস করতে থাকে। ফলে মদিনাতে মহানবি (স.)-এর মর্যাদা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কুরাইশগণ মুসলমানদের এ অগ্রগতিতে শঙ্কিত হয়ে তাদের ধ্বংস করার জন্য মদিনা আক্রমণের জন্য অগ্রসর হলে বদরের প্রান্তে যুদ্ধ হয়।
৫. বাণিজ্যিক পথ বন্ধের আশঙ্কা: মক্কার অভিজাত কুরাইশদের সিরিয়া ও পারস্যের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। বাণিজ্যের পথ মদিনার নিয়ন্ত্রণে ছিল বিধায় মুসলমানগণ যখন তখন এ পথ বন্ধ করে দিতে পারে এ আশঙ্কায় কুরাইশরা মদিনা আক্রমণের জন্য ষড়যন্ত্র করতে থাকে।
৬. কুরাইশগণ কর্তৃক মদিনা আক্রমণ: মক্কার কুরাইশগণ কর্তৃক মাঝেমধ্যে মদিনার সীমান্তে মুসলমানদের উপর আক্রমণ চলে। এমনকি কুরাইশরা মুসলমানদের শস্য ধ্বংস ও সম্পদ লুটতরাজ করত। উট ও দুম্বা অপহরণ করে মুসলমানদের ক্ষতি করত।
৭. নাখলায় খণ্ডযুদ্ধ: কুরাইশগণের সঙ্গে মদিনা প্রবাসী মুসলমানদের প্রথম সংঘর্ষ ঘটে নাখলায়, যা ইতিহাসে নাখলার খন্ডযুদ্ধ নামে পরিচিত। মুহম্মদ (স.) কুরাইশদের মদিনায় লুটতরাজ বন্ধ করার জন্য আব্দুল্লাহকে ১২ জন সঙ্গীসহ দক্ষিণ আরবে প্রেরণ করেন। নাখলায় কুরাইশদের সঙ্গে আব্দুল্লাহর সংঘর্ষ হয়। নাখলার যুদ্ধে একজন কুরাইশ নিহত হলেও অপর দুজন বন্দি হয়। ১,৬০০ দিরহামের বিনিময়ে পরবর্তীতে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। নাখলার অভিযানে সাফল্য মুসলমানদের পরবর্তী সময়ের জন্য আর একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাভিযানে অনুপ্রাণিত করেছিল। মৌলানা মুহম্মদ আলী বলেন, "ইসলামের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে ধ্বংস সাধন করার জন্য কুরাইশদের উদ্বেগই যুদ্ধের একমাত্র কারণ।"
৮. গুজব ও আবু সুফিয়ানের মিথ্যা প্রচারণা: কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান বাণিজ্যের অজুহাতে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য সিরিয়ায় নিরাপদ গমন করেন। কিন্তু মক্কায় খবর পৌঁছে যে, কুরাইশ কাফিলা মক্কায় ফেরার পথে মদিনার মুসলমানগণ কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছে। তার সঙ্গে মক্কার অভিজাত ব্যক্তির প্রায় ৫০,০০০ দিনার মূল্যের ধন-সম্পদ ছিল। তাই ঘটনার সত্যতা যাচাই না করে কুরাইশগণ আবু জেহেলের নেতৃত্বে (৭০০ উষ্ট্রারোহী, ১০০ অশ্বারোহী এবং ২০০ পদাতিক সৈন্যসহ) প্রায় ১০০০ সৈন্য নিয়ে মদিনা আক্রমণের জন্য অগ্রসর হন। কুরাইশদের আগমনের সংবাদ পেয়ে মহানবি (স.) চিন্তিত হয়ে পড়েন।
৯. বাণী লাভ: মহানবি (স.) মদিনা আক্রমণের সংবাদে চিন্তিত হয়ে আল্লাহর দরবারে পরবর্তী করণীয় কী এ নিয়ে প্রার্থনা করেন। সঙ্গে সঙ্গে ঐশীবাণী নাজিল হয়, "তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। তবে সীমালঙ্ঘন করো না। কারণ সীমালঙ্ঘনকারীকে আল্লাহ্ পছন্দ করেন না" (আল-কোরআন)। ঐশীবাণী লাভকরে মহানবি (স.) শিশু ইসলামি রাষ্ট্র। মদিনাকে রক্ষার জন্য তৎপর হলেন। মহানবি (স.) যুদ্ধসংক্রান্ত মন্ত্রণা সভার পরামর্শক্রমে ২৩৮ জন আনসার ও ৮৬ জন মোহাজেরিনসহ আল-আরিসা পাহাড়ের পাদদেশে মুসলিম শিবির স্থাপন করেন।
১০. বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি: মহানবি (স.) মাত্র ৩১৩ জন (২৩৮ জন আনসার ও ৮৬ জন মুহাজির) মুসলিম বাহিনী নিয়ে মদিনা হতে ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে বদর প্রান্তরে উপনীত হলে আবু জেহেলের বিশাল বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হওয়ার সংবাদ পান। দ্বিতীয় হিজরির ১৭ই রমজান (১৩ মার্চ, ৬২৪ খ্রি.) প্রত্যুষে উচ্চাভিলাষী আবু জেহেল দেখতে পায় মুসলিম সৈন্যরা বদরের সমস্ত পানির কূপগুলো দখল করে আছে। পানির অভাবেই তাদের বিপর্যয় হবে ভেবে আবু জেহেল মুসলমানদের আক্রমণ করল।
যুদ্ধের ঘটনা: আরবি রীতি অনুসারে মল্লযুদ্ধে প্রথম কুরাইশগণের বীর উৎবা, শাইবা এবং ওয়ালিদ অগ্রসর হলে মহানবি (স.)-এর নির্দেশে হামজা, আলী এবং আবু উবায়দা কুরাইশদের পরাজিত করেন। উপায়ান্তর না দেখে আবু জেহেল মুসলমানদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। মুসলিম বীরগণ প্রচন্ড বিক্রমে আক্রমণ প্রতিহত করে চলল। ১৭ই, ১৯শে এবং ২১শে রমজান এ তিনদিন যুদ্ধের পর কুরাইশ বাহিনী পরাজিত হয়ে পলায়ন করল। আবু জেহেলসহ ৭০ জন কুরাইশ যুদ্ধে নিহত হয়। অপরদিকে, ১৪ জন (৮ জন আনসার ও ৬ জন মুহাজির) মুসলমান শাহাদাতবরণ করেন। মাত্র ৪০০০ দিরহাম মুক্তিপণ নির্ধারিত হয়। দরিদ্র বন্দিদের মুসলমানদের বিরোধিতা না করার জন্য 'প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে মুক্তি' দেওয়া হয়।
বদরের যুদ্ধের ফলাফল ও গুরুত্ব: বদরের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে মুহম্মদ (স.)-এর পার্থিব ক্ষমতার ভিত্তি সুদৃঢ় হলো। অবহেলিত মুসলিম সমাজ কুরাইশদের সঙ্গে জয়লাভ করে ইসলাম ও রাষ্ট্রকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করল। বদরের যুদ্ধের গুরুত্বের কতিপয় দিক হচ্ছে:
১. ইসলামের প্রথম সামরিক বিজয় ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধ। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, চূড়ান্তকারী ও যুগসন্ধিকারী যুদ্ধ। এ যুদ্ধ ইসলামের সর্বপ্রথম সামরিক বিজয়ের গৌরবসূচক। এতদিন পর্যন্ত ভ্রান্তধারণার বশবর্তী হয়ে কুরাইশগণ মনে করত যে, সামরিক শক্তি পরীক্ষার সম্মুখীন হলেই মুহাম্মদ (স.)-এর ক্ষমতার অবসান ঘটবে। কিন্তু এখন তারা তাদের ভুল বুঝতে পারল। বদরের যুদ্ধের সাথে মুসলমানদের জীবন মরণের প্রশ্ন জড়িত ছিল। মুসলমানগণ এ যুদ্ধে পরাজিত হলে সম্ভবত ইসলাম কেবলমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে নয়, ধর্ম হিসেবেও পৃথিবীর বুক হতে লুপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিত। পক্ষান্তরে মুসলমানদের বিজয় ইসলামের নব দিগন্ত উন্মোচিত করে। তিনগুণ সংখ্যাগরিষ্ঠ দুশমন বাহিনীর সঙ্গে সংগ্রাম করেও যুদ্ধে জয়লাভ মুসলমানদের মধ্যে গভীর আত্মবিশ্বাস জন্মায়।
ঐতিহাসিক হিয়ি মন্তব্য করেছেন, "The spirit of discipline and contempt of death manifested at this first ercounter of Islam proved characterstic of it in all its later and greater conqust." অর্থাৎ এ সম্মুখ যুদ্ধে মুসলমানগণ যে নিয়মানুবর্তিতা ও মৃত্যুর প্রতি আজ্ঞা প্রদর্শনের নজীর স্থাপন করেছিলেন তাতে ইসলামের পরবর্তী ও মহত্ত্বর বিজয়ের লক্ষণ পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক জোসেফ হেল বলেন, "বদরের যুদ্ধে জয়লাভ ইসলামের প্রথম সামরিক বিজয়।" এটি স্বজাতীয় দেশবাসীর উপর মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে।" এটি জ্বলন্ত সত্য যে, বদরের যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
২. কুরাইশদের পরাজয় বদরের যুদ্ধে কুরাইশগণ চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়ে হযরত মুহম্মদ (স.)-কে হত্যা এবং ইসলামকে পৃথিবীর বুক হতে ধ্বংস করার দুরাশা চিরতরে ব্যর্থ হয়। ফলে কুরাইশরা বহুগুণে ক্রোধান্বিত হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে ওহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
৩. ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সূচনা: ইসলাম প্রজাতন্তের সূচনা ও সম্প্রসারণ ঘটায় এবং পরবর্তী একশত বছরের মধ্যে ইসলাম পশ্চিমে আফ্রিকা মহাদেশ হতে পূর্বে ভারতবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে।
৪. মুসলমানদের মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় সামান্য সংখ্যক মুসলমান সহস্রাধিক কুরাইশদের সঙ্গে জয়লাভ করে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়। মুসলমানদের মনোবল, শক্তি, সাহস ও উদ্দীপনা বৃদ্ধি পায়। ফলে মুসলমানগণ শহিদ হওয়ার অনুপ্রেরণা লাভ করে।
৫. সত্যের বিজয়: বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের জয়লাভ ছিল অজ্ঞতার বিরুদ্ধে জ্ঞানের বিজয়, অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের বিজয়, বেইমানের বিরুদ্ধে ইমানের বিজয়।
৬. ইসলামের প্রচার ও প্রসার বদরের যুদ্ধে বিজয় ইসলাম প্রচারে নবযুগের সূচনা করে। ঐতিহাসিক যোসেফ হেল বলেন, "ইসলাম ধর্মের প্রতি আরব বিশ্ব এমনকি পৃথিবীর মানুষের আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। দলে দলে লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ফলে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে আরব উপদ্বীপে ইসলাম সম্প্রসারিত হয়।"
৭. ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মনোবল ভেঙে পড়ে বদরের যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে মদিনার ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মনোবল ভেঙে পড়ে। তারা মুসলিম শক্তিকে ধ্বংসের জন্য উঠে পড়ে লাগে।
৮. মুসলমানদের উদারতা বদরের যুদ্ধে জয়লাভ করে মুসলমানগণ কুরাইশ বন্দিদের প্রতি সহানুভূতি ও উদারতা প্রদর্শন করেন। ফলে পৃথিবীর অন্যান্য জাতি মুসলমানদের নিকট হতে এ মহানুভবতার শিক্ষা গ্রহণ করে।
৯. মুহম্মদ (স.)-এর ক্ষমতা সুদৃঢ়করণ বদরের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে হযরত মুহম্মদ (স.) ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে খন্দকের যুদ্ধে জয়লাভ, ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে হুদায়বিয়ার সন্ধি, ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা বিজয়, ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে মুতার যুদ্ধ, ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে হুনায়নের যুদ্ধ ও ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে তাবুক অভিযানে জয়লাভ করে একদিকে ইসলামের প্রচার ও অপরদিকে স্বীয় ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করেন।
১০. হযরত মুহম্মদ (স.)-এর পার্থিব ক্ষমতার ভিত্তি স্থাপিত হয় বদরের যুদ্ধে মুসলমানগণ জয়লাভ করে এবং কুরাইশগণ পরাজিত হয়। পরাজিত কুরাইশগণ ধন-সম্পদ হারায়, মুসলমানগণ ধন-সম্পদ লাভ করেন। কুরাইশগণের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আবু জেহেল, ওকবা, উতবা, আল-হারিস, নওফল, শায়বা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারায়। অপরদিকে, মুহম্মদ (স.) মদিনা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে একক শক্তির অধিকারী হন। আরব বিশ্বে তাঁর প্রভাব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। তাই ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, "The battle of Badar laid the foundation of Muhammd temporal power, Islam had won its first and decisive military victory", অর্থাৎ সামরিক দ্বন্দ্ব হিসেবে বদর যতই নগণ্য হোক, এ যুদ্ধে মুহম্মদ (স.) পার্থিব শক্তির ভিত্তি স্থাপন করেন। ইসলাম তার প্রথম ও চূড়ান্ত সামরিক বিজয় অর্জন করে।
পরিশেষে বলা যায় যে, বদরের যুদ্ধ ছোট্ট যুদ্ধ হলেও ইসলামের ইতিহাসে এ যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। এ যুদ্ধে জয়লাভ না করলে ইসলাম ধর্ম হয়তো পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত হতে পারত না। বদরের যুদ্ধে জয়লাভের ফলে মুসলমানগণ একটি জাতি, ইসলাম একটি ধর্ম হিসেবে আরব উপদ্বীপ তথা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা লাভের প্রয়াস পায়। সুতরাং ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের বদরের যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এ যুদ্ধে জয়লাভের ফলে মুহম্মদ (স.)-এর পার্থিব ক্ষমতা সুদৃঢ় হয়। Encyclopedia Britannica-তে উল্লেখ আছে, "The Battle of Badar is not only the most celebrated battle in the memory of Muslims, it was really also of a great historical importance." অর্থাৎ বদরের যুদ্ধ মুসলমানদের ইতিবৃত্তের শুধু একটি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধই নয়, এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও অপরিসীম। এটি মুহাম্মদ (স.)-এর সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করতে যথেষ্ট সাহায্য করেছে।
উহুদের যুদ্ধ (২১শে মার্চ, ৬২৫ খ্রি.) [Battle of Uhud (21st March, 625 AD)]
উহুদ পরিচিতি: উহ্রদ 'হামযা' ও 'হা' বর্ণে পেশ যোগে গঠিত, প্রসিদ্ধ এক পাহাড় বিশেষ। মদিনা হতে প্রায় ৬ কি.মি. উত্তরে এর অবস্থান। মসজিদে নববী হতে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে দীর্ঘ এ পাহাড়টি শক্ত নুড়িযুক্ত মাটি দ্বারা আবৃত। উত্তরপার্শ্ব চওড়া পাথর বিশিষ্ট, যা দেখতে অনেকটা উঁচু দেওয়ালের মতো মনে হয়। লাল বেলে পাথর ও শক্ত পাথরের টুকরা, পাহাড়টির প্রার সর্বত্র পরিদৃষ্ট হয়। এ পার্শ্বেই একটি ক্ষুদ্র পাহাড় আছে, যাকে জাবালুর রুমাও বা জাবালুর আয়নায়ন বলা হয়।
উহুদ যুদ্ধের পটভূমি: ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধে কুরাইশগণ আর্থিক, সামরিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মক্কার কুরাইশদের নেতা বীর আবু জেহেল ও উতবা যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিল। পরাজিত হয়ে কুরাইশ দলপতি আবু সুফিয়ান প্রতিজ্ঞা করেন যে, পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি নারী অথবা, তৈল স্পর্শ করবেন না। মদিনার ইহুদিগণ মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের কুমন্ত্রণা দিতে শুরু করে। মদিনার কবি কা'ব বিন আশরাফ কবিতা রচনা করে মক্কার কুরাইশদের মদিনা আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করতে থাকে। মদিনার প্রাধান্য এবং ইসলামের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেখে মক্কার কুরাইশগণ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়ে।
মদিনায় হাশেমী গোত্রের হযরত মুহম্মদ (স.)-এর খ্যাতি ও একচ্ছত্র আধিপত্য লাভ দেখে উমাইয়া গোত্রপতি আবু সুফিয়ানের গাত্রদাহ দেখা দেয়। প্রকৃতপক্ষে কুরাইশ গোত্রের হাবেশী ও উমাইয়া শাখার পুরনো দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য লাভের প্রতিযোগিতার জন্য যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
উহুদ যুদ্ধের কারণ (Causes of Battle of Uhud)
১. বদর যুদ্ধের প্রতিশোধস্পৃহা দ্বিতীয় হিজরি সনের ১৭ রমজান বদর প্রান্তরে মুসলমানদের সাথে মক্কায় কাফেরদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তারা পরের বছর মদিনা আক্রমণ করে। এ যুদ্ধে তারা চেয়েছিল মুসলমানদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে দিতে। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ আপনজনদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে শোককে শক্তিতে পরিণত করে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
২. ইহুদিদের ষড়যন্ত্র: ইহুদি নেতা ও কবি কা'ব ইবনে আশরাফ মক্কার কুরাইশদের সাথে মিলিত হয়ে যড়যন্ত্র শুরু করে। সে কবিতা রচনা করে মক্কার কুরাইশ ও দুর্বল চিত্তের মুসলমানদের প্ররোচিত করতে থাকে। সে দুর্ধর্ষ বেদুইন সম্প্রদায়কে প্ররোচিত করে তার কবিতায় এতে মক্কায় কুরাইশদের অন্তরে প্রতিশোধের আগুন আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাই তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়।
৩. মদিনায় প্রাধান্য: বদর যুদ্ধের বিজয়ের মাধ্যমে মদিনার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামের প্রসার মদিনার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। এতে কুরাইশদের শঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং মদিনায় উপকণ্ঠে অরাজকতার সৃষ্টি করে।
৪. হাশিম ও উমাইয়া গোত্রের দ্বন্দ্ব: মদিনার হযরত মুহাম্মদ (স.) এর নেতৃত্বে বনু হাশিম গোত্রের ক্রমোন্নতিতে কুরাইশদের অন্য শাখা উমাইয়াদের মধ্যে ঈর্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।
৫. মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি: বদর যুদ্ধের পর মহানবি (স.) মদিনার সকল গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ করে মুসলিম শক্তি বৃদ্ধি করেন। এভাবে দিন দিন মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধিতে কুরাইশরা হিংসাত্মক হয়ে মদিনা আক্রমণ করে।
৬. প্রত্যক্ষ কারণ: আবু সুফিয়ান মদিনার ইহুদিদেরকে অনুপ্রাণিত করতে দু'শ অশ্বারোহীকে মদিনার দিকে প্রেরণ করে।. মদিনায় কতিপয় যড়যন্ত্রকারী ইহ্রদির সাথে আলাপ আলাচনার মাধ্যমে সাহায্যের আশ্বাস পোয়ে মদিনা রওয়ানা করে। পথে তারা সা'দ ইবনে আমরা নামে একজন সাহাবিকে হত্যা করে। সেখানে কয়কটি বাড়িঘর লুটপাট করে এবং মুসলমানদের চারণভূমিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। এ সংবাদ পেয়ে মহানবি (স.) তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেন। এ কারণে মূলত উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
যুদ্ধের ঘটনা: মক্কার কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই মার্চ, ৩ রা হিজরি ৩০০ উষ্ট্রারোহী ২০০ অশ্বারোহী, ৭০০ বর্মধারীসহ ৩০০০ সশস্ত্র সৈন্য নিয়ে মদিনা আক্রমণের জন্য রওনা হন। ২০শে মার্চ মদিনার পাঁচ মাইল পশ্চিমে উহ্রদ উপত্যকায় কুরাইশ বাহিনী সমবেত হলে মুহম্মদ (স.) অনিচ্ছা সত্ত্বেও ১০০ জন বর্মধারী, ৫০ জন তীরুদাজ সৈন্যসহ মাত্র ১০০০ সৈন্য নিয়ে শত্রুর মোকাবিলায় অগ্রসর হন। পথিমধ্যে মুনাফেক আব্দুল্লাহ বিন উবাই তাঁর ৩০০ জন সৈন্য নিয়ে পলায়ন করলে মাত্র ৭০০ মুসলিম সৈন্য নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মহানবি (স.) উহুদ পাহাড়ের গোলাকার অংশের বাইরে থেকে যুদ্ধ করার পরিকল্পনা এবং সেভাবে সৈন্য সমাবেশ করেন।
মুসলিম শিবিরের পিছনে বাম পাশে একটি গিরিপথ ছিল। পিছন দিক থেকে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য মহানবি (স.) হযরত আব্দুল্লাহ ইবন যুবায়েরের নেতৃত্বে ৫০ জন, তীরন্দাজ সৈন্যকে গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথটির প্রহরায় নিযুক্ত করেন। পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত স্থান ত্যাগ করতে নিষেধ করেন। ২৩শে মার্চ, ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দে যুদ্ধ শুরু হলে প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনী সাফল্য লাভ করলে শত্রু বাহিনী পরাজিত হয়ে জ্ঞানশূন্য অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন শুরু করেন। যুদ্ধের প্রাথমিক জয়ে উল্লাসিত মুসলিম বাহিনী শৃঙ্খলা হারিয়ে গিরিপথ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন না করে গনিমতের মাল সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
মুসলিম সৈন্যদের বিশৃঙ্খলের সুযোগে দুর্ধর্ষ কুরাইশ সেনাপতি খালিদ-বিন-ওয়ালিদ ঘুরে পিছন দিক থেকে অতর্কিত আক্রমণ করে মুসলিম বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং দ্রুত পলায়ন করতে বাধ্য করে। যুদ্ধক্ষেত্রে মহানবি (স.), হযরত আবু বকর (রা.), হযরত উমর (রা.), হযরত আলী (রা.)-সহ বহু সাহাবি আহত হন এবং স্বয়ং মহানবি (স.)-এর দুটি দাঁত মোবারক ভেঙে যায়। এ যুদ্ধে বীরকেশরী হযরত আমীর হামজা (রা.)- সহ ৭০ জন মুসলিম যোদ্ধা শহিদ হন। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা হামজা (রা.)-এর হৃৎপিন্ড ভক্ষণ করে ইতিহাসে নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছেন।
উহুদ যুদ্ধের ফলাফল/গুরুত্ব বদরের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করলেও উহুদের যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের জন্য ইমান ও ধৈর্যের অগ্নিপরীক্ষা। এ যুদ্ধ ছিল তাদের ভক্তি, বিশ্বাস ও আত্মজিজ্ঞাসার পরীক্ষা। যুদ্ধে কুরাইশগণ সাময়িক জয়লাভকরলেও প্রকৃতপক্ষে কুরাইশগণ মানসিক ও শারীরিক শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং এ কারণে তাদের জয় ছিল নামমাত্র। অপরদিকে মুসলিম বাহিনী সাময়িকভাবে পরাজিত হলেও এ যুদ্ধ হতে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে নেতার আদেশ পালন এবং যুদ্ধে চূড়ান্ত জয়লাভ পর্যন্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার শিক্ষালাভ করে। এছাড়া উহুদ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী আরও ঐক্যবদ্ধ "ও সুশৃঙ্খলাবদ্ধ হওয়ারও শিক্ষা লাভ করে। ফলে পরবর্তী যুদ্ধসমূহে উহুদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ করে জয়লাভের অনুপ্রেরণা হয়ে আছে। আর উহ্রদের যুদ্ধে কুরাইশগণ আপাতদৃষ্টিতে জয়লাভ করলেও প্রকৃত জয়লাভ'করতে পারে নি।
মুসলিম বাহিনীর সাময়িক পরাজয়ের কারণ: নিম্নে মুসলিম বাহিনীর সময়িক পরাজয়ের বিভিন্ন কারণগুলো আলোচনা করা হলো:
১. মুসলমানদের নেতার আদেশ অমান্য ও. শৃঙ্খলার অভাব উহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী সাময়িকভাবে পরাজিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরাজয়ের কারণ কুরাইশদের সৈন্য সংখ্যা মুসলিম বাহিনী অপেক্ষা তিনগুণ বেশি ছিল। অপরদিকে, মুসলিম বাহিনী নেতার আদেশ অমান্য করে যুদ্ধ নীতি লঙ্ঘন করে নিশ্চিত বিজয়কে পরাজয়ের পর্যায়ে নিয়ে যান।
২. মুসলিম সৈন্যদের ঘৃণ্য মনোবৃত্তি: নেতার আদেশ অমান্য করে মুসলিম সৈন্য বাহিনী আরবের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী গনিমতের মাল সংগ্রহে ব্যস্ত হওয়ার সুযোগে কুরাইশ সেনাপতি অতর্কিত আক্রমণ করে মুসলমানদের পরাজিত করে।
৩. যুদ্ধ চলাকালে অপপ্রচার: যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর জয়লাভ নিশ্চিত জেনে মিথ্যা গুজব রটনা করা হলো হযরত মুহম্মদ (স.) যুদ্ধে শাহাদাতবরণ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটি ছিল যুদ্ধে মুসলিম পতাকাবাহী মুসাব মারাত্মক আহত হয়ে শাহাদাতবরণ করেন। মহানবি (স.)-এর সাথে তার চেহারার কিছুটা সাদৃশ্য ছিল।
৪. খালিদ-বিন-ওয়ালিদের কৃতিত্ব: উহুদের যুদ্ধে কুরাইশ সেনাপতি খালিদ-বিন-ওয়ালিদ কুরাইশ বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত হন। তার রণ দক্ষতা, বীরত্ব ও সামরিক দক্ষতার জন্য কুরাইশ বাহিনী যুদ্ধে জয়লাভ করে। মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হন এবং পলায়ন করেন।
৫. আব্দুল্লাহ বিন উবাই-এর বিশ্বাসঘাতকতা: যুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে মুনাফেক আব্দুল্লাহ বিন উবাই ৩০০ সৈন্যসহ যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন। ফলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা কমে যায় এবং এর ফলে অন্যান্য সৈন্যদের মনোবল ভেঙে পড়ে।
৬. মদিনার কুরাইশদের যড়যন্ত্র মদিনা সনদ অনুযায়ী মদিনায় বসবাসকারী কোনো সম্প্রদায় মকার কুরাইশদের সহযোগিতা করবে না। কিন্তু মদিনার ইহুদি সম্প্রদায়ের বনু কাইনুকা গোত্র সনদের শর্ত ভঙ্গ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের সহযোগিতা করেন।
৭. মহিলাদের প্ররোচনা উহুদের যুদ্ধে সৈন্যদের সেবা করার জন্য কুরাইশ ও মুসলিম বাহিনীতে বহুসংখ্যক নারী অংশগ্রহণ করে। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা স্বামীর সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে কুরাইশ সৈন্যদের যুদ্ধ সংগীত ঘারা মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করার জন্য উৎসাহ দান করেন। হিন্দার ঘৃণিত আহবান ছিল, "তোমরা যুদ্ধে জয়লাভকরলে তোমাদের সঙ্গে সাদরে আলিঙ্গন করব এবং তোমাদের সঙ্গে যৌনাচারের ব্যবস্থা করা হবে। আর তোমরা পশ্চাদগমন করলে আমরা তোমাদের আনন্দ দান না করে পরিত্যাগ করব।"
পরিশেষে বলা যায় যে, উহুদ যুদ্ধে মুসলমানরা সাময়িক পরাজয় বরণ করলেও তারা এ যুদ্ধ থেকে নেতার আদেশ যথাযথভাবে পালন করা এবং শৃঙ্খলা রক্ষার চরম শিক্ষা পায়। তাই পরবর্তীতে কোনো যুদ্ধেই তারা আর এমন ভুল করেনি এবং সর্বত্র সাফল্য লাভ করে। অন্যদিকে কুরাইশরা আপাত জয় লাভ করলেও তারা এর কোনো সুফল ভোগ করতে পারেনি, বরং নৈতিক দুর্বলতাহেতু মনোবল হারিয়ে ময়দান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। তাই তাদের সাময়িক জয় ছিল পরাজয়ের নামান্তর।
খন্দকের বা পরিখার যুদ্ধ (মার্চ, ৬২৭ খ্রি.) [Battle of Khandaq (March, 627 AD)]
উহুদের যুদ্ধে জয়লাভ করে কুরাইশদের মনে চূড়ান্ত জয় এবং মুসলমানদের ধ্বংস করার বাসনা জাগ্রত হয়। ফলে তারা মদিনা আক্রমণ করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগের জন্য সমগ্র বেদুইন গোত্রগুলোকে একত্রিত করে প্রায় ১০ হাজার সৈন্য সংগ্রহ করেন। দুটি পৃথক বাহিনীতে দশ হাজার সৈন্য রণসাজে সজ্জিত করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। এ সময় গাতফান, সুলাইম এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র গোত্র প্রায় ৬ হাজার সৈন্য দিয়ে কুরাইশ বাহিনীকে সাহায্য করে। :
খন্দক পরিচিতি: যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে মদিনার বাইরে খন্দক বা পরিখা খনন করার ফলে যুদ্ধের নাম রাখা হয়েছে খন্দকের যুদ্ধ। কুরাইশদের সাথে বনু নাযিল ও বনু কাইনুকা জোট গঠন করে মদিনা আক্রমণ করেছিল। এজন্য এ যুদ্ধকে আহজাবের যুদ্ধ বলা হয়। পারস্য থেকে আগত সাহাবি সালমান ফারসির পরামর্শক্রমে মুহাম্মদ (স.) মদিনার চারপাশে পরিখা খননের নির্দেশ দেন। প্রাকৃতিকভাবে মদিনাতে যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল তার সাথে এ ব্যবস্থা যুক্ত হয়ে আক্রমণকারীদেরকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে।
যুদ্ধের কারণ: খন্দকের যুদ্ধের নানাবিধ কারণ ছিল। নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হলো:
১. ইহুদিদের উসকানি: উহুদ যুদ্ধের পর মদিনা হতে বহিষ্কৃত বনু নজির ও বনু কাইনুকা গোত্র কুরাইশদের সঙ্গে যোগ দিয়ে মদিনা আক্রমণ করার জন্য স্থানীয় ইহুদি ও পার্শ্ববর্তী লোকদের উত্তেজিত করে তোলে। তাদের প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে সবগুলো ইহুদি গোত্র একত্রিত হয়ে মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে কুরাইশদের সঙ্গে যোগ দেন।
২. বেদুইনদের শত্রুতা: মদিনায় শহরতলীতে ব্যবসারত বেদুইনগণ লুটতরাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করত। হযরত মুহম্মদ (স.) তাদের সকল অবৈধ কার্যকলাপ বন্ধ করে তাদের কয়েকজনকে শান্তি প্রদান করেন। এ সুযোগে তারা কুরাইশদের সঙ্গে মিলিত হয়ে মদিনা আক্রমণে অংশগ্রহণ করে।
খন্দকের যুদ্ধের ঘটনা কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশ, ইহুদি ও বেদুইনদের একটি সম্মিলিত বাহিনী ৬২৭. খ্রিষ্টাব্দের ২১শে মার্চ ৬০০ অশ্বারোহীসহ ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে মদিনা আক্রমণে অগ্রসর হয়। মহানবি (স.) ৩ হাজার মুসলিম যোদ্ধা সংগ্রহ করে কুরাইশ আক্রমণ প্রতিহত করার উপায় খুঁজে বের করার জন্য এক মত বিনিময় সভা আহ্বান "করেন। সভায় পারস্যবাসী হযরত সালমান ফারসি (র.)-এর পরামর্শক্রমে মদিনা শহরের চতুর্দিকে অরক্ষিত এলাকায় পরিখা খনন অর্থাৎ খাল খনন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী মদিনাবাসী সৈন্যদের সহযোগিতায় পরিখা খনন করা হয়। পরিখা অথবা খন্দক হতে এ যুদ্ধকে খন্দকের যুদ্ধ বলে। ইংরেজি ভাষায় এ যুদ্ধকে Battle of the confederates-বা: সম্মিলিত শক্তিসমূহের যুদ্ধ বলে। পবিত্র আল কুরআনে এটা আহজাবের যুদ্ধ বলে অভিহিত। করা হয়েছে। ইতঃপূর্বে যুদ্ধ কৌশলে এরূপ পরিখা খনন ব্যবস্থা আরব দেশে প্রচলন ছিল না।
৩,০০০ সৈন্য দীর্ঘ ২০ দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে দশহাত প্রন্থ এবং ছয় হাজার হাত দীর্ঘ পরিখা খনন শেষে হযরত মুহম্মদ (স.) স্বয়ং সাল পর্বতে আরোহণ করে মুসলিম সৈন্যদের নির্দেশ প্রদান করেন। তিন সপ্তাহ যাবৎ কুরাইশ বাহিনী মদিনা অবরোধ করে বিভিন্ন প্রচেষ্টায় শহরে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়। হঠাৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরু হলে প্রবল ঝড়-বৃষ্টির ফলে ঠান্ডায় কুরাইশ বাহিনী মরণাপন্ন হয়ে রণভঙ্গ দিয়ে, প্রাণ নিয়ে স্বদেশের উদ্দেশ্যে পলায়ন করলেন। বেদুইন, কুরাইশ ও ইহুদিদের দ্বারা গঠিত শক্তির মধ্যে সমন্বয়ের ও ঐক্যের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহানবি (স.)-এর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, রণকৌশল, মুসলিম গোয়েন্দা বাহিনীর কর্তব্যপরায়ণতা এবং মুসলিম বাহিনীর ঐক্যবদ্ধতা ও শৃঙ্খলাবোধ কুরাইশ বাহিনীকে পরাজয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
খন্দকের যুদ্ধের ফলাফল: ইসলামের ইতিহাসে তথা পৃথিবীর যুদ্ধসমূহের ইতিহাসে পরিখা যুদ্ধ এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। এ যুদ্ধে জয়লাভের ফলে উহুদের যুদ্ধের গ্লানি মুছে যায়। মুসলিম শক্তি দুনিয়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। কুরাইশ নেতৃত্বে ইহুদি ও বেদুইনদের শক্তি ধ্বংস হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে তারা আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। মুসলিম শক্তি সমগ্র আরব দেশে তথা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে বিস্তৃতি লাভ করে। ঐতিহাসিক এস এম ইমাম উদ্দিনের মতে, "এ সম্মিলিত বাহিনী (আহজাব) ভাঙনের ফলে মক্কাবাসীদের সম্পূর্ণ পরাজয় প্রতিভাত হয়ে ওঠে এবং মদিনায় মুসলিম রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল সুদৃঢ় করে।"
শৃঙ্খলা ও বিশ্বাসের বিজয় উহ্রদের যুদ্ধের শিক্ষা নিয়ে মুসলিম বাহিনী শৃঙ্খলা রক্ষায় মহানবি (স.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী পরিখা খনন করে জয়লাভ করতে সক্ষম হন। এ সম্পর্কে ঐতিহাসিক জোসেফ হেল বলেন, "পরিখার যুদ্ধের ফলাফল ছিল সংখ্যাধিক্য শক্তির উপর শৃঙ্খলা ও একতার নব বিজয়।" এর ফলে ইসলামের মর্যাদা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।
কুরাইশদের ব্যর্থতার কারণ: খন্দক যুদ্ধে কুরাইশরা পুরোপরি ব্যর্থ হয়। এ যুদ্ধে কুরাইশদের ব্যর্থতার মূলে অনেকগুলো কারণ ছিল। যেমন-
১. অভিনব রণকৌশল যুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসাবে পরিখা খননের মতো অভিনভ রণকৌশল কুরাইশরা বা আরবরা কখনো দেখেনি। তাই মুসলিম বাহিনীর পরিখা খননের ফলে তাদের সম্মুখসমরের আশা বিলীন হয়ে যায়। তাদের ধারণা ছিল, উহুদ যুদ্ধে মতো সংখ্যাধিক্যে তারা মুসলিম বাহিনীকে পর্যুদস্ত করবে।
২. মতানৈক্য বেদুইন গোত্রসমূহ, কুরাইশ ও ইহুদি সমন্বয়ে গঠিত ত্রিশক্তির মধ্যে ঐক্য ও সম্ভাবের অভাবে আক্রমণ শিথিল হয়ে পড়ে। বেদুইন গোত্রসমূহ, ইহুদি গোত্র বনু গাতফান, বনু কুরাইযা প্রভৃতির সঙ্গে আবু সুফিয়ানের মতানৈক্যে কাফের বাহিনীর শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
৩. প্রাকৃতিক দুর্যোগ: কুরাইশদের ব্যর্থতার প্রধান কারণের মধ্যে অন্যতম হলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কেননা, ধূলিঝড়, ঝঞা বায়ুসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রিশক্তির তাঁবু ও খাদ্যসামগ্রী বিনষ্ট হয়। ঘোড়া উট প্রভৃতি জন্তগুলো ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পলায়ন করে, আবার কোনোটা মৃত্যুমুখে পতিত হয়। এতে কুরাইশ বাহিনীর বাহন ও অবস্থানস্থালের সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। তাই তারা অবরোধ প্রত্যাহার করে মক্কা নগরীর উদ্দেশ্যে পলায়ন করে।
৪. তীব্র খাদ্যাভাব: প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দিলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই কুরইশরা অবরোধ তুলে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হয়।
৫. মুসলিম বাহিনীর ইস্পাত কঠিন শপথ উহ্রদের শিক্ষা কার্যকর করার জন্য মুসলিম বাহিনী ইস্পাত কঠিন শপথ গ্রহণ করে, তারা বিপদে ধৈর্য, একতা ও শৃঙ্খলা হারাবো না। ফলে দ্বিধাবিভক্ত ত্রিশক্তির আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, খন্দক যুদ্ধে কুরাইশগণ প্রমাণ পেল ইসলাম দুর্নিবার। তিন তিনবার তারা শক্তি পরীক্ষা করে। দেখেছে, তিনবারই তারা বিফল হয়েছে। এ যুদ্ধকে ইসলামের চূড়ান্ত যুদ্ধ বল্ম যেতে পারে। কেননা কুরাইশরা বদর যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে, উহুদেও মুসলমানদের পরাজিত করতে পারে নি। খন্দকে তারা আরবের সমস্ত শক্তি' নিয়েও পরাজিত হয়েছে। তাই খন্দক যুদ্ধের পর তাদের নৈতিক শক্তি ভেঙে পড়ে।
হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.) - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

