• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.)
হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.)

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

মদিনা সনদ Charter of Madina

মদিনা রাষ্ট্র গঠন: নবি করিম (স.) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় এসে একটি বিবদমান আরব জাতিকে মদিনা সনদের মাধ্যমে (৬২৪ খ্রি.) সুসংঘবদ্ধ জাতি বা উম্মায় রূপান্তরিত করেন। এর ফলে মদিনায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র নামে একটি রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে। তাতে গোত্র প্রথা চিরতরে বিলুপ্ত হয় এবং ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ একটি নতুন জাতির সৃষ্টি হয়- যা ইতিহাসে মহাসনদ বা 'Great Charter' নামে পরিচিত। এ কারণেই ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি বলেন, "Out of the religious community of Al-Medina the later and larger state of Islam arose", অর্থাৎ মদিনা রাষ্ট্রই পরবর্তীতে বিশাল ইসলামি রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল স্থাপন করে।

মদিনা সনদ: হযরত মুহম্মদ (স.) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা হতে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় ইসলামের নিরাপত্তা বিধান, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, সুশাসন কায়েম ও মদিনাবাসীদের মাঝে শান্তি স্থাপন ইত্যাদি বাস্তবায়নের জন্য একটি সনদ প্রণয়ন করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটিকে Charter of Madina বলা হয়ে থাকে। এম ওয়াট সাহেব একে মদিনার সংবিধান বলেছেন। ইবনে হিশাম সিরাহ গ্রন্থে এ সনদের ৪৭টি ধারা উল্লেখ করেছেন। ইবনে ইসহাক তাঁর সিরাত গ্রন্থে ৫৩টি ধারা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বিভিন্ন মতভেদ থাকা সত্ত্বেও এ সনদে মোট ৫৬টি ধারা ছিল। মদিনা সনদের পূর্ণ বিবরণ নিম্নরূপ:

ধারা-১: ইহা মহানবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে লিখিত অঙ্গীকারনামা।

ধারা-২ : কুরাইশ ও ইয়াসরেব-এর মুমিন-মুসল্লিগণ ও যারা তাদের অনুগামী হয়ে তাদের সাথে যুক্ত হবে এবং তাদের সাথে মিলে জিহাদ করবে তাদের মধ্যে (এই চুক্তিপত্র সম্পাদিত)।

ধারা-৩ : তারা অন্যদের থেকে ভিন্ন এক উম্মত।

ধারা-৪ : কুরাইশদের মধ্য থেকে যারা মুহাজির তারা তাদের পূর্বাবস্থায় বহাল থাকবে তাদের পূর্বেকার রক্তপণ লেনদেন করবে এবং স্বেচ্ছামূলকদানে তাদের বন্দি-মুক্তিপণ পরিশোধ করবে। তারা মুমিনদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে।

ধারা-৫ : এবং বনূ আওফ তাদের মধ্যে বিদ্যমান পূর্ব রক্তপণ আদায় করবে এবং সকল সম্প্রদায় নিজ নিজ বন্দিদের মুক্তিপণ স্বেচ্ছাদানে আদায় করবে এবং মুমিনদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে।

ধারা-৬ এবং বনূ হারেস (ইবনুল খাযরাজ) তাদের মধ্যে বিদ্যমান পূর্ব রক্তপণ আদায় করবে ও সকল সম্প্রদায় নিজ নিজ বন্দিদের মুক্তিপণ স্বেচ্ছাদানে আদায় করবে এবং মুমিনদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে।

ধারা-৭: বনূ সা'য়েদাহ তাদের মধ্যে বিদ্যমান পূর্ব রক্তপণ আদায় করবে এবং সকল সম্প্রদায় নিজ নিজ বন্দিদের মুক্তিপণ স্বেচ্ছাদানে আদায় করবে এবং মুমিনদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে।

ধারা-৮ : এবং বনূ জুশাম তাদের মধ্যে বিদ্যমান পূর্ব রক্তপণ আদায় করবে এবং সকল সম্প্রদায় নিজ নিজ বন্দিদের মুক্তিপণ স্বেচ্ছাদানে আদায় করবে এবং মুমিনদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে।

ধারা-৯ : এবং বনূ নাজ্জার তাদের মধ্যে বিদ্যমান পূর্ব রক্তপণ আদায় করবে এবং সকল সম্প্রদায় নিজ নিজ বন্দিদের মুক্তিপণ স্বেচ্ছাদানে আদায় করবে এবং মুমিনদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে।

ধারা-১০ এবং বনু 'আমর ইবন 'আওফ তাদের মধ্যে বিদ্যমান পূর্ব রক্তপণ আদায় করবে এবং সকল সম্প্রদায় নিজ নিজ বন্দিদের মুক্তিপণ স্বেচ্ছাদানে আদায় করবে এবং মুমিনদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে।

ধারা-১১: এবং বন্ নাবীত তাদের মধ্যে বিদ্যমান পূর্ব রক্তপণ আদায় করবে এবং সকল সম্প্রদায় নিজ নিজ বন্দিদের মুক্তিপণ স্বেচ্ছাদানে আদায় করবে এবং মুমিনদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে।

ধারা-১২: এবং বনু 'আওস তাদের মধ্যে বিদ্যমান পূর্ব রক্তপণ আদায় করবে এবং সকল সম্প্রদায় নিজ নিজ বন্দিদের মুক্তিপণ স্বেচ্ছাদানে আদায় করবে এবং মুমিনদের সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে।

ধারা-১৩: এবং মুমিনগণ তাদের কাউকে দায়গ্রস্ত ফেলে রাখবে না বরং তাদের মুক্তিপণ বা রক্তপণ স্বেচ্ছাদানে আদায় করে দেবে।

ধারা-১৪: এবং কোনো মুমিন অন্য মুমিনের অনুমতি ছাড়া তার বন্ধুর সাথে মিত্রতা করবে না।

ধারা-১৫: মুমিন মুত্তাকীদের কারও ওপর কোনো সন্ত্রাসী হামলা হলে অথবা জুলুমের থাবা বিস্তার করতে চাইলে অথবা কোনো অন্যায় বা সীমা লঙ্ঘন করতে চাইলে অথবা মুমিনদের মধ্যে বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইলে সকলের সম্মিলিত হাত ওই অপরাধীদের ওপর নিপতিত হবে, চাই সে কারও সন্তানই হোক।

ধারা-১৬: কোনো মুমিন কোনো কাফিরের পক্ষ নিয়ে অন্য মুমিনকে হত্যা করবে না এবং কোনো মুমিনের বিপক্ষে কোনো কাফেরকে সাহায্য করবে না।

ধারা-১৭: নিশ্চয় আল্লাহর জিম্মাদারী সকলের জন্য একই, তাদের পক্ষে একজন সাধারণ লোকও আশ্রয় দিতে পারবে।

ধারা-১৮: নিশ্চয় মুমিনগণ স্বতন্ত্রভাবে পরস্পরের মিত্র।

ধারা-১৯: এবং ইহুদিদের মধ্যে যারা আমাদের অনুগামী হবে তাদের জন্য সাহায্য ও মর্যাদার অধিকার থাকবে। তাদের প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করা হবে না।

ধারা-২০: মুমিনগণ প্রদত্ত শান্তি-নিরাপত্তা হবে অভিন্ন, আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধের সময় এক মুমিনকে ছেড়ে অন্য মুমিন নিরাপত্তাচুক্তি করতে পারবে না বরং পারস্পরিক সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক চুক্তিই গৃহীত হবে।

ধারা-২১: এবং যে সকল সম্প্রদায় আমাদের সাথে যুদ্ধ করবে তারা একের পর আরেক দল এসে দায়িত্ব পালন করবে।

ধারা-২২: এবং আল্লাহর রাস্তায় রক্তপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে মুমিনগণ একে অন্যের পক্ষে তা প্রতিহত করবে।

ধারা-২৩: এবং নিশ্চয়ই ধর্মনিষ্ঠ মুমিনগণ উত্তম ও সুষ্ঠুতম হেদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

ধারা-২৪: কোনো অংশীবাদী (মুশরেক) কুরাইশ-এর কোনো সম্পদ ও জীবনের পক্ষে সাহায্য করতে পারবে না এবং কোনো মুমিনের বিপক্ষে তার অবস্থান গ্রহণ করতে পারবে না।

ধারা-২৫: যদি কেউ গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া কোনো মুমিনকে হত্যা করেছে বলে প্রমাণিত হয় তাহলে তাকে শাস্তিস্বরূপ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। তবে যদি নিহতের অভিভাবক রক্তপণের বিনিময় গ্রহণে সম্মত হয় তাহলে সে তা পারবে। সকল মুমিনকে এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং ইহা কার্যকর করা ছাড়া তাদের জন্য অন্য কিছু বৈধ হবে না।

ধারা-২৬ : এবং কোনো মুমিন, যে এই চুক্তিপত্রে বিদ্যমান বিষয় স্বীকার করে নিয়েছে এবং আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান এনেছে, তার জন্য কোনো চুক্তিভঙ্গকারীকে সাহায্য করা বা আশ্রয় দেওয়া বৈধ নয়। যে এমন কাউকে সাহায্য করবে অথবা আশ্রয় দেবে তার ওপর রোজ কেয়ামতে আল্লাহর লা'নত ও ক্রোধ নিপতিত হবে। সেদিন তার কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা গ্রহণ করা হবে না।

ধারা-২৭: কোনো বিষয়ে তোমরা যখনই কোনো মতানৈক্যে উপনীত হবে তখন তা আল্লাহ ও-মুহাম্মদ (স.)-এর সমীপে সপর্দ করতে হবে।

ধারা-২৮ যুদ্ধ অবস্থায় ইহুদিরাও মুমিনদের সাথে ব্যয়ভার বহন করবে।

ধারা-২৯: বনূ 'আওফ-এর ইহুদিগণ মুমিনদের সাথে একই জাতি হিসেবে গণ্য হবে: ইহুদিদের জন্য তাদের ধর্ম আর মুসলমানদের জন্য তাদের ধর্ম। তারা এবং তাদের মিত্রগণ অভিন্ন অবস্থানে থাকবে। তবে যে জুলুম করবে এবং অপরাধে লিপ্ত হবে সে কেবল তাকে ও তার পরিজনদেরই ধ্বংস করবে।

ধারা-৩০: এবং বনি নাজ্জার-এর ইহুদিগণ বনি 'আওফের অনুরূপ অধিকার পাবে।

ধারা-৩১: এবং বনি হারেস-এর ইহুদিগণ বনি 'আওফ-এর ইহুদিদের অনুরূপ অধিকার পাবে।

ধারা-৩২: এবং বনি সা'য়েদাহ-এর ইহুদিগণ বনি 'আওফ-এর অনুরূপ অধিকার পাবে।

ধারা-৩৩: এবং বনি জুশাম-এর ইহুদিগণ বনি আওফ-এর অনুরূপ অধিকার পাবে।

ধারা-৩৪ : বনি আওসের ইহুদিগণ, বনি আওফ-এর অনুরূপ অধিকার পাবে।

ধারা-৩৫: বনি ছা'লাবাহ-এর ইহুদিগণ বনি 'আওফ-এর ইহুদিদের অনুরূপ অধিকার পাবে। তবে যে ব্যক্তি কোনো জুলুম ও অপরাধ করবে, সে বস্তুত নিজের ও নিজ পরিজনকেই ধ্বংস করবে।

ধারা-৩৬ এবং ছা'লাবাহ্ গোত্রের উপগোত্র জুফনা ছা'লাবাহ-এর মতই গণ্য হবে।

ধারা-৩৭: বনি শুতাইবাহ্-এর জন্য 'আওফ-এর অনুরূপ অধিকার থাকবে। অবশ্যই অঙ্গিকার পূর্ণ করতে হবে, তা ভঙ্গ করা যাবে না।

ধারা-৩৮: এবং ছা'লাবাহ্ গোত্রের মিত্ররা তাদেরই মতো।

ধারা-৩৯: নিশ্চয়ই ইহুদিদের অন্তরঙ্গ মিত্ররা তাদেরই মতো গণ্য হবে।

ধারা-৪০: এই চুক্তিবদ্ধ পক্ষগুলোর কেউ মুহাম্মদ (স.)-এর অনুমোদন ব্যতিরেকে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বের হতে পারবে না।

ধারা-৪১: আহত ব্যক্তিকে প্রতিশোধ গ্রহণে বাধা দেওয়া যাবে না।

ধারা-৪২: এবং যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ সংঘটন করবে সে তার জন্য দায়ী হবে এবং তার পরিজনও দায়ভার নেবে। তবে যদি সে মাজলুম হয় তাহলে সে নিজের প্রতিরক্ষা করতে পারবে। যে ব্যক্তি এই চুক্তির প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে আল্লাহ তার সাহায্য করবেন।

ধারা-৪৩: ইহুদিদের ব্যয়ভার তারা বহন করবে এবং মুসলিমগণ তাদের ব্যয়ভার বহন করবে।

ধারা-৪৪: এই চুক্তিপত্রের পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে কেউ লড়াই করলে পক্ষগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে তা প্রতিহত করবে।

ধারা-৪৫: এবং পক্ষগুলো নিজের মধ্যে পরামর্শ ও কল্যাণকামিতা বজায় রাখবে। প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে, তা ভক্তা করবে না।

ধারা-৪৬: এবং অবশ্যই কোনো ব্যক্তি তার মিত্রের সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে না এবং মজলুমকে সবাই সাহায্য করবে।

ধারা-৪৭ যুদ্ধ অবস্থায় ইহুদিরাও মুমিনদের সাথে ব্যয়ভার বহন করবেন।

ধারা-৪৮: এই চুক্তির পক্ষগুলোর জন্য ইয়াসরেব একটি সংরক্ষিত ও পবিত্র নগরী হিসেবে বিবেচিত হবে।

ধারা-৪৯: প্রতিবেশীকে নিজের মতোই গণ্য করতে হবে। তার কোনো ক্ষতি বা তার প্রতি কোনো অপরাধ সংঘটন করা যাবে না।

ধারা-৫০: কোনো নারীকে তার পরিবারের অনুমতি ছাড়া আশ্রয় দেওয়া যাবে না।

ধারা-৫১: এই চুক্তিপত্রের পক্ষগুলোর মধ্যে যদি এমন কোনো পরিস্থিতি বা মতানৈক্যের উদ্ভব হয় যাতে এই চুক্তি নস্যাৎ হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, সে ক্ষেত্রে ফয়সালার জন্য আল্লাহ ও মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (স.)-এর দিকে বুজু করতে হবে। এই চুক্তিপত্রের উত্তম হেফাজতকারী ও প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারীদের ওপর আল্লাহ (সাক্ষী) আছেন।

ধারা-৫২: এবং কুরাইশ ও তাদের সাহায্যকারীদের কোনো আশ্রয় দেওয়া যাবে না।

ধারা-৫৩: ইয়াসরেবকে কেউ আক্রমণ করলে চুক্তির সকল পক্ষ পারস্পরিক সাহায্যের মাধ্যমে তা প্রতিহত করবে।

ধারা-৫৪: যখন তাদেরকে (ইহুদিদেরকে) কোনো সন্ধি করতে এবং সংশ্লিষ্ট হতে আহ্বান করা হবে তারা সেই সন্ধি করবে এবং দায়ভার গ্রহণ করবে। যদি তারা কোনো অনুরূপ সন্ধির পক্ষে যায় তখন মুমিনদের ওপরও তাদের দাবি আছে। তবে যদি ইহুদিরা ধর্মকে আঘাতকারী কারও সাথে সন্ধি করতে চায় তা মুমিনগণ মেনে নেবে না।

ধারা-৫৫: প্রত্যেকের ওপর (প্রতিরক্ষার) সে অংশ বর্তাবে যা তার সম্মুখ দিক থেকে আসবে।

ধারা-৫৬: 'আওস গোত্রীয় ইহুদি- তাদের মিত্রগণ এবং তাদের নিজেদেরকে এই চুক্তিপত্রের পক্ষগুলোর অনুরূপ গণ্য করা হবে। এই চুক্তিপত্রের পক্ষগুলো থেকে তারা বিশ্বস্ত ও কল্যাণকামী আচরণ পাবে।

ইবন ইসহাক থেকে ইবন হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী এখানেই মদিনা সনদ সমাপ্ত হয়েছে। তবে তিনি ইবন ইসহাকের আরেকটি বর্ণনা যুক্ত করেছেন, যা নিম্নরূপ:

ধারা-৫৭: নিশ্চয়ই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে, ভঙ্গ করা যাবে না। কেউ কোনো বিরূপ কর্মতৎপরতায় জড়িত হলে তা তার ওপরই বর্তাবে।

ধারা-৫৮: এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ এই চুক্তিপত্রের বিষয়াদির সত্যনিষ্ঠ বাস্তবায়ন ও প্রতিশ্রুতির প্রতিপালনকারীদের সাথে আছেন।

ধারা-৫৯ : এবং এই লিখিত সনদ কোনো জালেম বা অপরাধীকে রক্ষা করবে না।

ধারা-৬০: এবং মদিনা থেকে যে বাইরে যাবে সে নিরাপদ এবং যে এর অভ্যন্তরে অবস্থান করবে সেও নিরাপদ। তবে যে জুলুম করবে এবং অপরাধ করবে সে নয়।

ধারা-৬১: নিশ্চয় আল্লাহ ও মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (স. সে ব্যক্তির সাহায্যকারী যে সত্যনিষ্ঠ ও সংযত।

সনদের শর্তাবলি: মদিনা সনদের প্রধান শর্তাবলি নিম্নে আলোচনা করা হলো:

১. সুবিচার: মদিনা সনদে স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তা ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবেই গণ্য করা হবে। এর জন্য অপরাধী সম্প্রদায়কে দোষী করা চলবে না।

২. যৌথ দায়িত্ব: বহিঃশত্রুর আক্রমণে মদিনা সনদে স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়সমূহ সম্প্রদায়সমূহ যৌথভাবে আত্মরক্ষা করবে এবং স্ব-স্ব যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করবে।

৩. পরস্পরের সমঝোতা স্বাক্ষরকারী কোনো সম্প্রদায়কে বহিঃশত্রু আক্রমণ করলে সকল সম্প্রদায়ের লোকেরা সমবেত প্রচেষ্টায় বহিঃশত্রুর আক্রমণকে প্রতিহত করবে।

৪. নিরপেক্ষতা: কেউ কুরাইশদের সাথে কোনো প্রকার সন্ধি যাপন করতে পারবে না কিংবা মদিনাবাসীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে কুরাইশদের সাহায্য করতে পারবে না।'

৫. ধর্মীয় স্বাধীনতা: পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় থাকবে। মুসলমান-অমুসলমান সম্প্রদায় বিনা দ্বিধায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে; কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

৬. মুহম্মদ (স.)-এর কৃতিত্ব হযরত মুহম্মদ (স.) নবগঠিত প্রজাতন্ত্রের সভাপতি এবং পদাধিকার বলে তিনি মদিনার সর্বোচ্চ বিচারালয়ে সর্বময় কর্তা হবেন।

৭. ইসলামি কমনওয়েলথ মদিনা সনদে স্বাক্ষরকারী ইহুদি, খ্রিষ্টান, পৌত্তলিক ও মুসলমান সম্প্রদায়সমূহ সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে এবং তারা একটি সাধারণ জাতি কমনওয়েলথ গঠন করবে।

৮. মুহম্মদ (স.)-এর প্রভাব: মহানবি (স.)-এর পূর্ব অনুমতি ব্যতীত মদিনাবাসীরা কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে না।

৯. সুদৃঢ় আইন: অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করতে হবে এবং অপরাধকে ঘৃণার চোখে দেখতে হবে।

১০. ইহুদিদের প্রতি সুবিচার: ইহ্রদিদের মিত্ররাও সমান নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা ভোগ করবে।

১১. পরোপকার: দুর্বল ও অসহায়কে সর্বতোভাবে সাহায্য ও রক্ষা করতে হবে।

১২. মদিনার পবিত্রতা: মদিনার পবিত্রতা ঘোষণা করা হলো। রক্তপাত, হত্যা, বলাৎকার ও অপরাপর অপরাধমূলক কার্যকলাপ একেবারেই নিষিদ্ধ করা হয়।

১৩. সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থা: স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে রাসূল (স.) আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তার মীমাংসা করবেন।

১৪. শর্ত ভঙ্গের পরিণতি: সর্বশেষ এই বলে শেষ করা হয় যে, সনদের শর্ত ভড়াকারীর উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হবে।

সনদের প্রয়োজনীয়তা: 'মদিনার সনদ' প্রণয়নে মহানবি (স.) রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। ধর্মীয় ও

সামাজিক জীবনে এর প্রভাবও কম নয়। এর প্রয়োজনীয়তা ছিল বিবিধ।

১। স্বদেশত্যাগী মোহাজেরিনদের মদিনায় বাসস্থান ও জীবিকা উপার্জনের ব্যবস্থা করা।

২। শতধা বিভক্ত মদিনাবাসীদের গৃহযুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা।

৩। মদিনায় ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

৪। সকল মুসলমান ও ইহুদিদের সমান অধিকার ও কর্তব্য নির্ধারণ করা।

মদিনা সনদের গুরুত্ব (Importance of Charter of Madina)

মদিনা সনদ উদারতাভিত্তিক একটি বৃহত্তর জাতি গঠনের পথ উন্মুক্ত করে। এ সনদের দ্বারা আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করা হয়। রাষ্ট্র ও ধর্মের সহাবস্থানের ফলে ঐশীতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। নিচে মদিনা সনদের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো:

১. প্রথম লিখিত সংবিধান। মদিনা সনদ বিশ্বের ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান। হিটি বলেন, "এটিই ছিল পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান।" ইতঃপূর্বে কোনো রাজ্যে কোনো শাসকই এরূপ সংবিধান প্রণয়ন করে যান নি। এ সনদে সরকারের প্রকৃতি ও নাগরিকদের অধিকার ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এজন্য এ সনদকে "Magnacarta" বলা হয়ে থাকে।

২. রাজনৈতিক দূরদর্শিতা মদিনা সনদ হযরত মুহম্মদ (স.)-এর রাজনৈতিগক দূরদর্শিতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে। এ সনদে মহানুভব হযরত মুহম্মদ (স.)-এর মহান মানবতার বিকাশ সাধিত হয়। তাই তিনি শুধু সেই যুগের নন সর্বযুগেরই আদর্শ মহাপুরুষ।

৩. রাজনৈতিক ঐক্য: এ সনদ মুসলমান ও অমুসলমান সম্প্রদায়কে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে হিংসা, বিদ্বেষ ও কলহের অবসান ঘটায়। তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল ঐকমত্যের এবং বিপদে তারা একে অপরকে সাহায্য করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল।

৪. ধর্মীয় সম্প্রীতি: এ সনদের মাধ্যমে মহানবি (স.) ধর্মের ব্যাপারে যে নীতির পরিচয় দেন তা তৎকালীন বিশ্বের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। মদিনা সনদ মুসলমান ও অমুসলমানদের ধর্মে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিশ্চয়তা প্রদান করে। মদিনার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা একে অপরের ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, হযরত মুহাম্মদ (স.) এ শর্ত দ্বারা যে .... মহানুভবতা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার পরিচয় দেন তা বিশ্বের ইতিহাসে সত্যিই বিরল। এস এ কিউ হুসাইনী বলেন, "ইসলামি বিপ্লব গোত্রভিত্তিক আরববাসীদের নতুন সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত করে। অনিশ্চিত জীবিকা সংবলিত আরব যাযাবরগণ আল্লাহর পথে নিয়মিত সৈনিকরূপে আত্মপ্রকাশ করে। বার্নাড লুইসের মতে, "এ দ্বৈত মানবতা (ধর্ম ও 'রাজনীতি) ইসলামি সমাজে মজ্জাগত ছিল এবং মুহাম্মদ (স.)-এর উম্মা বা প্রজাতন্ত্র ছিল এর ভিত্তি। সময় ও কাল বিচারে ইহা ছিল অবশ্যসম্ভাবী। প্রাচীন আরব সম্প্রদায়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থার মাধ্যম ছাড়া ধর্ম প্রকাশিত ও সংগঠিত হওয়ার অন্য কোনো উপায় ছিল না। অপরদিকে রাজনৈতিক ক্ষমতার ধারণা হতে বঞ্চিত আরবদের কেবলমাত্র ধর্মেই রাষ্ট্রের মূলভিত্তি হতে পারে।"

৫. সর্বজনীন ধর্ম: মদিনা সনদ গোত্র প্রথার বিলোপ সাধন করে। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্রে স্বীকৃতি লাভ করে। পি.কে. হিটি বলেন, "মদিনা প্রজাতন্ত্রই পরবর্তীকালে বৃহৎ ইসলামি সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূল স্থাপন করে।"

৬. ইসলামি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন: মদিনা সনদের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম একটি ইসলামি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন ঘটে এবং এ সনদে সর্বপ্রথম ইসলামি গণতন্ত্রের বীজ বপন করা হয়।

৭. জাতি গঠন: মদিনা সনদের মাধ্যমে মহানবি (স.) ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে এক জাতি হিসেবে মদিনাবাসীকে ঘোষণা করেন। এ সনদে ঘোষণা করা হয় গোত্রের ইহুদিরাও বিশ্বাসী একটি জাতির অন্তর্ভুক্ত।

৮. ইসলাম ধর্মের প্রচার: মদিনা সনদের মাধ্যমে মহানবি (স.) বিনা বাধায় ইসলাম ধর্ম প্রচারের সুযোগ লাভ করেন। তিনি মদিনার ভিতরে ও বাইরে ইসলামের বাণী প্রচার করতে সমর্থ হন।

১. মহানবি (স.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব এ সনদের দ্বারা মহানবি (স.) শুধু বিবাদমান আউস ও খাযরাজ গোত্রের কলহই নিরসন করেননি, অন্য গোত্রের বিবাদও তিনি মীমাংসা করেন। এতে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়।

মদিনা সনদ মহানবি (স.)-এর জীবন তথা ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এ সনদের মাধ্যমে মদিনায় একটি সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা হযরত মুহম্মদ (স.)-কে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। এ সনদ সৃষ্টির পরই তার প্রবল আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের বিকাশ পূর্ণ হতে পূর্ণতায় মহিমান্বিত রূপে প্রকাশ পেতে থাকে। এজন্য উইলিয়াম মুর বলেন, "।
reveals the man (the Prophet) his real greatness-a mastermind, not only of his age, but of all ages."

হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.) - অন্যান্য প্রশ্ন

হযরত মুহম্মদ (স.)-এর বংশ পরিচয়- Parentage of Hazrat Muhammad (SM.)হযরত মুহম্মদ (স.)-এর বাল্যকাল ও মক্কা জীবনহযরত মুহম্মদ (স.) ও বিবি খাদিজা (রা.)মহানবি (স.)-এর হিজরত (৬২২ খ্রি.)মদিনা সনদ Charter of Madinaপ্রাথমিক যুদ্ধসমূহ: বদর, উহুদ ও খন্দকমদিনায় ইহুদিদের সঙ্গে মুহম্মদ (স.)-এর সম্পর্কহুদায়বিয়ার সন্ধি (৬২৮ খ্রি.) ও এর ফলাফল মক্কা বিজয় (জানুয়ারি, ৬৩০ খ্রি.) ও শান্তিনীতিবিদায় হজ ও বিদায় হজের ভাষণমহানবি হযরত মুহম্মদ (স.)-এর সংস্কারসমূহ মহানবি (স.)-এর চারিত্রিক গুণাবলি ও কৃতিত্ব মহানবি (স.) কত খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় হিজরত করেন?বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের সেনাপতি কে ছিলেন?কত খ্রিষ্টাব্দে মহানবি (স.) মক্কা বিজয় করেন?মহানবি (স.) কোন বংশে জন্মগ্রহণ করেন?হিজরত শব্দের অর্থ কী?কত খ্রিষ্টাব্দে হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়?হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর মাতার নাম কী?মহানবি (স.) কত খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন?হিজরতের সময় মহানবি (স.)-এর সঙ্গী কে ছিলেন?মদিনার পূর্বনাম কী ছিল?উহুদের যুদ্ধে কুরাইশ নেতা কে ছিলেন?'কুরাইশ' শব্দের অর্থ কী?'মুহাম্মদ' শব্দের অর্থ কী?পবিত্র কাবাগৃহে রক্ষিত পাথরটির নাম কী?'হিলফুল ফুজুল' কে গঠন করেন?আল-আমিন শব্দের অর্থ কী?কত খ্রিষ্টাব্দে মহানবি (স.) নবুয়ত লাভ করেছিলেন?'আনসার' শব্দের অর্থ কী?মদিনায় হিজরতকারীরা কী নামে পরিচিত?কোন ঘটনাকে মহানবি (স.)-এর জীবনের মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা বলা হয়?বিশ্বের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান কোনটি?মদিনা সনদের কতটি ধারা ছিল?পবিত্র কুরআনে খন্দকের যুদ্ধকে কী নামে উল্লেখ করা হয়েছে?মুহাম্মদ (স.) কার পরামর্শে মদিনার চারপাশে পরিখা খনন করেছিলেন?'ফাতহুম মুবিন' অর্থ কী?কোন অভিযানকে 'গাজওয়াতুল ওসরাৎ' বলে?মেরাজ বলতে কী বোঝায়?হুদায়বিয়ার সন্ধিকে 'প্রকাশ্য বিজয়' বলা হয় কেন? ব্যাখ্যা কর।নাখলার খণ্ডযুদ্ধকে বদরের যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ বলা হয় কেন? ব্যাখ্যা কর।'বায়তুল মাল' কী? ব্যাখ্যা কর।হযরত মুহাম্মদ (স.) কে আল-আমিন বলা হতো কেন? ব্যাখ্যা কর।হিলফুল ফুজুল বলতে কী বোঝায়?হিজরত ও স্বদেশত্যাগের মধ্যে পার্থক্য কী?কাদেরকে আনসার ও মুহাজির বলা হয়?'ফাতহুম মুবিন' কী? ব্যাখ্যা কর।আকাবার শপথ বলতে কী বোঝায়? ব্যাখ্যা কর।

সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ