• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.)
হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.)

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

হযরত মুহম্মদ (স.) ও বিবি খাদিজা (রা.)

বিবি খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসায় মুহম্মদ (স.) হযরত মুহম্মদ (স.)-এর সরলতা, অনুপম পবিত্রতা, সত্যনিষ্ঠার খ্যাতি আরবের সর্বদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। আল-আমিন মুহম্মদ (স.)-এর সাধুতা ও বাণিজ্যিক দক্ষতা সর্বত্র সুবিদিত ছিল। এ সময় মক্কায় বিবি খাদিজা নামে একজন ধনাঢ্য বিধবা মহিলা বাস করতেন। অত্যুৎকৃষ্ট ও নিষ্কলুষ চরিত্রের জন্য তাঁকে 'খাদিজাতুত তাহিরা' বলা হয়। হযরত (স.)-এর কর্মদক্ষতা ও বিশ্বস্ততার খবর তাঁর কানে পৌঁছলে তিনি মুহম্মদ (স.)-কে তাঁর ব্যবসার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন। অল্পদিনের মধ্যে হযরত মুহম্মদ (স.)-এর তত্ত্বাবধানে খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসায় চরম উন্নতি লাভ হয়। অপরদিকে, হযরত (স.)-এর চারিত্রিক মাধুর্যে খাদিজা তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন।

খাদিজা (রা.)-কে বিবাহ: ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে খাদিজা (রা.) হযরত মুহম্মদ (স.)-কে বিবাহের প্রস্তাব করলে হযরত মুহম্মদ (স.) চাচা আবু তালেবের পরামর্শক্রমে মাত্র ২৫ বছর বয়সে ৪০ বছর বয়স্কা বিবি খাদিজা (রা.)-কে বিবাহ করেন। বয়সের তারতম্য সত্ত্বেও তাদের দাম্পত্য জীবন খুবই শান্তিপূর্ণ ও প্রীতিমধুর ছিল। বলাবাহুল্য, হযরত বিবি খাদিজা (রা.)-এর নিকট উৎসাহ ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা লাভে হযরত মুহম্মদ (স.) স্থিতিশীল জীবনের পরশ লাভ করেন। খাদিজা (রা.) সম্বন্ধে হযরত মুহম্মদ (স.) বলেন, "যখন কেউ তাঁকে বিশ্বাস করেনি খাদিজাই সর্বপ্রথম তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেন।" এ মহীয়সী নারীর গর্ভে হযরত মুহম্মদ (স.)-এর তিন পুত্র ও চার কন্যা জন্মে। শৈশবেই তিন পুত্র কাশেম, তৈয়ব ও তাহের এদের মৃত্যু হয়। চার কন্যা কুলসুম, যয়নব, রোকেয়া ও ফাতেমা জীবিত অবস্থায় পিতার মহৎ কার্যাবলি অবলোকন করেন। ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দে হযরতের পঞ্চাশ বছর বয়সের সময় ৬৫ বছর বয়সে বিবি খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন।

হযরত মুহাম্মদ (স.) ও খাদিজা (রা.)-এর মধ্যে বংশীয় সম্পর্ক

হাজারে আসওয়াদ বা কলো পাথর স্থাপন: ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে মকার পবিত্র কাবা শরিফ সংস্কার করার পর কাবা ঘরের আঙ্গিনায় অবস্থিত মর্যাদাপূর্ণ হাজারে আসওয়াদ বা কালো পাথরটি পুনঃস্থাপন করার অভিপ্রায়ে কুরাইশ বংশের বিভিন্ন শাখার মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি হয়। তখন হযরত মুহম্মদ (স.)-এর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের ফলে একটি অহেতুক রক্তপাত বন্ধ হয়। বিভিন্ন গোত্র হতে চারজন অধিপতি নির্বাচিত করে হযরত (স.) নিজের গায়ের চাদরের উপর উক্ত পাথরটি (হাজারে আসওয়াদ) রেখে চার প্রান্তে গোত্র অধিপতিকে ধরিয়ে পাথরটি কাবাঘরের যথাস্থানে হাপন করলেন। এভাবে উপস্থিত বুদ্ধি ও অসাধারণ বিচক্ষণতার দ্বারা হযরত (স.) একটি ভয়াবহ রক্তপাত বন্ধ করতে সক্ষম হন।

হযরত মুহম্মদ (স.)-এর নবুয়ত প্রাপ্তি আরবদেশের পাপ-পঙ্কিল সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ দিকভ্রষ্ট। কুসংস্কার ও পৌত্তলিকতাপূর্ণ এ সমাজ ব্যবস্থা দেখে হযরত মুহম্মদ (স.)-এর মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে এবং তিনি মানব জাতির মুক্তির জন্য চিন্তা করতে থাকেন। হযরত মুহম্মদ (স.)-এর বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। ফলে ৩৫ বছর বয়সেই তাঁর জীবনে এক ভাবান্তর ও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রতিবছর একমাস তিনি মক্কার অদূরে হেরা গুহায় এক গভীর ধ্যানে ও উপাসনায় মগ্ন থাকতেন।

ওহি লাভ: ধ্যানরত অবস্থায় ৪০ বছর বয়ঃক্রমকালে ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে রমজান মাসে ঐশী বাণী লাভ করেন। দ্ব্যর্থ কণ্ঠে স্বর্গীয় দূত জিব্রাইল (আ.) হযরত মুহম্মদ (স.)-এর সম্মুখে আবির্ভূত হয়ে তাঁকে বললেন, "ইকরা বি-ইসমি রাব্বিকাল্লাযী খালাক" অর্থাৎ পড়ুন আপনার সৃষ্টিকর্তার নামে। পবিত্র রমজানের ২৭ তারিখে গায়েবি এ আওয়াজে হযরত মুহম্মদ (স.) বিহ্বল হয়ে পড়েন যে, প্রথম দুবার চেষ্টা করেও তিনি ওহি উচ্চারণ করতে পারেন নি। তৃতীয়বার তিনি শবে-কদর রাতে ঐশী বাণী পাঠ করে দিব্যজ্ঞান লাভ করেন এবং বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবির মর্যাদা লাভ করেন।

বিবি খাদিজার ইসলাম গ্রহণ: ওহি লাভের পর হযরত মুহম্মদ (স.) ভীত, কম্পিত অবস্থায় হেরা পর্বত হতে স্বীয় গৃহে বিবি খাদিজা (রা.)-এর নিকট গমন করে এ অলৌকিক ঘটনা আদ্যপান্ত বর্ণনা করেন। বিবি খাদিজা (রা.) তাঁকে অভয় ও উৎসাহ দান করেন এবং বলেন যে, তিনি আল্লাহর পয়গম্বররূপে প্রেরিত হয়েছেন। বিবি খাদিজা (রা.) সর্বপ্রথম ওহির উপর আস্থা রেখে ইসলাম কবুল করেন। খাদিজা (রা.) হযরত মুহম্মদ (স.)-কে তাঁর অন্ধ বৃদ্ধ চাচাতো ভাই ওয়ারাকা-বিন-নওফেলের নিকট নিয়ে গেলেন। ঘটনার সমস্ত কাহিনি শোনার পর তিনি মন্তব্য করলেন যে, অনুরূপ ঐশী বাণী মুসা ও ঈসার নিকটও এসেছিল। সুতরাং মুহম্মদ (স.) অচিরেই নবি হবেন।

হযরত মুহম্মদ (স.) আল্লাহর নিকট হতে যে ওহি লাভ করেন তা হলো ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য আদিষ্ট হলেন। আল-কুরআনের বাণীতে উল্লেখ আছে যে, "আল্লাহর মনোনীত ধর্মই ইসলাম" আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং মুহম্মদ (স.) তাঁর প্রেরিত পুরুষ। "আল্লাহ ইসলামকে পূর্ণাঙ্গতা দান করেছেন এবং এর জন্য মুহম্মদ (স.)-কে গ্রহণ করেছেন। হযরত মুহম্মদ (স.) এক ঐশী বাণীতে ধর্ম প্রচারের জন্য আত্মনিবেশের প্রেরণা লাভকরেন যে, আমার রাসূল, তোমাকে প্রভু যে সত্য দান করেছেন তা প্রচার কর।

মহানবি (স.)-এর জীবনে পবিত্র আল-কুরআন নাজিল হয়েছিল। এ সম্পর্কে ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি বলেন, "কোনো লিখিত গ্রন্থই কুরআনের মতো এত ব্যাপকভাবে পঠিত হয়নি।"

নিজ গোত্রের মধ্যে ইসলাম প্রচার: নিজ আত্মীয়স্বজনের মধ্যে ইসলাম প্রচারের পর হযরত মুহম্মদ (স.) বিপথগামী মক্কাবাসীকে পৌত্তলিকতা পরিহার করে সত্য ধর্ম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানান। নিজ স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের পর হযরত আলী (রা.), যায়েদ, হযরত আবু বকর (রা.) সহ বিশজন লোক ইসলাম ধর্মে দীক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে হযরত ওসমান (রা.), সাদ-বিন-আবি ওয়াক্কাস, তালহা, বেলাল, আব্দুর রহমান বিন-আউফসহ বেশ কিছু ধনী ও যোদ্ধা ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার: ৬১৩ খ্রিষ্টাব্দে হযরত মুহম্মদ (স.) একটি ওহি লাভ করে প্রকাশ্যে ধর্ম প্রচারের জন্য আদিষ্ট হয়ে সাফা পর্বতের পাদদেশে একটি সম্মেলন আহ্বান করেন। হযরত (স.) ঘোষণা করেন, "লা ইলাহা-ইল্লাল্লাহ" অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া উপাস্য নেই। পুরাতন কুসংস্কার ও অন্ধ-বিশ্বাস পরিত্যাগ করে সত্য, প্রেম ও পবিত্রতার ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার জন্য সকলকে আহ্বান জানান। এ ঘোষণায় কুরাইশগণ ভীত ও শঙ্কিত হয়ে হযরত (স.)-এর প্রতি মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার করে তাঁর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলেন। অপরদিকে মক্কার কর্তৃত্ব কুরাইশদের হাতছাড়া হলে অর্থনৈতিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং রাজনৈতিক ভাবে হেয় হয়ে পড়ার আশঙ্কায় কুরাইশগণ মুহম্মদ এর বিরোধিতা করেন।

হযরত মুহম্মদ (স.)-এর উপর অত্যাচার: আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মুল জামিল ও আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা তাঁর চলার পথে কাঁটা দিত এবং মাথার উপর আবর্জনা নিক্ষেপ করত। আবু জেহেল তাঁর মাথায় প্রস্তর দ্বারা আঘাত করলে বীর কেশরী চাচা হামজা হৃদয়হীন আবু জেহেলকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করেন এবং প্রকাশ্যভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

মক্কার পৌত্তলিকগণ যখন দেখলেন যে, তাদের পুরাতন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে মুহম্মদ (স.) আঘাত হেনে নতুন মত প্রচার করে তাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার জন্য বদ্ধপরিকর তখন তারা তাঁকে টাকা-পয়সা, নেতৃত্ব এবং সুন্দরী নারীর লোভ দেখান। এ প্রসঙ্গে হযরত মুহম্মদ (স.) মন্তব্য করেন যে, "তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্র এনে দেন তথাপিও আমি সত্য প্রচার হতে বিরত থাকব না।" তখন কুরাইশরা নানা ধরনের কুৎসা রচনা, উৎপীড়ন, নির্যাতন করে ইসলাম প্রচারের পথে বাধা সৃষ্টি করতে লাগল। হারেজ-বিন-আবিহালা, ইয়াসার ও তার স্ত্রী সামিরার এবং বিলালসহ বহু নবদীক্ষিত মুসলমান তাদের দ্বারা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হন। নব-দীক্ষিত অনেককেই অন্ধ করে অথবা পুড়িয়ে মারা হয়। মুহম্মদ (স.)-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র প্রকাশিত হলে আবু তালেব, হাশিম ও মোত্তালিব গোত্রের সকলে মিলে তাঁকে সকল বিপদ হতে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।

আবিসিনিয়াতে হিজরত: অত্যাচার ও উৎপীড়নের এ অগ্নিপরীক্ষায় হযরত মুহম্মদ (স.) যে ধৈর্য ও সাহসিকতা প্রদর্শন করেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সত্যের পথে তিনি দৃঢ় অবিচল থেকে ইসলামের বাণী প্রচার করতে লাগলেন। কুরাইশ বংশের লোক হওয়াতে মহানবি (স.) অত্যাচার হতে নিরাপদ থাকলেও অন্যান্য মুসলিমদের উপর অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থা দেখে মুহম্মদ (স.)-এর কোমল মন ব্যথিত হয়ে ওঠে এবং ৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ১০টি পরিবার পরে আরও ত্রিশটি পরিবারকে আবিসিনিয়ার রাজা নাজ্জাসির নিকট প্রেরণ করেন। প্রথম দলের নেতৃত্ব দেন হযরত আলী (রা.)-এর ভ্রাতা জাফর এবং দ্বিতীয় দলের নেতৃত্ব দেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা (পরবর্তীতে) হযরত ওসমান (রা.)।

প্রবাসী মুসলমানদের রাজা নাজ্জাসি আশ্রয় প্রদান করলেও কুরাইশগণ আবিসিনিয়াতে লোক পাঠিয়ে রাজাকে ভুল বুঝাবার চেষ্টা করেন। নাজ্জাসি ইসলামের মহান বাণীতে মুগ্ধ হয়ে অত্যাচারী ও বিধর্মী কুরাইশদের হাতে আমন্ত্রিত মুসলমানদের অর্পণ না করলে কুরাইশগণ বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসেন এবং অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি করেন। ফিরে আসার দুমাস পর হযরত ওসমান (রা.) এবং তাঁর স্ত্রী রোকেয়া বহুসংখ্যক মুসলমানকে নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আবিসিনিয়াতে হিজরত করেন। ৬১৬ খ্রিষ্টাব্দে ১৮ জন মহিলাসহ প্রায় ১০০ জন মুসলমান সেখানে গমন করেন। সেখানে তারা কয়েক বছর অবস্থান করেন। ঐতিহাসিক ওয়াট সাহেব বলেন, "এ ঘটনার (আবিসিনিয়ায় গমন) মূলে ছিল প্রাথমিক যুগে মুসলমানদের অন্তর্নিহিত দলীয় বিসংবাদ।” ঐতিহাসিক মুইর বলেন, "তাঁরা অর্থাৎ নব-দীক্ষিত মুসলমানগণ যে সকল কার্য সম্পাদন করেছেন, ইসলামের ইতিহাসে তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।"

ওমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ: কুরাইশ বংশের বিরোধিতা সত্ত্বেও নবুয়তের যষ্ঠ বর্ষে হযরত ওমর (রা.) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এর ফলে ইসলামের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। কুদ্ধ ও জিঘাংসাপরায়ণ বিধর্মীরা অতঃপর ৬১৬ খ্রিষ্টাব্দে হাসিম ও মুত্তালিব গোত্রদ্বয়কে একঘরে করে সমাজচ্যুত করল। ব্যবসায়-বাণিজ্য, বৈবাহিক সম্পর্ক ও খাদ্যদ্রব্য হতে বঞ্চিত হয়ে মুহম্মদ (স.) পরিবারবর্গসহ অনুগামীদের নিয়ে মক্কার একপ্রান্তে নির্বাসিত জীবন যাপন করতে লাগলেন। বিধর্মীদের এ ঘৃণ্য বর্জন-নীতির ফলে ৬১৬ হতে ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অসহনীয় ধৈর্য স্বীকার করে হযরত মুহম্মদ (স.) 'আবু তালেবের উপত্যকা' থেকে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট মক্কাবাসীর ব্যক্তিগত সহযোগিতায় পুনরায় ফিরে আসেন। অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হয়েও মুহম্মদ (স.) আল্লাহর একত্ব ও মহত্ত্ব প্রচারে কুণ্ঠিত হননি।

বিবি খাদিজা (রা.) ও আবু তালিবের মৃত্যু নবুয়তের দশম বছর হযরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবনসঙ্গিনী বিবি খাদিজা (রা.)-কে এবং এর পাঁচ সপ্তাহ পরে পালক পিতা, আশ্রয়দাতা ও পিতৃব্য আবু তালেবকে চিরকালের জন্য হারালেন। দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর্যন্ত হযরতের জীবনসঙ্গিনী, পরামর্শদাতা হিসেবে খাদিজা (রা.)-এর দান ছিল অপরিসীম। বিপদের রক্ষক আবু তালেব ও খাদিজা (রা.)-কে হারিয়ে মহানবি (স.) কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন কিন্তু তিনি ধৈর্য হারাননি।

হযরত মুহম্মদ (স.)-এর তায়েফে গমন: আবু তালেব ছিলেন হযরত মুহম্মদ (স.)-এর রক্ষক ও অভিভাবক। আবু তালেবের মৃত্যুর পর বিধর্মী আবু লাহাব তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলে কুরাইশরা সুযোগ পেয়ে হযরত মুহম্মদ (স.)-এর উপর নিপীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দিলে তিনি পালিত পুত্র যায়েদকে নিয়ে তায়েফ গমন করেন। মক্কার ৭৫ মাইল দক্ষিণে তায়েফ শহরে হযরত মুহম্মদ (স.) বনু আহলাফ দলের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে সেখানে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। কিন্তু কোনো আশাপ্রদ ফল লাভ হলো না। তায়েফবাসী হযরত মুহম্মদ (স.)-এর উপর জঘন্য অত্যাচার করে শহর থেকে বিতাড়িত করে। তিনি যখন মক্কায় ফিরে আসছিলেন তখন বিপথগামী তায়েফবাসী তাঁদের উপর প্রস্তর নিক্ষেপ করে। অপমান ও লাঞ্ছনা সহ্য করে মুহম্মদ (স.) অবশেষে বনু নওফল গোত্রের আশ্রয়ে বসবাস করতে থাকেন।

হযরত মুহম্মদ (স.)-এর মিরাজে গমন: ৬২০ খ্রিষ্টাব্দে মহানবি (স.) প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোকাভিভূত থাকা অবস্থায় আল্লাহ তাঁকে সান্ত্বনা ও প্রেরণা প্রদানের জন্য মিরাজের মাধ্যমে তাঁর সান্নিধ্য লাভ করান। বিশ্বস্রষ্টা ও প্রতিপালকের দিদার লাভের জন্য তিনি বুরাক নামক বিশেষ আরোহণের সাহায্যে মক্কা হতে প্রথমে জেরুজালেম ও পরে সপ্ত আসমান ভেদ করে রাত্রিকালীন ভ্রমণ করে আল্লাহর প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎ লাভ করেন। মিরাজ শব্দের অর্থ ঊর্ধ্বগমন। ভক্ত মুসলমান মাত্রই এ অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাসী। মহানবি (স.) মিরাজ হতে মুসলমানদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বাধ্যতামূলক (ফরজ) আদায়ের নির্দেশ পান। দ্বিতীয় হিজরিতে রমজানের রোজা রাখার জন্য মুসলমানদের জন্য আল্লাহর নির্দেশ পান। মিরাজ হযরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবন তথা মুসলমানদের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

মদিনায় ইসলাম প্রচার: মহানবি (স.) নবুয়ত প্রাপ্তির পর কুরাইশদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি মক্কার বাইরে আবিসিনিয়া, তায়েফসহ মদিনাতে ইসলামের দাওয়াত পৌছান। মদিনাবাসী কতিপয় লোক মক্কায় এসে হযরত মুহম্মদ-এর নিকট ইসলাম গ্রহণ করেন। মদিনাবাসীর ইসলাম গ্রহণকে আকাবার প্রথম ও দ্বিতীয় শপথ হিসেবে অভিহিত করা হয়। যা নিম্নে আলোচনা করা হলো:

আকাবার শপথ বা বাইয়াতে আকাবা আকাবার শপথ বা বাইয়াতে আকাবা ইসলামের ইতিহাসে তথা ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ঘটনা। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর পারিপার্শ্বিক অবস্থা যখন বিরূপ, অধিকাংশ কুরাইশ' যখন তাঁর ওপর ক্ষুদ্ধ, সহযোগিতার সকল পথ যখন রুদ্ধ, ঠিক তখন বাইয়াতে আকাবার সূত্র ধরে রাসুলুল্লাহ (স.) ইসলাম প্রচারের এক অনুকূল পরিবেশ খুঁজে পেলেন।

আকাবার প্রথম শপথ: নবুয়তের দশম বর্ষে হজ্জের দিনগুলোতে মক্কা থেকে একটু দূরে আকাবা নামক স্থানে (বর্তমানে যেখানে 'মসজিদে আকাবা' অবস্থিত) ছয় জন লোক বসে কথাবার্তা বলছিল। হযরত মুহাম্মদ (স.) তাদের কাছে উপস্থিত হয়ে জানতে পালেন, তারা ইয়াসরিব (মদিনা) বাসী খাযরাজ বংশীয় লোক। হজ্জের মৌসুমে তারা মক্কায় এসে শুনতে পেল, মুহাম্মদ নামে এক কুরাইশ নবুয়তপ্রাপ্ত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) তাদের ইসলামের শিক্ষা ও সত্যতার কথা বুঝিয়ে দিলেন। অবশেষে কুরআনের কতকগুলো আয়াত পাঠ করে তাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন। তখন তারা একে অন্যের দিকে তাকায় আর বলে, দেখ ইহুদিরা যেন আমাদের আগেই ইসলাম গ্রহণের মর্যাদায় অভিষিক্ত না হয়। একথা বলে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। এসব লোক কেবল মুসলমান হয়েই নয়; বরং ইসলামের সেবক ও সত্য দ্বীনের প্রচারক হয়ে নিজেদের দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁদের এক বছরব্যাপী অবিশ্রান্ত চেষ্টার ফলে মদিনা (ইয়াসরিব) ও তার পার্শ্ববর্তী পল্লিসমূহে ইসলামের চর্চা আরম্ভ হয়ে যায়। ইতোমধ্যে কিছু লোককে তাঁরা সত্য দ্বীনে দীক্ষিত করতে সমর্থ হন। 'আসাহহুস সিয়ার' লেখক দানাপুরীর মতে, এটাই আকাবার প্রথম বায়াত বা শপথ।

আকাবার দ্বিতীয় শপথ: নবুয়তের একাদশ বর্ষে হজ্জের সময় মদিনার আওস ও খাযরাজ গোত্রের বারো জন লোক মহানবী (স.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে ইসলামের বায়াত গ্রহণ করেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করার সময় তাঁদের আবেদন অনুযায়ী দ্বীনী আহকাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য মহানবী (স.) আমর ইবনে মাকতুম এবং মুসয়াব (রা.)-কে তাদের সাথে মদিনায় প্রেরণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে একে দ্বিতীয় বায়াতে আকাবা বা আকাবার দ্বিতীয় শপথ বলা হয়।

আকাবার তৃতীয় শপথ: প্রথম ও দ্বিতীয় বায়াতে আকাবায় যেসব মর্দে মুমিন শপথ নিয়ে মদিনায় গিয়ে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন, হযরত মুসয়াব (রা.) তাঁদের ইমামতি করতেন। সে বছর মুসয়াব (রা.)-এর হাতে বহু লোক মুসলমান হন। তাঁদের মধ্যে ওসায়েদ ইবনে হোযায়ের এবং সাদ ইবনে মুয়াযও ছিলেন। এ দুব্যক্তির ইসলাম গ্রহণের কারণে বনী আবদুল আশহালের (আমর ইবনে সাবিত ছাড়া) সকল নরনারী মুসলমান হয়ে গেলেন। এভাবে মদিনায় দ্রুতগতিতে ইসলাম বিস্তৃত হতে থাকে। সে বছর মদিনায় রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুখ্যাতি ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে। নবুয়তের দ্বাদশ বর্যে হজ্জ কাফেলা বর্ধিত হারে মক্কাভিমুখে রওয়ানা করেছিল। এ হজ্জ কাফেলায় আনসার মুসলমান এবং কাফেরদের বিরাট দল অংশগ্রহণ করেন। এবার ৭৩ জন নারী পুরুষ মক্কায় এসে একসাথে মহানবী (স.)-এর হাতে আকাবা নামক স্থানে তৃতীয় বারের মতো ওয়াদাবদ্ধ হয়ে শপথ করল, "আমরা আপনার এবং ইসলামের হেফাযতের জন্য এভাবে জীবন উৎসর্গ করব, যেভাবে নিজের পরিবার-পরিজন এবং ইজ্জতের জন্য করে থাকি।" সে কঠিন শপথের পর মহানবী (স.) ইসলাম প্রচার এবং দ্বীনী তলীমের জন্য তাঁদের মধ্যে বারজন নকীব বা প্রচারক নিযুক্ত করেন। পরবর্তীতে এঁদের নেতৃত্বে মদিনায় ব্যাপক ইসলামের দাওয়াত প্রসার লাভ করতে থাকে।

হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.) - অন্যান্য প্রশ্ন

হযরত মুহম্মদ (স.)-এর বংশ পরিচয়- Parentage of Hazrat Muhammad (SM.)হযরত মুহম্মদ (স.)-এর বাল্যকাল ও মক্কা জীবনহযরত মুহম্মদ (স.) ও বিবি খাদিজা (রা.)মহানবি (স.)-এর হিজরত (৬২২ খ্রি.)মদিনা সনদ Charter of Madinaপ্রাথমিক যুদ্ধসমূহ: বদর, উহুদ ও খন্দকমদিনায় ইহুদিদের সঙ্গে মুহম্মদ (স.)-এর সম্পর্কহুদায়বিয়ার সন্ধি (৬২৮ খ্রি.) ও এর ফলাফল মক্কা বিজয় (জানুয়ারি, ৬৩০ খ্রি.) ও শান্তিনীতিবিদায় হজ ও বিদায় হজের ভাষণমহানবি হযরত মুহম্মদ (স.)-এর সংস্কারসমূহ মহানবি (স.)-এর চারিত্রিক গুণাবলি ও কৃতিত্ব মহানবি (স.) কত খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় হিজরত করেন?বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের সেনাপতি কে ছিলেন?কত খ্রিষ্টাব্দে মহানবি (স.) মক্কা বিজয় করেন?মহানবি (স.) কোন বংশে জন্মগ্রহণ করেন?হিজরত শব্দের অর্থ কী?কত খ্রিষ্টাব্দে হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়?হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর মাতার নাম কী?মহানবি (স.) কত খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন?হিজরতের সময় মহানবি (স.)-এর সঙ্গী কে ছিলেন?মদিনার পূর্বনাম কী ছিল?উহুদের যুদ্ধে কুরাইশ নেতা কে ছিলেন?'কুরাইশ' শব্দের অর্থ কী?'মুহাম্মদ' শব্দের অর্থ কী?পবিত্র কাবাগৃহে রক্ষিত পাথরটির নাম কী?'হিলফুল ফুজুল' কে গঠন করেন?আল-আমিন শব্দের অর্থ কী?কত খ্রিষ্টাব্দে মহানবি (স.) নবুয়ত লাভ করেছিলেন?'আনসার' শব্দের অর্থ কী?মদিনায় হিজরতকারীরা কী নামে পরিচিত?কোন ঘটনাকে মহানবি (স.)-এর জীবনের মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা বলা হয়?বিশ্বের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান কোনটি?মদিনা সনদের কতটি ধারা ছিল?পবিত্র কুরআনে খন্দকের যুদ্ধকে কী নামে উল্লেখ করা হয়েছে?মুহাম্মদ (স.) কার পরামর্শে মদিনার চারপাশে পরিখা খনন করেছিলেন?'ফাতহুম মুবিন' অর্থ কী?কোন অভিযানকে 'গাজওয়াতুল ওসরাৎ' বলে?মেরাজ বলতে কী বোঝায়?হুদায়বিয়ার সন্ধিকে 'প্রকাশ্য বিজয়' বলা হয় কেন? ব্যাখ্যা কর।নাখলার খণ্ডযুদ্ধকে বদরের যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ বলা হয় কেন? ব্যাখ্যা কর।'বায়তুল মাল' কী? ব্যাখ্যা কর।হযরত মুহাম্মদ (স.) কে আল-আমিন বলা হতো কেন? ব্যাখ্যা কর।হিলফুল ফুজুল বলতে কী বোঝায়?হিজরত ও স্বদেশত্যাগের মধ্যে পার্থক্য কী?কাদেরকে আনসার ও মুহাজির বলা হয়?'ফাতহুম মুবিন' কী? ব্যাখ্যা কর।আকাবার শপথ বলতে কী বোঝায়? ব্যাখ্যা কর।

সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ