- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.)
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
মহানবি (স.)-এর হিজরত (৬২২ খ্রি.)
৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় মহানরি (স.)-এর গমনকেই ইসলামের পরিভাষায় হিজরত বলে। হিজরত হযরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে হযরত মুহম্মদ (স.) নবুয়ত প্রাপ্তির দীর্ঘ ১২ বছর মক্কায় ইসলাম প্রচার করেন। কিন্তু মক্কার কুরাইশদের অত্যাচার ও ষড়যন্ত্রের ফলে সত্যের ডাকে কর্তব্যের খাতিরেই তিনি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন।
হিজরত কী: 'হিজরা' আরবি শব্দ থেকে হিজরত শব্দটি এসেছে। হিজরা এ ক্রিয়াপদের অর্থ সম্পর্কচ্ছেদ করা, প্রস্থান অর্থাৎ দেশত্যাগ বা একস্থান হতে অন্যস্থানে গমন করা। হযরত মুহম্মদ (স.) নবুয়ত প্রাপ্তির দীর্ঘ ১২ বছর পর ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা হতে মদিনায় হিজরত করেন। কুরাইশদের অত্যাচারের মাত্রা দিন দিন বেড়ে গেলে আল্লাহর আদেশে হযরত মুহম্মদ (স.) মক্কা থেকে মদিনায় গমন করেন। তিনি নির্যাতন বা মৃত্যুর ভয়ে হিজরত করেননি বরং সত্যের ডাকে কর্তব্যের খাতিরেই হিজরত করেছেন।
মহানবি (স.)-এর মদিনায় হিজরতের কারণ
৬১০ খ্রিষ্টাব্দে নবয়ত প্রাপ্তির পর মুহম্মদ (স.) দীর্ঘ ১২ বছর মক্কায় ইসলাম প্রচার করেন। কুরাইশদের অত্যাচার নির্যাতন সহ বিভিন্ন কারণে মক্কা হতে মদিনায় ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে হিজরত করেন। হিজরতের কারণগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো:
মনস্তাত্ত্বিক কারণ: পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো নবি বা মহাপুরুষ স্বদেশবাসীর দ্বারা সম্মানিত হননি।। কাজেই মহানবি (স.)-ও মক্কাবাসীর দ্বারা সম্মানিত না হয়ে নির্যাতন ও উপহাস ভোগ করেন। কিন্তু মদিনাবাসীরা নবি (স.)-কে এবং তাঁর ধর্মকে শান্তির ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করে মদিনায় আমন্ত্রণ জানায়।
পরিবেশগত পার্থক্য: শুষ্ক জলবায়ু এবং উষ্ণ আবহাওয়ার জন্য মক্কাবাসীরা ছিল রুক্ষ এবং বদমেজাজি। ফলে তারা কোনো কিছুকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। অপরদিকে, শস্য-শ্যামল মদিনার অধিবাসীরা সুরুচিসম্পন্ন এবং চিন্তাশীল ছিলেন। 'তারা ভালো-মন্দ সহজে বুঝতে পারত। ফলে তারা মহানবি (স.)-কে অতি সহজে গ্রহণ করেন।
অভিজাত কুরাইশদের বিরোধ মক্কার অভিজাত কুরাইশগণ ভাবে যে, ইসলাম প্রচারের ফলে তাদের উপার্জনের পথ, সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রভুত্ব সবই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই তারা হযরত মুহম্মদ (স.)-কে চিরশত্রু মনে করে এবং ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালায়। ফলে মহানবি (স.) মক্কা হতে মদিনায় হিজরত করেন।
যাজক শ্রেণির বিরোধিতা: মক্কায় ইসলাম প্রচারের ফলে পুরোহিত শ্রেণির ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিরাট ক্ষতি হয়। ফলে যাজক-পুরোহিতরা তাদের সনাতন ধর্ম রক্ষার জন্য মুহম্মদ (স.)-এর উপর অত্যাচার শুরু করে। অবশেষে মুহম্মদ (স.) মদিনায় হিজরত করেন।
মদিনায় বিভ্রান্তকর ধর্মমত পৌত্তলিকতা, জড়বাদ, খ্রিষ্টানদের ত্রিভুবাদ কোনোটাই মদিনার সরল প্রকৃতির মানুষের মনকে আকৃষ্ট করতে পারে নি। এ কারণে মদিনাবাসী ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করে মহানবি (স.)-কে মদিনায় আমন্ত্রণ জানায়।
মদিনার ইহুদিদের আমন্ত্রণ: মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিগণ তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতে জানতে পারে একজন নবির আবির্ভাব হবে। তারা মহানবি (স.)-এর মধ্যে তাওরাতের বাণীর মিল খুঁজে পায় এবং মহানবি (স.)-কে মদিনায় আমন্ত্রণ জানায়।'
আউস এ খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের আমন্ত্রণ: মদিনায় আউস ও খাযরাজ গোত্র দুটি তাদের মধ্যকার বুয়াস নামক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হতে রক্ষা পাবার জন্য একজন মধ্যস্থতাকারী খুঁজতে ছিল। মুহম্মদ (স.)-এর সংবাদ পেয়ে তারা তাঁকে মদিনায় আমন্ত্রণ জানায়।
মদিনাবাসীর সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক পিতা আব্দুল্লাহ ও পিতামহ আব্দুল মুত্তালিব মদিনাতে বিবাহ করেছিলেন। এ আত্মীয়তার জন্য মদিনাবাসী মুহম্মদ (স.)-কে মদিনায় এলে সর্বপ্রকার সাহায্যের জন্য আশ্বাস দেন।
নিকট আত্মীয়ের মৃত্যু: বিপদের রক্ষক আবু তালেব এবং চিরসঙ্গিনী বিবি খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুতে মুহম্মদ (স.) অসহায় হয়ে পড়েন। এ সুযোগে কুরাইশরা তাঁর উপর অমানুষিক অত্যাচার শুরু করলে মহানবি (স.) মক্কা হতে হিজরত করে মদিনা গমন করেন।
আকাবার শপথকারীদের আমন্ত্রণ: ৬২০ খ্রিষ্টাব্দে হজ মৌসুমে মদিনার খাযরাজ গোত্রের বারোজন লোক মক্কায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। ৬২১ খ্রিষ্টাব্দে হজ মৌসুমে আউস ও খায়রাজ গোত্রের ১২ জন লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। পরের বছর (৬২২ খ্রি.) দুইজন মহিলাসহ ৭৫ জন মদিনাবাসী ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর তারা মুহম্মদ (স.)-কে মদিনায় যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়।
আন্তর্জাতিক পরিবেশ: মক্কা একমাত্র পৌরহিত্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত ছিল। অপরদিকে, মদিনায় ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বসবাসের ফলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে এক রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ফলে মদিনায় ইসলাম প্রচার সহজ হবে ভেবে মহানবি (স.) মদিনায় হিজরত করেন।
মুসাবের আমন্ত্রণ: হযরত মুহম্মদ (স.) মুসাব নামক একজন বিশ্বস্ত সাহাবাকে হিজরতের এক বছর পূর্বে মদিনায় ইসলাম প্রচারের জন্য পাঠান। মুসাব মদিনায় ইসলাম প্রচারের অনুকূল পরিবেশ এবং তারা মুহম্মদ (স.)-কে মনে-প্রাণে ভালোবাসে এ সংবাদ পাঠালে মুহম্মদ (স.) মদিনাতে হিজরতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
মুহম্মদ (স.)-কে হত্যার পরিকল্পনা: কুরাইশদের বাধা সত্ত্বেও ইসলাম দিন দিন প্রসার লাভ করলে কুরাইশরা নিরাশ হয়ে হযরত (স.)-এর প্রাণনাশের পরিকল্পনা করে। বিভিন্ন গোত্রের যুবকদের নিয়ে হত্যাকারী স্কোয়াড গঠন করে। নির্ধারিত রাতে আক্রমণ করে হযরত (স.)-কে হত্যা করা হবে।
আল্লাহর প্রত্যাদেশ লাভ এবং হিজরত: প্রলোভনেও মুহম্মদ (স.) কুরাইশদের নিকট মাথানত বা জন্মভূমি ত্যাগ করার কথা ভাবেননি। আল্লাহ কর্তৃক সূরা ইয়াছিনের বাণী লাভ করে মহানবি (স.) মক্কা হতে মদিনায় হিজরত করেন। দিবাগত রাতে হযরত আলী (রা.)-কে নিজ বিছানায় শায়িত রেখে আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে বহু বাধা অতিক্রম করে ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের ২ জুলাই মদিনায় হিজরত করেন। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ হিজরতকে মুহম্মদ (স.)-এর পলায়ন আখ্যায়িত করলেও এটি সত্য নয়।
ঐতিহাসিক ওয়াট সাহেব বলেন, "হিজরতের অর্থ মুহম্মদ (স.)-কে মদিনাবাসী ধর্মের দিক দিয়ে নবি হিসেবে এবং রাজনৈতিক দিক দিয়ে তাদের বিবদমান গোত্রগুলোর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
হিজরতের ঘটনা: হযরত মুহম্মদ (স.), ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে আল্লাহর আদেশ প্রাপ্ত হয়ে হযরত আলী (রা.)-কে নিজ ঘরে রেখে হযরত আবু বকর (রা.)-এর সঙ্গে নিয়ে মদিনায় রওয়ানা হন। তাঁকে গৃহে না পেয়ে কুরাইশগণ তাঁর পশ্চাৎভ্রামন করেন। কিন্তু হযরত আবু বকরের সঙ্গে সওর নামক পর্বতের গুহায় তিন দিন আত্মগোপন থাকার পর কুরাইশদের দৃষ্টির অগোচবে মদিনায় গমন করেন। সত্তর পর্বতে অবস্থানকালে আবু বকর (রা.)-এর পুত্র আব্দুল্লাহ ও কন্যা আসমা তাঁদের খাদ্য সরবরাহ করে। মদিনায় যাওয়ার পর যে সকল মদিনাবাসী তাঁদের সাহায্য করে তারা আনসার নামে পরিচিত।
হিজরতের গুরুত্ব (Importance of Hijrat)
মুহম্মদ (স.)-এর মক্কা হতে মদিনায় হিজরতের গুরুত্ব নিম্নে আলোচনা করা হলো:
মক্কা জীবনের অবসান মদিনা জীবনের সূচনা: ইসলাম তথা মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে হিজরতের গুরুত্ব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।
হিজরতের ফলে মক্কা জীবনের অবসান ঘটে এবং মদিনা জীবনের সূচনা হয়। অধ্যাপক পি. কে. হিট্টি তাঁর History of the Arabs গ্রন্থে বলেন, "The Hijrat with which the Meccan period ened and the Madinese period began, proved a turnig point in the life of Muhammad."
আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক: হিজরতের ফলে মহানবি (স.) মদিনায় এসে একজন বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচয় লাভ করেন। কারণ তিনি মক্কায় ছিলেন একজন ধর্ম প্রচারক মাত্র কিন্তু মদিনায় এসে ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করেন।
মোহাজের ও আনসার হিজরতের সময় যেসব মুসলমান মহানবি (স.)-এর সঙ্গে মদিনায় গিয়েছিলেন তারা মোহাজের নামে পরিচিত। অপরদিকে, মদিনাবাসী যারা মহানবি (স.)-কে সর্বাত্মক সাহায্য করেছিলেন তারা আনসার বা সাহায্যকারী হিসেবে ইতিহাসে খ্যাতি লাভ করেন।
মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র গঠন: হিজরতের ফলে মদিনাতে ইসলামি রাষ্ট্র গঠিত হলো। মহানবি (স.) সে রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন এবং তিনি মদিনা সনদ নামে সকলের গ্রহণযোগ্য একটি সংবিধান প্রদান করে সেখানে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।
নবির শহর নামকরণ: মহানবি (স.)-এর হিজরতের ফলে তাঁর সম্মানার্থে ইয়াসরিববাসী তাদের শহরের নাম রাখেন মদিনাতুন নবি বা নবির শহর। পরবর্তীতে ইয়াসরিব মদিনা নামে বিশ্বে পরিচয় লাভ করে।
হিজরি সাল প্রবর্তন: মদিনায় হিজরতের ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য মদিনাবাসী এ মাস থেকে হিজরি সাল গণনা করেন। পরবর্তীতে আরবি সাল ও তারিখ গণনার ক্ষেত্রে 'হিজরি' সালের গুরুত্ব অপরিসীম।
মদিনা সনদ প্রদান: মহানবি হযরত মুহম্মদ (স.) মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় পৌঁছে মদিনাবাসী সকল নাগরিকের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করেন যা ইসলামের ইতিহাস ও বিশ্বের ইতিহাসে 'মদিনা সনদ' নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে 'মদিনা সনদ' পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম একটি লিখিত সংবিধান।
ইসলামের সম্প্রসারণ: মহানবি (স.)-এর হিজরতের ফলে মদিনাতেও ইসলাম দ্রুতগতিতে প্রসার লাভ করে। মদিনা রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পেয়ে মহানবি (স.) বিভিন্ন দেশে দূত প্রেরণ করে ইসলাম প্রচারের ব্যবস্থা করেন। ফলে আরব উপদ্বীপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ইসলামের বাণী পৌঁছায় ও ইসলাম প্রসার লাভ করে।
মদিনার মর্যাদা বৃদ্ধি: হিজরতের ফলে মদিনা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। ফলে অল্পদিনের মধ্যে মদিনার মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
হযরত মুহম্মদ (স.)-এর মূল্যায়ন: হিজরত হযরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবনের মোড় পরিবর্তনকারী মহান ঘটনা। মক্কার অবহেলিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে মদিনাতে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তিনি মদিনাতে একজন ধর্ম প্রচারক, সমাজ সংস্কারক, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক কর্ণধার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, হিজরত মহানবি (স.)-এর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ইসলামের ইতিহাসে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। মদিনায় হিজরতের পর মহানবি (স.)-এর জীবনের নির্যাতন, পরিহাস ও নিরাশার দিনগুলো শেষ হয়ে দেখা দেয় আশার আলো এবং ধারাবাহিক সফলতা। হিজরতের মাধ্যমেই মুহম্মদ (স.) আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। হিজরত মহানবি (স.)-এর জীবনের সফলতার দ্বার খুলে দেয়। তাই ঐতিহাসিক যোসেফ হেল যথার্থই বলেন, "Hijrat is the greatest turning point in the History of Islam." অর্থাৎ "হিজরত ইসলামের ইতিহাসের মোড় পরিবর্তনকারী মহান ঘটনা।"
মদিনায় হযরত মুহম্মদ (স.)
৬১০ খ্রিষ্টাব্দে নবুয়ত প্রাপ্তির পর দীর্ঘ ১২ বছর ইসলাম প্রচারের পর মক্কায় বিধর্মীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে হযরত মুহম্মদ (স.) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর সঙ্গীদেরকে নিয়ে মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় গমন করেন। তাঁর গুণমুগ্ধ ইয়াসরিববাসীরা তাঁদেরকে সাদরে গ্রহণ করেন। হযরত মুহম্মদ (স.)-এর সম্মানে ইয়াসরিবের নামকরণ করা হয় 'মদিনাতুন্নবি' বা নবির শহর।
মসজিদ নির্মাণ: মদিনা থেকে তিন মাইল দূরে যে উঁচু বসতি রয়েছে তাকে 'আলিয়া' বা 'কুবা' বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (স) এখানে আমর ইবনে আওফ গোত্রের কুলস ইবনে হেদামের ঘরে ১৪ দিন অবস্থান করেন। এসময় তিনি সেখানে দুনিয়ার প্রথম মসজিদ 'মসজিদে কুবা' নির্মাণ করেন। এর পর মদিনায় গিয়ে মহানবী (স.) আবু নাজ্জার গোত্রের সাহল ও সুহাইল নামক দুজন ইয়াতিম বালকের এক খণ্ড জমি ক্রয় করে সেখানে মসজিদ নির্মাণ করেন। হযরত নিজেও নির্মাণ কার্যে অন্যান্যদের সাথে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মসজিদের দেওয়াল তৈরি হয়েছিল ইট ও মাটি দিয়ে এবং ছাউনি দেওয়া হয়েছিল খেজুর পাতার। মদিনায় এটাই 'মসজিদুন্নবী' বা নবীর মসজিদ। এখানে বসেই মহানবী (স.) ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় সকল কাজ করতেন। কালক্রমে এটাই ইসলামের প্রধান মিলনকেন্দ্র হিসাবে পরিণত হয়। এ মসজিদের সাথেই তাঁর পরিবারবর্গের বাসস্থান নির্মাণ করা হয়।
আউস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয়ের ফন্দ্ব নিরসন: আউস ও খাজরাজ হচ্ছে মদিনার দুটি বিখ্যাত গোত্র। এরা দীর্ঘদিন পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। এতে তাদের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। ফলে উভয় গোত্রই তৃতীয় এমন একজন ব্যক্তির সন্ধান করছিল, যিনি তাদের মধ্যে উত্তম মীমাংসা করে দিবেন।
মহানবি (স.) মদিনায় হিজরত করলে আউস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয় তাঁকে সাদরে গ্রহণ করে। মহানবি (স.) এ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে বিরাজমান দীর্ঘকালীন শত্রুতার অবসান ঘটান এবং তাদেরকে পরস্পর ভ্রাতৃত্বের কখনে আবন্ধ করেন।
মুহাজেরীন ও আনসারদের মধ্যে সৌহার্দ স্থাপন: মুহাজের অর্থ শরণার্থী। অর্থাৎ কোনো কারণবশত নিজ এলাকা বা ভূখণ্ড ত্যাগ করে অন্যত্র গিয়ে আশ্রয় গ্রহণকারী। রাসুলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে মক্কার মুসলমানগণ মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করে। তাই তাদেরকে রাসুলুল্লাহ (স.) মুহাজির বলে অভিহিত করেন। আর আনসার অর্থ সাহায্যকারী। মদিনার মুসলমানগণ মক্কা থেকে আগত মুহাজিরদের সার্বিকভাবে সাহায্য করেছেন বিধায় রাসুলুল্লাহ (স) তাদেরকে আনসার বলে অভিহিত করেন। রাসুলুল্লাহ (স.) এই আনসার ও মুহাজেরীন সাহাবিদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ স্থাপন করেন।
ধর্মীয় অনুশাসনের প্রবর্তন: মদিনায় ইসলাম বিস্তারের সাথে সাথে হযরত মুহম্মদ (স.) আযানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তিনি ওমর (রা.)-এর পরামর্শক্রমে আযান প্রথা প্রবর্তন করেন। এ সময় হতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে আস্তে আস্তে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, অজু ও জুমার নামাজ 'কেবলা', রমযান মাসে রোজা পালন, হজ, যাকাত, কুরবানী ইত্যাদি ইসলামের বিধানাবলি নির্ধারিত হয়। রোজার পর ঈদুল ফিতর এবং এর আড়াই মাস পরে ঈদুল আযহা উৎসব প্রবর্তিত হয়। জুমার নামাজে খুতবার মাধ্যমে ধর্মীয় ভিত্তি মজবুত করেন।
সামাজিক অনুশাসন প্রবর্তন হযরত মুহম্মদ (স.) সমাজ উন্নয়নে ব্রতী হন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় সমাজ হতে মদ্যপান, জুয়া খেলা, লুণ্ঠন প্রভৃতি অসামাজিক কার্যকলাপ দূরীভূত হয়। পরবর্তীকালে পুনঃবিবাহ, তালাক এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার সম্পর্কিত আইন প্রবর্তিত হয়। প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হওয়া ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টির জন্য তিনি মুসলমানদের আহ্বান জানান।
হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.) - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

