- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.)
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
মদিনায় ইহুদিদের সঙ্গে মুহম্মদ (স.)-এর সম্পর্ক
মানবতার মুক্তির দিশারি হযরত মুহম্মদ (স.) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে হিজরত করে মক্কা হতে মদিনায় গমন করেন। আল্লাহর প্রত্যাদেশ লাভের পর হযরত মুহম্মদ (স.) সত্যের ডাকে কর্তব্যের খাতিরেই মক্কা হতে মদিনায় গিয়েছিলেন। মদিনায় তখন বিভিন্ন ধর্মীয় ও গোত্রীয় লোক বসবাস করত। প্রথমদিকে তারা মহানবি (স.)-কে পাওয়ার জন্য অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। মদিনায় আউস ও খাযরাজ গোত্রের সঙ্গে ইহুদিরা মহানবি (স.)-কে আমন্ত্রণ ও আন্তরিক অভিনন্দন জানায়। উল্লেখ্য যে মদিনায় বনু কায়নুকা, বনু নাজির ও বনু কুরাইজা নামে তিনটি ইহুদি গোত্র বাস করত।
প্রতিশ্রুত নবি হিসেবে গ্রহণ: হযরত মুহম্মদ (স.)-এর আবির্ভাবের পূর্বে মদিনার ইহুদিরা তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতের মাধ্যমে জানতে পারে একজন মহানবির আগমন হবে। হযরত মুহম্মদ (স.)-এর নবুয়ত প্রাপ্তির সংবাদ পাওয়ার পর তারা তাওরাতের বাণীর সঙ্গে মুহম্মদ (স.)-এর মিল খুঁজে পায় এবং তাঁকে প্রতিশ্রুত নবি হিসেবে পাওয়ার জন্য মদিনায় আমন্ত্রণ জানায়।
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক: হিজরতের পর মহানবি (স.) মদিনার সমস্ত প্রকার দ্বন্দ্ব কলহ দূরীভূত করে তথায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে মদিনার ইহুদিদের সঙ্গে মহানবি (স.)-এর সম্পর্ক গভীর হয়।
মদিনার সনদ প্রদান: মদিনায় গমন করে মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিদের সঙ্গে সম্ভাব গড়ে তোলার জন্য মহানবি (স.)-এর 'মদিনা সনদ' নামে এক মহাসনদ প্রদান করেন। এ সনদের মাধ্যমে মদিনায় একটি সাধারণ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় এবং মদিনায় বসবাসকারী সকল নাগরিক সুখ ও শান্তি লাভ করে। এ সনদের উল্লেখযোগ্য দিক হলো মদিনায় বসবাসকারী সকল নাগরিক স্বাধীনভাবে স্ব-স্ব ধর্মমত পালন করবে এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ সকলে একত্রিত হয়ে প্রতিহত করবে। এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের কোনো ক্ষতি করবে না এরূপ চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। মদিনায় বসবাসকারী সকল সম্প্রদায় উক্ত সনদে স্বাক্ষর করে।
ইহুদিদের অসন্তোষ: ইহুদিরা মহানবি (স.)-এর সহায়তায় মদিনায় একটি ইহুদি ফ্রন্ট গড়ে তুলবে বলে মহানবি (স.)-কে আহ্বান করেছিল। কিন্তু ইসলামের উদীয়মান শক্তিতে তাদের সে আশা সফল হয়নি। ফলে আউস ও খাযরাজ গোত্রের ভিতর বিদ্রোহ সৃষ্টির জন্য তারা তৎপর হয়ে ওঠে এবং গোপনে মকার কুরাইশদের সঙ্গে যড়যন্ত্র করতে থাকে। কুরআনে উল্লেখ আছে, "নিশ্চয় তারা (ইহুদিরা। জঘন্য ঘৃণা বা হিংসা প্রকাশ করছে এবং অন্তরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা আরও অধিক।" এমনকি ইহুদিরা মদিনা আক্রমণের জন্য মক্কার কুরাইশদের আমন্ত্রণ জানায়।
বনু কায়নুকা গোত্রের সন্ধি ভঙ্গ অল্পদিনের মধ্যে বনু কায়নুকা গোত্রের লোকেরা মদিনা সনদ ভঙ্গ করে। শর্তানুযায়ী বদরের যুদ্ধে ইহুদিদের মুসলমানদের সাহায্য করার কথা কিন্তু তারা সাহায্য না করে গোপনে কুরাইশদের সাহায্য করে। এমনকি জনৈকা মুসলিম মহিলাকে তারা রাস্তার উপর অপমান করেন। ইহুদিরা প্রকাশ্যভাবে মহানবি (স.) ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও ধ্বংসাত্মক কার্য পরিচালনা করলে মহানবি (স.) বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে বনু কায়নুকা গোত্রকে মদিনা হতে বহিষ্কার করেন।
বনু নাজির গোত্রকে মদিনা থেকে নির্বাসন উহ্রদের যুদ্ধের সময় ইহুদিদের বনু নাজির সম্প্রদায় কুরাইশদের সঙ্গে আঁতাত করে মদিনা আক্রমণ করে। এমনকি আমিন-বিন-জাহাস নামক জনৈক ইহুদি গৃহের চূড়া হতে পাথর নিক্ষেপ করে মুহম্মদ (স.)-কে মারার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। বনু নাজির গোত্রের প্রকাশ্য 'বিরোধিতা, ষড়যন্ত্র ও হিংসাত্মক কার্যকলাপের জন্য হযরত মুহম্মদ (স.) তাদের নেতা কাব-বিন-আশরাফ ও আবু রাফীকে হত্যার নির্দেশ প্রদান করেন। ফলে বনু নাজির গোত্রের লোকেরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। মহানবি (স.) তাদেরকে এক খণ্ডযুদ্ধে পরাজিত করেন। ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দে চতুর্থ হিজরিতে বনু নাজির গোত্রকে শাস্তিস্বরূপ মদিনা হতে বহিষ্কার করে খায়বারে বসতি স্থাপনে বাধ্য করেন।
বনু কুরাইজা গোত্রের ষড়যন্ত্র: বনু কুরাইজা গোত্রও ছিল ইহুদিদের তৃতীয় ও শেষ সম্প্রদায়। উহুদের যুদ্ধে তারা বিশ্বাসঘাতকতা করলেও পরবর্তীতে তারা মুসলমানদের সঙ্গে ভালো আচরণের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। কিন্তু পরিখার বা খন্দকের যুদ্ধের সময় তারা কুরাইশদের সাহায্য করে এমনকি প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে মদিনায় মুসলমানদের হত্যা ও রক্তপাত দ্বারা জীবন বিপন্ন করে তোলে। যুদ্ধ শেষে মহানবি (স.) তাদের অবরোধ করে বন্দি করেন।
সাদ ইবনে মাআজের সালিসি বনু কুরাইজা গোত্র উপায়ন্তর না দেখে আউস দলপতি হযরত সাদ ইবন মাআজের সালিসি মানতে রাজি হয়। সাদের বিচারে বনু কুরাইজার যুদ্ধক্ষম সকল পুরুষদের হত্যা এবং বাকিদের সিরিয়াতে নির্বাসন দেওয়া হয়। কিছু স্ত্রীলোক ও শিশুদেরকে মুসলমানদের আশ্রয়ে দেওয়া হয়। এ রায় যদিও কঠোর ছিল কিন্তু তৎকালীন আরবের যুদ্ধ প্রথা হিসেবে বিধিসম্মত ছিল।
খায়বারের যুদ্ধ: মদিনা হতে বিতাড়িত হয়ে ইহুদিগণ খায়বারে বসতি স্থাপন করে। তারা সেখান হতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্র করে এবং বনু সাদ ও বনু গাতফান গোত্রদ্বয়কে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলে। মুসলমানদের বাড়ি-ঘর লুণ্ঠন করে এবং বহু মুসলমানকে হত্যা করে। এ সংবাদ পেয়ে ১৬০০ সৈন্য নিয়ে ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে মহানবি (স.) খায়বার অবরোধ করেন। ইহুদিগণ মুসলমানদের নিকট আত্মসমর্পণ করে। কর প্রদানের মাধ্যমে ইহুদিগণ পুনরায় খায়বারে বসতির অনুমতি পায়। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক মুর বলেন, "The ostensible ground for which Muhammad punished the jews was political and not religious", একথা স্পষ্ট যে মুহম্মদ (স.) ইহুদিদের শাস্তি দিয়েছিলেন তা ধর্মীয় কারণ নয়, তা হলো রাজনৈতিক কারণ। Watt-এর মতে, "ইহুদিরা মহানবির নবুয়তের দাবিকে কটাক্ষ করে।"
মুহম্মদ (স.)-কে হত্যার প্রচেষ্টা: ইহুদিগণ সর্বশেষে হযরত (স.)-এর জীবন নাশের চেষ্টা চালায় বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আল্লাহর রহমতে হযরত মুহম্মদ (স.) বেঁচে যান। এরপরও মহানবি (স.) ইহুদিদের ক্ষমা করেন। শুধু অপরাধী যয়নবকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেন। হযরত মুহম্মদ (স.)-এর সঙ্গে মদিনার ইহুদিদের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার কথা। কারণ মহানবি (স.) মদিনায় এসে তাদের সঙ্গে সম্ভাব রেখে চলার জন্য মদিনা সনদ প্রদান করেন। তাদের ধর্মীয় গোঁড়ামির দ্বারা তারা ইসলাম ধর্মকে কুঠারাঘাত করে। যার ফলে মুহম্মদ (স.) তাদের ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
খ্রিষ্টানদের সাথে হযরত মুহম্মদ (স.)-এর সম্পর্ক: মদিনায় বসবাসকারী খ্রিষ্টানদের সঙ্গে হযরত মুহম্মদ (স.)-এর সম্পর্ক বিষয়ে আলোচনা করা হলো:
বন্ধুসুলভ সম্পর্ক: ইসলামের আবির্ভাবের প্রাথমিক পর্যায়ে আবিসিনিয়ার খ্রিষ্টান সম্রাট নাজ্জাসী মুসলমানদের প্রতি সহৃদয় ব্যবহার করেছিলেন। তিনি দুর্যোগের সময়ে মুসলমানদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। এই কারণে খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যে একটি হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। মহানবি (স.)-এর মদিনায় হিজরতের পরেও সম্রাট নাজ্জাসী ও মদিনায় বসবাসকারী খ্রিষ্টানদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক ভালো ছিল। মদিনার খ্রিষ্টানগণ মহানবি (স.)-এর প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা পোষণ করত। মহানবি (স.) তাদের এই বিশ্বস্ততা ও বন্ধুসুলভ ব্যবহারের কথা স্মরণ রেখেই সিনাই পর্বতের নিকটবর্তী সেট ক্যাথারিন নামক মঠের সন্ন্যাসী ও অন্যান্য খ্রিষ্টানদের একটি সনদ প্রদান করেন (যষ্ঠ হিজরি)। এই সনদ প্রদান পরধর্মের প্রতি তাঁর সীমাহীন সহনশীলতার একটি বড় নজির হয়ে রয়েছে। এই সনদে তিনি তাদেরকে ধর্মীয় রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠান, পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেন। এতে তিনি ওয়াদা করেন যে, খ্রিষ্টানদের উপর অন্যায়ভাবে কর ধার্য করা হবে না; তাদের কোনো ধর্মযাজককে উপাসনালয় হতে বহিষ্কার করা হবে না। তীর্থযাত্রা হতে কাউকেও বিরত রাখা হবে না। খ্রিষ্টানদের কোনো গির্জা ভেঙে তার উপর মসজিদ নির্মাণ করা হবে না। স্বধর্ম ত্যাগ না করেও যে কোনো খ্রিষ্টান মহিলা যে কোনো মুসলমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। গির্জা মেরামতের সময় মুসলমানরা খ্রিষ্টানদের সাহায্য করবে।
সন্ধির শর্তাবলি: মদিনা সনদে বলা হয়, আরবের বাইরের খ্রিষ্টানদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্কের অবনতি ঘটলে তজ্জন্য আরবীয় খ্রিষ্টানদের দোষী করা হবে না। সংখ্যালঘুদের জানমাল ও ধর্মের নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে এই সনদ একটি মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই সনদের গুরুত্ব সম্পর্কে আমীর আলী বলেন, "ইহা অসাধারণ সহিষ্ণুতার একটি কীর্তিস্তম্ভ।" মদিনার ইহুদিদের সঙ্গে মহানবি (স.)-এর সম্পর্ক আলোচনা করলে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মহানবি (স.) তাদের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা চালান, কিন্তু মদিনার ইহুদিরা মহানবি (স.)-কে ভুল বুঝে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ফলে মহানবি (স.) বাধ্য হয়ে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাদেরকে মদিনা থেকে বহিষ্কার করেন।
পরিশেষে বলা যায়, মদিনা সনদের মাধ্যমে মুহম্মদ (স.) মদিনায় বসবাসকারী সকল নাগরিকদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তিনি ইহুদি, খ্রিষ্টানদের স্ব-স্ব ধর্মমত স্বাধীনভাবে পালনের জন্য নিরাপত্তা বিধান করেন। তথাপি মদিনায় বসবাসকারী ইহুদি, খ্রিষ্টানগণ ভুল বুঝে বিদ্রোহ করলে মহানবি (স.) তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করেন।
হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.) - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

