- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.)
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
মহানবি (স.)-এর চারিত্রিক গুণাবলি ও কৃতিত্ব
চারিত্রিক গুণাবলি (Character)
মানবকুলের শিরোমণি মহানবি (স.)-এর তুলনা তিনি নিজেই। সর্বোত্তম গুণাবলির বিস্ময়কর সমাবেশ একমাত্র তাঁর চরিত্রেই মেলে। রাসুল হিসেবে তাঁর জীবন পরিক্রমার কার্যক্রমে প্রতিভাত হয় যে, তাঁর মহান চরিত্রের দিকগুলোর মধ্যে আল্লাহর তাওহিদ প্রতিষ্ঠার নিরলস প্রচেষ্টা অন্যতম। আল্লাহর উপর তাঁর প্রগাঢ় বিশ্বাসে মুহূর্তের জন্য কেউ চিড় ধরাতে পারেনি। বিশ্বাসের এ দৃঢ়তায় তিনি শত অত্যাচার সহ্য করেও ধৈর্য ধারণ করেছেন।
সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও শান্তিপ্রিয়তা ছিল তার চরিত্রের মহান ভূষণ। আজীবন তিনি তাঁর প্রতি কর্মে সত্যনিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর সততা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারির জন্য প্রাক-নবুয়ত সময় পূর্বে তিনি ঘুণে ধরা সমাজের জনগোষ্ঠীর দ্বারা 'আল-আমিন' বা বিশ্বাসী উপাধি অর্জন করেছিলেন। তাঁর শান্তি অন্বেষার জীবন্ত উদাহরণ হিলফুল ফুজুল বা শান্তি সংঘ গঠন। সব বয়স ও সব শ্রেণির মানুষের সাথে তিনি সর্বদা মধুর ব্যবহার করতেন। স্বার্থের পরিপন্থি হলেও তিনি কখনো মিথ্যা, প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার আশ্রয় গ্রহণ করেননি। তিনি সদা-সর্বদা অঙ্গীকার পালনে তৎপর থাকতেন। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাকে তিনি কপটতা হিসেবে গণ্য করতেন।
মহানবি (স.) দুঃখী, আর্তমানবতা, পীড়িত ও অনাহারক্লিষ্টদের দিকে সবসময় সহানুভূতির হাত বাড়িয়েছেন। নিজে অভুক্ত থেকে ক্ষুধার্তদের আহার জুগিয়েছেন এবং অসুস্থ পীড়িতদের অকাতরে সাহায্য করেছেন। অপরের কল্যাণ তাঁর জীবনের সুমহান ব্রত ছিল। সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে তিনি সকলের প্রয়োজনে ছুটে গেছেন। ক্ষত-বিক্ষত সমাজকে তাঁর কল্যাণী চিন্তা-চেতনার পরশে শান্তিময় করে তুলেছেন।
মহানবি (স.) ছিলেন সরল ও সাদামাটা জীবনের এক মূর্ত প্রতীক। অত্যধিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ছিল তাঁর বিশেষ ভূষণ। তাঁর খাওয়া-পরা এবং আসবাবপত্র ছিল অতি সাধারণ। অতীব অনাড়ম্বর জীবনযাপন ছিল সুমহান আদর্শ। সর্বাবস্থায় তিনি সাধারণভাবে জীবনযাপন করেছেন। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তাঁর বিলাসহীন জীবনযাপনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। পার্থিব সম্পদ ও লোভ-লালসার প্রতি কখনো তাঁর কোনো আকর্ষণ ছিল না। তাঁর ব্যবহার ছিল সবার সাথে অত্যন্ত অমায়িক ও স্নেহমিশ্রিত। তিনি অধীনস্থদের প্রতি সদা দয়াপরবশ ছিলেন। তাঁর কথায় ও কাজে কেউ কোনোদিন কষ্ট পায়নি। একটি রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়েও মুহম্মদ (স.) অত্যন্ত খোলামেলাভাবে দিনমজুর মানুষের সাথে মিশতেন। মদিনার মসজিদ নির্মাণ ও খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননকালে তিনি স্বয়ং সাধারণ শ্রমিকের মতো কাজে অংশগ্রহণ করে সমাজে শ্রমের মর্যাদা দানে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি পরিবারের সদস্যদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ছিলেন। গৃহকর্মে তিনি স্ত্রীদের সাহায্য করতেন। নিজ হাতে ছিন্নবস্তু সেলাই ও ছাগী-দুধ দোহন করতেন। শিশুরা তাঁর অতীব প্রিয়ভাজন ছিল। রাস্তায় কারো সাথে সাক্ষাৎ হলে অধর নেড়ে আদর করতেন। তাদের সাথে কখনো দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে শিশুদের আনন্দ দিতেন। কথোপকথনের সময় তাঁর বাচনভঙ্গি ছিল মধুর ও সুমিষ্ট। তাঁকে দেখামাত্র হৃদয়-মন শ্রদ্ধায় পূর্ণ হয়ে উঠত। এমতাবস্থায় সবাই বলতে বাধ্য হতো যে, 'পূর্বে অথবা পরে আমি তাঁর অনুরূপ ব্যক্তি পাইনি।'
একটি সুস্থ ও বিকাশমান সমাজের জন্য কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ক্ষমা করে দেওয়ার মানসিকতা অবশ্যই প্রয়োজন। এসব মানবিক গুণের মূর্ত প্রতীক ছিলেন মহানবি (স.)। তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আইনের প্রয়োগ করে গেছেন। আবার, মহত্ত্বের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে চরমশত্রুকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন। দীর্ঘদিন অত্যাচারিত ও নিগৃহীত হয়েও মক্কা বিজয়ের পর বিজয়ীর সুমহান আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করে মহানবি (স.) কাবার প্রান্তরে সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, "লা তাসরিবা আলায়কুমুল ইয়াওমা ফাইন্নাতুম তুলাকা" অর্থাৎ "হে দেশবাসী! তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো খেদ বা অভিযোগ নেই। তোমরা মুক্ত-স্বাধীন।" বিজিতের উপরে বিজয়ীর এরূপ ক্ষমার দৃষ্টান্ত বিশ্ব ইতিহাসে বিরল।
পরিশেষে বলা যায়, মহানবি (স.) তাঁর চরিত্র মাধুর্যে ও উদার মানসিকতায় এবং স্নেহ-মমতার পরশে আরবদের ন্যায় একটি অধঃপতিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন জাতিকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে সত্যতা ও মানবতার ঊর্ধ্ব শিখরে সমুন্নত করেন। যা বিশ্ব ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে কাল থেকে কালান্তরে। মহানবি (স.)-এর জীবন চরিত্রের আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করে বিস্ময়াভিভূত ফরাসি কবি লা মার্টিন তাই তো বলেছেন, "By all standards with which human greatness may be measured may we ask, was there any other man greater than Muhammad?" অর্থাৎ "মহত্ত্ব বিচারের সব মাপকাঠি প্রয়োগ করে আমরা কী প্রশ্ন করতে পারি মুহম্মদ (স.)-এর চেয়ে মহৎ আর কেউ আছে?" অর্থাৎ কেউ নেই।
কৃতিত্ব (Achievements)
মহানবি (স.)-এর আগমনের পূর্বে বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতি মোটেই সুখকর ছিল না। জাযিরাতুল আরব বা আরব উপদ্বীপের অবস্থাও নৈরাশ্যজনক ছিল। ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা বিরাজ করছিল। খুন-খারাবি, হানাহানি সমাজের সর্বস্তরে ব্যাপ্ত হয়ে পড়েছিল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছিল এবং এসব ক্ষেত্রে অনাকাঙিক্ষত পরিবেশ গোটা আরব সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। এমনি একটি দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় একজন নবি ও মুক্তিদাতার আগমন আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। পরিস্থিতির যথার্থতা অনুধাবন করে প্রাচ্যবিদ ও ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি মন্তব্য করেন, "The stage was set, the moment was psychological, for the rise of a great religious and national leader," অর্থাৎ একজন মহান ধর্মীয় ও জাতীয় নেতার আগমনের জন্য তৈরি হয়েছিল মঞ্চ এবং সময় ছিল মনস্তাত্ত্বিক। তিনি ঐশী নির্দেশে প্রজ্ঞার সাথে বিপন্ন জাতিকে সৎ পরিশীলিত ও কল্যাণকামী জাতিতে রূপান্তর করে বিপ্লব সাধন করেন। তিনি ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সংস্কার সাধন করে একটি পরিশীলিত জাতি ও রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এখানেই তাঁর বিস্ময়কর কৃতিত্ব নিহিত আছে।
তদানীন্তন আরবে সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ-নক্ষত্র থেকে শুরু করে বৃক্ষ, পাথর প্রভৃতি জড়বস্তু এবং বিভিন্ন দেব-দেবীর নামে মূর্তিপূজা জনগণের ধর্মবিশ্বাসে পরিণত হয়েছিল। আল্লাহর মৌখিক উচ্চারণ করলেও তার সাথে তাদের কল্পিত দেব-দেবীকে যোগ করে সেগুলোর আরাধনা করত। মোটকথা পৌত্তলিকতা ছিল আরবদের ধর্মবিশ্বাসের মূলমন্ত্র। এসবের মূলোৎপাটনকল্পে মুহম্মদ (স.) আল কুরআনের আলোকে তাদের জীবন ও বিশ্বাসবোধকে সাজাতে শুরু করেন। তিনি প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির আমূল সংস্কারে ব্রতী হলেন। তিনি শিরক ও কল্পিত দেব-দেবীর বিপরীতে তাওহিদের ধারণার বিস্তৃতি ঘটালেন।
তাওহিদ প্রতিষ্ঠা লাভ করল, রহিত হলো জড়পদার্থের পূজা-অর্চনা। কুসংস্কার বিদূরিত হলো। আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতা ও পরকালীন জীবনে বিশ্বাস মানুষকে আলোর মহিমায় উদ্দীপ্ত করে তুলল। তাওহিদের অবিনাশী বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আল্লাহর নির্দেশে প্রবর্তিত হলো নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজ পালনের ইসলামিক ব্যবস্থা। বিড়ম্বিত ধর্মবোধ বিদূরিত হয়ে সরলরেখায় প্রতিষ্ঠিত ইসলাম সমাজ মানসে স্বস্তি এনে দেয়।
ঘুণে ধরা সমাজের সংস্কার সাধন মহানবি (স.)-এর আর একটি কীর্তি। তিনি একটি সুস্থ ও সাবলীল-কল্যাণধর্মী সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে সাম্য ও সমতার বিকাশ ঘটালেন। তিনি আভিজাত্য ও রক্তের শ্রেষ্ঠতার মূলে কুঠারাঘাত করেন। উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা দেন, ইসলামে শ্রেণিবিভাজনের কোনো স্থান নেই এবং অনারবের উপর আরবের কিংবা কালোর উপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তিনি ক্রীতদাস ও কালোদের যুদ্ধের সেনাপতি নিয়োগ করে রক্তের আভিজাত্যের শেকড় তুলে ফেলেন।
ইসলাম-পূর্ব যুগে নারীর মর্যাদা স্বীকৃত ছিল না। যৌন লিপ্সা চরিতার্থ করা ও ভোগের সামগ্রী হিসেবে তারা বিবেচিত হতো। কোনো সম্পদেরই উত্তরাধিকারী তারা হতে পারত না। মহানবি (স.) নারীর সুষ্ঠু মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। শিশুকন্যাকে হত্যা কিংবা জীবন্ত কবর দেওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। যৌন অশ্লীলতা সকল সামাজিক অপকর্মের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে মহাঅপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তা নির্মূল করার জন্য তিনি কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তার নারীবান্ধব কর্মকান্ড প্রসারের ফলে স্ত্রীর উপর স্বামীর যেরূপ অধিকার, স্বামীর উপর স্ত্রীর অনুরূপ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
তিনি আরব ভূখন্ডের কালিমা দাসপ্রথার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তার পরিগৃহীত পদক্ষেপের ফলে দাসপ্রথা বন্ধ হতে শুরু করে। দাস ও স্বাধীনদের মধ্যে পার্থক্য উন্মোচন করে সকলকে একই কাতারে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ঘোষণা দেন, "তোমরা যেরূপ আহার গ্রহণ করবে ও কাপড় পরিধান করবে তোমাদের দাস-দাসীকে অনুরূপ খাবার দেবে এবং কাপড় পরিধান করতে দেবে।" মহানবি (স.) এবং তাঁর উত্তম চরিত্রের অধিকারী সাহাবিগণ দাসমুক্তির প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন এবং সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলেন।
মুসলিম সভ্যতার সোনালি যুগে বিভিন্ন দেশে দাস বংশ প্রতিষ্ঠা এই সাক্ষ্য দেয় যে, ইসলাম দাসদেরকে উন্নত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। সুপ্রসন্ন ভাগ্যকে বরণ করার জন্য তাদের দ্বার অবারিত রাখা হয়েছে। সর্বোপরি সমাজের সুস্থ বিকাশের জন্য মদ, জুয়া এবং সকল প্রকার নেশা জাতীয় দ্রব্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রাক-ইসলামি যুগে কোনো সুষ্ঠু রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। বরং গোত্রভিত্তিক সমাজকাঠামো গড়ে ওঠায় আসাবিয়াত বা-গোত্রপ্রীতি আরবদের রাজনীতির মূল চেতনা ছিল। ফলে স্বগোত্রের সদস্যের সাথে সম্ভাব ও প্রীতি এবং অপর গোত্রের সদস্যের সাথে বৈরিতা রাজনীতিতে দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক প্রবহমান থাকত। শাইখ ছিল প্রতিটি গোত্রের চালিকাশক্তি।
মহানবি (স.) গোত্রীয় শাইখতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ধারণার উপর রাজনৈতিক সংস্কার সাধন করেন। তিনি শতধা বিভক্ত আরব গোত্রসমূহকে এ ধারণায় উদ্বুদ্ধ করে এককেন্দ্রিক শাসনের আওতায় এনে এক মহাশক্তিশালী জাতিতে পরিণত করেন। মদিনার সনদের ভিত্তিতে এক ইসলামি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন, যাতে ছিল সবার অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার এবং পরামর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় কার্যাবলি সম্পাদনের দৃঢ় প্রত্যয়।
গঠিত রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্যে তাঁর বিজ্ঞানধর্মী প্রশাসনিক বিভাজন এক চমৎকার উদ্যোগ। তিনি আরব দেশকে কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত করে ওয়ালি বা প্রশাসক নিয়োগ করেন। বিচারকাজের জন্য নিয়োগ দেন কাজি। মহানবি (স.) মদিনার মসজিদ হতে রাষ্ট্রীয় সকল কাজ সম্পাদন করতেন। জাকাত প্রদান, দূত প্রেরণ, দূতদের অভ্যর্থনা, সেনাবাহিনী সংগ্রহ ছাড়া সকল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় প্রজ্ঞাসম্পন্ন সাহাবিদের মতামত নিয়ে নিষ্পত্তি করতেন। এই মসজিদেই তিনি প্রশাসনিক ও প্রাগ্রসর বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করতেন। ইসলাম-পূর্ব যুগের 'জোর যার মুল্লুক তার' রীতির অবসান ঘটিয়ে আল্লাহর নির্দেশিত অবকাঠামোর পরামর্শভিত্তিক একটি সুস্থ রাজনীতির ধারা বাস্তবায়িত করেন, যা বিশ্বের ইতিহাসে তাওহিদ আশ্রয়ী রাষ্ট্রতন্ত্র হিসেবে পরিজ্ঞাত।
মহানবি (স.) উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যাবশ্যক। এ উপলব্ধি থেকে ধনসম্পদ যাতে কারো কাছে অস্বাভাবিক পুঞ্জীভূত হতে না পারে সে উদ্দেশ্যে তিনি আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক জাকাত, সাদকা, খারাজ, জিযিয়া, গনিমত প্রভৃতি ধার্যকৃত কর রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে বিলি-বণ্টনের ব্যবস্থা। করেন। উপরন্তু তিনি রিবা বা সুদপ্রথা অবৈধ ঘোষণা করে চোরাচালানি, কালোবাজারি ও মুনাফাখোরি প্রভৃতি শান্তি বিনষ্টকারী সামাজিক অপরাধ বন্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করেন। তিনি রাষ্ট্রের অর্থ-সম্পদে জনসাধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত এবং দীন-দুঃখীদের সাহায্যের ব্যবস্থা করেন। মোটকথা মহানবি (স.) অর্থনৈতিক সংস্কারের যে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তা সমকালীন বিশ্বের কোনো উন্নত রাষ্ট্রে ছিল না।
ইসলাম-পূর্ব আরবের দুই একটি ব্যতিক্রমী গুণ ছাড়া সাংস্কৃতিক জীবন তেমন প্রশংসনীয় ছিল না। ভোগবাদী জীবনাচারে সিক্ত সমাজে চরম আড়ষ্টতা নেমে এসেছিল। মুহম্মদ (স.) ঐশী দ্যোতনায় ভরপুর শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন শুরু করেন। 'বিদ্বানের কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়ে পবিত্র' ঘোষণা দিয়ে সংস্কৃতির পরিমন্ডলে শিহরণ সৃষ্টি করেন। তাঁর উদ্দীপনায় শিক্ষা ও 'জ্ঞানচর্চায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে প্রাক-ইসলামি যুগের সংস্কৃতির বলয় পরিবর্তিত হয়ে তাওহিদভিত্তিক সংস্কৃতি সব আবিলতা দূর করে মানুষকে সত্যাশ্রয়ী ও মানবতাবাদী করে তোলে। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার ফলে মনোজগতে পবিত্রতার ধারা প্রবাহিত হয়।
মহানবি (স.)-এর জীবনের সর্বশেষ কৃতিত্ব হলো একটি ঐশীনির্ভর কল্যাণকামী জাতি ও রাষ্ট্র গঠন। তিনি ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধের সুমহান শিক্ষার মাধ্যমে তাদের সকল ভেদাভেদ ও দ্বন্দ্ব-কলহের অবসান ঘটান। গোত্রপ্রীতির পরিবর্তে তিনি তাদেরকে মানবতাবোধের মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ ধরে তোলেন। হিজরত করে তিনি মদিনায় আনসার ও মুহাজির মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধের সম্পর্ক স্থাপন করেন। ভ্রাতৃত্ববোধের ভিত্তিতে তাদের মধ্যে জাতীয় চেতনার বীজ উপ্ত হয়।
মদিনায় বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের লোকদের একটি সনদ বা লিখিত দলিল প্রদান করে তিনি একটি উম্মাহ বা অভিন্ন জাতি গঠন করেন। তাঁর এ পদক্ষেপ ফলপ্রসূ হয়েছিল এবং এক জাতিতত্ত্বের ধারণায় মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্রের সূত্রপাত ঘটেছিল। আবার, রাষ্ট্রের অখন্ডতা এবং জাতীয় চেতনার বিকাশে পারস্পরিক দায়বদ্ধতার শর্তও আরোপিত হয়েছিল সবার উপর। তার প্রতিটি কথায় ও কাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। পরধর্মে তিনি ছিলেন যেমন সহিষ্ণু, তেমনি পররাষ্ট্রসমূহের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল শান্তি ও সম্প্রীতির। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল তাঁর জাতি গঠন ও পররাষ্ট্রনীতির মূলকথা।
মহানবি (স.) জাতি গঠনে গণতন্ত্রায়ন এবং পরমত ও পরধর্মসহিষ্ণুতার এক অভিনব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। তিনি বিবদমান আরব গোত্রসমূহকে তাওহিদের মর্মবাণীতে দীক্ষিত করে এক কর্মনিষ্ঠ ও ত্যাগী জাতিতে পরিণত করেছেন। পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে তারা গণতন্ত্রের যে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন তাকে উপজীব্য করে তাঁর সাম্য ও শান্তির বাণী নিয়ে বিশ্বের সর্বত্র পদচারণা করেছেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, মহানবি (স.) আল্লাহর যে কোনো দায়িত্ব ও কর্তব্য অতীব সতর্কতার সাথে সুচারুরূপে পালন করেছেন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে আদর্শের ছাপ রেখে গেছেন। আল্লাহর তাওহিদ প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে জাতি, জনগোষ্ঠী ও বৈশ্বিক পরিমন্ডলে তাঁর প্রদর্শিত পথ ও আদর্শ বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে অনতিক্রম্য রয়ে গেছে। মহানবি (স.) মদিনায় হিজরত করে আদর্শ সমাজ গঠনের অনেকটা অনুকূল পরিবেশ প্রত্যক্ষ করে এবং প্রয়োজনের তাগিদে উল্লিখিত জাতি এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে মদিনায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে একটি সনদ বা লিখিত সংবিধান প্রদান করেন।
এই সনদের আলোকে মদিনায় একটি ব্যতিক্রমধর্মী এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থাও গড়ে তোলেন। শাসনকার্য পরিচালনার জন্য আমির ছাড়াও পৃথকভাবে বিচারকাজের জন্য কাজি নিয়োগ দেন। জাকাত ও সদকা, জিজিয়া, খারাজ ও গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ ও আলফে ইত্যাকার উৎস হতে রাজস্ব সংগৃহীত হতো। এছাড়া তাঁর শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ও সামরিক সংগঠন-চমৎকার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। ন্যায়নীতির প্রতিষ্ঠাতা মহানবি (স.) দূরদর্শী ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে সমাদৃত ছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা ও রাষ্ট্র নিরাপত্তার নানাদিক তাঁকে কল্যাণবহ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
হযরত মুহাম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.) - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

