- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- বাংলাদেশের স্বাধীনতা
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
স্বাধীন বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান
বাংলাদেশের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই স্বাধীনচেতা। যখনই তাদের স্বাধীনতা ও অধিকার হুমকিতে পড়েছে, তারা নানাভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। পাকিস্তান শাসনামলে বৈষম্য, বঞ্চনা এবং অগণতান্ত্রিক দুঃশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়েছে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষ প্রতিবাদী আন্দোলন শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালে এই ভূখণ্ডে অভূতপূর্ব গণজাগরণ ঘটে। ফলে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতন ঘটে। এই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ঘটনাবলি ১৯৭১ সালে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করে। স্বাধীন বাংলাদেশেও আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান
গণমানুষের প্রত্যাশা ছিল- স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে আইনের শাসন, গণতন্ত্র এবং সর্বজনীন মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু এই প্রত্যাশা স্বাধীন বাংলাদেশেও বারবার হোঁচট খেয়েছে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব সরকার সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থেমে যায়। রাজনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু হয়। এ সময় দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং গণতান্ত্রিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য খাল খনন কর্মসূচি ও ফসল বহুমুখিকরণ, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং বহুদলীয় গণতান্ত্রিক চর্চা পুনরায় চালুকরণ। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থব্যবস্থার পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক অর্থব্যবস্থা গ্রহণ করায় শিল্প উৎপাদন শক্তিশালী হয়। এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের পোশাক শিল্প কেন্দ্রিক রপ্তানি খাত গতি লাভ করে। ১৯৮১ সালের মে মাসে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করেন। ১৯৮১ সালের নভেম্বর মাসে দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ প্রেসিডেন্ট আব্দুস সাত্তারকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করেন।
বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও সুশাসনের ব্যর্থতাকে এরশাদ ক্ষমতা দখলের যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, দেশের ছাত্র-জনতা, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক দলসমূহ ও নাগরিক সমাজ তার ক্ষমতা গ্রহণকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। বিশেষ করে ছাত্রসমাজ প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে। রাজনৈতিক দলগুলো ধীরে ধীরে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন জোরদার করে। এর মধ্যে গঠিত হয় তিনটি রাজনৈতিক জোট। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট। পরে ১৫ দলীয় জোট ভেঙে গঠিত হয় ৫ দলীয় জোট। তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দলীয় জোট পুনর্গঠিত হয়। ২৪টি ছাত্রসংগঠন মিলে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য। এছাড়াও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ আরো কিছু রাজনৈতিক দল এ আন্দোলনে শামিল হয়। জেনারেল এরশাদের সময় যে কয়টি নির্বাচন হয় তার সবগুলোই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এছাড়াও তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদের কথা বলে ক্ষমতা দখল করেছিলেন কিন্তু তার শাসনামলে দুর্নীতি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তার শাসনের বৈধতা জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের কাছে সবসময়েই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং রাজপথে ছাত্রসমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলো জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলে। প্রায় নয় বছরের আন্দোলনে নুর হোসেন, নাজির উদ্দিন জেহাদ, ডা. শামসুল আলম খান মিলনসহ অনেকে জীবন দান করেন। ১৯৯০ সালে নভেম্বর-ডিসেম্বরে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে সরকার কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সামরিক বাহিনী তাকে রক্ষার জন্য জনগণের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগে অস্বীকৃতি জানায়। ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। এরশাদ বিরোধী তিনটি রাজনৈতিক জোটের রূপরেখা অনুযায়ী তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও শাসকগোষ্ঠীর পলায়ন
১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল একটি গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক সরকার প্রতিষ্ঠার গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অপেক্ষাকৃত সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়। অবশ্য এ সময় রাষ্ট্রপরিচালনাকারী সরকারসমূহের নানা বিচ্যুতি ও সুশাসনের অভাবে শাসন ব্যবস্থায় পুনরায় আস্থাহীনতা তৈরি হতে থাকে। ফলে ২০০৬ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশ আবার সংকটে পড়ে। ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে সেনাসমর্থিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এর দুই বছর পর ২০০৮ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে। ক্ষমতাসীন হয়ে শেখ হাসিনা সরকার স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার আকাঙ্ক্ষা থেকে ক্রমাগত কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতের মানুষের ওপর দমন নিপীড়ন শুরু করে।
একইভাবে দুর্নীতির প্রসার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করার মাধ্যমে দলীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সীমা ছাড়িয়ে যায়।
বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ, তরুণ শিক্ষার্থী এবং সাধারণ জনতা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। এর মধ্যেই শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনব্যবস্থা বাতিল করে। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে অস্বীকার করে। শুরু হয় নতুন সংকট। এভাবে ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালে নির্বাচনের পূর্বরাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে জনগণের সাথে প্রতারণা এবং ২০২৪ সালে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার রোডম্যাপ প্রণয়ন করে আওয়ামী লীগ। জনগণ তাদের ক্ষমতায় থাকার এই নীলনকশা প্রত্যাখ্যান করে। অগণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও জনগণ প্রতিবাদী আন্দোলন অব্যাহত রাখে।
এর ধারাবাহিকতায় সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা জুন ২০২৪ থেকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তোলে। এ আন্দোলন দমনে সরকারি দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর সাথে জুলুম-নির্যাতনে শরিক হয়। আন্দোলন চলাকালে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ নির্মম হামলা চালালে আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারী ছাত্র আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামে মোঃ ওয়াসিম আকরাম, মোঃ ফয়সাল আহমেদ শান্তসহ আরো কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। এ ঘটনায় সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এবং রাজপথে জন-আক্রোশের বিস্ফোরণ ঘটে। লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলন দমাতে সরকার মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ করতে থাকে। শত শত নিরস্ত্র ছাত্রজনতা আন্দোলনে শাহাদত বরণ করতে থাকে। সরকার আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনার সরকার যতো বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে থাকে, মানুষ ততো বেশি আন্দোলনে সম্পৃক্ত হতে থাকে। অবশেষে ৫ আগস্ট সরকারের পতন ঘটে এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এভাবেই ন্যায্যতার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রজনতার বিজয়ের মাধ্যমে ইতিহাসে নজিরবিহীন এক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। প্রমাণিত হয়, নিপীড়ক শাসক যতো শক্তিশালীই হোক গণপ্রতিরোধের মুখে তার পরাজয় অনিবার্য।
জাতিসংঘ গঠিত একটি তদন্ত দলের রিপোর্ট মতে, এই আন্দোলনের উত্তাল ৩৬ দিনে প্রায় দেড় হাজার মানুষ শাহাদাত বরণ করেন। এর মধ্যে ১২-১৩ শতাংশ ছিল শিশু। এ ছাড়াও হাজার হাজার মানুষ আহত হয়। জাতিসংঘ এই ঘটনাকে মানন্বতাবিরোধী অপরাধের সমপর্যায়ের অপরাধ (amount to crimes against humanity) হিসেবে চিহ্নিত করে। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের Office of the High Commissioner for Human Rights (OHCHR) এক প্রতিবেদনে এই হত্যাকাণ্ডকে 'brutal systematic oppression of protest' অর্থাৎ 'প্রতিবাদ কর্মসূচির উপর নিষ্ঠুর পদ্ধতিগত দমন-পীড়ন' হিসেবে অভিহিত করে। জনগণের বিরুদ্ধে যে অপরাধ সংগঠিত হয়েছিল তা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নেতৃত্বে ঘটেছে বলে জাতিসংঘ উল্লেখ করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি এবং আল-জাজিরা একাধিক প্রতিবেদনে চিহ্নিত করে যে, নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতি অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ
দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উল্লেখযোগ্য দিক
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের গুরুত্ব কয়েকটি দিক থেকে বিবেচনা করা যেতে পারে-
সামাজিক: এই আন্দোলনে সকল মত ও পথের শিক্ষার্থীরা গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদার দাবিতে অভূতপূর্ব ঐক্যের পরিচয় দেয়। প্রমাণিত হয় যে, দেশ এবং মানুষের অধিকার যখন হুমকির মুখে পড়ে মানুষ তখন দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীরের মতো প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সমাজের উপর বিগত দুঃশাসনের ফলাফল ছিল দীর্ঘমেয়াদি এবং ধ্বংসাত্মক। এসময় সমাজের সর্বস্তরে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে রাজনীতিক, পেশাজীবী এবং ব্যবসায়ীদের একটি ক্ষুদ্র স্বার্থগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। তারা প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল এবং অকার্যকর করে ফেলে। ফলে সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের পদে পদে হয়রানি এবং দুর্নীতির মুখোমুখি হতে হয়। এতে জনগণের একটি অংশ দুর্নীতিকে স্বাভাবিক হিসেবে ভাবতে থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থায় চিড় ধরে। অন্যদিকে সরকার সমাজের অভ্যন্তরে মানুষের মধ্যে নানা মুখী বিভাজন সৃষ্টি করে। ফলে সমাজের অভ্যন্তরীণ সংহতি দুর্বল হয়ে যায় এবং সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিবাদে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আন্দোলন সংগ্রামে নেমে পড়তে বাধ্য হয়। এজন্য দেখা যায়, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন পেশাজীবী ও শ্রমজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে। রাজনৈতিকদলসমূহও আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্দোলনের অগ্রণী শক্তি- স্কুল, মাদরাসা, কলেজ, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল স্তরের শিক্ষার্থীরা জীবনের মায়া ত্যাগ করে রাস্তায় নেমে এসে জীবন উৎসর্গ করেন।
এই অভূতপূর্ব ঐক্য ভবিষ্যতে সমাজের ঐক্য ও সংহতি আরো মজবুত করবে। সাথে সাথে এ আন্দোলনে সমাজের অন্যান্য অংশের সাথে গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব এবং রাজপথের আন্দোলনে নারীদের সক্রিয় ভূমিকা ছিলো চোখে পড়ার মতো। ইতোপূর্বে কোনো আন্দোলন সংগ্রামে এতো বিপুল সংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব দেখা যায়নি। এর একটি স্থায়ী প্রভাব সমাজের উপর পড়বে। আশা করা যায় যে, নারীরা সমাজের নেতৃত্বের মূলধারায় অধিক হারে যুক্ত হবেন।
রাজনৈতিক: ২০২৪ সালের শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিলেও আওয়ামীলীগ ও তার দোসররা ব্যতীত সমাজের সকল রাজনৈতিক শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে শরিক হয়। এই গণআন্দোলন নির্দেশ করে, স্বৈরশাসক যতো শক্তিশালীই হোক এ দেশের শিক্ষার্থী-তরুণ-সাধারণ মানুষ কোনো অবস্থাতেই স্বৈরশাসন এবং গণতন্ত্রহীনতা মেনে নেয় না। এই পরিবর্তনের একটি স্থায়ী সুফল সমাজ পেতে পারে। এই গণআন্দোলনের আরেকটি ব্যতিক্রমী দিক হচ্ছে দেশব্যাপী দেয়ালে দেয়ালে বিপুল পরিমাণ গ্রাফিতি বা দেওয়ালচিত্র অঙ্কন। সেসব গ্রাফিতিতে বাংলাদেশের মানুষের চিরায়ত অধিকার চেতনা, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবিক ভাবনা, ইনসাফ, জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় সংহতির চেতনা ফুটে ওঠে। এই গণআন্দোলনের ফলে জনগণের মধ্যে যে অধিকার সচেতনতা তৈরি হয়েছে তার ফলে জনগণ ভবিষ্যতের যেকোনো সরকারকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন মেনে চলতে বাধ্য করবে। এতে শাসন ব্যবস্থা এবং নাগরিক সেবার উন্নয়ন ঘটবে।
অর্থনৈতিক: শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদি শাসনের অর্থনৈতিক ফলাফল ছিল দীর্ঘমেয়াদে ধ্বংসাত্মক। অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার শেখ হাসিনা ও তার নিকট সহযোগীদের সম্পদ পাচার, দুর্নীতি এবং আর্থিক ক্ষেত্রে লুটপাটের প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য একটি কমিশন গঠন করে। তাদের রিপোর্টে দেখা যায়, বিগত ষোল বছরে দেশ থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে বছরে ষোল বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ বিভিন্নরূপে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। শেখ হাসিনা এবং তার দুঃশাসনের সহযোগীদের অপশাসন ও দুর্নীতি যে সমাজ ও রাষ্ট্রকে কতটা ভয়াবহরূপে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তার প্রমাণ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি, আল জাজিরা, দি গার্ডিয়ানে প্রকাশিত হয়েছে। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি 'চোরতন্ত্র' (Kleptocracy) কায়েম করেছিল। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও ভঙ্গুর করে দেয়। ব্যাংক, বীমা, ব্যাংক বহির্ভুত আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে জাতীয় জীবনের আর্থিক অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান নিছক কোন সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা নয়। বরং এটা বাংলাদেশিদের জাতীয় জীবনের নতুন নাগরিক চেতনার উন্মেষ। এই চেতনার সারমর্ম হলো গণতন্ত্র, সাম্য, সামাজিক ন্যায় বিচার ও মানবিক মর্যাদা। এর মধ্য দিয়ে জনগণের এমন এক দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে যার মাধ্যমে মানুষ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা আর কখনই স্বৈরাচার, দুঃশাসন, জুলুম এবং নিপীড়নের কাছে পরাভব মানবে না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা - অনন্যা প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

