- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- উমাইয়া খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা
৬৬১ সালে মুয়াবিয়া দামেস্কে উমাইয়া খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগে ৬৬০ সালে তিনি অবৈধভাবে মক্কা ও মদিনায় সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন ও তাঁর পক্ষে এ অঞ্চলের জনগণের সমর্থন জোরপূর্বক আদায় করেন। হযরত আলী ৪,০০০ সৈন্য প্রেরণের মাধ্যমে পুনরায় মক্কা ও মদিনার আনুগত্য লাভ করেন। এরূপ ঘটনা প্রবাহের এক পর্যায়ে শান্তিপ্রিয় খলিফা মিশর ও সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব হযরত মুয়াবিয়া (রা.) কে ছেড়ে দেওয়ার শর্তে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হন। তাঁরা উভয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থানে থাকার স্বীকার করেন।
৬৬১ সালের ২৭ জানুয়ারি চতুর্থ খলিফা হযরত আলী রাজধানী কুফায় শাহাদত বরণ করেন। কুফাবাসী ইমাম হাসানকে পরবর্তী খলিফা হিসাবে মনোনীত করে। মক্কা ও মদিনাও হযরত হাসানের আনুগত্য স্বীকার করে।
হযরত আলী (রা.)-এর সাথে সংঘটিত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে হযরত মুয়াবিয়া (রা.) কুফা দখলের জন্য সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন। ফলে ইমাম হাসান ও মুয়াবিয়া (রা.) এর মধ্যে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ইমাম হাসান পরাজিত হন এবং সপরিবারে পারস্যে চলে যান। পরবর্তীতে একটি চুক্তির পর ইমাম হাসান হযরত মুয়াবিয়া (রা.) এর অনুকূলে খেলাফতের স্বত্ত্ব ত্যাগ করেন এবং মদিনায় সপরিবারে বসবাস শুরু করেন। এভাবে হযরত মুয়াবিয়া (রা.) সারা মুসলিম জাহানের ক্ষমতা দখল করে ইসলামি খেলাফতের পরিবর্তে উমাইয়া খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। এর পর উমাইয়া বংশ পর্যায়ক্রমে ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত (দীর্ঘ ৯০ বছর) মুসলিম জাহান শাসন করে।
উমাইয়া খেলাফতের বৈশিষ্ট্য (Feature of The Umayyad Khilafat)
রাজতন্ত্র: মুয়াবিয়া (রা.) খলিফা হয়ে স্বীয় পুত্র ইয়াজিদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করলে ইসলামি গণতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর সময় হতে ক্ষমতাসীন খলিফা তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকারী মনোনীত করতেন এবং সাম্রাজ্যের গণ্যমান্য লোকেরা তাঁর সম্মুখে আনুগত্যের শপথ নিতেন, প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ ভাবী খলিফার পক্ষে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিকট হতে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করতেন। এভাবে উমাইয়া খলিফাগণ জনমতের উপর গুরুত্ব না দিয়ে ইচ্ছামতো উত্তরাধিকারী মনোনীত করতেন। নির্বাচনের পরিবর্তে এ মনোনয়ন প্রথা প্রবর্তন ইসলামি সাধারণতন্ত্রের আদর্শের মূলে কুঠারাঘাত করেছিল। ঐতিহাসিক মুইর বলেন, "মুয়াবিয়া (রা.)-এর দামেস্কের সিংহাসনে উপবেশন খিলাফতের সমাপ্তি ও রাজতন্ত্রের সূচনা করে।"
মজলিস-উস-সূরার বিলুপ্তি: উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠার ফলে মজলিস-উস-সূরা দ্বারা খলিফা নির্বাচনের পদ্ধতি বন্ধ হয়ে যায়। খলিফা নির্বাচনে মজলিস-উস-সূরার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এটি ছিল স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্তরায়। সর্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত না হলেও গণতান্ত্রিক আদর্শপুষ্ট মজলিসের একটি নির্বাচকমন্ডলী দ্বারা খলিফা নির্বাচিত হতো এবং রাষ্ট্রের কার্যকলাপ পরামর্শক্রমে সম্পন্ন করা হতো। কিন্তু মুয়াবিয়া খলিফা হয়ে মজলিস-উস-সূরার বিলোপসাধন করেন। খলিফা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হলেন, রাজ্য পরিচালনায় জনসাধারণের অংশগ্রহণ অথবা সমালোচনা করার অধিকার রইল না।
খলিফাদের মর্যাদা লোপ ৬৩২ থেকে ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত খলিফাগণ ধর্মীয় ও পার্থিব ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। খলিফাগণকে ধর্মীয় প্রধানের মর্যাদা দেওয়া হতো। ফলে 'খলিফা' পদের প্রদি জনসাধারণের ধর্মীয় আবেগ জড়িত ছিল। কিন্তু রক্তাপাতের মাধ্যমে হযরত মুয়াবিয়া (রা)-এর ক্ষমতা গ্রহণ ও ইসলামি আদর্শ থেকে বিচ্যুতির কারণে খলিফা পদ শুধু রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদায় নেমে আসে। তবে উমাইয়া বংশের ১৪ জন খলিফার মধ্যে শুধু ওমর বিন আব্দুল আজিজ তাঁর শাসনামলকে ইসলামের চার খলিফার সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। হযরত মুয়াবিয়া (রা) খোলাফায়ে রাশেদীনের চারিত্রিক আবেগিক বৈশিষ্ট্য থেকে সরে এসে খেলাফতের মর্যাদার যে ক্ষতি করেছেন, তা আজ পর্যন্ত অপূরণীয় থেকে গেছে। P.K. Hitti তাঁর, History of the Arabs গ্রন্থে বলেন, "The hereditary principle was there introduced into the Caliphat succession never there after to be entirely abandoned." অর্থাৎ, এই যে বংশপরস্পরা রক্ষার নীতি খলিফার উত্তরাধিকারী স্থির করার ক্ষেত্রে চালু হলো তা কিন্তু কখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। খিলাফত উমাইয়া ও আব্বাসীয়দের হাত ধরে সর্বশেষে অটোমান তুর্কিদের হাতে আসে। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চে জাতীয় সংসদে তুরস্ক প্রজাতান্ত্রিক দেশ ঘোষণা করার সাথে সাথে খেলাফতের চূড়ান্ত পতন ও বিলুপ্তি হয়।
বায়তুলমাল রাজপরিবারের ব্যক্তিগত সম্পদ মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্য দিয়ে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে পরবর্তী খলিফাগণ বায়তুলমালকে জনগণের সম্পদের পরিবর্তে রাজপরিবারের ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করেন। উমাইয়া খলিফা উমর-বিন-আব্দুল আজিজ ব্যতীত সকল খলিফা বায়তুলমালকে ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করে ইচ্ছামাফিক খরচ করতেন। এ অর্থ খলিফা পরিবারের বিলাস-ব্যসনে ব্যয়িত হতে থাকে।
ধর্মীয় মর্যাদা লোপ: রাজতন্ত্রের আবির্ভাবের পূর্বে হযরত মুহম্মদ (স.) ধর্মীয় ও পার্থিব ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। খলিফা ও তাঁর প্রাদেশিক শাসকবৃন্দ জনসাধারণের কাছে অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। কিন্তু উমাইয়া আমলে বিভিন্ন অনৈসলামিক কার্যাবলি প্রচলিত হয়ে রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনকে কলুষিত করে তোলে, ফলে রাষ্ট্রীয় কার্যাবলি হতে ধর্মীয় অনুশাসন লোপ পায়। ঐতিহাসিক ভনক্রেমার বলেন, "খলিফাদের দরবারে বিলাসিতা অবাধ গতিতে চললে এটি প্রথম খলিফাদের সারল্যের পরিপন্থী ছিল।" ধর্মের নামে অধর্ম, সততার নামে অসাধুতা, নিরপেক্ষতার পরিবর্তে স্বজনপ্রীতি প্রভৃতি উমাইয়া দরবারে স্থান পায়।
গোত্রীয় কলহ পুনরুজ্জীবন হযরত মুহম্মদ (স.)-এর শিক্ষার আদর্শের প্রভাবে যাবতীয় বর্ণ বৈষম্য নির্মূল হয়েছিল এবং খুলাফায়ে রাশেদিনের চার খলিফা তা কঠোরভাবে অনুসরণ করেন। কিন্তু উমাইয়া খলিফাদের আমলে স্বীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য এক গোত্রকে অন্য গোত্রের বিরুদ্ধে লাগিয়ে রাখা হতো। এক গোত্রকে বেশি সুযোগ দেয়া হতো অন্যদেরকে বঞ্চিত করা হতো। হিমারীয় ও মুদারীয় গোত্রের দ্বন্দ্বে ইন্ধন জুগিয়ে পুনরুজ্জীবিত করা হয়।
জাতিগত প্রাধান্য স্থাপন: ইসলাম বিশ্বভ্রাতৃত্ব শিক্ষা দেয়। ইসলামে জাতিগত প্রাধান্যের পরিবর্তে ব্যক্তির যোগ্যতা ও মেধানুসারে সরকারি কার্যে নিয়োগ দান করা হতো। কিন্তু উমাইয়াদের আমলে জাতিগত প্রাধান্যের উপর জোর দেওয়া হতো। উচ্চ রাজকার্যে আরব মুসলমানদের নিয়োগ দান করা হতো। অনারব মুসলমানদের অবহেলা করা হতো। ঐতিহাসিক ওয়েল হাউসেন বলেন, "উমাইয়া খিলাফত ছিল আরবদের দ্বারা গঠিত এবং আরবদের জন্য। আরবরা শাসকগোষ্ঠী গঠন করে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা একচেটিয়া টিয়া করে নিয়েছিল।"
মদিনার প্রাধান্য বিলোপ উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর ইসলামের প্রাণকেন্দ্র মদিনার প্রাধান্য বিলুপ্ত হয়ে দামেস্কে নব প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আরনল্ডের মতে, "মদিনায় ইসলামের ধর্ম, আইন এবং রাজনীতি সংক্রান্ত বিধি-ব্যবস্থা প্রচলিত হয়। কিন্তু আরবের বাইরে ইসলাম বিস্তৃত হলে এ সমস্ত বিধি-ব্যবস্থার প্রয়োগ শুরু হয়।"
খলিফাদের আড়ম্বরহীন জীবনযাত্রার অবসান: উমাইয়া খলিফারা ইসলামি সোনালি যুগের খলিফাদের অনাড়ম্বর জীবন প্রণালি ত্যাগ করে বিলাসী পোশাক ও দেহরক্ষী দ্বারা বেষ্টিত থাকত। চাকচিক্যময় দরবার ও বাসগৃহ স্থাপন করে বিলাসী জীবনযাপন করতে থাকে। এ সম্বন্ধে ঐতিহাসিক ভনক্রেমার বলেন, "খলিফাদের দরবারে বিলাসিতা অবাধ গতিতে চলত। এটি প্রথম খলিফাদের পরিপন্থী ছিল।"
স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা: উমাইয়া শাসন ব্যবস্থা ইসলামি গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়। ইসলামের মহান আদর্শ হতে বিচ্যুত হয়ে উমাইয়া খলিফাগণ নিজের ইচ্ছায় কাজ করতেন। মজলিস-উস-সূরার বিলোপ ঘটিয়ে জনগণের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে নিজ খেয়াল মোতাবেক শাসনকার্য চালাতে থাকে।
অনৈসলামিক কার্যাবলি: উমাইয়া শাসনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো বিভিন্ন অনৈসলামিক কার্যকলাপের অনুপ্রবেশ। মধ্যপান, না-গান, জুয়া খেলা, ঘোড় দৌড় অনৈতিক কার্যকলাপ ইত্যাদিতে মুসলিম সমাজ কলুষিত হতে থাকে। জাঁকজমকপূর্ণ জীবন, বিলাসিতা, অপব্যয় ইত্যাদি নিয়মে পরিণত হয়। খলিফা ও প্রাদেশিক গভর্নরদের চরিত্র সকল নিন্দার ঊর্ধ্বে থাকা উচিত; কিন্তু তাদের চরিত্র সমালোচনার উর্ধ্বে ছিল বলে জোর দিয়ে বলা যায় না।
পরিশেষে বলা যায়, খোলাফায়ে রাশেদীনের আমল ও উমাইয়া শাসনামল তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে চারিত্রিক আচরণিক ও আদর্শিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। উমাইয়া আমলের সঙ্গে জাহেলিয়া আমলের ঘনিষ্ঠতা, পারস্পরিক যুদ্ধ, অস্থির সামাজিক, আর্থিক অবস্থা এ সবকিছুই সেই উমাইয়া যুগে সামাজিক ও ধর্মীয় জাগরণের বিরুদ্ধে কাজ করেছিল। উমাইয়াদের শাসনের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করতে গিয়ে ভন ক্রেমার যথার্থই বলেছেন, "Luxury had become rampant at the court of the caliphs. It stood in blodest contrast to the simplicity of the first caliphs." অর্থাৎ, উমাইয়া আমলে পূর্বেকার শাসনীতি, আদর্শ, প্রকৃতি সকলই আমূল পরিবর্তিত হয়ে যায়।
উমাইয়া খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

