- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- উমাইয়া খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
খলিফা আল-ওয়ালিদ-বিন-আব্দুল মালিক (৭০৫-৭১৫ খ্রি.)
খলিফা আল-ওয়ালিদের রাজত্বকাল আরব সাম্রাজ্য বিজয়ের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ। মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাসে আল-ওয়ালিদের রাজত্বকাল এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর স্বল্পকালীন শাসনব্যবস্থায় মুসলিম সাম্রাজ্য ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়। ঐতিহাসিক উইলিয়াম মুইর বলেন, "The reign of Al-Walid was glorious both at home and abroad." অর্থাৎ "আল-ওয়ালিদের রাজত্বকাল দেশ ও বিদেশে খুবই গৌরবময় ছিল।" rious we
আল-ওয়ালিদের ক্ষমতা লাভ
পিতা আব্দুল মালিকের মৃত্যুর পর তার সুযোগ্য পুত্র আল-ওয়ালিদ ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া সাম্রাজ্যের ক্ষমতা লাভ করেন। ওয়ালিদের ক্ষমতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে আরব সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সংযোজন হয়। হযরত উমর (রা.) ও উসমানের রাজত্বকালে যে বিজয় শুরু হয় তাও খালিদের সময় পরিপূর্ণতা লাভ করে। কারণ আল-ওয়ালিদ ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দ হতে ৭১৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের অধিকাংশ এলাকা জয় করে মুসলিম সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ ঘটান। আল-ওয়ালিদের রাজ্য জয় সম্পর্কে ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, "আব্দুল মালিক এবং আল-ওয়ালিদের অধীনে আরব মুসলিম সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হলো।"
খিলাফতের সম্প্রসারণ
আল-ওয়ালিদ সিংহাসনে আরোহণ করে পিতার বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করেন। অভ্যন্তরীণ গোলযোগ দমন করে তিনি সেনানায়কদের নেতৃত্বে ইসলামি সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ ঘটান। বস্তুত আল-ওয়ালিদের রাজত্বকাল আরব সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত।
পূর্ব ও মধ্য এশিয়া বিজয় আল-ওয়ালিদ পূর্বাঞ্চলীয় শাসনকর্তা হাজ্জাজ-বিন-ইউসুফের পরামর্শে মধ্য এশিয়ার শাসনকর্তা ইয়াজিদ-বিন-মুহাল্লিবকে পদচ্যুত করে ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে কুতায়বাকে মধ্য এশিয়ার শাসক নিয়োগ করেন। তুর্কিদের উৎপাত কথ এবং হৃতরাজ্য পুনরাধিকার করার জন্য হাজ্জাজ ৫৪,০০০ সৈন্যের একটি বাহিনীসহ কুতায়বাকে মধ্য এশিয়ায় প্রেরণ করেন। প্রথমে তিনি বলখ ও তুখারিস্তানের শাসনকর্তাকে পরাজিত করে খলিফার বশ্যতা স্বীকার করান এবং নিয়মিত কর দানে বাধ্য করেন। বোখারা দখল করে ৭১০ খ্রিস্টাব্দে তিনি আমু নদী (Oxus) অতিক্রম করে খাওয়ারিজমের শাহকে পরাজিত করে খলিফার বশ্যতা স্বীকার করান। অতঃপর তিনি সমরখন্দ, শাশ ও ফারগানা দখল করে ৭১৩ খ্রিষ্টাব্দে চীন সীমান্তে পৌঁছান। ঐতিহাসিক আত তাবারী বয়েন, "কুতায়বা কাশগড় জয় করে মূল চীন ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছিলেন।" তারাবীর এ মন্তব্য ভুল, কারণ এসব এলাকা পরবর্তীতে বিজিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক আমীর আলী বলেন, "কুতায়বা একজন সুযোগ্য সমরবিদ এবং সুদক্ষ সেনাপতি ছিলেন। মধ্য এশিয়ায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠায় তার দান অপরিসীম।"
মুসলমানদের সিন্ধু বিজয় ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে আল-ওয়ালিদের সম্মতিক্রমে তরুণ সেনাপতি মুহম্মদ বিন কাশিম সিন্ধু অভিযান এর মাধ্যমে ভারতে মুসলিম সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করেন।
সিন্ধু বিজয়ের কারণ: সিন্ধু বিজয়ের কারণগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো:
১. মুসলমানদের সম্প্রসারণ নীতি: উমাইয়া খলিফা আল ওয়ালিদের রাজত্বকালে মুসলমানগণ ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক কারণে রাজ্য বিজয়ের উচ্চাভিলাসী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাই মুসা ও তারিকের নেতৃত্বে স্পেন অভিযান প্রেরণ করেন। এ অভিযান সফল হলে এতে উৎসাহী হয়ে সিন্ধু অভিযানেরও পরিকল্পনা করেন। ড. অতুর চেন্দ্ররায় বলেন, "ভারতের বাইরে সামরিক সাফল্য আরবগণকে রাজ্যগ্রাসী করেছিল এবং ভারতে আক্রমণের পশ্চাতে আরবদের লক্ষ্যই ছিল রাজবিস্তার।"
২. সিন্ধুর রাজা দাহির কর্তৃক পারস্যবাসীকে সাহায্য দান: আরবগণ যখন পারস্য আক্রমণ করে তখন সিন্ধুর রাজা দাহির সৈন্য দ্বারা পারস্যবাসীকে সাহায্য করেছিল। সিন্ধুর রাজার এই শত্রুতামূলক আচরণে হাজ্জাজ-বিন-ইউসুফ ক্ষুদ্ধ হয়ে সিন্ধু অভিযান পরিচালনা করেন।
৩. সিন্ধুর রাজা কর্তৃক আরব বিদ্রোহীদের আশ্রয়দান: ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ-বিন-ইউসুফের কঠোর শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে কিছুসংখ্যক আরববিদ্রোহী সিন্ধুতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। হাজ্জাজ তাদের ফেরত চাইলে রাজা দাহির তাদের ফেরত দিতে অস্বীকার করে। ফলে তাকে সমুচিত শান্তিদানের জন্য হাজ্জাজ সিন্ধু আক্রমণ করেন।
৪. হাজ্জাজ-বিন ইউসুফের উচ্চাকাঙ্ক্ষা হাজ্জাজ ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ। তাই নতুন দেশ জয়ের বাসনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে হাজ্জাজ ভারতে মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তারের চিন্তা করেন। ফলে সিন্ধু আক্রমণ করার জন্য মুহম্মদ-বিন-কাসিমকে সসৈন্যে প্রেরণ করেন।
৫. অরক্ষিত সীমান্ত: ৬৪৩-৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে আবদুল্লাহ-বিন-আমর-বিন-রাবী বেলুচিস্তানের পশ্চিমাঞ্চল মেকরান অধিকার করলে আরবীয় সাম্রাজ্য সিন্ধু রাজ্যের অতি সন্নিকটে এসে পড়ে। ফলে মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমান্ত অরক্ষিত থাকার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এজন্য মুসলমানরা সিন্ধুতে অভিযান পরিচালনা করে।
৬. ইসলাম প্রচারের আকাঙ্ক্ষা ইসলামের সম্প্রসারণের জন্য মুসলিম খলিফাগণ বিশেষ এবং উমাইয়া খলিফাগণ ভারত জয়ের সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। খলিফারা মনে করতেন, দেশ জয় করে ইসলামের সম্প্রসারণ একটি ধর্মীয় কর্তব্য ও দায়িত্ব। এটাও সিন্ধু জয়ের অন্যতম কারণ।
৭. সিন্ধু আক্রমণের প্রত্যক্ষ কারণ সিংহলের রাজা কর্তৃক প্রেরিত খলিফা আল-ওয়ালিদকে কিছু মূল্যবান উপঢৌকন ও মুসলিম সওদাগরদের বাণিজ্যিক সম্ভার ভর্তি আটখানা বাণিজ্য জাহাজ সিন্ধুর দেবল কন্দর অতিক্রম করার সময় জলদস্যুদের দ্বারা লুণ্ঠিত হয়। হাজ্জাজ-বিন-ইউসুফ রাজা দাহিরের নিকট লুণ্ঠিত জাহাজের ক্ষতিপূরণ ও জলদস্যুদের শাস্তি দানের দাবি করলে রাজা দাহির ক্ষতিপূরণ বা দস্যুদের শাস্তি দানে অস্বীকার করে। রাজা দাহিরের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যবহারের জন্য হাজ্জাজ সিন্ধু আক্রমণের নির্দেশ দেন।
সিন্ধু বিজয়ের ঘটনা: পূর্বাঞ্চলীয় গভর্নর হাজ্জাজ উবায়দুল্লাহ ও বুদায়েলের নেতৃত্বে পর পর দুটি অভিযান প্রেরণ করে ব্যর্থ হন। অতঃপর ক্রুদ্ধ হয়ে হাজ্জাজ ১৭ বছরের তরুণ মুহম্মদ-বিন-কাশিম-এর নেতৃত্বে ৬,০০০ সিরীয় অশ্বারোহী, ৬,০০০ উট্রারোহী এবং ২,০০০ ভারবাহী পশুর সমন্বয়ে এক সুসংগঠিত বাহিনী নিয়ে সিন্ধু আক্রমণ করেন। ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে রাওয়ার নামক স্থানে রাজা দাহির অসংখ্য রণহস্তী, অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে মুসলিম সৈন্যের সম্মুখীন হন। তুমুল যুদ্ধে রাজা দাহির পরাজিত ও নিহত হন। অতঃপর ৭১৩ খ্রিষ্টাব্দে মুসলমানগণ মুলতান জয় করে ভারতে' মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
সিন্ধু বিজয়ের ফলাফল: আরবদের সিন্ধু বিজয়ের ফলাফল ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইংরেজ ঐতিহাসিক টন্ড তাঁর 'রাজস্থানের ইতিহাস' গ্রন্থে আরবদের সিন্ধু বিজয়ের ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু আধুনিক ও ঐতিহাসিকগণ তাঁর এ মন্তব্যকে অযৌক্তিক বলে মনে করেন। ঐতিহাসিক স্টেনলী লেনপুল বলেন, "The Arab Conquest of Sind was an episode in the history of India and of Islam a triumph without result", অর্থাৎ আরবদের সিন্ধু বিজয় পাক-ভারত এবং ইসলামের ইতিহাসে একটি উপাখ্যান মাত্র; এটি একটি নিষ্ফল বিজয় মাত্র।" ড. ঈশ্বরী প্রসাদের মতে, "এটি একটি অকিঞ্চিৎকর ঘটনা।" রাজনৈতিক দিক থেকে চিন্তা করলে লেনপুল ও ঈশ্বরী প্রসাদের মন্তব্যকে অনেকটা সত্য বলে মনে হবে। কারণ তাঁর এ বিজয় মুলতান ছাড়া অন্য কোনো এলাকায় রাজনৈতিক প্রভুত্ব বিস্তার করে নি। সিন্ধু বিজয়ের রাজনৈতিক গুরুত্ব কম হলেও সামাজিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হিন্দু-মুসলিম মিলনে ভারতে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়। ইসলামের মহান বাণীতে মুগ্ধ হয়ে নির্যাতিত হিন্দুগণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। আরবীয় সওদাগরগণ এদেশে বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা লাভ করে, ফলে ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে।
আফ্রিকা বিজয়: আল-ওয়ালিদ ৭০৮ খ্রিষ্টাব্দে উত্তর আফ্রিকার শাসনকর্তা হাসান বিন নোমানের পরিবর্তে মুসা-বিন-নুসাইরকে নিয়োগ করেন। এ সময় রোমানদের উস্কানিতে বার্বারগণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে মুসা তাদেরকে দমন করেন এবং সমগ্র উত্তর আফ্রিকা হতে রোমানদের বিতাড়িত করেন। ফলে মরক্কো ও তাঞ্জিয়াসহ সমগ্র আফ্রিকাতে মুসলিম শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। বহু বার্বার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তাদের সহায়তায় আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে পশ্চিম জগতে খ্যাতি লাভ করেন।
ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ বিজয়: ভূমধ্যসাগরের দ্বীপসমূহ হতে রোমান খ্রিষ্টানগণ আরব উপনিবেশগুলোতে মাঝে মাঝে আক্রমণ করত। সেনাপতি মুসা দ্বীপগুলোকে দখল করার জন্য নৌবাহিনীসহ আক্রমণ চালিয়ে মেজকা, মিনকা, আইভিকা দ্বীপগুলো দখল করে মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
এশিয়া মাইনর বিজয়: আরবগণ যখন সিন্ধু বিজয়ে ব্যস্ত ঠিক সেই মুহূর্তে খ্রিষ্টানগণ এশিয়া মাইনরে আক্রমণ চালিয়ে মুসলিম সাম্রাজ্যে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। সেনাপতি মুসায়লামার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী এশিয়া মাইনরে আক্রমণ চালিয়ে খ্রিষ্টানদের নিকট হতে টায়ার ও কাস্পিয়ান অঞ্চলের এক অংশ দখল করেন। অতঃপর মুসলিমগণ আর্মেনিয়ার কিছু অংশ করতলগত করেন।
আরবদের স্পেন বিজয়ের কারণ আফ্রিকার গভর্নর মুসা তার সুযোগ্য সেনাপতি তারিকের নেতৃত্বে স্পেন বিজয় করেন। স্পেন বিজয়ের কারণগুলো রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থায় বিভক্ত করে নিম্নে আলোচনা করা হলো:
১. রাজনৈতিক অবস্থা সমগ্র স্পেন কতিপয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। সে সময় স্পেনের রাজা ছিল গথিকবংশীয় খ্রিষ্টান রাজা রডারিক। তিনি অত্যন্ত দুর্নীতিপরায়ণ শাসক ছিলেন। রডারিকের কুশাসনে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে মুসলিম আফ্রিকায় আশ্রয় নেয়। রাজ্যগুলোর শাসনকর্তাগণ একে অন্যের সঙ্গে সবসময় দ্বন্দ্ব-কলহে লিপ্ত হয়। এ অবস্থায় মুসলিম সেনাপতি ও শাসক মুসাকে নির্যাতিত খ্রিষ্টানগণ স্পেন আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানান।
২. সামাজিক অবস্থা: স্পেনের সামাজিক অবস্থা শোচনীয় ছিল। সমাজে তিন শ্রেণির লোক বাস করত (ক) অভিজাত সম্প্রদায় (খ) মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় (গ) নিম্নবিত্ত শ্রেণি। অভিজাত সম্প্রদায় ছিল বিলাসপ্রিয় এবং তারা ছিল সমাজের নেতৃস্থানীয়। নিম্নশ্রেণি ছিল কৃষক ও ক্রীতদাস, তাদের ভাগ্য অভিজাত শ্রেণির হাতে ছিল। ঐতিহাসিক আমির আলী বলেন, "ভূমিদাস হোক বা ক্রীতদাস হোক মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তাদের স্বাধীনতা লাভ বা মুক্ত সূর্যালোক ভোগ করার কোনো আশা ছিল না।" এক কথায় বলতে গেলে সমাজে তখন অসাম্য, অনাচার ও অত্যাচার পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান। মূলত অর্থলোভী অধঃপতিত খ্রিষ্টান বিশপরা এবং বিলাসী হৃদয়হীন ভূস্বামীরা সমগ্র স্পেন শোষণ করছিল।
৩. অর্থনৈতিক অবস্থা: সমগ্র স্পেনের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল দুর্গতিপূর্ণ ও হতাশাব্যঞ্জক। অভিজাত শ্রেণি ছাড়া সমগ্র জাতি ছিল আর্থিক বিপর্যয়ের চরম সীমায়। অতিরিক্ত করের বোঝা হতে মুক্তি লাভের জন্য তারা চেষ্টা করত।
৪. ধর্মীয় অবস্থা: সমগ্র স্পেনে খ্রিষ্টান ও ইহুদি ধর্মের লোক বাস করত। তবে খ্রিষ্টানদের অত্যাচারে ইহুদিরা হয় খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে নিষ্কৃতি পেত, না হয় সেবা দাসের জীবনযাপন করত। তাদের জোরপূর্বক খ্রিস্টান দাস-দাসীর সাথে বিবাহ দেয়া হতো। ফলে সমগ্র স্পেনে ধর্মীয় কোনো স্বাধীনতা ছিল না।
স্পেন আক্রমণের প্রত্যক্ষ কারণ: রাজা রডারিকের কুশাসনে স্পেনবাসী যখন নিপীড়িত ও অত্যাচারিত তখন অতিষ্ঠ জনগণ মুক্তির অপেক্ষায় দিন গুণতে ছিল, ঠিক সেই সময় বহু অত্যাচারিত স্পেনবাসী মুসলিম আফ্রিকায় আশ্রয় নিয়েছিল। স্পেন আক্রমণের জন্য সেই মুহূর্তে সিউটা দ্বীপের শাসনকর্তা কাউন্টজুলিয়ানের আমন্ত্রণ ও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেয়ে মুসলিম সেনাপতি ও শাসক মুসা, খলিফা আল-ওয়ালিদের অনুমতিক্রমে তরুণ সেনাপতি তারিককে স্পেন আক্রমণের জন্য প্রেরণ করেন।
স্পেন বিজয়ের ঘটনা: ইফ্রিকিয়ার প্রশাসক মুসার নির্দেশক্রমে সেনাপতি তারিক কিছু বার্বার উদ্যমশীল তরুণসহ সাত হাজার সৈন্য ও রণতরী নিয়ে স্পেন আক্রমণ করেন।
সেনাবাহিনীকে চার ভাগে বিভক্ত করে প্রথম দলটি কর্ডোভার দিকে, দ্বিতীয়টি মালাগার দিকে এবং তৃতীয়টি গ্রানাডার দিকে এবং অপরটি নিয়ে স্বয়ং নিজে টলেডো আক্রমণ করেন।
তারিকের অসাধারণ সাফল্যের সংবাদ পেয়ে মুসা ১৮,০০০ সৈন্য নিয়ে স্পেনে অবতরণ করেন। মুসা একে একে সেভিল ও মেরিবা দখল করে তারিকের সঙ্গে মিলিত হন। যদিও কিছু মনোমালিন্য ঘটার আশঙ্কা ছিল কিন্তু মুসা ও তারিক সাক্ষাৎ লাভের পর সম্মিলিতভাবে সারাগোসা, টেরাগোনা ও বার্সিলোনা দখল করেন। রাজা রডারিক মুসলিম আক্রমণের সংবাদ পেয়ে ১,২০,০০০ সৈন্যসহ গোয়াডিলেট নদীর তীরে মেডিনা-সিডোনিয়া রণক্ষেত্রে মুসলিম বাহিনীর সম্মুখীন হন। ইতোমধ্যে মুসার প্রেরিত আরও ৫,০০০ সৈন্য পেয়ে তারিক সপ্তাহকাল যুদ্ধ চলার পরে ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে রডারিককে গোয়াডিলেট (Goadillete) যুদ্ধে পরাজিত করেন।
এ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে স্পেনবাসী দুর্বল হয়ে পড়ে। মুসলমানগণ অতি অল্প সময়ে সিডোনিয়া, কারমোনা এবং ইসিজাসহ অধিকাংশ শহর দখল করে নেয়। এ সময়ে মুসলমানগণ পর্তুগাল জয় করে তার নাম রাখেন "আল গারব"। মুসা ফ্রান্স জয় করার জন্য অগ্রসর হলে আল-ওয়ালিদের এক আদেশ তাকে কার্য হতে নিবৃত্ত করে। তবে স্পেন পরিত্যাগের পূর্বে মুসা তাঁর পুত্র আব্দুল আজিজকে নতুন প্রদেশের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, "যুদ্ধের ক্ষিপ্রগতিশীলতা এবং বিজয়ের পূর্ণ সাফল্যের জন্য স্পেন অভিযান মধ্যযুগের সামরিক ইতিহাসে অনুপম স্থান অধিকার করে।"
স্পেন বিজয়ের ফলাফল নিম্নে মুসলমানদের স্পেন বিজয়ের ফলাফল আলোচনা করা হলো:
নবযুগের সূচনা: আরবদের স্পেন বিজয় ছিল এ উপদ্বীপে এবং মধ্যযুগের ইউরোপীয় ইতিহাসে এক নব যুগের সূচনা।
সাম্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা: স্পেন বিজয়ের ফলে এক সামাজিক ও ধর্মীয় বিপ্লব সৃষ্টি হয়। ইসলামি সমতা ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ তাদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে। ক্রীতদাস ও নিপীড়িত জনগণ ইসলামের মহান বাণীতে আকৃষ্ট হয়ে সামাজিক ও ধর্মীয় মুক্তি লাভ করেন। এছাড়া দাসদের পদমর্যাদা লাভ, অমুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভ, শিক্ষা, সভ্যতা ও কৃষ্টির প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়।
কৃষি ও শিল্পের সম্প্রসারণ: স্পেন বিজয়ে তিন মহাদেশব্যাপী মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ফলে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যের প্রসার ঘটে এবং স্পেন আবার এক সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ঐতিহাসিক আমির আলী বলেন, "Many modern Governments might well take a lesson from the Muslim adminstration of Spain" অর্থাৎ "স্পেনে মুসলিম শাসন হতে আধুনিক বহু সরকারের শিক্ষা গ্রহণ করার অনেক বিষয় রয়েছে। জনগণ অবৈধ কর হতে অব্যাহতি পেয়ে সুখে ও শান্তিতে দেশে বসবাস করতে থাকে। দীর্ঘ প্রায় আটশত বছরব্যাপী মুসলমানগণ গৌরবের সঙ্গে স্পেন শাসন করেন।"
খলিফা আল-ওয়ালিদের মৃত্যু: খলিফা আল-ওয়ালিদ ৯ বছর ৭ মাস অতি সাফল্য ও গৌরবজনকভাবে রাজ্য শাসন করেন এবং ৪০ বছর বয়সে জমাদিউল আওয়াল ৯৬ হিজরি মোতাবেক ফেব্রুয়ারি ৭১৫ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।
আল-ওয়ালিদের চরিত্র ও কৃতিত্ব
ওয়ালিদ পিতা মালিকের সুযোগ্য পুত্র ছিলেন। তিনি উজ্জ্বল, গৌরবর্ণ, দীর্ঘ ও বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী ছিলেন। ঐতিহাসিক মাসুদী, ওয়ালিদকে স্বেচ্ছাচারী, অত্যাচারী ও নৃপতি বলে অভিহিত করেন। অনেক ঐতিহাসিক আল-ওয়ালিদকে বিচক্ষণ, দূরদর্শী, কর্তব্যপরায়ণ, নীতিজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ হিসেবে অভিহিত করেন।
আল-ওয়ালিদ তাঁর রাজত্বকালে দ্বিতীয়বারের মতো মুসলিম খিলাফতের সম্প্রসারণ ঘটান। তাঁর স্বল্পকালীন রাজত্বকালে তিনটি মহাদেশব্যাপী তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বীর সিজার, আলেকজান্ডার, নেপোলিয়নের পক্ষেও তাঁর মতো এত বড় সাম্রাজ্য বিজয় ও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় নি।" ঐতিহাসিক মুইর বলেন, "There is no other reign not excepting even that of Omar in which Islam so spread abroad and was consolidated." অর্থাৎ, "এমনকি উমরের শাসন আমল বাদ না দিলেও এমন কোনো আমল ছিল না যখন ইসলাম বিদেশে এতটা সম্প্রসারিত ও সংহত হয়েছিল।" তিনি আরও বলেন, "ওয়ালিদের রাজত্বকালের প্রথম হতে শেষ অবধি বিচার করলে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, খিলাফতের ইতিহাসে বিজেতা হিসেবে আল-ওয়ালিদ অপেক্ষা আর কারও খিলাফত গৌরবোজ্জ্বল নয়।"
পরিশেষে বলা যায়, আল-ওয়ালিদের রাজত্বকালের সর্বদিক বিচার করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ বিজেতা ও সুশাসক ছিলেন। তাই দেশ জয়ের ইতিহাসে আল-ওয়ালিদ ও তাঁর সেনানায়কদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
উমাইয়া খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

