- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- উমাইয়া খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
খলিফা হিশাম (৭২৪-৭৪৩ খ্রি.)
উমাইয়াদের পতন যখন অবশ্যম্ভাবী ঠিক তখন হিশাম-বিন-আব্দুল মালিক ৭২৪ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করে খিলাফতের নিভন্ত প্রদীপকে শেষবারের মতো প্রজ্জ্বলিত করেছিলেন। হিশাম ছিলেন উমাইয়া বংশের সর্বশেষ কর্মদক্ষ খলিফা।
ঐতিহাসিকগণ খলিফা হিশামকে "উমাইয়া বংশের শেষ গৌরব" বলে অভিহিত করেছেন। সিংহাসনে আরোহণের সাথে সাথে তাঁকে চরম রাজনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হতে হয়েছে। এই সময়ে হিশাম ও উমাইয়া বংশের কলহ, আব্বাসীয় আন্দোলন, খারেজি উপদ্রব, বিভিন্ন প্রদেশের বিদ্রোহ এবং বার্বার, রোমান ও ফ্রাংকদের হুমকিতে সাম্রাজ্যে অশান্তি বিরাজ করছিল। এই সকল পরিস্থিতিতে প্রাণপণ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও উমাইয়া বংশের ধ্বংস হতে গৌরব পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। তবে যে কারণে তাঁকে উমাইয়া বংশের শেষ শ্রেষ্ঠ রাজনীতিজ্ঞ বলা হয় তা নিম্নে আলোচনা করা হলো:
প্রশাসনিক নীতি: হিশাম মুদারীয়দের পরিবর্তে হিমারীয়দের প্রাধান্য দেন। খলিফা দ্বিতীয় ইয়াজিদের সময় মুদারীয়গণ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। সম্ভবত তাদের প্রাধান্য খর্ব করার উদ্দেশ্যে হিশাম ইয়েমেনী ভাবাপন্ন খালিদ-বিন-আব্দুল্লাহ আল-বাসরীকে ইরাকের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। ওয়ালিদের ভ্রাতা আসাদ আল-হোরায়রাকে খোরাসানের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন।
সাম্রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা: খলিফা হিশাম সাম্রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা নিম্নরূপ:
১. ইরাকের বিদ্রোহ দমন: ইরাকের নবনিযুক্ত শাসনকর্তা খালিদ মুদারীয় এবং হিমারীয় গোত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হন। তাঁর সুশাসনে ইহুদি ও খ্রিষ্টানগণ তাঁর উপর সন্তুষ্ট ছিল। ঐ সময় খালিদের খ্রিষ্টান মাতা একটি গির্জা নির্মাণ করলে মুসলমান ও খারেজিদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে। ফলে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এতে খারেজি নেতা বাহলোল পরাজিত ও নিহত হন। পরবর্তীতে ইরাকের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন ইউসুফ-বিন-উমর। তিনি ছিলেন মুদারীয় বংশের লোক। তাঁকে ইয়েমেনীরা মেনে নিতে পারে নি। ৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে যায়েদ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পরাজিত ও নিহত হন। ইরাক আপাতত শান্ত হলো।
২. খোরাসানে বিদ্রোহ দমন: ইরাকে শান্তি স্থাপিত হলেও খোরাসান ও মধ্য এশিয়ায় অনেকগুলো বিদ্রোহ দেখা দেয়। জিজিয়া হতে অব্যাহতি লাভের আশায় সেখানকার অধিবাসীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে কিন্তু হিশাম তাদের উপর জিজিয়া কর চাপিয়ে দিলে তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। হারিসার নেতৃত্বে কতিপয় আরবও এই বিদ্রোহে যোগ দেয়। বিদ্রোহীরা খাকান নামে তুর্কী রাজ্যের রাজার নিকট সাহায্য চান। খাকানও তাদের সাথে মিলিত হন। সুতরাং উমাইয়া শাসনকর্তা তাদের সাথে যুদ্ধ করে নিষ্ফল হন। অবশেষে খালিদ আল-কাসরী তার ঘনিষ্ঠ ভ্রাতা আসাদ আল-কাসীরকে খোরাসানে শান্তি স্থাপনের জন্য শাসনকর্তা নিযুক্ত করে পাঠান। তিনি খাকানকে পরাজিত ও নিহত করেন। খালিদ আল-কাসরীর দলত্যাগের পর নসর ইবনে সাইয়ার খোরাসানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
৩. মধ্য এশিয়ায় খাজারদের দমন আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানের খাজার সম্প্রদায় ৭৩১ খ্রিষ্টাব্দে ইরাক ও মসুল আক্রমণ করে উমাইয়া শাসনকর্তাকে হত্যা করে। হিশাম সাইদ আল-হাবসীকে প্রথম পর্যায়ে মাসলামা এবং মারওয়ানকে পরবর্তী পর্যায়ে প্রেরণ করে খাজার বিদ্রোহ দমন করেন। রোমান আক্রমণ প্রতিহত করবার জন্য এশিয়া মাইনরে হিশাম তার দুই পুত্রকে প্রেরণ করেন।
৪. উত্তর আফ্রিকায় বিদ্রোহ দমন পারস্য, আরব, ইরাক প্রভৃতি অঞ্চলের খারেজিগণকে যখন খলিফা কঠোর হস্তে দমন করতে ব্যস্ত ছিলেন ঠিক সেই সময় একদল খারেজি উত্তর আফ্রিকায় গমন করে বার্বারদের সহায়তায় সেখানে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা তাজিয়ারের শাসনকর্তাকে হত্যা করে রাজধানী কায়রোয়ান আক্রমণ করে। হিশাম বিদ্রোহীকে দমন করার জন্য সেনাপতি কুলসুম-বিন-আরাবকে প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি পরাজিত ও নিহত হন। অতঃপর ৭৪২ খ্রিষ্টাব্দে হিশাম হানজালা-বিন-সাফওয়ানকে বার্বারদের বিদ্রোহ দমনে প্রেরণ করেন। তিনি উত্তর আফ্রিকায় কঠোর হস্তে বিদ্রোহ দমন করে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
স্পেন ও ফ্রান্সের ঘটনাবলি: বিদ্রোহ দমন এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করে খলিফা হিশাম উমাইয়া বংশকে সংকটমুক্ত করার চেষ্টা করেন। দ্বিতীয় ওমরের খিলাফতে আস সামাহ টুলসের যুদ্ধে খ্রিষ্টান রাজা ডিউকের নিকট পরাজিত ও নিহত হন। হিশাম পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলার জন্য প্রথমে সাময়িকভাবে সহকারী সেনাপতি আব্দুর রহমান আল-গাফিকীর উপর সেখানকার শাসনভার অর্পণ করেন। কিন্তু কয়েক মাস পরে আনবাসাহ শাসনভার গ্রহণ করেন। আনবাসাহর মৃত্যুর পর ঘন ঘন শাসনকর্তা পরিবর্তনের ফলে দেশের শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে অচল হয়ে পড়ে।
দেশের এই বিশৃঙ্খল অবস্থায় হিশাম আব্দুর রহমান আল-আরাবকে স্পেনের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। উমাইয়া যুগের শাসনকর্তাদের মধ্যে আব্দুর রহমান নিঃসন্দেহে সর্বাপেক্ষা যোগ্য ও দেশপ্রেমিক ছিলেন। তিনি বিদ্রোহ দমন করে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং ফ্রান্সের রাজধানীর দিকে অগ্রসর হলে তিনি টুরস নামক স্থানে পরাজিত ও নিহত হন।
আব্বাসীয় বিদ্রোহ: আফ্রিকা ও স্পেনের বিশৃঙ্খলার সুযোগে আব্বাসীয়গণ হিশামের খিলাফতে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই সময় আবু মুসলিম নামক জনৈক ইস্পাহানবাসী আব্বাসের বংশীয় মুহম্মদ এবং তার পুত্র ইব্রাহীমের পক্ষে খোরাসানে প্রচারকার্য চালাতে থাকে। তবে তার উদ্ভব সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা না গেলেও উমাইয়া বংশের পতনে এবং আব্বাসীয় বংশের উত্থানে যে কোনো লোকের চেয়ে তাঁর অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি।
হিশাম সুদীর্ঘ ২০ বছর উমাইয়া খিলাফতে অধিষ্ঠিত ছিলেন। শাসনকার্যে কৃতকার্যতা দেখাতে না পারলেও তার সময় মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তৃতির চরম সীমায় পৌঁছেছিল। হিট্টি বলেন, "তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে উমাইয়া বংশের স্বর্ণযুগের অবসান ঘটে।"
হিশামের কৃতিত্ব
সাহসী যোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ হিসেবে হিশাম ছিলেন উমাইয়া খলিফাদের মধ্যে অন্যতম। আরব ঐতিহাসিকগণ তাঁকে তৃতীয় সর্বশ্রেষ্ঠ উমাইয়া খলিফা বলে অভিহিত করেন এবং মুয়াবিয়া ও আব্দুল মালিকের পরই তাঁর স্থান নির্ধারণ করেন। তাঁর খিলাফতকালেই আরব সাম্রাজ্য বিস্তৃতির চরম সীমায় উপনীত হয়েছিল। আরব সাম্রাজ্যের সীমা এই সময় স্পেন হতে চীন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সিংহাসনে আরোহণ করে হিশাম চতুর্দিকে বিপ্লব, বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহ দেখতে পান। একদিকে মুদারীয়-হিমারীয়দের সংঘর্ষ, তুর্কী, খারেজি, খাজার এবং বার্বারদের বিদ্রোহ এবং উমাইয়াদের পতনের জন্য শিয়া ও আব্বাসীয়দের ষড়যন্ত্র। এমন বিপদের দিনেও তিনি বিচলিত না হয়ে শত্রুদের মোকাবিলা করেন এবং প্রায় সকল বিদ্রোহই দমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তিনি স্পেন ও ফ্রান্সে সৈন্য পাঠিয়ে ইউরোপে মুসলিম শক্তির গৌরব প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় ইয়াজিদের মৃত্যুর পরে তাঁর মতো সুযোগ্য উত্তরাধিকারী সিংহাসনে আরোহণ না করলে সেই সময়ই উমাইয়া বংশের পতন হতো। তিনি মুয়াবিয়া, আব্দুল মালিক, ওয়ালিদের মতো সুযোগ্য না হলেও পতনের যুগে উমাইয়া বংশের গৌরবের বাতি শেষবারের মতো জ্বালাতে পেরেছিলেন।
হিশামের শাসন নীতির পর্যালোচনা
অধিকাংশ ঐতিহাসিকগণ তার সমালোচনা করে বলেন, হিশাম সুদীর্ঘকাল যোগ্যতার সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করলেও উমাইয়া বংশের পতনকে রোধ করতে পারেন নি। কিন্তু এই অকৃতকার্যতার জন্য শুধু তাঁকে দায়ী করলেও তার প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি গোত্রপ্রিয় মানসিকতার দরুন শাসনকর্তাদের নিয়োগের ব্যাপারে সংকীর্ণতার পরিচয় দিয়েছেন। এর ফলে সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। তাঁর রাজত্বকাল ছিল অবনতি ও বিচ্ছিন্নতার যুগ। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবার মতো সাহস ও দৃঢ়তা তাঁর ছিল না। তথাপি উমাইয়া সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার জন্য তাঁর প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতার অভাব ছিল না। তিনি সন্দেহপরায়ণ ও ধনলিঙ্গু ছিলেন।
সন্দেহপরায়ণতার কারণে তিনি প্রায়ই প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণকে বদলি করতেন। খালিদ এর মতো সুযোগ্য শাসনকর্তাকে তিনি বিশ্বাস না করে মারাত্মক ভুল করেছিলেন। অতিরিক্ত অর্থলিপ্সার জন্য জনসাধারণের উপর কর বাড়িয়ে দিতেন। এই কারণে জনসাধারণ তাঁকে পছন্দ করতেন না।
উপরিউক্ত আলোচনা ও সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, উমাইয়া নৃপতিদের মধ্যে হিশাম একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ছিলেন। হিশামের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত উমাইয়া বংশের গৌরবকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বিভিন্ন বিদ্রোহ বিশৃঙ্খলা স্থায়ীভাবে দমন করতে না পারলেও সাময়িকভাবে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তাই ঐতিহাসিক ভনক্রেমারের সাথে একমত হয়ে বলতে পারি যে, হিশাম ছিলেন প্রতিভাবান উমাইয়া শাসকদের মধ্যে সর্বশেষ অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক।
উমাইয়া খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

