- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- উমাইয়া খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
ইয়াজিদ ও ইমাম হোসেন (রা.)
ইয়াজিদের পরিচয়, মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াজিদ ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে কুরাইশ বংশের উমাইয়া শাখায় জন্মগ্রহণ করেন। এ সময় মুয়াবিয়া সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন। ইয়াজিদের মায়ের নাম মাইমুন বিনতে বাহদাল কিলাব গোত্রের মহিলা। রাজ পরিবারের রাজকীয় কায়দায় ইয়াজিদ-এর বাল্যকাল কড়া শাসনে অতিবাহিত হয়। লেখাপড়ার জন্য বিশুদ্ধ পাঠ ও রক্ষণশীল পরিবেশে রাখা হয়। মুয়াবিয়া তাকে দুবার হজ্ব কাফেলার আমিরের দায়িত্ব পালনে মক্কায় পাঠান। ৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দে সভাসদের পরামর্শক্রমে হযরত মুয়াবিয়া ইয়াজিদকে উমাইয়া বংশের পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দান করেন।
ইমাম হোসেন (রা.)-এর পরিচয় ইমাম হোসেন (রা.) হযরত মুহম্মদ (স.)-এর দৌহিত্র এবং হযরত ফাতিমা (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর কনিষ্ঠ পুত্র। হযরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর সঙ্গে ইমাম হাসান (রা.)-এর ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দের চুক্তি অনুযায়ী ইমাম হোসেন (রা.) মুয়াবিয়া পরবর্তী মুসলিম জাহানের খলিফা হবেন। কিন্তু ৬৮০ খ্রি. মুয়াবিয়া সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে নিজ পুত্র ইয়াজিদকে মনোনয়ন দান করলে ইয়াজিদের সঙ্গে ইমাম হোসেনের সংঘর্ষ বাঁধে যা কারবালা যুদ্ধ নামে পরিচিত।
ইয়াজিদের ক্ষমতা লাভ উমাইয়া বংশের প্রতিষ্ঠাতা মুয়াবিয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর তাঁর মনোনয়ন প্রাপ্ত হয়ে অযোগ্য ও অধার্মিক পুত্র ইয়াজিদ সিংহাসনে আরোহণ করেন। হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (রা.)-এর পুত্রগণ ইয়াজিদের আনুগত্য স্বীকার করলেও মুয়াবিয়ার সাথে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী খিলাফতের ন্যায়সঙ্গত দাবিদার ইমাম হোসেন (রা.) ইয়াজিদের আনুগত্য অস্বীকার করেন। ইয়াজিদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হোসেন (রা.) ও খিলাফতের অন্যতম দাবিদার আব্দুল্লাহ-বিন-যোবাইয়ের উভয়েই মক্কায় চলে যান।
কারবালার যুদ্ধের কারণ
কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেন (রা.)-এর নির্মম হত্যাকান্ডের বিভিন্ন কারণ বিদ্যমান। তা নিম্নে আলোচিত হলো:
সন্ধি চুক্তির অবমাননা: ইমাম হাসানের সাথে সম্পাদিত সন্ধি চুক্তিতে মুয়াবিয়ার পর ইমাম হোসেনের খিলাফত লাভের শর্ত ছিল। কিন্তু মুয়াবিয়া (রা.) এ সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে ৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে স্বীয় অযোগ্য পুত্র ইয়াজিদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করলে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। ঐতিহাসিক ভনক্রেমারের মতে, "মুয়াবিয়ার মতো জ্ঞানী ও বিচক্ষণ পিতার পক্ষে তাঁর অযোগ্য পাপাসক্ত পুত্রকে উত্তরাধিকারী মনোনয়ন ঐতিহাসিকদের নিকট সত্যিই দুর্বোধ্য।"
নীতিগত বিরোধ: হযরত ইমাম হোসেন (রা.) ছিলেন ধর্মপরায়ণ, ন্যায়পরায়ণ, নম্র, সৎ ও অকপট। ঐতিহাসিক সেডিলট বলেন, "তাঁর একটি মাত্র গুণের অভাব ছিল, তা হলো ষড়যন্ত্র ফাঁদবার কৌশল। উমাইয়াগণ এ ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত ছিল।" অপরদিকে, ইয়াজিদ ছিলেন পাপাসক্ত, অত্যাচারী, নীতিজ্ঞানহীন, মদ্যপায়ী, হৃদয়হীন। উভয়ের মধ্যকার নীতিগত বিরোধও সংঘর্ষের মূলে ছিল।
আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইয়ের দুরভিসন্ধি খিলাফতের প্রথম অবস্থায় স্বার্থান্বেষী আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের হযরত ইমাম হোসেনকে সমর্থন দান করলেও শীঘ্রই তিনি হোসেনকে স্বীয় পথ হতে অপসারিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।
গোত্রীয় বিরোধ: ইয়াজিদের খিলাফত আরোহণে কোরাইশ বংশের উমাইয়া ও হাশেমী গোত্রের বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। এ গোত্রীয় বিরোধ কারবালার হত্যাকান্ডকে ত্বরান্বিত করে।
ধর্মীয় নেতাদের অসন্তুষ্টি নিষ্ঠুর, বিশ্বাসঘাতক ও পাপাচারী ইয়াজিদের অধার্মিক কার্যকলাপে ধর্মীয় নেতাগণ বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং তার বিরুদ্ধাচরণ শুরু করেন।
মক্কা ও মদিনার জনসাধারণের আমন্ত্রণ অত্যাচারী ইয়াজিদের খিলাফত আরোহণে বীতশ্রদ্ধ মক্কা ও মদিনার জনসাধারণ ইয়াজিদের বিরুদ্ধে ইমাম হোসেন (রা.)-কে সমর্থন দানের প্রতিশ্রুতি দেয়। হিডির ভাষায়, "Ali dead proved more effective than Ali living. "অর্থাৎ "জীবিত আলী অপেক্ষা মৃত আলী অধিকতর কার্যকরী প্রমাণিত হলো।"
চপলমতি কুফাবাসীদের আমন্ত্রণ চঞ্চল, চপলমতি ও অস্থির কুফাবাসীরা ইয়াজিদের শাসনের অভিশাপ হতে মুক্তিলাভের জন্য ইমাম হোসেন (রা.)-কে কুফায় আসার জন্য আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু পরবর্তীতে তারা ইমাম হোসেন (রা.)-এর পক্ষ ত্যাগ করেন।
মুসলিমের হত্যা: কুফার অবস্থা জানার জন্য ইমাম হোসেন (রা.) স্বীয় চাচাতো ভাই মুসলিমকে কুফায় প্রেরণ করলে কুফার শাসনকর্তা ওবায়দুল্লাহ কর্তৃক তিনি নিহত হন।
কারবালার বিষাদময় ঘটনা
ইমাম হোসেন (রা.) ইয়াজিদের মনোনয়ন মেনে না নিয়ে কুফাবাসীর সাহায্য লাভের আশায় কুফা যাত্রা করেন। এছাড়া বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-
ইমাম হোসেন (রা.)-এর কুফায় যাত্রা: একদিকে আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইয়েরের উৎসাহ ও প্ররোচনা, অন্যদিকে কুফাবাসীদের সকল প্রকার আশ্বাস ও সাহায্যের উপর নির্ভর করে হোসেন (রা.) কুফা যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি সুহূদবর্গের বাধা-নিষেধ অমান্য করে ২০০ অনুচরসহ সপরিবারে কুফা যাত্রা করেন।
হোসেন কারবালায় অবরুদ্ধ ইমাম হোসেন (রা.)-এর কুফা যাত্রার সংবাদ পেয়ে ইয়াজিদ তাঁর গতিরোধ করার জন্য কুফার শাসনকর্তা ওবায়দুল্লাহকে নির্দেশ দেন। ইমাম হোসেন কুফার নিকটবর্তী হলে গভর্নর ওবায়দুল্লাহর নির্দেশে উমর-বিন-সাদের নৃেতত্বে একদল অশ্বারোহী বাহিনী তাঁকে কুফা প্রবেশে বাধা দান করে। অনন্যোপায় হয়ে বিচলিত হোসেন কুফার ২৫ মাইল উত্তরে ফোরাত নদীর তীরবর্তী ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তরে শিবির স্থাপন করতে বাধ্য হন।
হোসেনের শান্তি প্রস্তাব কুফা বাহিনীর সেনাপতি উমর-বিন-সা'দ হোসেনকে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করাতে ব্যর্থ হলে তাঁকে বাধ্য করার উপায় হিসেবে জলকষ্ট সৃষ্টি করার জন্য ফোরাত নদীর পথ বন্ধ করে দেন। অবস্থার গুরুত্ব অনুধাবন করে হোসেন মক্কায় প্রত্যাবর্তন করতে, তুর্কী সীমান্তের দুর্গে অবস্থান করতে কিংবা পরিস্থিতি আলোচনার্থে ইয়াজিদের নিকট উপস্থিত হওয়ার প্রস্তাব দেন। ঐতিহাসিক মুইর বলেন, "এ অনুরোধ রক্ষা করা হলে উমাইয়াদের মঙ্গল হতো।" কিন্তু তাও ব্যর্থ হলে তিনি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করতে মনস্থ করেন।
যুদ্ধের মর্মান্তিক ঘটনা: ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ অক্টোবর কারবালা প্রান্তরে উভয় দলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। শত্রুপক্ষের বিরাট সৈন্যবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে হোসেন পরিবারের প্রত্যেকেই শহিদ হন। বীরত্ব ও স্বাধীনতাপ্রিয়তার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে হোসেন পরাজিত ও শহিদ হন। কারবালার এ অশ্রুসিক্ত ঘটনার উল্লেখ করে ঐতিহাসিক গীবন মন্তব্য করেন, "সে সুদূর অতীতে ও পরিবেশে হোসেনের মৃত্যুর বিয়োগান্ত দৃশ্য কঠিনতম পাঠকের হৃদয়েও সহানুভূতির সঞ্চার করবে।"
কারবালার যুদ্ধের গুরুত্ব
কারবালার বিষাদময় হত্যাকান্ডের ফলাফল অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক। নিম্নে বিস্তারিত আলোচিত হলো:
উমাইয়া-হাশেমী দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি কারবালার হত্যাকান্ড ইসলামি জগতের সর্বত্র ত্রাসের শিহরণ জাগিয়ে তুলেছিল। এ ঘটনা খিলাফত ও মুসলিম সালতানাতের ভাগ্যলিপি নির্ধারণ করে। এ মর্মান্তিক ঘটনার পর হাশেমি ও উমাইয়া বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। এ হত্যাকান্ডের মাধ্যমে সমগ্র মুসলিম জগতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
শিয়া মতবাদের পুনর্জন্ম: ঐতিহাসিকদের মতানুসারে কারবালার নির্মম হত্যাকান্ডের ফলেই শিয়া সম্প্রদায়ের শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং উমাইয়া বিরোধী মতবাদ গড়ে ওঠে। হিট্টি বলেন, "হোসেনের রক্ত তাঁর পিতার রক্ত অপেক্ষাও বেশি করে শিয়া মতবাদের বীজ বলে প্রমাণিত হয়েছে।"
জয় ছিল পরাজয়ের নামান্তর যুদ্ধে জয়লাভ উমাইয়া বংশের জন্য ছিল পরাজয়ের নামান্তর। কারবালা যুদ্ধের অনিবার্য পরিণতিতে প্রতিষ্ঠিত উমাইয়া রাজতন্ত্র মাত্র নব্বই বছরের মধ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
শিয়া-সুন্নিফ্য: কারবালার বিষাদময় ঘটনা শিয়া ও সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করে ঐক্য ও সংহতি চিরতরে বিনষ্ট করে দেয়।
খারেজি বিদ্রোহ: কারবালার যুদ্ধের ফলাফলের প্রেক্ষিতে খারেজিরাও বিদ্রোহ ঘোষণা করে। কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা এবং হোসেন পরিবারের প্রতি কৃত অপরাধের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তারা ইয়াজিদের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলে।
পারস্যে জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান: ঐতিহাসিক আমীর আলীর মতে, "কারবালার নির্মম হত্যাকান্ডে ইসলামি দুনিয়ার সর্বত্র ত্রাসের সঞ্চার করে এবং পারস্যে এক জাতীয় চেতনাবোধের উন্মেষ ঘটায়।"
মক্কা ও মদিনায় প্রতিক্রিয়া: কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনার প্রত্যক্ষ ফল ছিল আব্দুল্লাহ-বিন-যুবাইয়েরের নেতৃত্বে পরিচালিত মক্কায় ও মদিনায় বিদ্রোহ। কারবালার বিয়োগবিধুর ঘটনা শোকসন্তপ্ত মক্কা ও মদিনার জনগণকে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিক্ষুদ্ধ করে তোলে।
মদিনা অবরোধ: বিক্ষুব্ধ জনতা মদিনার শাসনকর্তাকে বিতাড়িত করে ইয়াজিদের পদচ্যুতি দাবি করলে তাদের দমন করার জন্য ওকবার নেতৃত্বে এক বিরাট সৈন্যবাহিনী ৩ দিন ধরে মদিনায় লুণ্ঠনকার্য চালিয়ে মদিনাকে অপবিত্র করে। আমীর আলী বলেন, "যে শহর নবিকে আশ্রয়দান করেছিল এবং যা তাঁর জীবন ও নবুয়ত দ্বারা পবিত্র হয়েছিল তা এক্ষণে জঘন্যভাবে অপমানিত হলো। নবির বিপদের সময় যাঁরা পার্শ্বে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তারা এক্ষণে ন্যক্কারজনক নিষ্ঠুরতার সম্মুখীন হন।"
মক্কা আক্রমণ ও কাবা ধ্বংস: মদিনা ধ্বংসের পর ৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে ইয়াজিদের সৈন্যবাহিনী মক্কা অবরোধ করে এবং এর বিশেষ ক্ষতি সাধন করে। ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, "অবরোধের ফলে কাবাগৃহে অগ্নি সংযোজিত হয়, পবিত্র হাজারে আসওয়াদ ত্রিখন্ডিত হয় এবং কাবাগৃহ ক্রন্দনরত রমণীর ভগ্ন হৃদয়ের রূপ লাভ করে।" জনৈক ঐতিহাসিকের মতে "ইসলামের উপর এর প্রতিফল হলো নিষ্ঠুর, ভয়াবহ এবং বীভৎস। ইসলামের বিজয়ের মুহূর্তে উমাইয়াদের প্রতি যে দয়া এবং সহিষ্ণুতা দেখানো হয়েছিল এভাবে তার প্রতিদান দিল।"
পরিশেষে বলা যায়, কারবালার প্রান্তরে নির্মম হত্যাকান্ড ও শোকবিধুর পরিবেশ সৃষ্টি করে ইয়াজিদের সামরিক বিজয় সূচিত হলেও যে নৈতিক পরাজয় ঘটেছিল তা-ই উমাইয়া বংশের পতনকে ত্বরান্বিত করে। ঐতিহাসিক বার্নার্ড লুইস বলেন, "প্রত্যক্ষ গুরুত্ব যাই থাকুক না কেন, কারবালা যুদ্ধের পরবর্তী ফলাফল সত্যিই বিস্ময়কর।"
ইয়াজিদের চরিত্র
চারিত্রিক বিচারে ইয়াজিদ মোটেই ভালো ছিলেন না। ইয়াজিদ ছিলেন পাপাসক্ত, অত্যাচারী, ইন্দ্রিয় পরায়ণ, নীতিজ্ঞানহীন, মদ্যপায়ী ও হৃদয়হীন। ভন ক্রেমারের মতে, মুয়াবিয়ার মতো জ্ঞানী ও বিচক্ষণ পিতার পক্ষে তাঁহার অযোগ্য ও পাপাসক্ত পুত্রকে উত্তরাধিকারী মনোনয়ন ঐতিহাসিকদের নিকট সত্যই দুর্বোধ্য।
ইয়াজিদ তিন বছর ছয় মাস রাজত্ব করেন। এর প্রথম বছর আলীর পুত্র হুসাইনকে হত্যা করেন, দ্বিতীয় বছর মদিনা আক্রমণ করে তিন দিন ধরে লুট করেন এবং তৃতীয় বছর তিনি কা'বা বিধ্বস্ত করেন।
ঐতিহাসিক ইবনুত তিকতাকা, ভন ক্রেমার ইয়াজিদকে উপরের তিন অপকর্মের জন্য দায়ী করেন।
ঐতিহাসিক বার্নার্ড লুইসের মতে, "ইয়াজিদ লম্পট ও দুঃশ্চরিত্রবান হলেও সে সম্ভবত কিছু রাজোচিত গুণাবলির অধিকারী ছিল।"
ইমাম গাজালি ইয়াজিদকে কারবালার হত্যাকান্ডের জন্য পুরোপুরি দায়ী করেন না।
তিন বছর ছয় মাসের শাসনামলে ইয়াজিদ গৃহযুদ্ধ সামাল দিতে ব্যয় করেছেন। কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনী প্রধান ও ইরাকের ওয়ালী ওবায়দুল্লাহ, হুসাইন ও তাঁর পরিবারের প্রতি সদয় হলে এবং হুসাইনের শান্তির প্রস্তাব মেনে নিলে ইয়াজিদকে হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর পরিবারের আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হতো না।
দ্বিতীয় মুয়াবিয়া (৬৮৩ খ্রি.) উমাইয়া বংশের দ্বিতীয় খলিফা প্রথম ইয়াজিদের মৃত্যুর পর তার অযোগ্য পুত্র দ্বিতীয় মুয়াবিয়া সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। উমাইয়া খিলাফতের এই তৃতীয় শাসক ৬৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১১ই নভেম্বর থেকে মাত্র তিন মাস রাজত্ব করেন। নবপ্রতিষ্ঠিত উমাইয়া বংশের এই শাসক ছিলেন যুগণ ও নম্র স্বভাবের। তিনি ছিলেন আবু সুফিয়ান গোত্রের সর্বশেষ খলিফা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল শাসক। তাঁর সময় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এ সময় মক্কা ও মদিনার স্বাধীন শাসক আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের মিশর ও সিরিয়ার একটি বিশাল অংশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। তামিম গোত্রের জনৈক ব্যক্তি বসরায় আব্দুল্লাহ-ইবনে-জুবায়েরকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করলে সেখানকার ওয়ালি ওবায়দুল্লাহ পালিয়ে যান। কুফাবাসীও আব্দুল্লাহকে খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এ সময় পারস্য ছিল খারেজিদের নিয়ন্ত্রণে। এভাবে উমাইয়া সাম্রাজ্য শুধু দামেস্ককেন্দ্রিক হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় মুয়াবিয়া ছিলেন শান্ত, নম্র ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ মাসক হিসেবে অযোগ্য। তিনি পিতার অনৈসলামিক কর্মকান্ডের বিরোধী ছিলেন। সাহিত্য ও বিজ্ঞানচর্চায় লিপ্ত থাকতে পছন্দ করতেন বলে কয়েক মাস শাসনের পর স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ত্যাগ করেন। ধারণা করা হয়, তাঁকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবু সুফিয়ান গোত্রের শাসন ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং মারওয়ান বিন হাকামের নামানুসারে হাকামি শাখা দামেস্কের খিলাফত লাভ করে। রাজ্য হাপন ও পরিচালনায় মুয়াবিয়ার ইচ্ছা পূর্ণ হলো না। পূর্ণ হলো সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা।
প্রথম মারওয়ান (৬৮৪-৬৮৫ খ্রি.)
প্রাথমিক জীবন ও খিলাফত লাভ: মারওয়ান ইবনে হাকাম বা প্রথম মারওয়ান ছিলেন উমাইয়া বংশের চতুর্থ খলিফা। দ্বিতীয় মুয়াবিয়া নিঃসন্তান ছিলেন বলে তাঁর ভ্রাতা খালিদ সিংহাসনের দাবিদার ছিলেন। কিন্তু খালিদ অল্পবয়স্ক হওয়ায় রাজ্যের তৎকালীন অবস্থা বিবেচনা করে সভাসদগণ হাকাম গোত্রের সর্বাপেক্ষা বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি মারওয়ানকে ক্ষমতায় বসান। হাকাম ছিলেন মারওয়ানের পিতা। এর মধ্য দিয়ে হাকামি শাসনের উন্মেষ ঘটে, যা ৭৫০ সাল পর্যন্ত উমাইয়া বংশের প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি ছিলেন, হজরত ওসমান (রা.)-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা। তাঁর ক্ষমতারোহণের সময় উমাইয়া খিলাফতে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। উত্তরাধিকার প্রশ্নে উমাইয়া নেতৃবৃন্দ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন, পরিশেষে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তায় বিবাদের মীমাংসা হয় এবং সিদ্ধান্ত হয়, খালিদ নাবালক হওয়ায় মারওয়ান প্রথমে খলিফা নিযুক্ত হবেন এবং পরবর্তীকালে খালিদ বয়ঃপ্রাপ্ত হলে খলিফার দায়িত্বে নিযুক্ত হবেন। উল্লেখ্য, মারওয়ান খালিদের বিধবা মাতাকে বিবাহ করেন।
অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দমন কূটকৌশল ও চক্রান্তমূলক অভিসন্ধির ভিত্তিতে দ্বিতীয় মুয়াবিয়া ক্ষমতা দখল করলেও উমাইয়াদের বিশৃঙ্খলার সুযোগে আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের সিরিয়ার একটি বিশাল অংশে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এ কারণে মারওয়ান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই ইবনে জুবায়েরের সেনাপতি আল-ফিহরির বিরুদ্ধে মারজ রাহিতের প্রাঙ্গণে অভিযান। প্রেরণ করেন। যুদ্ধে মারওয়ান বিজয়ী হন এবং এর ফলে সিরিয়া ও মিশরে উমাইয়া প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তাছাড়া কারবালা প্রান্তর ত্যাগকারী কুফার একদল অনুশোচনাকারী নিজেদের "কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করে উমাইয়াবিরোধী তৎপরতা শুরু করে। মারওয়ান তাদের কঠোর হস্তে দমন করেন।
মারওয়ান স্বীয় বংশের স্থায়িত্বের কথা চিন্তা করে মিশর থেকে দামেস্কে ফেরার পথে 'আল-সুবরা' নামক স্থানে পৌছে 'জাবিয়া' সম্মেলনের সিদ্ধান্ত বাতিল করে নিজ পুত্র আব্দুল মালিক ও আব্দুল আজিজকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। এ সংবাদে ক্ষুদ্ধ হয়ে তাঁর স্ত্রী এবং খালিদের মাতা ৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই মে ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। তবে এস. এম. ইমামুদ্দীনের মতে, মারওয়ান প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মারওয়ান যোগ্য শাসক ছিলেন। মৃত্যুর সময় সুযোগ্য পুত্রদের রেখে যান ফলে তার বংশধর দীর্ঘদিন শাসন করেন।
উমাইয়া খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

