- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- উমাইয়া খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
খলিফা আব্দুল মালিক (৬৮৫-৭০৫ খ্রি.)
৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে খলিফা মারওয়ানের মৃত্যুর পর তদীয় পুত্র আব্দুল মালিক দামেস্কের সিংহাসনে আরোহণ করেন। উমাইয়া বংশের শ্রেষ্ঠ শাসকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাই তাকে রাজেন্দ্র বা Father of Kings বলা হয়। উমাইয়া সাম্রাজ্য যখন অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলায় বিপর্যন্ত এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণে ধ্বংসপ্রায় ঠিক সে মুহূর্তে আব্দুল মালিক সিংহাসনে বসেন। দীর্ঘ বিশ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তিনি উৎসাহী, যড়যন্ত্রে সিদ্ধহস্ত এবং ধর্মভয় বিবর্জিত ছিলেন। স্বীয় ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করার জন্য তিনি অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে আত্মনিয়োগ করেন। তার শাসনকাল পর্যালোচনা করে ঐতিহাসিক পি. কে হিট্টি বলেন, "Under Abdul-Malik's rule and that of the four sons who succeeded him. The dynasty at Damascus reached the meridian of its power and glory." অর্থাৎ "আব্দুল মালিক এবং তার উত্তরাধিকারী চার পুত্রের শাসনকালে দামেস্কের এ রাজবংশ শৌর্য-বীর্য ও গৌরবের চরম শিখরে আরোহণ করে।
উমাইয়া শাসন পুনর্গঠন ও সুদৃঢ়ীকরণ
আব্দুল মালিক উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সিংহাসন ছিল বিশৃঙ্খল ও অরাজকতায় পরিপূর্ণ। তাই খলিফা আব্দুল মালিক সিংহাসনে আরোহণ করে শাসন ব্যবস্থা সুদৃঢ়ীকরণে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেন:
অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন: সিংহাসনে আরোহণ করে আব্দুল মালিক নানাবিধ বাধার সম্মুখীন হন। তিনি ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে অবস্থার মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণ সকল বিদ্রোহ দমন করে সমগ্র সাম্রাজ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা আনয়ন করেন এবং উমাইয়া বংশকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন।
মুখতারের বিদ্রোহ দমন সাকীফ গোত্রের আবু উবায়দার পুত্র আল-মুখতার সাহসী যোদ্ধা ছিলেন। কারবালা হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ গ্রহণকারী হিসেবে কুফায় রণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। আব্দুল মালিক সর্বপ্রথম মুখতারের বিদ্রোহ দমনে ওবায়দুল্লাহকে প্রেরণ করেন। কিন্তু মুখতারের সঙ্গে যুদ্ধে ওবায়দুল্লাহ পরাজিত ও নিহত হন। ইতোমধ্যে মুখতার ও ইরাকের গভর্নর মুসাবের মধ্যে বিদ্রোহ বাঁধলে মুখতার পরাজিত ও নিহত হয়। এরূপে আব্দুল মালিক তার অন্যতম শত্রু মুখতারকে অপসারিত করেন।
আমরের বিদ্রোহ দমন: আমর-বিন-সাইদ ছিলেন আব্দুল মালিকের ভাই। মারওয়ানের মৃত্যুর পর তার খলিফা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মারওয়ানের মৃত্যুর পর আব্দুল মালিক খলিফা হলে ৬৮৯ খ্রিষ্টাব্দে আমর নিজেকে দামেস্কের খলিফা ঘোষণা করেন। আব্দুল মালিক তাকে বারবার পরাজিত করেও ক্ষমা প্রদর্শন করেন। কিন্তু তিনি আনুগত্য স্বীকার না করায় অবশেষে প্রলোভন দিয়ে রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানান। আব্দুল মালিক নিজ হস্তে আমরকে হত্যা করেন।
খালিদের বিদ্রোহ দমন: পিতা মারওয়ানের মনোনয়নক্রমে খালিদ-বিন-ইয়াজিদের খলিফা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আব্দুল মালিক খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করলে খালিদ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। আব্দুল মালিক তাকে বিভিন্ন কৌশল ও প্রলোভন দ্বারা স্বীয় দলভুক্ত করেন।
মুসাবের বিদ্রোহ দমন: আব্দুল মালিক দামেস্কে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে মেসোপটেমিয়ার দিকে দৃষ্টি দেন। ঐ সময় আব্দুল্লাহ-বিন- জুবায়েরের প্রতিনিধি মুসাব ইরাকের শাসনকর্তা ছিলেন।
বাইজান্টাইনদের সঙ্গে ১,০০০ স্বর্ণমুদ্রা দেবার প্রতিশ্রুতিতে আব্দুল মালিক আক্রমণের আশঙ্কায় এক সন্ধি করেন। বাইজান্টাইনদের আক্রমণের আশঙ্কা মুক্ত হয়ে আব্দুল মালিক মুসাবের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং কুফাবাসীকে প্রলোভন দ্বারা স্বীয় দলভুক্ত করেন। অতঃপর ৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে মুসাবকে পরাজিত ও নিহত করেন। এভাবে সমগ্র ইরাক আব্দুল মালিকের সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের বিদ্রোহ দমন: আব্দুল মালিক তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হেজাজের শাসনকর্তা আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। হাজ্জাজ-বিন-ইউসুফ ৬৯২ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা অবরোধ করেন এবং আব্দুল্লাহকে আনুগত্য স্বীকার করার জন্য আব্দুল মালিকের একখানা পত্র তাকে দেন। আব্দুল্লাহ আব্দুল মালিকের বশ্যতা অস্বীকার করেন। ফলে হাজ্জাজ প্রায় বিনা বাধায় মদিনা দখল করে মক্কা অবরোধ জোরদার করেন। দীর্ঘ সাত মাস অবরোধে শহরবাসী ক্ষুধার তাড়নায় অতিষ্ঠ হয়ে দলে দলে আব্দুল্লাহকে পরিত্যাগ করে। আব্দুল্লাহ বাধ্য হয়ে ৬৯২ খ্রিষ্টাব্দে মাতার পরামর্শে "জয়ী হব বা জান দিব"
এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে অগ্রসর হন। আরাফাতের ময়দানে যুদ্ধে অসংখ্য উমাইয়া সৈন্য নিহত করেও আব্দুল্লাহ শেষ রক্ষা পেল না। উমাইয়াগণ তার মৃত দেহের উপর নির্যাতন করল এমনকি ছিন্ন মস্তক প্রথমে মদিনায় প্রদর্শিত হয় এবং পরে দামেস্কে প্রেরিত হলো। ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, "ইবনে যুবাইরের মৃত্যুর সাথে সাথে পুরোনো ধর্মবিশ্বাসের সাথে সর্বশেষ যোগসূত্র চিরতরে রহিত হলো। উসমান হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ সম্পন্ন হলো।" (With the death of Ibn-al-Zubair the last champion of the old faith passed away. Uthman was fully avenged).
সুন্নি সম্প্রদায় তাকে আইনসম্মত খলিফা হিসেবে গ্রহণ করেন। এর ফলে অপরাপর বিদ্রোহীরা আব্দুল মালিকের বশ্যতা স্বীকার করেন। ফলে আব্দুল মালিক ইসলামি জগতের একচ্ছত্র অধিপতি হন। পূর্ব হতে পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত মসজিদগুলোতে তার নামে খুতবা পঠিত হতে আরম্ভ হলো।
খারেজিদের বিদ্রোহ দমন: আব্দুল মালিক যখন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যস্ত ঠিক সে মুহূর্তে খারেজিগণ শক্তি সঞ্চয় করে পারস্য ও কালদিগয়ায় ক্ষমতা বিস্তার করে। তারা উমাইয়া শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং কারবালার হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য বিদ্রোহী হলে আব্দুল মালিক তাদের দমনের চেষ্টা করেন। কিন্তু উমাইয়া বাহিনী খারেজিদের নিকট বারবার পরাজিত হয়। খারেজিদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতির অভাবে কিরকেসিয়ার নিকট খলিফার সেনাপতি মুহাল্লিবের বাহিনীর নিকট পরাজিত হয়। ৬৯৬ খ্রিষ্টাব্দে খারেজিগণ নাফির নেতৃত্বে পুনরায় বিদ্রোহ করলে হাজ্জাজ-বিন-ইউসুফ তাদের কঠোর হস্তে দমন করেন।
রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধ: খারেজিদের মতো রোমানগণ অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের সুযোগে ৬৮৯ খ্রিষ্টাব্দে সন্ধি ভঙ্গ করে মুসলিম সাম্রাজ্যে অনধিকার প্রবেশ করে। আব্দুল মালিক কয়েকটি যুদ্ধে রোমানদের পরাজিত করে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বহু এলাকা দখল করেন। ফলে আরমেনিয়া ও সাইপ্রাস মুসলমানদের দখলে আসে। পূর্বদিকে কাবুলসহ এশিয়া মাইনরের বহু দুর্গ মুসলমানদের করতলগত হয়।
আফ্রিকা পুনরাধিকার: উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়ার শাসনামলে উকবা-বিন-নাফি সর্বপ্রথম ইফ্রিকিয়া জয় করেন। ইফ্রিকিয়ার বা বার্বার নেতা কুসায়লা ওকবাকে হত্যা করে ইফ্রিকিয়া মুসলমানদের নিকট হতে উদ্ধার করেন। সাম্রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে আব্দুল মালিক ওকবার সুযোগ্য সহকারী জুহাইরের নৃেতত্বে এক সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। যুদ্ধে কুসায়লা নিহত হন। কিন্তু বার্বাররা রোমানদের সহযোগিতায় মুসলমানদের অতর্কিত আক্রমণ করে পরাজিত করেন। এ ঘটনায় ক্রুদ্ধ হয়ে খলিফা আব্দুল মালিক হাসান-বিন-নোমানের নেতৃত্বে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। তিনি পর পর কায়রোয়ান, কার্থেজ, বার্কা দখল করে আটলান্টিকের উপকূল পর্যন্ত মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তার করেন।
কাহিনার আবির্ভাব এ সময় অলৌকিক গুণসম্পন্না মহিলা কাহিনা (অর্থাৎ গণকী) আবির্ভূত হয়ে বার্বারদের নতুনভাবে সাহস ও উদ্দীপনা দান করে সেনাপতি হাসানকে যুদ্ধে পরাজিত করেন। কাহিনা পাঁচ বছর ইফ্রিকিয়া শাসন করেন অতঃপর ৭০৩ খ্রিষ্টাব্দে আব্দুল মালিক হাসানের সাহায্যার্থে আর একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। যুদ্ধে কাহিনা পরাজিত ও নিহত হলে ইফ্রিকিয়া মুসলিম সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।
আব্দুল মালিকের শাসননীতি ও সংস্কার
অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করে সাম্রাজ্যের মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা আব্দুল মালিকের অন্যতম কৃতিত্ব। সাম্রাজ্যে শান্তি স্থাপনের পাশাপাশি উন্নত শাসন নীতি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নানাবিধ সংস্কার করেন। অধ্যাপক পি. কে হিটি বলেন, "আব্দুল মালিকের রাজত্বকাল উমাইয়া বংশের গৌরবময় যুগ বলে অভিহিত করেন। ঐতিহাসিক স্পুলার বলেন, "আব্দুল মালিকের রাজত্বকাল ইসলামের ইতিহাসে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ যুগ ছিল।" শাসনব্যবস্থাকে জাতীয়করণ আব্দুল মালিকের সর্বপ্রধান কৃতিত্ব। তিনি আরবিকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দান করেন। ৬৯৬ খ্রিষ্টাব্দ হতে ৬৯৭ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা একটি আদেশ জারি করেন। আঞ্চলিক ভাষার পরিবর্তে আরবি ভাষায় সরকারি দলিল-পত্রাদি রক্ষিত করার প্রথা চালু করেন। সালীহ-বিন-আব্দুর রহমানের পরামর্শে আব্দুল মালিক উক্ত পদক্ষেপ নেন। খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর পরে ইসলামের ইতিহাসে আব্দুল মালিকই সর্বপ্রথম বৈপ্লবিক সংস্কার প্রবর্তন করেছিলেন। আব্দুল মালিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সম্পূর্ণ আরবীয়করণ নীতি প্রবর্তন করে আরবদের মৌসিক প্রতিভা বিকাশের পথ উন্মুক্ত করেন।
আরবি বর্ণমালার উৎকর্ষ সাধন: আব্দুল মালিক আরবি বর্ণমালার লিখন, পঠন ও উচ্চারণ পদ্ধতির উৎকর্ষ সাধনে হাজ্জাজ-বিন-ইউসুফের পরামর্শে আরবি বর্ণমালায় হরকত ও নোকতার প্রচলন করেন। ফলে আরবি লিপির পূর্ণতা সাধিত হয় এবং অধিকসংখ্যক পাঠকের মধ্যে তা প্রচার লাভ করে।
আরবি মুদ্রা প্রচলন: ঐতিহাসিক গিলমান বলেন, "এ সময় সারাসেন সর্বপ্রথম নিজেদের জন্য মুদ্রা তৈরি করেন।" আব্দুল মালিকের সিংহাসনারোহণের পূর্বে আরবদের নিজস্ব কোনো মুদ্রা ছিল না। আব্দুল মালিক ৬৯৬ খ্রিষ্টাব্দে দামেস্কে একটি জাতীয় টাকশাল তৈরি করেন। "কুল হ্রয়া আল্লাহ্র আহাদ" অক্ষরযুক্ত দিনার (স্বর্ণমুদ্রা), দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) ও ফালুস (তাম্র মুদ্রা। নামে মুদ্রা সমগ্র সাম্রাজ্যে চালু করেন। দিনার ও দিরহামের অনুপাত ছিল ১০: ১।
ডাক বিভাগের সংস্কার: বিশাল সাম্রাজ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য মুয়াবিয়ার আমলের প্রবর্তিত ঘোড়ার ডাকের উন্নয়ন ঘটান। দ্রুত খবর আনয়নের জন্য রাজধানীর সঙ্গে প্রদেশগুলোর যোগাযোগের উন্নয়ন ঘটান। সাহিবুল বারিদ ছিলেন ডাক বিভাগের প্রধান। রাস্তায় ঘোড়া বদলির ব্যবস্থা করেন।
রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার: ঐতিহাসিক বার্নার্ড লুইস বলেন, "আব্দুল মালিক এবং তার উপদেষ্টাগণ রাজস্ব ব্যবস্থার পুনর্গঠনের জন্য এমন একটি পন্থা উদ্ভাবন করেন যা তার উত্তরাধিকারীদের আমলে একটি অভিনব এবং বিশেষ করে ইসলামি কর ব্যবস্থায় পরিণত হয়।" খিলাফত লাভের পর আব্দুল মালিক দারুণ অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হন। এ বিপর্যয়ের হাত হতে রক্ষার জন্য হাজ্জাজ-বিন-ইউসুফের পরামর্শ ও সক্রিয় সহযোগিতায় আব্দুল মালিক রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার করেন।
১. ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও নবদীক্ষিত অনারব মুসলমানদের ভূমি রাজস্ব বা খারাজ দিতে হবে।
২. যে সকল নবদীক্ষিত মুসলিম গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যায় তাদেরকে শহর ছেড়ে গ্রামে যেতে বাধ্য করেন।
৩. ভূমিকর যাতে হ্রাস না পায় তার জন্য আরবীয় মুসলমানগণ কর্তৃক মাওয়ালীদের ভূমি ক্রয় নিষিদ্ধ করেন।
৪. অনুর্বর ও পতিত জমি তিন বছরের জন্য বিনা রাজস্বে কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করার ব্যবস্থা করেন। তিন বছর পর উক্ত জমির ফসলের অংশ রাজস্ব ধার্য করেন।
উপর্যুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে রাজস্ব ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়। ফলে সাম্রাজ্যের মধ্যে সুখ ও শান্তি স্থাপিত হয়।
স্থাপত্য শিল্প: মহানবির মিরাজ গমনকালে যে পাথরে পদচিহ্ন রেখে গিয়েছিলেন সে পাথরকে কেন্দ্র করে একটি বিরাট সৌধ নির্মাণ করেন। এটাকে ডোম-অব-দা রক অথবা কুব্বাত-আস-সাখরা বলা হয়। এটার সন্নিকটে আব্দুল মালিক 'মসজিদ-উল-আকসা' নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি কয়েকটি নতুন শহর নির্মাণ করেন। 'ওয়াসিত' শহরটি ইতিহাসে বিশেষ খ্যাতি লাভ করে।
উত্তরাধিকারী মনোনয়ন পিতা মারওয়ান তাকে এবং ভ্রাতা আব্দুল আজিজকে পর্যায়ক্রমে খলিফা মনোনয়ন করে যান। আব্দুল মালিক ভ্রাতা আব্দুল আজিজের পরিবর্তে ৭০৪ খ্রিষ্টাব্দে পুত্র ওয়ালিদকে মনোনয়ন দান করে এক ঘোষণাপত্র জারি করেন। অবশ্য এর পূর্বেই ভাই আব্দুল আজিজের মৃত্যু হয়। তাই সমগ্র রাজ্যের জনসাধারণ ওয়ালিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।
আব্দুল মালিকের মৃত্যু: খলিফা আব্দুল মালিক দীর্ঘ বিশ বছর মুসলিম জাহান শাসন করেন। তিনি পুত্র ওয়ালিদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করার পর ৭০৫ খ্রিস্টাব্দের ৮ই সেপ্টেম্বর ৬২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
উমাইয়া বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা: উমাইয়া বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আব্দুল মালিককে ঐতিহাসিকগণ এক বাক্যেই স্বীকার করেন। তার কার্যাবলির সকল দিক বিবেচনা করলে তাকে নিঃসন্দেহে উমাইয়া বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক ও প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা যায়। কারণ তিনি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ নীতি গ্রহণ করেন। তাই তাকে উমাইয়া বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। মুয়াবিয়া যদিও এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা কিন্তু তার মৃত্যুর পর আব্দুল মালিক উমাইয়া শাসনকে সুদৃঢ় করেন। ঐতিহাসিক মুইর বলেন, "সকল দিক বিবেচনা করলে ইতিহাসের রায় আব্দুল মালিকের পক্ষেই যাবে।"
চরিত্র ও কৃতিত্ব
মারওয়ানের মৃত্যুর পর তদীয় পুত্র আব্দুল মালিকের দামেস্কের সিংহাসনে আরোহণ ইসলামের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। সিংহাসনে আরোহণ করে তিনি নানা বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হন। সর্বত্র অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা পরিলক্ষিত হয়। তিনি সেসব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করে উমাইয়া খিলাফতকে সুসংহত করতে সমর্থ হন। তার বিজ্ঞজনোচিত পদক্ষেপে তার পুত্র ওয়ালিদ, সুলাইমান, দ্বিতীয় ইয়াজিদ ও হিসাম পরপর উমাইয়া খিলাফত অলংকৃত করেন বলে তাঁকে রাজাদের জনক বা রাজেন্দ্র বলা হয়।
আব্দুল মালিকের চরিত্র ভালো-মন্দ, কোমলতা ও কঠোরতার সংমিশ্রণে গঠিত ছিল। ঐতিহাসিক আমীর আলী বলেন, "তিনি সুবিচারক ছিলেন, যতক্ষণ সে সুবিচার বংশের স্বার্থের প্রতিকূল হতো না।" সততা ও বিচক্ষণতার অভাব ছিল না; তবে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রশ্নে সেসব জলাঞ্জলি দিতে পিছপা হতেন না। নিষ্ঠুরতার দিক দিয়ে অনেক ঐতিহাসিক তাঁকে ফ্রাঙ্কিস রাজা শার্লমেন, রাশিয়ার পিটার দি গ্রেট কিংবা রোমের দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ানের সাথে তুলনা করতে প্রয়াস পেয়েছেন। তবে আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ করে প্রতিভাত হয় যে, তিনি নিষ্ঠুর নন বরং তাঁদের তুলনায় সদাশয়ই ছিলেন। তিনি কৃপণ ও লোভী ছিলেন না। তিনি যদি লোভী ও কৃপণ হতেন তাহলে কখনও নির্মাতা এবং কবি ও সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কৃতিত্বের দাবিদার হতে পারতেন না। তিনি নিজেও একজন উঁচুদরের লেখক ছিলেন এবং কবি ও সাহিত্যিকদেরকে পুরস্কার ও সাহায্যদানে উৎসাহিত করতেন। জরির আল-আখতার কুসেইর, আচ্ছা আল-ফারাযদাক প্রমুখ কবি তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির জ্ঞানীগুণীদের সমাদর করতেন। বিশেষ করে খ্রিষ্টানগণ তাঁর দরবারে সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তায়াযুক নামক জনৈক খ্রিষ্টান তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন। সারজিয়াস নামক একজন খ্রিষ্টান তাঁর প্রধান পরামর্শক ছিলেন।
খলিফা আব্দুল মালিক একজন উদ্যমশীল, প্রতিভাবান ও দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি নিঃসন্দেহে উমাইয়া বংশের রক্ষাকর্তা ও দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তাঁর উদ্যম, যোগ্যতা এবং ব্যক্তিত্বের অভাব হলে উমাইয়া বংশ অকালেই ধ্বংস হয়ে যেত এবং মুয়াবিয়ার আজীবনের পরিশ্রম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতো। তবে সিংহাসনারোহণের সময় সাম্রাজ্যে খুব দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছিল। ভয়ঙ্কর প্রতিদ্বন্দ্বী, মিথ্যা দাবিদার ও বিদ্রোহীদের আবির্ভাবে উমাইয়া খিলাফত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছে। আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের আরব, ইরাক ও মেসোপটেমিয়ায় প্রভুত্ব স্থাপন করে। মুখতার কুফায় সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। খারেজিরা সাম্রাজ্যকে বিদ্রোহ ও অরাজকতার বিষবাষ্পে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। এমনকি খোদ সিরিয়া ও দামেস্কে আব্দুল মালিকের অবস্থান নিরাপদ ছিল না। নিরতিশয় আত্মবিশ্বাসী আব্দুল মালিক অতুলনীয় উদ্যম ও সাহসিকতার সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন এবং সকল প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুদেরকে সমূলে বিনাশ করে নিজেকে খিলাফতে প্রতিষ্ঠিত করেন। এভাবে তিনি উমাইয়া বংশকে বিপদমুক্ত করেন, খিলাফতের ঐক্য সম্প্রক্ষিত করেন এবং উমাইয়া খিলাফতকে নতুনভাবে দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন।
তিনি দেশে বিবিধ সংস্কার প্রবর্তন করে মৌলিক প্রতিভার পরিচয় দেন এবং দেশে সমৃদ্ধি আনয়নে সক্ষম হন। জনসাধারণের নৈকট্য অর্জন ও আনুগত্য লাভে তার এ ধরনের প্রয়াস সফলতা লাভ করেছিল। সরকারি অফিসে আরবি ভাষার প্রবর্তন, আরবি বর্ণমালার উন্নতি সাধন, মুদ্রা সংস্কার ও আরবি মুদ্রার প্রচলন, ডাক বিভাগের উন্নয়ন, রাজস্ব ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস আব্দুল মালিককে কীর্তিমান শাসকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। বিশেষত মুদ্রার সংস্কার সাধন, আরবিকে সরকারি ভাষারূপে গ্রহণ আব্দুল মালিকের বুদ্ধিমত্তা ও রাজনৈতিক জ্ঞানের পরিচায়ক। জেরুজালেমকে মুসলমানদের হজের হানে পরিণত করবার প্রয়াসের মধ্যেও তাঁর রাজনৈতিক প্রবণতা তথা উচ্চাভিলাষী কূটকৌশল লক্ষ করা যায়। উমাইয়া শাসিত মুসলমানগণ যাতে ধর্মীয় অনুপ্রেরণার জন্য শুধু মক্কার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ না করে সেজন্য আব্দুল মালিক 'কুব্বাতুস সাখরা' নির্মাণ করে তাঁর সাম্রাজ্যকে কিবলা নির্দেশক করতে চেয়েছিলেন। এটি তাঁর শিল্পীমানস ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রতিফলন। বিখ্যাত নির্মাতা হিসেবে মসজিদ উল আক্সা ও আলওয়াসিত শহর প্রতিষ্ঠা করে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। পরিশেষে বলা যায় যে, আব্দুল মালিক তাঁর কার্যাবলির দ্বারা উমাইয়া বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। প্রশাসনিক ও শাসন সংস্কারের জন্য তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক মুইর বলেন, "Upon the whole, the vardiet on Abdul Malik must be in his favour" অর্থাৎ সকল দিক বিবেচনা করলে, ইতিহাসের রায় আব্দুল মালিকের পক্ষে যাবে।
উমাইয়া খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

