- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- উমাইয়া খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
খলিফা ওমর-বিন-আব্দুল আজিজ (দ্বিতীয় উমর) (৭১৭-৭২০ খ্রি.)
উমাইয়া বংশের ধার্মিক খলিফা (আল-খলিফা তুস সালিহ) আখ্যাপ্রাপ্ত দ্বিতীয় ওমরের সিংহাসন লাভ উমাইয়া বংশ তথা পৃথিবীর ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা। সুন্নিরা ওমরকে পঞ্চম খলিফা বলে মনে করেন। ইতিহাসে তিনি ন্যায়পরায়ণ খলিফা হিসেবে পরিচিত।
সিংহাসনারোহণ: দ্বিতীয় ওমর অর্থাৎ ওমর-বিন-আব্দুল আজিজ ৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে সেপ্টেম্বর মাসে ৯৯ হিজরি সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর পিতা আজিজ এক সময় মিশরের শাসক ছিলেন। তাঁর মাতা খলিফা প্রথম ওমরের পৌত্রী ছিলেন। ন্যায়পরায়ণ ও ধার্মিক শাসক হিসেবে তিনি ইসলামের ইতিহাসে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তিনি শাসনকার্য পরিচালনায় পূর্ববর্তী উমাইয়া খলিফাদের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির ছিলেন। অপরাপর খলিফার মতো যড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা, নিষ্ঠুরতা পরিত্যাগ করে প্রজা সাধারণের মঙ্গলের জন্য শাসনকার্য পরিচালনা করেন। ঐতিহাসিকগণ তাঁর চারিত্রিক গুণাবলির ভূয়সী প্রশংসা করেন।
ওমর বিন-আব্দুল আজিজ-এর শাসন নীতি
খলিফা ওমর বিন-আব্দুল আজিজ খোলাফায়ে রাশেদীনের ন্যায় শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য কতিপয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তা নিম্নরূপ:
অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন: জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রজাপালন এবং মানবতার সেবাই ছিল দ্বিতীয় উমরের শাসনব্যবস্থার মূলমন্ত্র। সিংহাসনে আরোহণ করে তিনি শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন।
প্রথমত, তিনি অত্যাচারী, লোভী ও অযোগ্য প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের পদচ্যুত করে বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিদের নিয়োগ করেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি প্রত্যেক প্রদেশের শাসনকর্তাদের নির্দেশ দেন প্রজাদের প্রতি তারা যেন নিরপেক্ষ ও সদাচরণ করেন।
তৃতীয়ত, খোরাসানের শাসনকর্তা ইয়াজিদ ইবনে মুহাল্লিবকে অর্থ আত্মসাৎ ও স্পেনের শাসনকর্তা আল-হ্ররকে দুর্নীতির দায়ে পদচ্যুত করেন।
পূর্ণাঙ্গ ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা: খলিফা দ্বিতীয় ওমর সিংহাসনে আরোহণ করে অভ্যন্তরীণ প্রশাসন ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করেন।
অতঃপর তিনি উমাইয়াদের শাসননীতির পরিবর্তন করে খুলাফায়ে রাশেদিনের শাসন চালু করেন। তিনি মজলিস-উস-সূরা গঠন করে পরামর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।
বায়তুলমালকে উমাইয়াদের ব্যক্তিগত সম্পদ মনে না করে জনগণের সম্পদ বলে ঘোষণা করেন। রাজকীয় অশ্বশালার অশ্বগুলো বিক্রয় করে প্রাপ্ত অর্থ বায়তুলমালে জমা রাখেন। তাঁর স্ত্রীর গহনাদি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করেন এবং অন্যান্য উমাইয়াদের নির্দেশ দেন অতিরিক্ত সম্পদ রাজকোষে জমা দিতে। অধিকাংশ ঐতিহাসিকগণ দ্বিতীয় উমরকে ইসলামের পঞ্চম খলিফা বলে মনে করেন।
হাশেমীদের প্রতি সহানুভূতি: খলিফা দ্বিতীয় ওমর হাশেমীয় বংশের লোকদের প্রতি সহানুভূতি দেখান। মারওয়ানের সময় মুহম্মদ (স.)-এর বংশধরদের নিকট হতে 'ফিদাক' নামক বাগানটি জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তিনি বাগানটি তাদের ফিরিয়ে দেন। এছাড়া আব্দুল মালেকের সময় আত্মসাৎকৃত সকল সম্পদ হাশেমীদের ফিরিয়ে দিয়ে পক্ষপাত নীতি পরিত্যাগ করেন।
আলীপন্থীদের প্রতি সদাচরণ উমাইয়াদের শাসনকালে দীর্ঘদিন যাবৎ খুতবায় মিম্বর হতে আলী (রা.) ও তার বংশধরদের অভিসম্পাত বর্ষণ করা হতো। দ্বিতীয় উমর উক্ত প্রথা রহিত করেন এবং নির্দেশ দেন এতদিন যাবৎ যে অভিশাপ দেওয়া হয় তার পরিবর্তে বদান্যতা, ক্ষমাশীলতা এবং পরোপকারের প্রতি লোকদের হৃদয় আকর্ষণ করার জন্য প্রার্থনা করতে হবে।
খারেজিদের প্রতি তাঁর নীতি: খলিফা দ্বিতীয় ওমর খারেজি সম্প্রদায়ের প্রতি সহানুভূতি দেখান। কারণ খারেজিরা ছিল
উমাইয়া শাসনের বিরোধী। তিনি খারেজিদের প্রতি সদাচরণ করার জন্য প্রত্যেক প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের নির্দেশ দেন। ফলে তাঁর আমলে খারেজিগণ কোনো বিদ্রোহ করে নি।
অমুসলিম প্রজাদের প্রতি তাঁর নীতি: মহানুভব এবং উদারতার মূর্ত প্রতীক ওমর জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল শ্রেণির লোকদের প্রতি সহানুভূতি দেখান। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের গির্জা ও ধর্মশালাগুলো ফিরিয়ে দেন এবং তা সংস্কার ও মেরামতের জন্য অর্থ সাহায্য করেন। বার্ষিক কর ২০০০ বস্ত্র খন্ড হতে ২০০ বস্তু খন্ডে কমিয়ে দিয়ে তাদের সচ্ছলতা দান করেন। এছাড়া সারগোসায় একটি নতুন গির্জা নির্মাণ ও গুহায় সেপ্ট থমাসের গির্জা পুনঃনির্মাণের অনুমতি দেন।
মাওয়ালি নীতি: নবদীক্ষিত মুসলমানগণ রাষ্ট্রীয়কার্য ও যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণের পর অন্যান্য আরব মুসলমানদের ন্যায় সুযোগ-সুবিধা পায় নি। তিনি তাদের প্রতি সদয় হন এবং আব্দুল মালিকের চাপিয়ে দেওয়া জিজিয়া কর তিনি মাওয়ালিদের উপর হতে প্রত্যাহার করেন। ফলে অল্পদিনের মধ্যে খোরাসান, বোখারা, সমরখন্দ ও নিশাপুর প্রভৃতি এলাকায় ইসলাম ব্যাপক প্রসার লাভ করে।
সংস্কারসমূহ
খলিফা ওমর বিন আব্দুল আজিজ-এর সংস্কারসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো:
রাজস্ব সংস্কার: তাঁর সময় নবদীক্ষিত মুসলমানদের (মাওয়ালিদের) নানাপ্রকার কর রেহাই দেয়ায় রাজকোষে অর্থসংকট দেখা দেয়। তাই রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করার জন্য তিনি কতিপয় বলিষ্ঠ পন্থা অবলম্বন করেন। এ বিষয়ে হাজ্জাজের ব্যবস্থার চেয়ে তাঁর ব্যবস্থা অনেক সুবিবেচিত ছিল।
নবদীক্ষিত মুসলমানদের জিজিয়া প্রদান: কোনো মুসলমানকে ভূমি রাজস্ব বা খারাজ প্রদান করতে হতো না। তাদের উৎপন্ন দ্রব্যের এক-পঞ্চমাংশ খারাজের পরিবর্তে এক-দশমাংশ উশর রাজস্ব হিসেবে প্রদান করত। ফলে রাষ্ট্র অর্ধেক রাজস্ব হতে বঞ্চিত হতো। তাই খলিফা নবদীক্ষিত মুসলমানদের ভূমি রাজস্ব এবং জিজিয়া প্রদানে বাধ্য করেন।
খারাজি ভূমি ক্রয়-বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা তিনি মদিনায় উলামাদের সাথে একমত হয়ে ঘোষণা দেন যে, ১০০ হিজরি পর অমুসলমানেরা মুসলমানদের কাছে খারাজ ভূমি বিক্রি করতে পারবে না। এ ঘোষণার ফলে রাজস্বের দিক দিয়ে ক্ষতির সম্ভাবনা কিছুটা দূর হলো।
সকল অমুসলিমদের জিজিয়া প্রদানের নির্দেশ রাজকোষের আয় বৃদ্ধির জন্য পূর্ববর্তী খলিফাদের অনুকরণে তিনি প্রত্যেক অমুসলমান অর্থাৎ ইহুদি, খ্রিষ্টান, অগ্নি উপাসকদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য নিয়মিত জিজিয়া কর প্রদানের নির্দেশ প্রদান করেন।
উমাইয়াদের সঞ্চিত সম্পত্তি রাজকোষে জমাদানের নির্দেশ: খলিফা নিজে মাত্র ২০০ টাকার সম্পত্তি রেখে অবশিষ্ট সম্পত্তি রাজকোষে জমা দেন, তিনি উমাইয়াদের সঞ্চিত অতিরিক্ত সম্পত্তি রাজকোষে জমা দিতে নির্দেশ দেন। উমাইয়াগণের মধ্যে অনেকেই অতিরিক্ত সম্পত্তি রাজকোষে জমা দেন। এ সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করার ফলে রাজকোষ অর্থশূন্যতা কাটিয়ে ওঠে এবং আর্থিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়।
কৃষি সংস্কার: রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ছিল অপরিহার্য। দ্বিতীয় উমর ভূমি জরিপ করে সঠিক খাজনা নির্ধারণ করেন। তিনি আদমশুমারি করেন এবং সেতু ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করেন। ফলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটে। জনসাধারণ সুখ ও শান্তিতে বসবাস করেন।
বৈদেশিক নীতি: খলিফা দ্বিতীয় উমর রাজ্য বিস্তার অপেক্ষা রাজ্য শাসন বেশি পছন্দ করতেন। মাসলামার নেতৃত্বে কনস্টান্টিনোপল-এর প্রাচীরের পাদদেশে অবস্থিত সেনাদের ফিরিয়ে আনা হয় এবং সকল অভিযান বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্পেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সেখানকার শাসক আল-হ্ররকে পরিবর্তন করে আল-সামাহকে শাসক নিয়োগ করা হয়। রাজ্য বিস্তারের চেয়ে রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করেন।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: দ্বিতীয় ওমর শাসনকর্তাদের চেয়ে বিচারকদের বেশি গুরুত্ব দিতেন। বিচারের ক্ষেত্রে মুসলমান ও অমুসলমানের কোনো পার্থক্য ছিল না। বিচারকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য তিনি তাদের উচ্চতর মর্যাদা ও বেতন প্রদান করেন। হাসান আল বসরী ছিলেন তাঁর সময় বসরায় প্রধান কাজি।
ওমর-বিন-আব্দুল আজিজের মৃত্যু
ওমর বিন আব্দুল আজিজের প্রবর্তিত কঠোর ও নিরপেক্ষ নীতি উমাইয়াদের মনঃপূত হয় নি। উমাইয়ারা বুঝতে পারে, তাঁর নীতির জন্য ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি দ্রুত তাদের হস্তচ্যুত হয়ে যাবে। খলিফার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য উমাইয়ারা খলিফার খেদমতে নিযুক্ত জনৈক ক্রীতদাসকে উৎকোচ দ্বারা বশীভূত করে তাঁর সাহায্যে খলিফাকে বিষ প্রয়োগ করা হয়। এর ফলাফল হয়েছিল মারাত্মক। ফলে তিনি হিমসের নিকটবর্তী 'দায়র সিমান' নামক স্থানে ৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে ১০১ হিজরির মাঝামাঝি মারা যান।
ওমর-বিন-আব্দুল আজিজ-এর চরিত্র
খলিফা দ্বিতীয় ওমর উন্নত চরিত্রের লোক ছিলেন। তাঁর চরিত্রের গুণাবলিতে মুগ্ধ হয়ে ঐতিহাসিকগণ তাঁকে খুলাফায়ের খলিফাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং তাঁকে ইসলামের পঞ্চম খলিফা আখ্যায়িত করেছেন। উমাইয়াদের মধ্যে তিনিই একমাত্র খলিফা যিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগার হতে নিজের ব্যয়ের জন্য দৈনিক মাত্র ২ দিরহাম খরচ করতেন। ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তাঁর মতো ন্যায়পরায়ণ, নিষ্ঠাবান ও ধার্মিক শাসক শুধু একালেও নয় সেকালেও বিরল ছিল। আব্বাসীয় খলিফা আস সাফফাহ সকল উমাইয়ার কবর অপবিত্র করলেও দ্বিতীয় ওমরের কবরটি করেন নি। গরিবের বন্ধু হিসেবে দ্বিতীয় ওমর ঐতিহাসিক খ্যাতি লাভ করেন। ধনী-দরিদ্র সকল শ্রেণির প্রজা তাঁর দরবারে ন্যায়বিচার লাভ করত। প্রজাদের কল্যাণের জন্য তিনি প্রাদেশিক শাসকদের নির্দেশ প্রদান করেন। ঐতিহাসিক আমির আলী বলেন, "Unaffected piety, a keen sense of justice, unswerving uprightness, moderation and an almost primitive simplicity of life formed the chief features in his character." অর্থাৎ "অব্যাহত ধর্মানুরাগ, তীক্ষ্ণ ন্যায়দর্শিতা, অবিচল নীতিবোধ, সহিষ্ণুতা এবং আদিম সরলতা তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ছিল।"
ওমর-বিন-আব্দুল আজিজ-এর কৃতিত্ব
নিম্নে ওমর-বিন-আব্দুল আজিজ-এর কৃতিত্বসমূহ আলোচনা করা হলো:
ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, "Though he was inspired by the best of intentions, Umar's policy was not successful." অর্থাৎ "ওমর সদিচ্ছায় অনুপ্রাণিত হয়ে শাসন সংস্কার করলেও তাঁর নীতি সফল হয় নি।" এর ফলে রাষ্ট্রের রাজস্ব কমে যায়। কতিপয় ঐতিহাসিক অভিযোগ করেন যে, তাঁর ত্রুটিপূর্ণ শাসনব্যবস্থা ও সংস্কার উমাইয়া বংশের পতনের অন্যতম কারণ। প্রকৃতপক্ষে তাঁকে উমাইয়া বংশের ধ্বংসের জন্য দায়ী করা যায় না। এ সম্পর্কে ওয়েল হাউসেন বলেন, "উমাইয়া বংশ তাঁর রাজত্বের পূর্ব থেকেই টলমলে অবস্থায় ছিল।" মূলত তাঁর শাসন সংস্কার উমাইয়া বংশের পতনের জন্য দায়ী না হয়ে বরং স্থায়িত্বের অনুকূলে ছিল। যেমন-
প্রথমত, দ্বিতীয় ওমরের শাসনব্যবস্থায় রাজ্যে সাময়িকভাবে রাজস্বের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল বটে, কিন্তু খলিফা তা বুঝতে পেরে কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভূমি রাজস্ব খারাজ বৃদ্ধি করেন।
দ্বিতীয়ত, হাশেমী ও আলীর সমর্থকগণ পরবর্তীকালে উমাইয়া বংশের পতনের জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেজন্য দ্বিতীয় ওমরকে দায়ী করা যায় না। বরং দায়ী ছিলেন তাঁর পরবর্তী দুর্বল উত্তরাধিকারিগণ। খলিফার উদার শাসনে হাশেমী ও আলীর সমর্থকগণ উমাইয়া বংশের উপর বিদ্বেষভাব ভুলে গিয়েছিল। এমনকি যে খারেজিগণ শক্তিশালী উমাইয়া খলিফাগণকে স্বীকৃতি প্রদান করেনি, তারাও এ রাজর্ষিকে স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত হন নি। তাই বলা যায় যে, তাঁর উত্তরাধিকারিগণ বিশেষ করে দ্বিতীয় ওয়ালিদ, তৃতীয় ইয়াজিদ, দ্বিতীয় মারওয়ান যদি তাঁর অনুসৃত নীতি অনুসরণ করত তবে সাম্রাজ্যে কোনো প্রকার গোলযোগ দেখা দিত না বরং তাদের পতন আরো বিলম্বিত হতো।
তৃতীয়ত, অনেক ঐতিহাসিকই তাঁর বৈদেশিক নীতির সমালোচনা করে বলেন যে, সম্প্রসারণ নীতি এবং সামরিক বিভাগের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করার ফলে সামরিক শক্তি হ্রাস পায় এবং সৈন্যবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। এ রকম অভিযোগ সত্য নয়।
কেননা দ্বিতীয় ওমর ছিলেন শান্তিপ্রিয়, সাম্রাজ্যবাদী রণনীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর শাসনকালে অভ্যন্তরীণ গোলযোগ সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা হয়। উপরন্তু তিনি সমরনীতির পরিবর্তে সংগঠন পদ্ধতিকে অধিক গুরুত্ব দেন। খোদাবক্সের মতে, "The military organization of Omar I had already done its task before the reign of Omar II. Under the caliphate of Walid, the Arab conquest had reached limits which could no longer be extender or over-stepped." অর্থাৎ "প্রথম ওমর ইসলামি রাষ্ট্রের সামরিক সংগঠন সুষ্ঠুভাবে সমাধা করে যান এবং খলিফা ওয়ালিদের আমলে পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তরে ইসলামি সাম্রাজ্যের যথেষ্ট বিস্তৃতি হয়েছিল। এরপর আর রাজ্য বিস্তারের প্রয়োজন ছিল না।" অবশ্য সামরিক বিভাগের প্রতি পুরোপুরি অবহেলা প্রদর্শন করা খলিফার উচিত হয় নি। তাই তাঁর খিলাফত উমাইয়া বংশের পতনের জন্য কিছুটা দায়ী হলেও পুরোপুরিভাবে দায়ী করা যায় না।
দ্বিতীয় ওমরের শাসননীতির পর্যালোচনা: খলিফা দ্বিতীয় ওমরের নীতি যদিও জনকল্যাণমুখী তথাপি তাঁর নীতি উমাইয়া বংশের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। বিশেষ করে হাশেমী, আলীপন্থী ও খারেজিদের প্রতি উদারতা প্রদর্শন এবং মাওয়ালি নীতি উমাইয়া বংশের পতনকে ত্বরান্বিত করে। এ সকল নীতির ফলে বিদ্রোহীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং উমাইয়াদের পতন ঘটানোর জন্য চেষ্টা করে। তাঁর বৈদেশিক নীতি আরও মারাত্মক ছিল। কারণ সৈন্যবাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে রাখার জন্য বিদেশে উমাইয়াদের গৌরব হ্রাস পায়। ঐতিহাসিকরা দ্বিতীয় উমরের ভূয়সী প্রশংসা করলেও সরল মানসিকতার জন্য উমাইয়া সাম্রাজ্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পরিশেষে বলা যায়, দ্বিতীয় ওমরের মতো ন্যায়বান শাসক ইতিহাসে বিরল। তিনি সিংহাসনে আরোহণ করে উমাইয়াদের প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন করে ইসলামি প্রশাসন ব্যবস্থার রূপরেখাভিত্তিক শাসন পরিচালনা করেন। তাঁর শাসনব্যবস্থার প্রশংসা করে ঐতিহাসিকগণ তাকে পঞ্চম খলিফা বলে আখ্যায়িত করেন।
উমাইয়া খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

