- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- উমাইয়া খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
উমাইয়া খিলাফতের ক্রমাবনতি ও পতন
মুয়াবিয়া কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ উমাইয়া বংশ নামে খ্যাত। ৬৬১ হতে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৯০ বছর উমাইয়ারা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। মুয়াবিয়া কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের উত্থান, উন্নতির চরম শিখরে অবস্থান ও পতন এ তিনটি ধাপ অতিক্রম করে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে যাবের যুদ্ধে উমাইয়া শেষ খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে উমাইয়া বংশের পতন সংঘটিত হয়। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক ইবনে খালদুনের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তাঁর মতে "বে কোনো রাজবংশের স্থায়িত্বকাল ১০০ বছর।" তাঁর সংজ্ঞানুযায়ী সকল রাজবংশের প্রতিষ্ঠা, চরম উন্নতি ও পতন এ তিনটি অধ্যায় অতিক্রম করতে হয়। উমাইয়ারা স্বাভাবিককাল অতিক্রম করতে না পারলেও বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে তাদের পতন ঘটে।
উমাইয়া বংশের পতনের কারণ
উমাইয়া বংশের পতনের কারণগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো:
১. রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা: উমাইয়া বংশের প্রতিষ্ঠাতা মুয়াবিয়া বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইসলামের সাথে সম্পাদিত সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে পুত্র ইয়াজিদকে পরবর্তী উত্তরাধিকারী নিযুক্ত করে ইসলামি গণতন্ত্রের পরিবর্তে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। খুলাফায়ে রাশেদিনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ধ্বংস করে রাজতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ উমাইয়াদের প্রতি আস্থা স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়।
২. উত্তরাধিকার নীতির অভাব: উমাইয়া যুগে গণতন্ত্রের পরিবর্তে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ায় খলিফার মৃত্যুর পর পরবর্তী খলিফা নির্বাচনে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতি ছিল না। খলিফার যোগ্যতার কথা চিন্তা না করে নিজ পুত্রদের পরবর্তী খলিফা নিয়োগে প্রাধান্য দিতেন। ফলে যোগ্যের চেয়ে অযোগ্য খলিফাই বেশি নিয়োগ পেতেন। অপরদিকে সিংহাসন নিয়ে পিতা-পুত্র, ভ্রাতা-ভগ্নি, আমির-উমরাহদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-কলহ লেগে থাকত। ফলে 'জোর যার মুল্লক তার' এ নীতি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. খলিফাদের বিলাসিতা ও অনৈসলামিক কার্যকলাপ উমাইয়া খলিফারা যদিও মুসলমান তথাপি তারা ইসলামি খিলাফত থেকে দূরে সরে পড়েন। ইসলামি শাসনের পরিবর্তে তারা স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। রাজদরবারে অনেক অনৈসলামিক কার্যকলাপ সংঘটিত হয়। মদ-জুয়ার প্রচলন শুরু হয়। একমাত্র খলিফা দ্বিতীয় ওমর ছাড়া সকল উমাইয়া খলিফা ভোগ-বিলাস ও জাগতিক মোহে অন্ধ হয়ে পড়েন। কুরআন-হাদিসের পরিপন্থী কাজ করতে থাকেন।
৪. মন্ত্রিবর্গের বিশ্বাসঘাতকতা: উমাইয়া খলিফারা মজলিস-উস-সূরার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে উজির ও মন্ত্রী নিয়োগ করেন। খলিফারা যখন ভোগ-বিলাসে ব্যস্ত, সুচতুর উজিরগণ তখন নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে সিদ্ধহস্ত। মন্ত্রিবর্গ ইচ্ছা মোতাবেক কার্যকলাপ পরিচালনা করেন। এমনকি রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ করতে তারা কুণ্ঠাবোধ করে নি। অনেক সময় বিদ্রোহীদের সাহায্য করেছেন এবং বিদ্রোহীদের দলে যোগদান করে খলিফার পতন ঘটান।
৫. সেনাবাহিনীর বিদ্রোহ: সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা শাসকের শক্তিকে বৃদ্ধি করে। উমাইয়া খলিফারা সেনাবাহিনীর উপর নির্ভরশীল ছিল। শাসকরা যখন অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িত কিংবা নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করত, তখন সেনাবাহিনী নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য তৎপর হতো এমনকি বিদ্রোহী হয়ে উঠত। অনেক সময় অযোগ্য শাসকদের আমলে রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়লে সৈন্যদের বেতন বাকি পড়ে যেত, ফলে তারা বিদ্রোহ করত। সেনাবাহিনীর বিদ্রোহ উমাইয়া শাসনের পতনের জন্য কিছুটা দায়ী।
৬. অনারব মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য: উমাইয়া বংশের অধিকাংশ শাসকই ইসলামের মূল আদর্শচ্যুত হয়ে নওমুসলমান ও অনারব মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করত। অনারব মুসলমানগণ আরব মুসলমানদের ন্যায় ইসলামের খেদমত করেও তাদের মতো সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এমনকি খলিফা আব্দুল মালিকের সময় তাদের উপর খারাজ ও জিজিয়া কর ধার্য করা হয়।
৭. হাশেমী ও উমাইয়া বিরোধ: উমাইয়া সাম্রাজ্যের পতনের জন্য কুরাইশ বংশের দুটি শাখা হাশেমী ও উমাইয়াদের মধ্যকার বিরোধ কম দায়ী নয় বরং আরও বেশি। হাশেমীদের হাত থেকে জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল করার ফলে হাশেমীরা উমাইয়া শাসনের বিরোধিতা করতে থাকে। অপরদিকে উমাইয়ারা হাশেমীদের দমনের জন্য নানাভাবে তাদের শোষণ করতে থাকে।
৮. মাওয়ালিদের প্রতি দুর্ব্যবহার: উমাইয়া খলিফাদের গোত্র বা বংশ প্রীতি তাদের পতনের জন্য দায়ী। উমাইয়া খলিফারা মাওয়ালি মুসলমানদের প্রতি দুর্ব্যবহার করেন। তাদের অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট মুসলমান বলা হতো। নব্য মুসলমানগণ যদিও ইসলাম ধর্মের অনুসরণ করতেন কিন্তু তথাপিও উমাইয়া শাসকগণ তাদের উপর, জিজিয়া ও খারাজ ধার্য করেন। ফলে মাওয়ালিরা উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
৯. হেজাজী-ইয়ামেনীদের দ্বন্দ্ব হেজাজী ও ইয়ামেনীদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বকে উমাইয়া শাসকগণ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য দমন না করে এক পক্ষকে সমর্থন দান করে অপরপক্ষকে শায়েস্তা করেন। ফলে তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব উমাইয়াদের ইন্ধনের ফলে আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
১০. সাম্রাজ্যের বিশালতা উমাইয়া আমলে মুসলিম সাম্রাজ্য ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছিল। পূর্বে সিন্ধু হতে পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত এ বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করা কঠিন হয়ে পড়ত দুর্বল শাসকদের আমলে। ফলে প্রজারা খলিফাদের প্রতি সন্দিহান হয়ে ওঠেন। অপরদিকে প্রাদেশিক শাসকগণ কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা না করে নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন।
১১. শিয়া সম্প্রদায়ের বিরোধ: উমাইয়াদের পতনের মূলে ছিল শিয়া সম্প্রদায়ের বিরোধিতা। উমাইয়ারা হাশিমীয়দের নিকট হতে ক্ষমতা দখল করেন। অপরদিকে কারবালায় ইমাম হোসেনকে হত্যা করে উমাইয়ারা শিয়াদের রোষানলে পড়েন। শিয়ারা সব সময় উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং উমাইয়া বিরোধী আব্বাসীয় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে উমাইয়াদের পতন ঘটান।
১২. খারেজিদের বিদ্রোহ খারেজিদের চিরশত্রু ছিল উমাইয়া শাসকগণ। উমাইয়াদের পতন ঘটানোই ছিল খারেজিদের প্রধান লক্ষ্য। খারেজিদের মতে উমাইয়া খিলাফত ও খলিফা উভয়ই অবৈধ। তাই তাদের ক্ষমতাচ্যুত করা ধর্মীয় কর্তব্য। ফলে তারা উমাইয়া সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে উমাইয়া বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন।
১৩. শূন্য রাজকোষ: খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে রাজকোষ ছিল জনসাধারণের, খলিফাগণ ছিল খাদেম ও রক্ষক মাত্র। কিন্তু উমাইয়া আমলে তা খলিফাদের ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হয়। খলিফারা খেয়ালখুশিমতো রাজকার্য 'পরিচালনা করতে থাকে। বিলাসিতার জন্য খলিফাগণ প্রচুর অর্থ অপচয় করেন ফলে রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে।
১৪. অমুসলিম প্রজাদের বিরোধ উমাইয়া সাম্রাজ্যে বসবাসকারী অমুসলিম প্রজাগণ বিভিন্ন প্রকার নাগরিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করা সত্ত্বেও মুসলিম শাসনের বিরোধিতা করতে থাকে। উমাইয়া বিরোধী আন্দোলনে তারা পরোক্ষভাবে ইন্ধন যোগায়।
১৫. রোমান সাম্রাজ্যের বিরোধ মুসলমানগণ রোমানদের পরাজিত করে বিভিন্ন এলাকা সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। সাম্রাজ্যের মধ্যে অমুসলিম প্রজারা বসবাস করতে থাকে। তাদের অজুহাতে মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমায় বিভিন্ন অমুসলিম দেশ মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে যড়যন্ত্র করতে থাকে।
১৬. শাসকদের নিষ্ঠুরতা ও স্বৈরাচারিতা উমাইয়া শাসকগণ স্বৈরাচারী ছিলেন। স্বৈরাচারিতা ও নিষ্ঠুরতার জন্য উমাইয়া সাম্রাজ্যে প্রজাসাধারণ শাসকদের থেকে বহুদূরে সরে গিয়েছেন। তারা মদ, জুয়া, নারী নিয়ে মগ্ন থাকতেন।
১৭. খলিফা দ্বিতীয় ওমরের নীতি উমাইয়া বংশের পতনের পিছনে খলিফা দ্বিতীয় ওমরের গৃহীত নীতি কিছুটা দায়ী। খলিফা দ্বিতীয় ওমর যে সকল নীতি গ্রহণ করেছিলেন তার জন্য উমাইয়া বংশের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
১৮. আব্বাসীয় আন্দোলন উমাইয়া বংশের পতন ঘটানোর জন্য আব্বাসীয় আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং আব্বাসীয় আন্দোলনের নেতা আবু মুসলিম, খালিদ বার্মাক, আবুল আব্বাস ও আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে খারেজি, শিয়া, অনারব মুসলিমগণ একত্রিত হয়ে উমাইয়া বিরোধী গণআন্দোলন গড়ে তোলেন এবং ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে যাব নদীর তীরে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে উমাইয়া বংশের শেষ শাসক দ্বিতীয় মারওয়ানকে পরাজিত করে নব্বই বছরব্যাপী চলমান উমাইয়া সাম্রাজ্য ধ্বংস করা হয়।
উমাইয়া সাম্রাজ্যের পতনের পিছনে বহুবিধ কারণ বিদ্যমান। উমাইয়া শাসকগণ বেশি স্বৈরাচারী ছিলেন। তাদের শাসনে জনগণ বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন এবং আব্বাসীয় আন্দোলনকে সমর্থন করে উমাইয়া শাসনের পতন ঘটান। উমাইয়াগণ যে তরবারির জোরে গণতন্ত্রের কবর রচনা করে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে সে তরবারি দিয়েই ৯০ বছর পর উমাইয়াদের পতন ঘটানো হয়।
উমাইয়া খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

