- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- উমাইয়া খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
উমাইয়া আমলের আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্য
উমাইয়া খিলাফতে খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলের অনুসৃত রাষ্ট্রীয় নীতিমালার পরিবর্তন হয়। রাজ্য সম্প্রসারণের ফলে খলিফারা প্রাচুর্য ও বিত্ত-বৈভবের অধিকারী বিজিত জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে আসেন। দ্বিতীয় ওমর ব্যতীত সব উমাইয়া খলিফা ছিলেন ইন্দ্রিয়পরায়ণ, সৌখিন ও বিলাসপ্রিয়। তাঁদের জীবনযাত্রার এ বিবর্তনে প্রচুর অর্থকড়ি ব্যয় হতো। জনসাধারণের নিকট তাঁদের কোনো দায়বদ্ধতা ছিল না বলে অজস্র অর্থ ব্যয় করেও ব্যক্তিগত অধিকার বলে তারা এবং তাঁদের আত্মীয়স্বজন অঢেল সম্পদের মালিক হন।
বায়তুলমাল রোষ্ট্রীয় কোষাগার)-কে কুক্ষিগত করে খলিফাগণ তেমন জনকল্যাণমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন না। তাঁদের ভোগ-বিলাস এবং রোমান ও পারসিক রীতিনীতি মোতাবেক জাঁকজমকের সাথে শাসনকার্য পরিচালনায় অত্যধিক ব্যয় নির্বাহের জন্য রাজকোষে অর্থ সংকট দেখা দেয়। অর্থ ঘাটতি পূরণে খুলাফায়ে রাশেদিনের পূর্বে গৃহীত অর্থ সংগ্রহ নীতির কিছুটা পরিবর্তন সাধন করেন। আরোপকৃত অতিরিক্ত করের মধ্যে-
(ক) সন্ধির শর্তানুযায়ী লোকগোষ্ঠী বা ব্যক্তির নিকট হতে আদায় করা কর।
(খ) বিভিন্ন দ্রব্যের উপর ধার্যকৃত কর;
(গ) উৎসবাদি কর;.
(ঘ) বার্বারদের শিশুর জন্য ধার্য কর;
(ঙ) নবদীক্ষিত মুসলমানদের নিকট হতে জিজিয়া ও খারাজ এবং
(চ) জাহাজ নির্মাণের দ্রব্যাদি ও যন্ত্রপাতির উপর আরোপিত কর অন্যতম।
এ সকল কর বিশেষত মাওয়ালিদের উপর খারাজ ও জিজিয়া আরোপের দরুন তাদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ জাগিয়ে তোলে। তাদের এই বৈষম্যমূলক আচরণ উমাইয়া শাসনের পতনে ইন্ধন সৃষ্টি করে। কতিপয় খলিফা তাঁদের চিত্তবিনোদনের জন্য সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে মনোরম অট্টালিকা নির্মাণে বহু অর্থ ব্যয় করেন। তদুপরি উমাইয়া শাসনামলে হেরেম প্রথার প্রচলন ও খোজা নিয়োগের মধ্য দিয়ে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার অবক্ষয় প্রতীতি হয়।
আরব-অনারব, বিজেতা-বিজিত এবং মুসলিম ও অমুসলিম প্রভৃতি দৃষ্টিকোণ হতে বিচার-বিশ্লেষণ করে ঐতিহাসিকগণ উমাইয়া যুগের সমাজকে প্রধানত চারটি স্তরে ভাগ করেছেন। এর প্রথম পর্যায়ে রাজপরিবার, শাসকগোষ্ঠী ও বিজেতা আরবগণ; দ্বিতীয় পর্যায়ে মাওয়ালি ও নও-মুসলিম সম্প্রদায়; তৃতীয় পর্যায়ে আহলে জিম্মাহ বা রক্ষিত সম্প্রদায় এবং সর্বনিম্ন পর্যায়ে আবদ বা মামলুক বা দাসদেরকে ধরা হয়েছে।
শাসকগোষ্ঠী ও আরব বিজেতাগণ খলিফা রাজদরবারের অন্যান্য সদস্য ও বিজেতা আরব কুলীন সম্প্রদায় প্রথম শ্রেণির নাগরিক হিসেবে পরিগণিত হতেন। এরাই ছিলেন সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণি। এরা সকলেই রাজকোষ হতে প্রচুর ভাতা পেতেন। খলিফা প্রথম ওয়ালিদের সময় শুধু দামেস্কেই এদের সংখ্যা ছিল ৪৫,০০০। প্রথম মারওয়ানের সময় কেবল হিমসেই ২০,০০০ সুবিধাভোগী আরব কুলীন সম্প্রদায়কে ভাতার তালিকাভুক্ত করা হয়। বস্তুত এ শ্রেণির হাতেই রাজ্যের সম্পত্তি কুক্ষিগত হয়েছিল। ভূমিলোভী উমাইয়াগণ খলিফা ওমরের আদেশ অমান্য করে রাজ্যের সমুদয় ভূসম্পত্তি নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেয়। অথচ এগুলোর কোনো খারাজ দিতে হতো না। উপরন্তু হাজার হাজার দাস-দাসী নিয়ে সেসব সম্পত্তির আয়ে তারা রাজকীয় জীবনযাপন করত।
মাওয়ালি: সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে মাওয়ালি বা নবদীক্ষিত মুসলমানরা দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত ছিল। ইসলাম গ্রহণ করার ফলে আইনত তারা আরবীয় মুসলমানদের মতো সকল বিষয়ে সম-পদমর্যাদার অধিকারী হলেও তাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার দেওয়া হয় নি। আরব কুলীনরা সবসময় তাদের উপেক্ষা করে চলত এবং তাদের সাথে পথচলা, সমভাবে কথা বলা বা সমআসনে বসার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। পদবি ছাড়া পুরা নামে তাদের সম্বোধন করত না। সভাসমিতিতে সমঅধিকার নিয়ে কথা বলা কিংবা উচ্চাসনে উপবিষ্ট হওয়া নিষেধ ছিল। ইসলামে অনুপ্রবেশ করা সত্ত্বেও তাদের খারাজ-জিজিয়া প্রভৃতি দিতে হতো। প্রকৃতপক্ষে আরববাসীরা ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত মাওয়ালিগণ সমাজে উচ্চাসন পায় নি। এ কারণে বিরক্ত ও বঞ্চিত মাওয়ালিগণ আব্বাসীয় আন্দোলন শুরু হলে সে আন্দোলনে যোগদান করে উমাইয়া বংশের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
জিম্মি (খ্রিষ্টান, ইহুদি ও সাবীয়ানগণ): মাওয়ালি ছিলেন সমাজের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। শুধুমাত্র আব্দুল মালিক ও দ্বিতীয় ওমরের শাসনকাল ছাড়া অন্য সময়ে নানা সুবিধা, গ্রহণ করে দ্বিতীয় পর্যায়ের মাওয়ালিরা কখনো আরব অভিজাতদের সমমর্যাদা লাভ করত। কেননা ইসলামে এরা আহলে কিতাবের মর্যাদায় অভিষিক্ত ছিল। শুধুমাত্র জিজিয়া প্রদানের শর্তে মুসলিম রাষ্ট্রে এরা বসবাস করত। আহলে কিতাব হওয়ার কারণে মহিলার সাথে মুসলমান পুরুষের বিবাহ বৈধ ছিল। শুধুমাত্র আনুগত্যের শর্তে জিম্মিদের স্বাধীনতা ছিল অবারিত। রাজ্যবিস্তৃতির সাথে সাথে জোরোস্ট্রিয়ান এবং পৌত্তলিক যাযাবরগণও জিম্মি হিসেবে পরিগণিত হয়। এরা রাজকার্যে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। খলিফা মুয়াবিয়া বিশেষত খ্রিষ্টানদের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল ছিলেন। মুয়াবিয়ার সভাকবি ইউহান্না এবং হিল্লীজা ইয়াজিদের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। উমাইয়াদের সভাকবি আল-আখতাল এবং মুয়াবিয়ার গৃহচিকিৎসক উছলি ছিলেন খ্রিষ্টান। সিরিয়ার খ্রিষ্টানদের সাথে মুয়াবিয়ার সখ্য ছিল। এরা সকলে তার সমর্থকও ছিলেন। জ্যাকেবাইট ও ম্যারোনাইট খ্রিষ্টানগণ ধর্মীয় বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য মুয়াবিয়ার দরবারে হাজির হতো। মুয়াবিয়া এডেসার ভগ্ন গির্জাটি পুনঃনির্মাণ করে খ্রিষ্টানদের প্রতি যথেষ্ট সহনশীলতা প্রদর্শন করেন।
মামলুক বা দাস: উমাইয়া আমলে দাস প্রথার প্রচলন থাকলেও এরা নানা সুযোগ-সুবিধা লাভ করত। মেধা, যোগ্যতা ও দাসদের প্রতি ইসলামের নমনীয় মনোভাবের কারণে সার্বিক অবস্থা খারাপ ছিল না। তদানীন্তন সমাজে দাস ছিল দুধরনের-ক্রীতদাস ও যুদ্ধবন্দী দাস-দাসী। আফ্রিকার বাজার হতে যে সকল দাসকে ক্রয় করা হতো তারা বংশানুক্রমিক ক্রীতদাস এবং স্পেন, তুর্কিস্থান ও মধ্য এশিয়া প্রভৃতি দেশ হতে যেসকল যুদ্ধবন্দী আনা হতো তারা দাস হিসেবে বিবেচিত হতো। এসকল দাস-দাসী মনিবের গৃহকর্ম, ব্যবসায়-বাণিজ্য বা খামারে কাজ করত। দাস-দাসীদের সন্তানরা দাস বা দাসী হয়েই থাকত। কিন্তু স্বাধীন পুরুষ কোনো দাসীর গর্ভজাত সন্তানের জনক হলে সে সন্তান আযাদ বলে পরিগণিত হতো এবং পিতার সম্পত্তির অংশীদার হতো। অনুরূপভাবে স্বাধীন মাতার সন্তানের পিতা যদি কোনো দাস হয় তবে সেই সন্তান আযাদ হিসেবে গণ্য হতো। দাসীর উপর মনিবের পূর্ণ অধিকার শরিয়ত স্বীকৃত। দাসীকে আযাদ করে মনিব বিবাহ করতে পারতেন। কিন্তু দাসিত্বে থাকা অবস্থায় মনিব দাসীর বিবাহ আইনসম্মত নয়।
উমাইয়া আমলে যুদ্ধবন্দী দাস-দাসী অসম্ভব রকম বৃদ্ধি পায়। সিফফিনের যুদ্ধে মুয়াবিয়ার প্রায় সৈন্যেরই অন্তত একজন হতে দশজন করে সেবাকারী দাস বর্তমান ছিল। মুসা ইবনে নুসায়ের ইফরিকিয়া হতে ৩,০০,০০০ দাস-দাসী সংগ্রহ করেন এবং স্পেন হতে ৩০,০০০ কুমারী বন্দী করেন। সেনাপতি কুতায়বা সোগদিয়ানা হতে এক লক্ষেরও অধিক যুদ্ধবন্দীকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করেন। এ সকল দাস-দাসীর ১/৫ অংশ খলিফার রাজকোষে জমা হতো এবং অধিকাংশ গাজীদিগের মধ্যে বণ্টন করা হতো। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দাস-দাসীরা নানা সুযোগ-সুবিধার অন্তরালে রাজপরিবার, বিত্তশালী ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত হতো। মোটকথা উমাইয়া আমলে দাসদের জীবন দুর্বিষহ ছিল না। বিভিন্ন মানবিক অধিকার ভোগ করত। ইসলামের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ক্রীতদাসগণ অভূতপূর্ব ও অসাধারণ পদমর্যাদার অধিকারী হন। মিশরে ও দিল্লিতে তারা রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের সর্বোচ্চ পদও অলংকৃত করেছেন।
উমাইয়া শাসনামলে নারীরা বিশেষ সামাজিক মর্যাদা ও স্বাধীনতা ভোগ করতেন। মেধা বিকাশের সুযোগ অবারিত ছিল। এ সময়ের কয়েকজন অনন্য সুন্দরী, গুণান্বিতা এবং বিদুষী মহিলার কথা জানা যায়। ইমাম হোসেন (রা.)-এর কন্যা সৈয়দা সখিনা, আয়েশা বিনতে তালহা ও উম্মুল বনিন ছিলেন সে যুগের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী এবং প্রতিভাধর রমণী। তৎকালীন ধার্মিক এবং শ্রেষ্ঠ নারীদের মধ্যে তাপসী রাবেয়া অন্যতম ছিলেন।
উমাইয়া যুগে সমাজ জীবনে নৈতিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছিল। শাসক অভিজাতদের বিলাস-ব্যসনে খিলাফত তথা মুসলমানদের পবিত্রতা ম্লান হতে বসেছিল। হেরেম প্রথা, আনন্দ-উল্লাস, মদ্য পান প্রভৃতি সমাজকে নিস্তেজ করে ফেলেছিল। সুন্দরী গায়িকা, নর্তকী ও উপপত্নীদের ভিড়ে সমাজের মৌলিক চেতনা ও প্রবহমান মানবিক ধারা বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। অঢেল অর্থের বেহিসাবি ব্যয় তদানীন্তন সমাজের বিত্তবানদের দেউলিয়া করে তুলেছিল। দেশে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। বঞ্চিত উপসম্প্রদায়সমূহের অসন্তোষ উমাইয়াদের সাধের খিলাফতকে শতাধিক বছরও অতিক্রম করতে দেয় নি।
উমাইয়া যুগে খাদ্য ও খাদ্যাভাসেও তেমন বিশেষ পরিবর্তন ঘটে নি। পূর্বের মতোই ছিল। তবে তেল, ঘি উপাচারে প্রস্তুতকৃত খাদ্য, পাখির মাংস প্রভৃতি নতুন সংযোজন হয়। আনন্দ-ফুর্তি ও যৌনবিলাস দীর্ঘস্থায়ী ও আনন্দময় করার জন্য সুরার বহুল প্রচলন ঘটে। পোশাক-পরিচ্ছেদের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় পরিবর্তন হয় নি। পরিধানকারীরা সামর্থ্যানুযায়ী পেশার ভিত্তিতে পোশাক পরিধান করত। শাসক, আইনবিদ, লেখক ও সৈনিকের বিভিন্ন ধরনের পোশাক ব্যবহারের চল ছিল। উমাইয়াগণ সাধারণত ঢিলা পাজামা, লম্বা কোর্তা, চোগা জুতা ও পাগড়ি পরিধান করত। বেদুইনগণ কটি বন্ধ, কম্বোপরি ক্ষুদ্র চাদর, হাফশার্ট ও মস্তকাবরণ ব্যবহার করত। সিরিয়কগণ সাধারণত বেগুনি রঙের আজানুলম্বিত জামা, নীল পাগড়ি ও লাল জুতা পরত। মহিলাগণ ঢিলা পাজামা, কামিজ ও বক্ষোপরি রুমাল ব্যবহার করত। অভিজাতরা তদীয় কাপড়কে শ্রীমন্ডিত করার জন্য সোনার জরি ব্যবহার করত।
উমাইয়া খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

