• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • স্পেনে উমাইয়া শাসন
স্পেনে উমাইয়া শাসন

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাস

ভৌগোলিক অবস্থান: আইবেরিয়ান উপদ্বীপের তের ভাগের এগারো ভাগ স্থান জুড়ে স্পেন অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় দ্বিগুণ। উত্তর-পূর্বদিক ছাড়া স্পেন তিনদিকে সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত। পূর্বদিকে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণে জিব্রালটার প্রণালি দ্বারা আফ্রিকা মহাদেশ হতে বিচ্ছিন্ন, পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর। উত্তরে প্রায় তিনশত মাইল বিস্তৃত পিরেনীজ পর্বত যা ফ্রান্সের সঙ্গে স্পেনের সংযোগ রক্ষা করেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে স্পেন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কারণ একদিকে উত্তর আফ্রিকার সাথে ইউরোপ এবং অপরদিকে ইউরোপের সাথে ভূমধ্যসাগরের মধ্য দিয়ে সমগ্র এশিয়ার সংযোগ রক্ষা করছে। এর ফলশ্রুতিতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে স্পেন একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভৌগোলিক অবস্থানের দাবিদার।

স্পেনের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য: ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিমে আইবেরীয় উপদ্বীপে অবস্থিত স্পেন মুসলিম আমলে আন্দালুসিয়া নামে পরিচিত ছিল। উত্তর-পূর্ব দিক ছাড়া স্পেনের তিনদিক সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত। পূর্বদিকে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে জিব্রালটার প্রণালি দ্বারা বিচ্ছিন্ন, পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর; স্পেনের সঙ্গে ফ্রান্সের যে ভূখণ্ড সংযোগ রক্ষা করছে তা হচ্ছে পিরেনীজ পর্বতশ্রেণি- যা প্রায় তিনশত মাইল পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে স্পেন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কারণ একদিকে উত্তর আফ্রিকার সাথে ইউরোপের এবং অপর দিকে ইউরোপের সাথে ভূমধ্যসাগরের মধ্য দিয়ে সমগ্র এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করছে। এর ফলশ্রুতিতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে স্পেন একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে।

মুসলিম বিজয়ের ফলে স্পেনে ইসলামের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় ৭১১ সালে এবং এই সার্বভৌমত্ব ১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দে মুসলমানদের স্পেন থেকে বিতাড়িত হবার পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় আটশত বছর অপ্রতিহত ও অলঙ্ঘনীয় ছিল। এই উপদ্বীপের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান, বৈশিষ্ট্য, জলবায়ু ও পরিবেশের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল ছিল। মোটামুটিভাবে স্পেনকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়।

উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিমের উপকূল পর্বত শ্রেণি দ্বারা আবৃত থাকলেও এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কতিপয় সমৃদ্ধিশালী সমুদ্রপোত ছিল। বিশেষভাবে উল্লেখ্য হচ্ছে তারাগোন, কাসটেলন, ভ্যারেনসীয়া। দক্ষিণ দিকের সমুদ্র তটের উল্লেখযোগ্য সমুদ্র বন্দর হচ্ছে 'আলমেরিয়া, মালাগা, আলজেসিরাস, তারিফ এবং কাদিস। অনুরূপভাবে পশ্চিম সমুদ্রতটেও কতিপয় কদর ছিল।

স্পেনের মধ্যবর্তী অঞ্চলকে মেসেটা (Meseta) বলা হয় এবং এই অঞ্চলটি পূর্বদিক থেকে পশ্চিম দিকে ঢালু, এই অঞ্চলটি উত্তর দিক থেকে দক্ষিণেও ঢালু। ধারণা করা হয় যে, এর উচ্চতা গড়ে ২০০০ ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত। আইবেরীয় উপদ্বীপে কতিপয় গিরিপথ রয়েছে, যেমন- স্পেনের সঙ্গে ফ্রান্সের সংযোগ রক্ষাকারী রায়সী ভ্যালী, পারটুস, ভ্যালী দ্যা আরন এবং সোমপো। এখানে বছরের ছয় মাস বরফ দ্বারা আবৃত থাকলেও বছরের বাকি কয়েক মাস চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হতো। অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের জন্য পর্বতসঙ্কুল স্পেনে কতিপয় ব্যবহারযোগ্য গিরিপথ রয়েছে। মধ্যবর্তী মালভূমিতে, পূর্বদিকের সমুদ্র তটে এবং দক্ষিণে গুয়াদালকুইভার নদীর তীরবর্তী স্থানে যাওয়ার জন্য কতিপয় গিরিপথ ছিল। নতুন ও পুরাতন ক্যাসটাইলের মধ্যে সংযোগকারী গিরিপথ হচ্ছে- সিয়েরা দ্যা গুয়াদালামা। পর্বতসঙ্কুল হলেও স্পেনের যাতায়াত ব্যবস্থা রোমীয় এবং মুসলিম আমলে সন্তোষজনক ছিল। রোমীয় যুগের একটি সড়ক ৩৭২ টি শহরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করত। আরব বিজয়ের পরে এই সমস্ত রাস্তার সংস্কার করা হয় এবং সমগ্র উপদ্বীপব্যাপী উন্নত ধরনের যাতায়াত ব্যবস্থা চালু করা হয়। নৌ-বাণিজ্যের প্রধান সহায়ক ছিল নদ-নদী। এই উপদ্বীপে কতিপয় নদী প্রবাহিত রয়েছে। পশ্চিমে তাগুস, দুয়োরো, গুয়াডিয়ানা ও গুয়াদালকুইভার, উত্তর-পূর্ব এবরো। গুয়াদালকুইভার নদীর তীরে মুসলিম স্পেনের সমৃদ্ধ নগরী কর্ডোভা অবস্থিত।

স্পেনের আবহাওয়া: স্পেনের আবহাওয়া খুবই স্বাস্থ্যকর, গ্রীষ্মে উত্তাপ ও উষ্ণতা থাকলেও শীতের মৌসুমে বৃষ্টিপাত হয়। দক্ষিণ ও পূর্বে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া বিরাজমান। গ্যালিসিয়া এবং ক্যানটাব্রিয়ায় অত্যধিক বৃষ্টিপাত হয়; মধ্যবর্তী মালভূমিতে বৃষ্টিপাত কম হয়। স্পেনের অলবায়ু বিভিন্ন ধরনের শস্য উৎপাদনের জন্য উপযোগী। পূর্ব ও দক্ষিণ সমুদ্র তটে গম, চাল, আখ, জলপাই এবং বিভিন্ন ধরনের ফল, শাকসবজি উৎপাদিত হয়। স্পেনের খনিজ সম্পদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সোনা, রূপা, লোহা, তামা ইত্যাদি।

ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশের জন্য স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাতন্ত্র্য লক্ষ করা যায়। এই স্বাতন্ত্র্য জাতিগত স্থানীয় আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি ও চাল-চলনের উপর নির্ভরশীল ছিল। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাজনিত কারণে ক্যাসটিলীয়গণ দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের অধিবাসীদের তুলনায় অনগ্রসরমান ছিল। প্রাক-মুসলিম যুগের স্পেনে বিভিন্ন জাতির অধীনে ছিল- রোমান, ভ্যানডালস (Vandals), বর্বরজাতি (Barbarians) এবং গথ (Goths)। মুসলিম বিজয়ের পর দক্ষিণাঞ্চল মুসলমানদের দখলে আসে এবং উত্তরাঞ্চল খ্রিষ্টানদের অধিকারে থাকে। আন্দালুসিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য মুসলমানদের পক্ষে জিব্রালটার অতিক্রম করে সহজে এই দেশটি জয় করা সম্ভবপর হয়। এছাড়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হয়। ব্যবসায়-বাণিজ্য ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত সমুদ্র বন্দর থেকে প্রসারতা লাভ করে। ইউরোপ ও আফ্রিকা, পূর্ব-পশ্চিম এমনকি আটলান্টিক ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে সামুদ্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। মুসলিম আমলে কর্ডোভা, গ্রানাডা, সেভিল ইউরোপের সুসমৃদ্ধ নগরী হিসেবে পরিচিত হয়।

প্রাক-মুসলিম যুগের স্পেনের অবস্থা: ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে স্পেনের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর সময়ে ইসলামের যে বিজয়াভিযান শুরু হয় উমাইয়া খলিফা আল-ওয়ালিদের সময়ে তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। হযরত উমরের খিলাফতে আমর ইবন আল-আস মিশর জয় করেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে উমাইয়া খিলাফতে উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ৬৯৮ খ্রিষ্টাব্দে রাজধানী কার্থেজ থেকে বায়জান্টাইনদের বিতাড়িত করা হয় এবং তিউনিসে ইসলামের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর পশ্চিম দিকে মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হতে থাকে এবং মুসা ইবন নুসাইরের সেনানায়কত্বে মরক্কো পর্যন্ত মুসলিম আধিপত্য বিস্তার লাভ করে। ইফ্রিকিয়া বা উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম কর্তৃত্ব স্থাপনের ফলেই পরবর্তী পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী মুসা এবং তাঁর সেনাপতি তারিক ইবন জিয়াদের নেতৃত্বে স্পেনে অভিযান করে। প্রাক-মুসলিম যুগে স্পেন গথিক রাজাদের অধীনস্থ ছিল। গথগণ (Goths) তিন শতাব্দী ধরে (৪০৯-৭১২ খ্রি.) স্পেন শাসন করেন। গথিক শাসনামলে স্পেনের রাজনৈতিক অরাজকতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ধর্মীয় বিভেদ চরম আকার ধারণ করে। লুইস বাট্রান্ডের ভাযায়, তাঁদের শাসন ছিল-"Full of devastation, Massacres, political assassinations, intestinal wars among the invading barbarians." সামাজিক অবস্থা: প্রাক-মুসলিম যুগে স্পেনের সামাজিক অবস্থা ছিল শোচনীয়। গথিক স্পেনের সমাজ ব্যবস্থা ছিল ঘৃণ্য। সমাজে সুবিধাভোগকারী তিনটি পৃথক শ্রেণি ছিল- (ক) অভিজাত সম্প্রদায়, (খ) মধ্যবিত্ত ভূস্বামীবৃন্দ, (গ) ক্রীতদাসগণ। অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল- প্রধানত রাজন্যবর্গ, অমাত্যগণ, ধর্মযাজক শ্রেণি ও সামন্ত রাজাগণ। রাজা, পুরোহিত ও সামন্তবর্গের এই ত্রি-চক্র প্রাক-মুসলিম স্পেনের সুবিধাভোগকারী হিসেবে চিহ্নিত হন। স্বৈরাচারী ও স্বেচ্ছাচারী রাজা জনগণের দুঃখ-কষ্টের দিকে ভূক্ষেপ করতেন না। বিলাস-ব্যসন, আরাম-আয়াসে সুসজ্জিত রাজপ্রাসাদে তাঁরা আমোদ-প্রমোদে কালাতিপাত করতেন। পুরোহিত শ্রেণি দুভাগে বিভক্ত ছিল- প্রথম শ্রেণি ছিল গির্জার পুরোহিতবর্গ, যারা অগাধ সম্পদের মালিক ছিল এবং রাজপরিবারের উপর তাঁদের অসামান্য প্রভাব ছিল। রাজপরিবারের অনুকম্পায় এই উচ্চশ্রেণির পুরোহিতবর্গ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে একচেটিয়া প্রভুত্ব কায়েম করেন। দ্বিতীয় শ্রেণির পুরোহিতবর্গ প্রথম শ্রেণির মতো সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারত না। তারা মূলত প্রধান খ্রিস্টান ধর্মযাজকের অধীনস্থ ছিল। রাজা ও প্রধান পুরোহিতের মধ্যে সখ্যতা ছিল এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা 'গির্জার কাউন্সিল' কর্তৃক প্রণীত হতো।

রাজন্যবর্গ ও পুরোহিত শ্রেণির পরেই সামাজিক স্তরের উচ্চ মার্গে স্থান ছিল ক্ষমতালোভী, বিলাসপ্রিয় অভিজাত শ্রেণির। প্রাক-মুসলিম যুগে হিস্পনো-রোমান এবং ভিসি গথিক সামন্ত রাজাগণ বিশেষ প্রভাবশালী ছিলেন। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে এই দুটি শ্রেণি একীভূত হয়ে একটি নতুন সুবিধাভোগকারী দলে পরিণত হয়। এই দলটি Clasas clevadas নামে পরিচিত ছিল। অভিজাত শ্রেণিভুক্ত এই সামন্ত রাজাগণ বিলাস-ব্যসনে কালাতিপাত করতেন। মদ্যপান, ঘোড়দৌড় এবং ভোজসভায় তাঁরা আত্মনিয়োগ করেন। রাজকীয় প্রাসাদে বসবাস করে তাঁরা নিম্নশ্রেণির জনগণের সুযোগ-সুবিধার প্রতি ভূক্ষেপ করতেন না। রাজা ও ধর্মীয় যাজকগণ বিপুল সম্পদের অধিকারী ছিলেন; কিন্তু তাঁদের কোনো প্রকার কর দিতে হতো না।

স্পেনীয় সমাজব্যবস্থায় দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত ছিল মধ্যবিত্ত ভূস্বামীবৃন্দ। এই শ্রেণিভুক্ত ব্যক্তিবর্গ সাধারণত Curial অথবা burgess নামে পরিচিত ছিলেন। তারা সীমিত পরিমাণ জমির মালিক হতে পারতেন এবং প্রত্যেকে ২৫ একরের অধিক জমি ভোগ করতে পারতেন না। তাদের প্রশাসনিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত করা হতো। খরা, অনাবৃষ্টি বা প্রাকৃতিক কারণে শস্য উৎপাদিত না হলেও তাদের নিয়মিতভাবে কর প্রদান করতে হতো। ফলে তারা হতভাগ্য কৃষক শ্রেণির নিকট থেকে বলপূর্বক অর্থ আদায় করে কর পরিশোধ করত। কর দিতে ব্যর্থ হলে তারা কৃষিকাজ পরিত্যাগ করে সেনাবাহিনীতে যোগদান করত। ফলে কৃষিকার্যে ব্যাঘাত ঘটত। গথিক স্পেনের সমাজব্যবস্থায় তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত ছিল হতভাগ্য, সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত ও অবহেলিত ক্রীতদাসবর্গ (Serfs and slaves)। ফরাসি বিপ্লব-পূর্ব যুগে যারা 'The Third Estate' হিসেবে চিহ্নিত হতো।

স্পেনের এই নিম্নবিত্ত, বঞ্চিত সর্বহারা শ্রেণিই ছিল কৃষক, ফ্রীতদাস ও ভূমিদাস। সার্ফ ও ক্রীতদাস শ্রেণির মধ্যে প্রভেদ ছিল এই যে, প্রথম গোষ্ঠীর সদস্যগণ ভূমিরক্ষণের সাথে জড়িত ছিল। রোমীয় যুগে 'Coloni' এর সঙ্গে সমতুল্য এই সার্ফগোষ্ঠীর চাষবাসের জন্য কৃষক ও শ্রমিক সংগ্রহ করত এবং শস্য উৎপাদনের পর কর প্রদান করত। উৎপাদন না হলেও তাদের কর প্রদানে বাধ্য করা হতো। ভূমি কর ছাড়াও তাদের নিকট থেকে ব্যক্তিগত কর আদায় করা হতো। সাধারণ দাস এবং ভূস্বামীর (Curial) মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এই সার্ফ শ্রেণির কোনো ব্যক্তিস্বাধীনতা ছিল না। তাদের জমির কোনো মালিকানা স্বত্ব ছিল না এবং জমি বিক্রি হয়ে গেলে জমির সাথে তারাও বিক্রি হয়ে যেত এবং নতুন মনিবের অধীনে কৃষিকাজ করতে হতো। কর প্রদানে বার্থ হলে তাদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হতো। কখনো কখনো রাজকীয় আদেশে সৈন্য সরবরাহ করতে হতো। অনুমতি ব্যতিরেকে সার্ফগণ স্বেচ্ছায় বিবাহ বন্ধনে আবন্ধ হতে পারত না। যদি অনুমতি ব্যতিরেকে বিবাহ সম্পন্ন হতো তাহলে সে বিবাহ নাকচ করে দেওয়া হতো। যদি এ দুটি পার্শ্ববর্তী ভূস্বামীর ভূমিদাস-দাসীদের মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হতো তাহলে তাদের সন্তানসন্ততি এই দুটি অঞ্চলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো। কখনো কখনো তাদের বাজারে পণ্যের মতো বিক্রি করে দেওয়া হতো। তাদের জীবন এমন দুর্বিষহ ছিল যে, ঐতিহাসিকদের মতে, তাদের কবরেও সূর্যের আলো পড়বার সুযোগ ছিল না। ভূমিদাস ব্যতীত সর্বাপেক্ষা বঞ্চিত শ্রেণি ছিল সাধারণ দাস। সার্ফদের মতো তারাও সমাজে সর্বহারা, নিপীড়িত শ্রেণি ছিল। দাসত্ব প্রথা গথিক যুগে চরম আকার ধারণ করে। ডোজী বলেন যে, একজন স্বাধীন ব্যক্তি ৪,০০০ থেকে ৮,০০০ পর্যন্ত ক্রীতদাস রাখতে পারত। এই দাসদের কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে: (ক) কৃষক, (খ) মেষ পালক, (গ) জেলে, (ঘ) কামার ইত্যাদি। এই শ্রেণির লোকেরা এমন উৎপীড়নের শিকার হতো যে তারা তাদের পেশা ছেড়ে দিয়ে বনে-জঙ্গলে চলে যেত এবং খুন, রাহাজানি করতে বাধ্য হতো। অর্থসংকট এমন পর্যায়ে দাঁড়ায় যে তারা জীবন রক্ষার জন্য শহরে লুটতরাজ করতে বাধ্য হয়। তাদের নৈতিক চরিত্রেরও অধঃপতন হয়। আমীর আলীর ভাষায়, "Their morality became as degraded as their material condition was wretched." অর্থাৎ "তাদের নৈতিক চরিত্র যেমন কলুষিত ছিল তেমনি তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও ছিল শোচনীয়।"

অর্থনৈতিক অবস্থা: গথিক স্পেনের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেই সন্তোষজনক ছিল না। প্রজাগণ নিপীড়িত হতো এবং শাসকগোষ্ঠী সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত। শাসক ও সুবিধা ভোগ্নকারীদের কোনো কর প্রদান করতে হতো না। করের বোঝা মধ্যবিত্ত ও নিম্নশ্রেণির লোকদের বহন করতে হতো। ফলে মারাত্মক অর্থনৈতিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। বৈষম্যমূলক এবং মাত্রাধিক করের বোঝা সহ্য করতে না পেরে সার্কগণ বনে-জঙ্গলে পালিয়ে যেত। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতো এবং এর ফলে আর্থিক সংকট দেখা দেয়। সন্তোষজনক জল সেচের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষিকাজ বন্ধ হবার উপক্রম হয়। রোমীয় আধিপত্য তিরোধানের পর গথিকগণ স্পেনে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলে তাঁরা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জমি দখল করে এবং এই বিশাল অঞ্চলে দুই শতাব্দী পর্যন্ত (৫১১-৭৭১ খ্রি.) প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এই অধিকৃত অঞ্চলে Sortes Gothic নামে পরিচিত। এই জমি প্রভাবশালী ভূস্বামী জমিদার ও সামন্ত রাজাদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। প্রাচীন 'লতিফান্দিয়া প্রথা' (Latifundia system) অনুযায়ী ভূস্বামীরা দু'ভাগে কৃষিকাজ সম্পন্ন করতেন। তাঁরা নিজস্ব ব্যবস্থায় জমি চাষের উদ্যোগ নিতেন অথবা বর্গা প্রথায় সার্ফদের মধ্যে জমি বিতরণ করতেন নির্দিষ্ট করের বিনিময়ে। দ্বিতীয় ব্যবস্থাটি ছিল খুবই সার্বজনীন। এক্ষেত্রে সার্কগণ জমির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকত এবং জমি বিক্রি হয়ে গেলে তারাও নতুন মালিকের অধীনস্থ হতেন। Scigniorial বা বর্গা প্রথার ঘৃণিত দিক হচ্ছে যে উৎপাদন প্রাকৃতিক কারণে ব্যাহত হলেও সার্ফদের নির্দিষ্ট হারে কর দিতে হতো। কিন্তু এক্ষেত্রে অত্যাচারিত ভূমিদাসগণ কৃষিকাজ পরিত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেলে অনাবাদি জমির সংখ্যা বাড়তে থাকে।

প্রাক-মুসলিম যুগে স্পেনের বৈষম্যমূলক ধন-সম্পদ বণ্টন, উৎপাদনে পুঁজি বিনিয়োগের অভাবে কৃষিক্ষেত্রে অব্যবস্থার ফলে অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে যায়। গ্রামাঞ্চলে পশুপালনই একমাত্র জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন ছিল। শহরাঞ্চলে মিল-ফ্যাক্টরির উৎপাদন শ্রমিক অসন্তোষের জন্য ব্যাহত হয়। রোমীয় যুগে স্পেনের আস্তুরিয়াস, ডেলটোনাস এবং লুসিটানিয়া ও গ্যালিসীয় অঞ্চলের মধ্যবর্তী স্থানে খনিজ সম্পদ আহরিত হলেও গথিক আমলে সোনা, রূপা, লোহা, সিসার খনন কাজ ব্যাহত হয়। আরব বিজয়ের প্রাক্কালে স্পেনের সব খনিই বন্ধ ছিল। গথিক যুগে রোমীয় রাস্তাঘাট সংস্কারের অভাবে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে, ফলে ব্যবসায়-বাণিজ্যের বিশেষ অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি।

ধর্মীয় অবস্থা: প্রাক-মুসলিম যুগে স্পেনে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও স্বাধীনতা ছিল না। ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে প্রধান ছিল দুটি- (ক) খ্রিষ্টান ও (খ) ইহুদি। শাসক ও যাজক সম্প্রদায় খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী ছিলেন। গথিক আমলে প্রথম দিকে এরিয়ান ধরনের খ্রিষ্টধর্ম প্রচলিত ছিল; কিন্তু রিকার্ডো (Ricardo), যিনি ৫৮৬-৬০১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দেশ শাসন করেন সর্বপ্রথম স্পেনে ক্যাথলিক খ্রিষ্টধর্ম প্রবর্তিত করেন। তিনি এই ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্মের মর্যাদা দেন। ক্যাথলিক ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হলে স্পেনে বসবাসকারী ইহুদিগণ অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন। উল্লেখ্য যে, বুদ্ধিজীবী শ্রেণিভুক্ত এই ইহুদিগণ স্পেনের অর্থনৈতিক বুনিয়াদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। অথচ সামাজিক মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নীতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে অত্যাচারী শাসক-পুরোহিতবর্গ ইহুদি সম্প্রাদয়ের উপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। ৬১৬ খ্রিষ্টাব্দে গথিক রাজা সিসিবুত (Sisibut) এই মর্মে এক ফরমান জারি করেন যে, ইহুদিগণ খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত না হলে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত অথবা নির্বাসিত করা হবে। এই আদেশ কার্যকরী করে ৬১২ থেকে ৬২০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৯০,০০০ ইহুদিকে বলপূর্বক খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করা হয়। রাজধানী টলেডোতে ধর্মীয় কাউন্সিলের বৈঠকে ইহুদি নির্যাতনের নীলনকশা প্রণীত হতো এবং নকশা মোতাবেক ইহুদিদের উপর অমানুষিক নির্যাতন পরিচালিত হতো। ফলে ইহুদিগণ, যারা নামে মাত্র খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ৬৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বার্বার ও জিব্রালটার অন্তরীপে বসবাসকারী ইহুদিদের সঙ্গে সংঘবদ্ধ হয়ে স্পেনের ইহুদি সম্প্রদায় ধর্মীয় অনাচার ও উৎপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ব্যর্থ হয়। ফলে আক্রোশ বশে শাসক ও পুরোহিত গোষ্ঠী ইহুদিদের নির্যাতন ও পাইকারিভাবে হত্যা করে। এই হত্যাযজ্ঞ থেকে শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ ব্যক্তিগণও রেহাই পান নি। বৃদ্ধ ব্যক্তিদের অব্যাহতি দেওয়া হলেও যুবকদের বলপূর্বক খ্রিষ্টান করা হয়। নির্যাতনের মাত্রা এমনভাবে বৃদ্ধি পায় যে তাদের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। একজন ইহুদি দাস কেবলমাত্র একজন খ্রিষ্টান দাসকে বিবাহ করতে পারত। এডউইন হোল বলেন, "সপ্তম শতাব্দীর Furco Juzgo ইহুদিদের সৎকার, খাতনা এবং বিবাহ উৎসব নিষিদ্ধ করে এবং যে ইহ্রদি তার সন্তানকে খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত না করত তাকে একশতবার বেত্রাঘাত করা হতো, জমি বাজেয়াপ্ত করা হতো এবং তার মস্তক মুণ্ডন করা হতো। নিপীড়িত, উৎপীড়িত ও নির্যাতিত ইহুদি সম্প্রদায় এক অনাগত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষায় ছিল এবং মুসলিম বিজয়ের ফলে তাদের এই অসহনীয় ধর্মীয় বৈষম্যের অবসান হয়।

পরিশেষে বলা যায় যে স্পেনের বৈচিত্র্যময় ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ইউরোপ মহাদেশের দেশগুলো হতে স্পেনকে স্বতন্ত্র করেছে। স্পেন ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ভূমধ্যসাগরীয় একটি দেশ। এদেশের ভৌগোলিক প্রভাব জনগণের উপর সুস্পষ্ট ছাপ রেখেছে। মুসলিম আগমনের ফলে মুসলিম শাসনে স্পেনের ভৌগোলিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

পূর্ববর্তী

স্পেনে উমাইয়া শাসন - অন্যান্য প্রশ্ন

স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাসমুসলমানদের স্পেন বিজয় (৭১১ খ্রি.)স্পেনে উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা: আব্দুর রহমান আদ-দাখিল (৭৫৬ খ্রি.)দ্বিতীয় আব্দুর রহমান (৮২২-৮৫২ খ্রি.)আমির প্রথম মুহম্মদ (৮৫২-৮৮৬ খ্রি.)আমির মুনজীর (৮৮৬-৮৮৮ খ্রি.)আমির আবদুল্লাহ (৮৮৮-৯১২ খ্রি.) তৃতীয় আব্দুর রহমান (৯১২-৯৬১ খ্রি.) দ্বিতীয় হাকাম (৯৬১-৯৭৬ খ্রি.)স্পেনে মুসলিম শাসনের পতনস্পেনে মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশমুসলিম শাসনামলে স্পেনের রাজধানীর নাম কী ছিল?মোজারেব কারা?কোন শাসককে আদ-দাখিল বলা হয়?স্পেনে অভিযানে নেতৃত্ব দেন কোন সেনাপতি?স্পেন ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী প্রণালির নাম কী?মুসলমানরা কত খ্রিষ্টাব্দে স্পেন জয় করে?স্পেনে স্বাধীন উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় কত খ্রিষ্টাব্দে?কত খ্রিষ্টাব্দে স্পেনে উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়?কার সময়ে স্পেন মুসলমানদের অধিকারে আসে?স্পেনের সর্বশেষ আমির কে ছিলেন?ঐতিহাসিকরা কাকে 'ইসলামের নেপোলিয়ন' আখ্যা দিয়েছেন?ইতিহাসে 'আল আসওয়াত' বা মধ্যবর্তী নামে পরিচিত কে?মুসলিম স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক কে?স্পেনের স্বাধীন আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা কে?'মাসারা' যুদ্ধ কত খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত হয়েছিল?কুরাইশদের বাজপাখি বলা হয় কাকে?স্পেনে উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা করেন কে?তৃতীয় আবদুর রহমান কত খ্রিষ্টাব্দে দুর্গ দখল করেন?'আরবদের বাজপাখি (The Falcon of the Quraysh) বলা হয়েছে কাকে?কোন আমিরের শাসনামলে ধর্মান্ধ আন্দোলন বা Zealot Movement শুরু হয়?কাকে, কেন 'কুরাইশদের বাজপাখি' বলা হয়? ব্যাখ্যা কর।কর্ডোভাকে ইউরোপের বাতিঘর বলা হয় কেন?মুসলিম বিজয়ের আগে স্পেনের রাজনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল?প্রথম আব্দুর রহমানকে আদ-দাখিল বলা হয় কেন? ব্যাখ্যা কর।'ধর্মান্ধ আন্দোলন' কী? ব্যাখ্যা কর।তৃতীয় আব্দুর রহমানকে 'Saviour of Spain' বা স্পেনের ত্রাণকর্তা বলা হয় কেন?

সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

স্পেনে মুসলমানদের ইতিহাস | ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ১ম পত্র - Uddoyon | Uddoyon