- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- স্পেনে উমাইয়া শাসন
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
তৃতীয় আব্দুর রহমান (৯১২-৯৬১ খ্রি.)
পরিচয় ও সিংহাসনারোহণ
১১২ খ্রিষ্টাব্দে আমির আব্দুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর পৌত্র তৃতীয় আব্দুর রহমান সিংহাসনে আরোহণ করেন। পরবর্তীতে "আন-নাছির লি-দীনিল্লাহ উপাধি" ধারণ করেন। তাঁর পিতৃব্য পরিজনবর্গ এবং জনসাধারণ তাঁর সিংহাসনারোহণকে রাজ্যের মঙ্গলসূচক বলে অভিহিত করেন। কারণ তিনি এক সংকটময় মুহূর্তে স্পেনের সিংহাসনে আরোহণ করেন। স্বীয় প্রতিভাবলে পতন মুখর স্পেন সাম্রাজ্যকে তিনি সমৃদ্ধির উচ্চশিখরে পৌঁছে দেন। তাই ন্যায়সংগত কারণে তাঁকে স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক বলা হয়।
তৃতীয় আব্দুর রহমানের কৃতিত্ব
শাসন নীতি: সিংহাসনে আরোহণ করে তিনি আব্দুল্লাহর ভীরু, কুটিল ও অনুপযোগী নীতি পরিহার করে বিদ্রোহীদের প্রতি বলিষ্ঠ, কঠোর ও সময়োপযোগী নীতি অবলম্বন করেন।
অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন: রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা নিজ হস্তে গ্রহণ করে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেন। আরব অভিজাত সম্প্রদায়কে দমন করার জন্য তিনি সেনাবাহিনীতে বিদেশি লোক নিয়োগ করেন। তিনি ঘোষণা করেন কোনো প্রকার অবাধ্যতা বরদাস্ত করা হবে না। এক আদেশ বলে সকল বিদ্রোহী সরদারদের আনুগত্য স্বীকারের নির্দেশ দেন। ফলে ত্রাস সৃষ্টিকারী উমর-বিন-হাফসুন তাঁর নিকট নতি স্বীকার করে।
হৃতরাজ্য পুনরাধিকার: অভ্যন্তরীণ গোলযোগ দমন করে আব্দুর রহমান হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারে মনোনিবেশ করেন। ১১৩ খ্রিষ্টাব্দে তরুণ সম্রাটকে কাছে পেয়ে সেনাবাহিনীর মধ্যে এক অভূতপূর্ব সাড়া জাগে। দক্ষিণাঞ্চল এবং সেভিলের বার্বার ও খ্রিষ্টানগণ তাঁর প্রভুত্ব মেনে নেয়। ৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে বোবাস্ট্রো ও অন্যান্য দুর্গ অধিকৃত' হয়। দুবছর পর বেদাজোজের ঘাঁটি তাঁর করতলগত হয়। টলেডোর বিদ্রোহী অধিবাসীগণও দীর্ঘদিন অবরোধ থেকে বিনা শর্তে তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করে।
খ্রিষ্টান ওরডোনার বিদ্রোহ দমন: ৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে লিওন অধিপতি, দ্বিতীয় ওরডোনার মুসলিম রাজ্য আক্রমণ করেন। আব্দুর রহমান একদল সৈন্য প্রেরণ করে ওরডোনাকে যুদ্ধে পরাজিত করেন। নেভারের শাসনকর্তা সানকোর সাথে মিলিত হয়ে ওরডোনা পুনরায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তাঁরা হত্যা ও লুণ্ঠনকার্য চালিয়ে মুসলিম প্রজাদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত দুর্বিষহ করে তোলেন। এ সংবাদ শুনামাত্র আব্দুর রহমান সানকোর রাজ্য আক্রমণ করে তাদের যৌথবাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে নেভারের রাজধানী পাম্পলোনা অধিকার করে নেন।
রামীর বিদ্রোহ দমন: ওরডোনার মৃত্যুর পর তদীয় পুত্র দ্বিতীয় রামীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন মুসলিম বিদ্বেষী। সারগোসার বিদ্রোহী গভর্নরের সঙ্গে মিলিত হয়ে মুসলিম অঞ্চলে উপদ্রব শুরু করেন। আব্দুর রহমান তাদের পরাজিত করে লিওন ও নেভার আশ্রিত রাজ্যে পরিণত করেন।
ফাতেমীয় শাসক ওবায়দুল্লাহ আল-মেহদীর সঙ্গে সংঘর্ষ: আব্দুর রহমানের রাজত্বকালে মিশরের ফাতেমীয় শাসক ওবায়দুল্লাহ আল-মেহদী স্পেন জয় করার উদ্দেশ্যে বিদ্রোহী উমর-বিন-হাফসুনের সঙ্গে সিউটা অধিকার করেন। পরবর্তীতে ফাতেমীয়দের নৌবহরকে বিতাড়িত করে আফ্রিকার উপকূলে আঘাত হানেন। তাই লেনপুল বলেন, "তিনি শুধু স্পেনকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করেননি বরং একে সুন্দর ও শক্তিশালী করে তুলেছিলেন।" তাঁর অসাধারণ সামরিক প্রতিভা ছিল।
খিলাফত প্রতিষ্ঠা ও খলিফা উপাধি গ্রহণ
তৃতীয় আব্দুর রহমান স্পেনে উমাইয়া আমিরাতের ৮ম তম আমির, খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে নিজে খলিফা উপাধি গ্রহণ করেন। এ বিষয়ে নিম্নে আলোচিত হলো:
তৃতীয় আব্দুর রহমানের খলিফা উপাধি গ্রহণ: তৃতীয় আব্দুর রহমানের গৌরবোজ্জ্বল রাজত্বকালে বাগদাদের আব্বাসীয় খিলাফত ছিল ধ্বংসমুখী। কারণ পবিত্র মক্কা ও মদিনা ফাতেমী শাসক আল-মুইজের দখলে ছিল। তাই তিনি মনে করেন বাগদাদের ক্ষমতাহীন খলিফার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা নিরর্থক। সেজন্য তিনি ৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা ও আমিরুল মুমেনিন উপাধি গ্রহণ করেন।
শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে তৃতীয় আব্দুর রহমান
খলিফা আব্দুর রহমান স্পেনে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সুবিন্যস্ত করেন। তাই ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, "ইতঃপূর্বে কর্ডোভা কখনো এত সমৃদ্ধিশালী, আন্দালুসিয়া এত উন্নত রাষ্ট্র এবং এত সাফল্য অর্জন করতে পারে নি।" তিনি নিজ ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করে সাম্রাজ্যকে ৬টি প্রদেশে বিভক্ত করেন। প্রদেশের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য সামরিক ও বেসামরিক শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। বেসামরিক শাসনকর্তাকে ওয়ালী বলা হতো। এছাড়া পুলিশ কর্মকর্তা সাহিব উস-সুরতা, কাজি, মুহতাসিব নামক কর্মচারী শাসনকার্যে সহযোগিতা করত।
সামরিক সংস্কার: অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থাকে সুগঠিত করা এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষার জন্য তৃতীয় আব্দুর রহমান স্নাভ, খ্রিষ্টান, বার্বার ও আরবদের সমন্বয়ে একটি সুগঠিত সৈন্যবাহিনী গঠন করেন। তাঁর সৈন্যবাহিনী ছিল ১ লক্ষ ৫০ হাজার। এছাড়া অনিয়মিত সৈন্যবাহিনী ছিল। দেহরক্ষীর সংখ্যা ছিল ১২ হাজার, তার মধ্যে অশ্বারোহী বাহিনী ছিল ৮ হাজার। ঐতিহাসিক ডোজি বলেন, "এর বিশাল সুশৃঙ্খল সৈন্যবাহিনী তৎকালীন পৃথিবীর মধ্যে সম্ভবত সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল।"
নৌবাহিনী গঠন: তিনি ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ সিউটা দখল করেন। এ সময় তিনি নৌবাহিনীর গুরুত্ব উপলব্ধি করে একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠন করেন।
বিচারব্যবস্থা: আব্দুর রহমান ন্যায়বিচারক ছিলেন। তার কাছে ধনী-দরিদ্র সকলেই সমান। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে তিনি কখনো স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেন নি। নিজ বিদ্রোহী পুত্রকেও তিনি কঠিন শাস্তি দানের ব্যবস্থা করেন।
তৃতীয় আব্দুর রহমানের বৈদেশিক নীতি তৃতীয় আব্দুর রহমান শুধু স্বীয় সাম্রাজ্যেই শান্তি ও সমৃদ্ধি আনয়ন করেননি, বিদেশে তিনি প্রচুর সম্মান ও শ্রদ্ধা এবং খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর কৃতিত্বে মুখ হয়ে ইউরোপীয় প্রখ্যাত রাষ্ট্রপ্রধানগণ তাঁর সঙ্গে কন্ধুত্ব যাপন করেন। ওদের মধ্যে কনস্টান্টিনোপল, জামার্ন, ফ্রান্স ও ইতালির রাজাগণের নাম সমধিক প্রসিদ্ধ। ঐতিহাসিক আমীর আলী বলেন, "৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে কর্ডোভায় বহু দূতের সমাগমের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল।" তাঁর শক্তি, প্রজ্ঞা ও প্রাচুর্য সমগ্র ইউরোপ ও আফ্রিকাব্যাপী বিস্তার লাভ করে।"
শিল্প ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক: তৃতীয় আব্দুর রহমান জ্ঞান-বিজ্ঞান ও স্থাপত্য শিল্পের উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। হিট্টির মতে, "আব্দুর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম স্পেন বিশ্ব সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।" স্পেনে বহু জ্ঞানী--গুণী লোকের সমাবেশ ঘটে। সাম্রাজ্যের সর্বত্র স্কুল, পাঠাগার ও এতিমখানা ছিল। কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় পাশ্চাত্যের অন্যতম শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়। স্পেনের সভ্যতায় খলিফা আব্দুর রহমানের অবদান চিরস্মরণীয়।
স্থাপত্য শিল্প: আব্দুর রহমানের সময় রাজধানী কর্ডোভাতে ৩০০ মসজিদ, ১০০ প্রাসাদ, ১৩০০ গৃহ এবং ৩৮০টি হাম্মামখানা ছিল। তাঁর পত্নী জোহরার নাম চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য ৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে কর্ডোভার ৩ মাইল উত্তরে আল যাহরা প্রাসাদ নির্মাণ করেন প্রায় ৫,০০,০০০ দীনার ব্যয়ে। তাঁর যোগ্যতা ও গুণাবলির জন্য তাঁকে আধুনিক যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসকদের অন্যতম বলা যায়। অধ্যাপক হিট্টি বলেন, "ইতঃপূর্বে কর্ডোভা কখনো এত সমৃদ্ধিশালী, আন্দালুসিয়া এত উন্নত রাষ্ট্র, এত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।"
যোগাযোগ, কৃষি ও ব্যবসায়ের উন্নতি আব্দুর রহমান বহু রাজপথ নির্মাণ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করেন। পথিক ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার জন্য রক্ষীবাহিনী নিযুক্ত করেন। ঘোড়ার ডাক দ্বারা সংবাদ আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করেন। কৃষির উন্নতির জন্য খাল কেটে সেচ দেয়ার ব্যবস্থা করেন। দেশে প্রচুর ফসল উৎপন্ন হয়। ফলে স্বাচ্ছন্দ্য ও প্রাচুর্যে দেশ ভরে ওঠে। স্পেনে প্রায় ১,০০০ বাণিজ্যিক জাহাজ ছিল যার ফলে ব্যবসায়-বাণিজ্যেও প্রসার লাভ করে।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, তৃতীয় আব্দুর রহমান তৎকালীন শাসকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর ৪৯ বছর রাজত্বে মৃতপ্রায় স্পেন সমৃদ্ধিশালী হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক লেনপুল বলেন, "তিনি শুধু একে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করেননি, তিনি একে সুন্দর ও শক্তিশালী করে তুলেছিলেন।" কর্ডোভা নগরী তখন রাত্রের বাতিতে আলোকিত কিন্তু তাঁর সাত শত বছর পরেও লন্ডনের রাস্তায় বাতির ব্যবহার হয়নি।" এ কারণে তৃতীয় আব্দুর রহমানকে (Saviour of Spain) স্পেন রক্ষাকারী বলা হয়। হিটি বলেন, "Never before was Cordova so prosperous, Andalus so reach and the state so triumhant." অর্থাৎ "ইতঃপূর্বে কর্ডোভা কখনো এত সমৃদ্ধশালী, আন্দালুসিয়া এত উন্নত এবং রাষ্ট্র এত সাফল্য অর্জন করতে পারে নাই।"
স্পেনে উমাইয়া শাসন - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

