- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- স্পেনে উমাইয়া শাসন
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
স্পেনে মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ
মধ্যযুগে মুসলিম স্পেনে সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশে মুসলমানদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হয়ে আছে। অষ্টম শতকের প্রথম ভাগ হতে ত্রয়োদশ শতকের শেষ ভাগ পর্যন্ত মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় স্পেনের ভাষা-সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে মুসলমানগণ অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, "মধ্যযুগীয় ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তির ইতিহাসে স্পেন একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা করে।"
কর্ডোভায় মুসলিম সভ্যতা: কর্ডোভা ছিল মুসলিম সভ্যতার উজ্জ্বল নিদর্শন। স্পেনে মুসলিম সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র কর্ডোভা। অনুপম সৌন্দর্যমন্ডিত এ নগরী ছিল তৎকালীন যুগের জগৎমণি। চব্বিশ মাইল দীর্ঘ এবং ছয় মাইল প্রন্থ কর্ডোভায় দশ লক্ষ লোকের বসবাস ছিল। মসজিদ, মাদ্রাসা, স্নানাগার, বিপণি, উদ্যান, দুর্গ, প্রাসাদ দ্বারা আলোকিত এ কর্ডোভা নগরীকে মধ্যযুগের ইউরোপের বাতিঘর বলা হতো। কর্ডোভা ছাড়া সেভিল ও গ্রানাডাও মুর সভ্যতা বিকাশে বিশেষ অবদান রাখে।
ভাষা ও সাহিত্য: স্পেনে উমাইয়া আমির ও খলিফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ভাষা ও সাহিত্য চর্চা শুরু হয়। ভাষাতাত্ত্বিক আবু আলী আল-কাদির 'আমালী' নামক গ্রন্থ অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। তাঁর শিষ্য মুহাম্মদ ইবন-উল-হাসান আল জুবাইদি ব্যাকরণবিদ ও ভাষাবিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তৃতীয় আব্দুর রহমানের সভা কবি-সাহিত্যিক ইবনে আবদ রাববির খ্যাতি অনেক। তাঁর গ্রন্থ 'ইকদ-উল-ফরীদ' মূল্যবান সাহিত্য সংকলন। ইবনে হাজম (৯৯৪-১০৬৪ খ্রিষ্টাব্দ) ইতিহাস, ধর্মবিদ্যা, হাদিস তর্কশাস্ত্রের উপর বারশত মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। সেভিল, টলেডো এবং গ্রানাডায় মুসলিম আমলে সাহিত্য চর্চা বৃদ্ধি পায়।
শিক্ষা: মাদরাসাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষার শুরু হতো আল-কুরআন, আরবি ব্যাকরণ ও কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে। কুরআনের ব্যাখ্যা ধর্মশাস্ত্র, দর্শন, আরবি ব্যাকরণ, কবিতা, অভিধানশাস্ত্র, ইতিহাস ও ভূগোল ছিল উচ্চ শিক্ষার ভিত্তি। কর্ডোভা, সেভিল ও গ্রানাডা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা দেওয়া হতো। এছাড়াও, ধর্ম-দর্শন, চিকিৎসা বিজ্ঞান, রসায়নবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা দেওয়া হতো এ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্পেনের এ শিক্ষাব্যবস্থা ইউরোপের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
ইতিহাস চর্চা: কর্ডোভার ঐতিহাসিক আবু বকর ইবনে উমর বা ইবন-উল-কুতিয়া কর্তৃক লিখিত তারিখ ই-ইফ তিতাহ্ আল-আন্দালুস (স্পেন বিজয়ের ইতিহাস) গ্রন্থে মুসলিম বিজয় হতে তৃতীয় আব্দুর রহমানের রাজত্বকালের ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়।
কর্ডোভার অন্য একজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবন-হাইয়ান বহু ইতিহাস গ্রন্থের প্রণেতা ইবন-উল-খাতির (১৩১৩-১৩৭৪ খিস্টাব্দ) গ্রানাডার বিস্তৃতির ইতিহাস রচনা করেন। স্পেনের কালজয়ী ঐতিহাসিক ইবনে খালদুনের গ্রন্থ 'আল মুকাদ্দমা' জগদ্বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ।
ভূগোলবিদ্যা: স্পেনের বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার ন্যায় ভূগোলবিদ্যায় মুসলমানগণ অবদান রাখেন। মুসলিম স্পেনে আল-বাকরী ও আল-ইদ্রিসী ভূগোলবিদ্যায় খ্যাতি অর্জন করেন। আল-বাকরীর আল-মাসালিক ওয়াল মামালিক এবং আল-ইদ্রিসীর নূজহাত-উল-মুশতাক ফি ইখতিখার-উল-তাহাঙ্কি গ্রন্থ দুটি জগদ্বিখ্যাত।
জ্যোতির্বিদ্যা: কর্ডোভা, সেভিল এবং টলেডোর শাসকগণ জ্যোতির্বিদ্যা শাস্ত্রের উন্নয়নের জন্য গবেষণাকার্য পরিচালনা করেন। গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি আলোচনায় স্পেনের বৈজ্ঞানিকগণ টলেমী অপেক্ষা অ্যারিস্টটলের মতামতের উপর অধিক গুরুত্বারোপ করেন। জ্যোতির্বিদগণের মধ্যে কর্ডোভার আল মাজরীতী, টলেডোর আল জারকালী এবং সেভিলের ইবন আফলাহর নাম উল্লেখযোগ্য। জাবীর ইবন আফলাহ কিতার উল-হাইরাহর গ্রন্থে গ্রহ-নক্ষত্র ও ত্রিকোণমিতি সম্বন্ধে আলোচনা করেন। এ গ্রন্থটি পরবর্তীতে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়।
উদ্ভিদবিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্র: উদ্ভিদবিদ্যা ও চিকিৎসাবিদ্যায় স্পেনের মুসলমানদের দান কম নয়। কর্ডোভার চিকিৎসক আল গাফিকী আবু জাফর আহম্মদ ইবনে মুহাম্মদ স্পেন ও উত্তর আফ্রিকার বৃক্ষের চারা সংগ্রহ করে আরবি, ল্যাটিন এবং বার্বার নাম প্রদান করেন। তাঁর গ্রন্থ আল-আদবিয়াহ্ আল মুফরাদাহ্ বিখ্যাত। ইবন-উল-আব্বাস আল-জাহরাবী কৃষি বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেন।
ইবন-উল-বাইতার উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও ঔষধ প্রস্তুতকরণ প্রকৌশলবিদ হিসেবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। তাঁর গ্রন্থগুলোতে চিকিৎসা ও ঔষধ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা ছিল। মুসলিম চিকিৎসাবিদ ইবন জুহরের গ্রন্থ আল-তাইমীর সুপরিচিত।
দর্শনশাস্ত্র: স্পেনীয় দশর্নশাস্ত্রী প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যোগাযোগের সহায়ক ছিল। মুসলিম স্পেনে দার্শনিক হিসেবে বেন-গ্যাব্রিয়েল, ইবন-বাজ্জাহ্, ইবনে-রুশদ, ইবন মায়মুন এবং ইবন-উল-আরাবী অত্যন্ত বিখ্যাত। তাদের লেখা দার্শনিক গ্রন্থগুলো মুসলিম স্পেন ও ইউরোপে দার্শনিক জগতে প্রভাব বিস্তার করে।
স্থাপত্য শিল্প: মুসলিম স্পেনে শাসকগণ স্থাপত্য শিল্পানুরাগী ছিলেন। শাসনকার্যের প্রয়োজনে তারা কর্ডোভার মসজিদ, সেভাইলের আল-ফাজার ও গ্রানাডার আল হামরা প্রাসাদ এখনো বর্তমান। আল-হামরা প্রাসাদে মোজাইক ও হস্তলিপি ব্যবহৃত হয়েছে। তৃতীয় আব্দুর রহমান তার স্ত্রীর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তার নামানুসারে আল-যাহরা প্রাসাদ নির্মাণ করেন। মুসলিম স্পেনে মৃৎশিল্প, বস্ত্রশিল্প, ধাতব শিল্প ও সংগীতের উৎকর্ষ সাধনে অগ্রগতি সাধিত হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় স্পেনের মুসলমানগণ অবদান রাখেন।
স্পেনে উমাইয়া শাসন - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

