- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- স্পেনে উমাইয়া শাসন
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
স্পেনে উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা: আব্দুর রহমান আদ-দাখিল (৭৫৬ খ্রি.)
স্পেনের ইতিহাসে আব্দুর রহমানের আবির্ভাব এক রোমাঞ্চকর ও নাটকীয় ব্যাপার। রক্তপিপাসু আবুল আব্বাস আস-সাফফার প্রতিজ্ঞালখ সিংহাসনকে নিষ্কণ্টক করার জন্য, উমাইয়া বংশকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য এবং বেপরোয়া ও পাইকারি নিধনযজ্ঞের হাত হতে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সে অনুযায়ী শত্রুর কবল হতে পরিত্রাণ লাভের জন্য প্রাণপণে পলায়ন করে কপর্দকহীন অবস্থায় আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ পাঁচ বছর ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ান। পরবর্তীতে আপন সাধনা বলে তিনি সৌভাগ্যের উচ্চশিখরে উপনীত হন।
আব্দুর রহমানের পলায়ন
৭৫০ সালে উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানের মৃত্যু হলে আব্বাসীয় খলিফা আস-সাফফা জোরপূর্বক সিংহাসন দখল' করেন। ক্ষমতা লাভের পর তিনি উমাইয়া বংশ ধ্বংস করতে এক প্রচন্ড অভিযান পরিচালনা করেন। উমাইয়া খলিফা হিসামের পৌত্র উক্ত হত্যাকান্ড হতে কোনো রকমে রেহাই পেয়েছিলেন। পাঁচ বছরকাল তিনি প্যালেস্টাইন, মিশর, উত্তর আফ্রিকায় নিতান্ত অসহায় অবস্থায় ঘুরে বেড়ান। এত দুর্দশার মধ্যেও তিনি একটি উমাইয়া সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন।
বনু নাসর গোত্রে আশ্রয় গ্রহণ
শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও আব্দুর রহমান স্বীয় উচ্চাভিলাষ থেকে ফিন্দুমাত্র পিছপা হন নি। তিনি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। স্বীয় আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য অবশেষে তিনি মরক্কোর সিউটা নগরের দক্ষিণে এক পার্বত্য অঞ্চলে বনু নাসর গোত্রে আশ্রয় গ্রহণ করেন। বনু নাসরগণ মাতুলগোষ্ঠীর হওয়ায় আব্দুর রহমানকে সাদরে গ্রহণ করলেন। এ আশ্রয়স্থল হতেই আব্দুর রহমানের ভাবী উজ্জ্বল জীবনের দীপ প্রজ্বলিত হয়। সাগর পাড়ের স্পেন ভূমিতে তার ভাগ্যান্বেষণের নতুন পথ বেছে নিলেন। তিনি প্রথমে তার ভগ্নীর মুক্তদাস সেলিমের নিকট থেকে স্পেনের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হন। এবার তিনি তার আবাল্য লালিত বাসনা ফলবতী করার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। স্পেনের সার্বিক অবস্থা সুষ্ঠুভাবে জানার জন্য তার দুর্দিনের সঙ্গী মুক্তদাস বদরকে এলভিয়া, জায়েন ও দক্ষিণ স্পেনের জেলাগুলোতে দামেস্ক শাখার উমাইয়াগণের নিকট প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য স্পেনে একটি স্বাধীন উমাইয়া রাজ্য স্থাপন করা। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য তার বিশ্বস্ত অনুচর এখানে প্রায় ৫০০ উমাইয়া বংশীয় লোক বসবাস করছিল।
স্পেনের রাজনৈতিক অবস্থা: এ সময়ে স্পেনের রাজনৈতিক অবস্থা খুবই সংকটজনক ছিল। বিভিন্ন শ্রেণি ও গোত্রের মধ্যে বিরাজমান ফন্দ্ব ও কলহ চরম আকার ধারণ করছিল। মুদারীয় ও হিমারীয়দের স্বন্দ্বই ছিল সর্বাপেক্ষা প্রকট। উভয় দলই শক্তিতে ছিল প্রবল। তাই বহুদিন ধরে ফন্দ্ব-কলহে যখন কোনো ফল হলো না তখন তারা এ সিদ্বান্তে উপনীত হলো যে, পর্যায়ক্রমে হিমারীয় ও মুদারীয় প্রতিনিধিগণ সিংহাসনে বসবে। এ নীতির ফলে মুদারীয় গোত্রের প্রতিনিধি ইউসুফ সিংহাসন ছাড়তে অস্বীকার করেন এবং অন্যায়ভাবে ক্ষমতা ধরে রাখেন। হিমারীয়গণ ইউসুফের অত্যাচারে অত্যন্ত অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তাদের মধ্যে সেভিলেন গভর্নর আহম্মদ-বিন-আমর স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। অতঃপর হিমারীয়গণের আন্দোলনে সমগ্র স্পেনে এক বিদ্রোহাত্মক অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাছাড়া আস্তরীয়গণ মুসলমানদের অন্তঃবিপ্লবের সুযোগে নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে থাকে এবং ঐ অঞ্চল দখলের চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়।
হিমারীয়দের সাহায্যের আশ্বাস স্পেনের এহেন অবস্থায় আব্দুর রহমানের পত্র নিয়ে বদর দামেস্ক শাখার দলপতি উবাইদুল্লাহ-বিন-উসমান, আব্দুল্লাহ-বিন-খালিদের নিকট উপস্থিত হয়। এলভিয়ার এ দলপতিদ্বয় আব্দুর রহমানের পত্র পেয়ে হিমারীয়গণকে মুদারীয়গণের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলে। হিমারীয়গণ বিপুলভাবে সাড়া দিয়ে আব্দুর রহমানের সাহায্য ও সমর্থনে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগলেন।
স্পেনে পদার্পণ: ৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দে সেপ্টেম্বর মাসে আব্দুর রহমান স্পেনের মাটিতে পদার্পণ করেন। উবাইদুল্লাহ ও ইবনে খালিদ আব্দুর রহমানকে নিয়ে টোরস দুর্গে উপনীত হলেন। সেখানে প্রতীক্ষারত মানুষ তাকে বিপুলভাবে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। আব্দুর রহমানের সমর্থনে দলে দলে বার্বার ও হিমারীয়গণ তার পতাকাতলে সমবেত হন এবং তার সাহায্যে তিনি একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গঠন করেন। ইউসুফ আব্দুর রহমানের আগমনের সংবাদে রাজধানী কর্ডোভায় ফিরে আসেন এবং তার সাথে সন্ধির প্রস্তাব দেন। কিন্তু আব্দুর রহমান তার নবাগত বাহিনীসহ ইউসুফের বিরুদ্ধে যাত্রা করেন।
উমাইয়া আমিরাত প্রতিষ্ঠা
দক্ষিণ স্পেনে আব্দুর রহমান অবতরণ করে জনগণকে নিজের প্রভাবাধীনে আনতে সক্ষম হন। ৭৫৬ সালের ৮ই মার্চ তিনি আর্চিদোনার রাজধানী বিজিওতে প্রবেশ করেন। সেখানেই তাকে স্পেনের আমির বলে ঘোষণা করা হয় এবং তার নামে খুতবা পাঠ করতে হয়। ৭৫৬ সালের মাঝামাঝিতে তিনি স্পেনের দক্ষিণ জেলাগুলোতে বিনা রক্তপাতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
মাসারাহ যুদ্ধ ও কর্ডোভা দখল স্পেনে আব্দুর রহমানের অবতরণ ও জনসমর্থনের খবর শুনে ইউসুফ টলেডো ও মুরসিয়া হতে সৈন্য সংগ্রহ করে রাজধানী কর্ডোভা হতে সেভিলের দিকে গুয়াডালকুইভা নদীর দক্ষিণ তীর ধরে আব্দুর রহমানকে বাধা প্রদানের জন্য অগ্রসর হন। সুচতুর আব্দুর রহমান নদীর বাম তীর দিয়ে রাজধানীর দিকে যাত্রা শুরু করেন। এভাবে সেভিলের অনিবার্য সংঘর্ষ এড়িয়ে আব্দুর রহমান রাজধানীতে পৌঁছেন। এ সংবাদ পেয়ে ইউসুফ সেভিল হতে দ্রুতগতিতে রাজধানীর অভিমুখে অগ্রসর হন। আব্দুর রহমানও এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এ যুদ্ধে ইউসুফ পরাজিত হয়ে টলেডোতে আশ্রয় গ্রহণ করে। আব্দুর রহমান বিজয়ী বেশে রাজধানী কর্ডোভার প্রশাসক নিযুক্ত করেন।
উমাইয়া বংশের প্রতিষ্ঠাতা ৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে মাসারার যুদ্ধের ফলাফল ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইউসুফ এর পরাজয়ের ফলে আইবেরীর উপদ্বীপে পুনরায় উমাইয়া বংশ প্রতিষ্ঠা হয়। এ বংশ ১০৩১ খ্রিষ্টাব্দে পর্যন্ত সগৌরবে রাজত্ব করেন। আমির আলী বলেন, "বিতাড়িত, পলাতক ও গৃহহীন যাযাবর তার উচ্চাভিলাষের সর্বোচ্চ শিখরে উপনীত হন। এভাবে তিনি একটি রাজ্যের অধিকারী হন।" উমাইয়া বংশের প্রতিষ্ঠাতা আমির হিসেবে তাকে "আদ-দাখিল" নামে অভিহিত করা হয়। পরবর্তীতে আব্দুর রহমান আদ-দাখিল স্পেনে তার আমন্ত্রণকে সুদৃঢ় করার প্রতি মনোনিবেশ করেন।
গোত্রীয় বিদ্রোহ দমন: স্পেনের সিংহাসনে আরোহণ করে আব্দুর রহমান নানা প্রকার বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হন। যুদ্ধ-বিগ্রহ, ষড়যন্ত্র, গোত্রীয় কোন্দল ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করে তিনি স্বীয় যোগ্যতার পরিচয় দেন। প্রথমে পরাজিত গভর্নর ইউসুফ পুনরায় সৈন্যবাহিনী সংগ্রহ করে কর্ডোভা দখলের চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজকীয় বাহিনীর মোকাবিলা করা নিষ্ফল জেনে ইউসুফ বাধ্য হয়ে সন্ধি করে। শর্তানুযায়ী ইউসুফের বর্তমান সম্পত্তি তার দখলে থাকবে এবং তিনি আব্দুর রহমানকে আমীর হিসেবে মেনে নিবেন। কিন্তু অচিরেই উভয়ের মাঝে ভুল বুঝাবুঝি শুরু হয় এবং ইউসুফ পরাজিত ও নিহত হন। পরবর্তীতে সামুয়েল ও জায়েদ নিহত হন।
সিংহাসনে আরোহণ করে আব্দুর রহমান আদ-দাখিল কঠোর হস্তে বিদ্রোহী গোত্রীয় দলপতিদের যড়যন্ত্র ও বিরোধিতা নির্মূল করার প্রয়াস পান। এমনিভাবে আব্দুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী ও তার বংশের প্রতিদ্বন্দ্বীর পতন হয়।
সেভিলে বিদ্রোহ: ইউসুফের শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার পরও আব্দুর রহমান নিরাপদে রাজ্য শাসন করতে পারেন নি। বার্বার ও ইয়েমেনীয়গণ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। কিন্তু তাদের দমন করতে আব্দুর রহমানকে বিশেষ বেগ পেতে হয় নি। ৭৬০ সালে আরজাক-বিন-নুমান সেভিলে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যথাসময়ে তাকে দমন করে আব্দুর রহমান শান্তিমূলক কাজে লিপ্ত হলে ৭৬৬ সালে তাকে হত্যা করা হয়, তবে ৭৭৪ সালে সেভিলবাসী আবার বিদ্রোহী হলে আব্দুর রহমান বিশেষ কঠোরতা অবলম্বন করেন। বিদ্রোহ দমনকল্পে তিনি কুড়ি হাজার লোককে হত্যা করেন এবং অন্যান্যদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তির বিধান করেন। তার জীবদ্দশায় সেভিলে আর বিদ্রোহ দেখা দেয়নি।
টলেডোতে বিদ্রোহ: ৭৬০ সালে হিশাম-বিন-উরাহ টলেডোতে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। আব্দুর রহমান তাকে পরাজিত করে এবং তার পুত্রকে জামিন স্বরূপ কর্ডোভাতে আনয়ন করেন। ৭৬৪ সালে কর্ডোভাতে আবার বিদ্রোহ দেখা দেয়। এবার বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের কর্ডোভাতে ফাঁসি দেওয়া হয়। এভাবে টলেডোতে বিদ্রোহ দমন করা হয়।
আব্বাসীয় বিরোধ: আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর স্পেনে উমাইয়া বংশের প্রতিষ্ঠায় ঈর্ষান্বিত হয়ে কায়রোয়ানের শাসনকর্তা আলী-বিন-মুগিসকে আন্দালুসিয়া জয়ের জন্য পাঠান। কিন্তু ৭৬৩ সালে কারমোনায় আব্বাসীয় বাহিনীকে আব্দুর রহমান অবরোধ করে রাখে এবং একদিন অতর্কিত আক্রমণে আলী বিন-মুগিসের শিবির আক্রমণ করে তাকে হত্যা করেন। তার মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে লবণ, গন্ধক মিলিয়ে থলিতে ভর্তি করে মনসুরের নিকট প্রেরণ করেন। ফলে আব্বাসীয়দের স্পেন জয়ের বাসনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
আব্দুর রহমানকে কুরাইশদের বাজপাখি উপাধি আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর স্পেনে নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য কায়রোয়ানের শাসনকর্তা আলী-বিন মুগিসকে ৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দে বিরাট সৈন্যবাহিনীসহ আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে পাঠান। স্পেনের অন্যান্য হানের বিদ্রোহীরাও এ আব্বাসীয় বাহিনীর সঙ্গে যোগদান করে। দুর্দমনীয় আব্দুর রহমানকে দমাতে না পেরে আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর তাকে "কুরাইশদের বাজপাখি" বলে অভিহিত করেন এবং আব্দুর রহমানের উপরিউক্ত কীর্তির জন্য স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, "আল্লাহ এমন শত্রুর মধ্যে একটি সমুদ্র রেখে তাকে বিপদমুক্ত করেছেন।"
বার্বারদের বিদ্রোহ: আব্দুর রহমান তার সর্বাত্মক ক্ষমতা ও দক্ষতার সাথে বার্বার বিদ্রোহ দমন করেন। আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে বার্বারগণ ৭৬৮ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্রোহ শুরু করলে আব্দুর রহমান তাদের দমন করার জন্য একটি শক্তিশালী বাহিনী প্রেরণ করেন। বার্বারগণ প্রাণভয়ে গুহায় আত্মগোপন করে। এভাবে প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলে ৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে তার এক সঙ্গীর হাতে আব্দুল্লাহ নিহত হন।
শার্লিমেনের স্পেন জয়ের চেষ্টা: দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত থাকার সুযোগে উত্তর স্পেনে কতিপয় আরব দলপতি খ্রিষ্টান রাজা শার্লিমেনের সাথে ষড়যন্ত্র করে আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেন। শার্লিমেন ৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে পিরেনীজ অতিক্রম করে স্পেনে অভিযান পরিচালনা করলেও আব্দুর রহমানের বাহিনী খ্রিষ্টান বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে। এভাবে স্পেনে বিরাজমান বিদ্রোহ, অসন্তোষ আব্দুর রহমান অপরিসীম বিচক্ষণতার সাথে মোকাবিলা করেন। স্বাধীন উমাইয়া রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আব্দুর রহমান আদ-দাখিলের মূল্যায়ন করে লেনপুল বলেন, "যৌবনে যে আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে আব্দুর রহমান কর্মক্ষেত্রে অগ্রসর হয়েছিলেন তা এখন বাস্তবে রূপায়িত হয়েছে এবং তিনি একক শক্তিরূপে স্পেনে স্বাধীন রাজ্য যাপনে সমর্থ হন।"
আব্দুর রহমান আদ-দাখিলের কৃতিত্ব বিচার
তিনি দীর্ঘ ৩৩ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করে বিদ্রোহ দমন, গোলযোগ নিরসন এবং শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপনই করেননি; একটি সুষ্ঠু প্রশাসনিক কাঠামো নীতিও সৃষ্টি করেন। তিনি ফিহারাস্টি, বার্বার, ইয়েমেনী, খ্রিষ্টান সম্প্রদায় এবং বিশেষ ভাবাপন্ন আরব গোত্রের ষড়যন্ত্র ধূলিসাৎ করে দেন। ফলে স্পেনে স্বাধীন উমাইয়া আমিরাত স্থায়ী ও সুদৃঢ় হয়। নিম্নে তার কৃতিত্ব আলোচনা করা হলো:
শাসক হিসেবে: স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে আব্দুর রহমান আদ-দাখিল অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। সাথে সাথে তিনি ৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর এর নামের পরিবর্তে নিজ নামে খুতবা পাঠের নির্দেশ দেন। তিনি আমিরুল মোমেনীন উপাধি গ্রহণ করেন। তিনি প্রশাসনিক কাঠামোর শিরোমণি ছিলেন এবং সামন্ত রাজকর্মচারী নিজ হস্তে নিযুক্ত করতেন। সমগ্র দেশকে তিনি ছয়টি প্রদেশে ভাগ করে প্রতিটির শাসনভার একজন সামরিক গভর্নরের উপর ন্যস্ত করেন। আমিরের একটি পরামর্শসভা ছিল। প্রধানমন্ত্রী বা ওয়াজির ছাড়াও, হাজীব সামা বা প্রধান বিচারপতি, সাহিব-আস-সুরতা বা পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। সামরিক বাহিনী গঠন দেশের অভ্যন্তরে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, পৌনঃপুনিক বিদ্রোহ দমন, বৈদেশিক শত্রুর সঙ্গে সার্থকভাবে মোকাবিলার জন্য আব্দুর রহমান এক বিশাল সৈন্যবাহিনী গঠন করেন। সৈন্যদের সংখ্যা ছিল প্রায় দুই লক্ষের মতো। মুক্তদাস ও বার্বারগণই ছিল সৈন্যবাহিনীর প্রধান অংশ। তার অধীনে বহু খ্যাতনামা সামরিক নায়ক ছিল। এদের মধ্যে বদর, তামান-বিন-আল-কাসাই, হাবিব ইবনে আবদুল মালেক প্রমুখ অন্যতম।
জ্ঞানী-গুণীদের পৃষ্ঠপোষক: তিনি জ্ঞানী ও পণ্ডিতগণকে যথেষ্ট সমাদর ও শ্রদ্ধা করতেন। ইয়াহইয়া-বিন-ইয়াহিয়া, ঈসা-বিন-দিনার, শায়খ আবু মুসা হাওয়ারী ও সাইদ-বিন-হাসান প্রমুখ মনীষীরা তার দরবার অলংকৃত করেন। এসব জ্ঞানী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ছিলেন উদার ও অকৃপণ। জনহিতকর কার্যাবলি বহুবিধ জনহিতকর কার্যাবলি দ্বারাও তিনি তার প্রতিভার পরিচয়কে বহুলাংশে প্রসারিত করেন।
কৃষিকার্যের সুবিধার্থে তিনি সেচ প্রকল্পের প্রচলন করেন। খাল খনন ও পানি সেচের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে কৃষিক্ষেত্রের উন্নতি সাধিত হয়। ব্যবসায়-বাণিজ্য, চলাচল ও যোগাযোগের সুবিধার্থে তিনি সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার সাধন করেন। কর্ডোভার প্রাসাদ, সরকারি ইমারত, মসজিদ, সেতু ও উদ্যান প্রভৃতি উন্নয়নমূলক কার্যের দ্বারা রাজধানীকে সুসজ্জিত করেন। ৮০,০০০ স্বর্ণমুদ্রায় কর্ডোভাতে জামে মসজিদ নির্মাণ করেন। পয়ঃপ্রণালি এবং স্নানাগার প্রভৃতি নির্মাণ করে তিনি নগরবাসীর জীবনযাত্রাকে উন্নত করে তোলেন। দেশি-বিদেশি মনোরম ও মনোহারিণী লতা, গুল, ফল ও ফুলের উদ্যান রচনা করে তিনি তার সৌন্দর্য ও সুরুচি জ্ঞানের পরিচয় দেন।
চারিত্রিক গুণাবলি
বিভিন্নমুখী প্রতিভা ও অপূর্ব কৃতিত্বে আব্দুর রহমানের চরিত্র সমৃদ্ধ ছিল। তিনি একাধারে ছিলেন সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ব্যক্তি, কর্ডোভা জামে মসজিদের ইমাম, বিচারালয়ের প্রধান বিচারপতি ও রণক্ষেত্রের প্রধান সেনাপতি। তিনি নিছক আমির উপাধি নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন না। কারণ তিনি মনে করতেন মক্কা ও মদিনা নগরীদ্বয়ের অধিকর্তাগণই খলিফা হওয়ার অধিকারী। তার মধ্যে মাঝে মাঝে কঠোরতা প্রকাশ পেলেও প্রধানত তিনি ছিলেন সদয় সহানুভূতিশীল। উন্নত রাষ্ট্রসমূহের আমির আব্দুর রহমান সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবনুল আসির এক অনবদ্য ও নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেন। তার বর্ণনা মতে, "তিনি ছিলেন দীর্ঘকায়, কৃশ, সুঠাম দেহের অধিকারী, বিদ্বান, কবি, প্রখর বুদ্ধি ও দূরদর্শিতাসম্পন্ন কর্তব্যপরায়ণ, দানশীল ও উদার। অধ্যবসায় ও শাসন দক্ষতায় তিনি মনসুরের সমকক্ষ ছিলেন।"
উত্তরাধিকারী নির্বাচন
আব্দুর রহমান আদ-দাখিল তার মৃত্যুর পূর্বে কর্ডোভার প্রাসাদ কক্ষে টলেডো, মেরিদা, সারগো ভ্যালেনসিয়া, মরুসিয়ার গভর্নর ও মন্ত্রিাণ, কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী, সেক্রেটারি, প্রধান বিচারপতি, প্রধান সেনাপতি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে আহ্বান করেন। সে কক্ষে শাহজাদা হিশামকে উপস্থিত করে ভাবী আমির বলে ঘোষণা করেন। অতঃপর প্রত্যেকে তাকে ভাবী আমির হিসেবে স্বীকৃতি দান করেন।
আব্দুর রহমান আদ-দাখিল-এর মৃত্যু
উত্তরাধিকার মনোনয়ন পর্ব শেষ করে আব্দুর রহমান পুত্র আবুদুল্লাহকে কর্ডোভায় রেখে ভাবী আমির হিশামকে নিয়ে মেরিদায় গমন করেন। সেখানে সামান্য অসুস্থতায় তিনি ৭৮৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর ২ মাস ৪ দিন।
উপরিউক্ত আলোচনায় আমরা দেখতে পাই যে, ভীষণ দুর্যোগ ও বাধাবিপত্তির মুখে আব্দুর রহমান স্পেনে উমাইয়া শাসন প্রতিষ্ঠিত করে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার চরম শিখরে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন গৃহহীন, সহায় সম্বলহীন, তথাপি তিনি কঠোর সাধনার দ্বারা স্পেনে গৌরবময় মুসলিম শাসনের দ্বারোদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইতিহাসে এই ঘটনা একটি বিস্ময়কর ব্যাপার। নিঃসন্দেহে তিনি একজন শ্রেষ্ঠ সেনাপতি, দক্ষ শাসনকর্তা, মহানুভব ও শিল্পানুরাগী সুলতান ছিলেন। তার ক্ষিপ্র গতি, অবিচল ও অব্যর্থ লক্ষ্য স্বীকার করে আব্বাসীয় খলিফা আল-মনসুর তাকে "কুরাইশদের বাজপাখি" নামে অভিহিত করেন।
আমির প্রথম হিশাম (৭৮৮-৭৯৬ খ্রি.)
ক্ষমতা লাভ: পিতা প্রথম আব্দুর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র প্রথম হিশাম ৭৮৮ খ্রি. আমির হিসেবে স্পেনের সিংহাসনে আরোহণ করেন। সিংহাসনে আরোহণ করে তিনি আপন ভ্রাতাদের বিদ্রোহ এবং সারাগোসা ও বার্সিলোনার বিদ্রোহ দমন করে উমাইয়া প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। খ্রিষ্টানদের নস্যাৎমূলক কার্যকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে হিসাম বিশাল সেনাবাহিনী প্রেরণ করে নারবোন, সেপটিমানিয়া ও গ্যালেসিয়ায় বিদ্রোহ দমন করে তাদের যড়যন্ত্র নসাৎ করেন। তিনি স্পেনে মালিকী ধর্মমতকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দান করেন। তিনি দানশীল, ধার্মিক ও মহানুভব শাসক ছিলেন। ৭৯৬ খ্রি. আমির হিশাম মৃত্যুবরণ করেন।
আমির প্রথম হাকাম (৭৯৬-৮২২ খ্রি.)
সিংহাসনে আরোহণ: ৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দ হিসামের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র প্রথম হাকাম আমির হিসেবে স্পেনের সিংহাসনে আরোহণ করেন। সিংহাসনে আরোহণের পর তাঁকে নানা বিপর্যয় এবং শত্রুর বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ফকিহগণের বিদ্রোহ ছাড়াও তাঁর দুই পিতৃব্য আবদুল্লাহ এবং সুলাইমান তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করেন। আবদুল্লাহ ফ্রাঙ্কিস রাজা শার্লিমানের সাহায্যে টলেডো আক্রমণ করে অধিকার করেন এবং সুলাইমান ভ্যালেনসিয়া দখল করেন। এ সময় শার্লিমানের পুত্রদ্বয় লুইস ও চার্লস সহসা উত্তর প্রদেশসমূহ আক্রমণ করে তাদের ধ্বংস সাধন করেন এবং গ্যালিসীয় নেতা আলফানসো আরাগ আক্রমণ করে। তিনি দীর্ঘ ২৬ বছর রাজত্ব করে ৮২২ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর দ্বিতীয় আব্দুর রহমান ক্ষমতা লাভ করেন।
স্পেনে উমাইয়া শাসন - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

