- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- স্পেনে উমাইয়া শাসন
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
দ্বিতীয় আব্দুর রহমান (৮২২-৮৫২ খ্রি.)
আমির হাকামের মৃত্যুর পর তার পুত্র দ্বিতীয় আবদুর রহমান মাত্র ৩১ বছর বয়সে কর্ডোভার সিংহাসনে আরোহণ করেন। আবদুর রহমান ছিলেন শৌর্য-বীর্য ও পান্ডিত্যের অধিকারী। তিনি প্রাসাদ, উদ্যান, মসজিদ, ইমারত, সেতু, সড়ক, ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষা ও সংস্কৃতির দ্বারা কর্ডোভাকে সুন্দর ও মনোরমভাবে সুসজ্জিত করেন। সৌন্দর্য চর্চা ও কাব্যপ্রীতিতে তিনি ছিলেন বিশেষ আগ্রহী। তিনি সর্বদা কবি, শিল্পী, সংগীতজ্ঞ ও জ্ঞানী-গুণী যারা পরিবেষ্টিত থাকতেন। তার বিভিন্নমুখী গুণাবলিতে মুগ্ধ হয়ে ঐতিহাসিকগণ মন্তব্য করেছেন, "তার রুচি ছিল মার্জিত, লোকেরা সমৃদ্ধ ছিল এবং প্রচুর রাজস্ব আমদানি হতো।"
দ্বিতীয় আব্দুর রহমানের কৃতিত্ব
সিংহাসনারোহণ ও বিদ্রোহ দমন দ্বিতীয় আবদুর রহমান ক্ষমতারোহণ করে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তার গৃহীত কার্যাবলি নিম্নে আলোচনা করা হলো:
বিদ্রোহ দমন: সিংহাসনে আরোহণ করে দ্বিতীয় আব্দুর রহমান সাম্রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য নানাবিধ বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত হন। প্রথম আব্দুর রহমানের পুত্র আব্দুল্লাহ সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনের চেষ্টা করেন। কিন্তু তেমন কোনো সমর্থন না পেলেও স্বসৈন্যে স্পেনে প্রবেশ করে নিজেকে আমির হিসেবে ঘোষণা করেন। খন্ড যুদ্ধে রাজকীয় বাহিনী তাকে পরাজিত করে। দ্বিতীয় আব্দুর রহমান তাকে ক্ষমা প্রদর্শন করেন এবং মুরসিয়ার শাসনকর্তা পদে নিয়োগ দেন।
তাদমির বিদ্রোহ: ইয়ামেনী ও মুদারিয়দের সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়লে ৮২২ খ্রিষ্টাব্দে ইয়ামেনী এবং মুদারীয়দের যুদ্ধ শুরু হয়। এ গোত্রীয় যুদ্ধটি সাত বছর চলার পর ৮২৯ খ্রিষ্টাব্দে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আব্দুর রহমান চেষ্টা করেন।
মেরিদায় বিদ্রোহ: আব্দুর রহমানের সময় মেরিদা বিদ্রোহ ছিল মারাত্মক। কর্ডোভা সরকার বিপজ্জনক মনে করে ঝুঁকি নিয়ে এ বিদ্রোহ মোকাবেলা করেন। বিদ্রোহটি ছিল খ্রিষ্টান, ইহুদি নব-মুসলিম ও বার্বারদের একটি যৌথ ষড়যন্ত্র। ৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে কর আদায়কারি আব্দুল জব্বার ও সুলায়মান বিন-মারাতিনের নেতৃত্বে খ্রিষ্টান ও ইহুদিগণ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। কয়েকটি যুদ্ধাভিযানে তাদের পরাজিত করে শান্তি স্থাপন করেন।
টলেডো বিদ্রোহ: টলেডোর খ্রিষ্টান, ইহুদি ও নব-মুসলিমগণ মৈত্রীবন্ধ হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে অনেক অভিযানের পর সর্বশেষে আব্দুর রহমানের ভাই ওয়ালিদ ৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্রোহীদের দমন করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন।
খ্রিষ্টানদের শত্রুতা: স্পেনের মুসলিম শাসনকে খ্রিষ্টানগণ কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারে নি। মুসলিম শাসন উচ্ছেদ করার জন্য ৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে এবং ৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে গথিক চার্চের কাউন্ট বয়েল মুসলিম রাজ্য আক্রমণ করে। আব্দুর রহমান সৈন্য প্রেরণ করে খ্রিষ্টান বাহিনীকে পরাজিত করে সাম্রাজ্যে শান্তি স্থাপন করেন।
ন্যান আক্রমণ: স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসানের জন্য জার্মান বংশোদ্ভূত স্যানগণ জলপথে স্পেন আক্রমণ করে সেভিল আক্রমণ করলে আব্দুর রহমান তাদের পরাজিত করে স্পেনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
বায়জান্টাইনদের সঙ্গে সম্পর্ক: আব্দুর রহমানের বৈদেশিক নীতি ছিল শত্রুর, শত্রুর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করা। রোমান সম্রাটগণ মুসলিম রাজাদের প্রতি সহনশীল ছিলেন।
ধর্মান্ধ আন্দোলন: মুসলিম স্পেনে গোড়া ও ধর্মান্ধ খ্রিষ্টানগণ আন্দোলন করেন। ধর্মান্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে স্পেন হতে খ্রিষ্টানগণ মুসলমানদের বিতাড়নের জন্য যড়যন্ত করেন। তা ইতিহাসে ধর্মান্ধ আন্দোলন নামে অভিহিত করা হয়।
দ্বিতীয় আবদুর রহমান চার ব্যক্তি দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। এ চার ব্যক্তি ছিলেন ধর্মবেত্তা ইয়াহহিয়া-তাঁর শাসনামলে তিনি চারজন প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। বিন-ইয়াহিয়া, প্রতিভাধর সংগীতজ্ঞ জিরিয়াব, প্রভাবশালী মৃক খোজা নাজের ও সম্রাজ্ঞী সুলতানা তারুবা।
ইয়াহিয়া-বিন-ইয়াহিয়া: মুসলিম স্পেনে মালিকী মাযহাব প্রবর্তনের মূলে প্রভাবশালী ফকীহ বা ধর্মবেত্তা ইয়াহিয়া-বিন- ইয়াহিয়ার অবদান ছিল অপরিসীম। হিশামের রাজত্বকালে এ মাযহাব রাষ্ট্রীয় ধর্মমতের মর্যাদা পায়। হিশাম মালিক ইবন আনাসের অনুসারী ইয়াহিয়া-বিন-ইয়াহিয়াকে মালিকী মতবাদে দীক্ষা লাভের জন্য মদিনা প্রেরণ করেন। মালিকী ফিকাহ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করে ইয়াহিয়া স্পেনে ফিরে এসে মালিকী মাযহাব প্রচার শুরু করেন। হিশামের পর হাকাম সিংহাসনে আরোহণ করলে তিনি ফকীহদের প্রভাবে শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। মদ্যপায়ী হাকামের বিরুদ্ধে যে সমস্ত ধর্মবেত্তা সোচ্চার হয়ে ওঠেন তাঁদের সর্বশেষ প্রভাবশালী ছিলেন ইয়াহিয়া।
সন্দেহভাজন হাকাম তার বিরুদ্ধে ষড়যন্তের অভিযোগে অসংখ্য ফকীহকে বন্দি ও হত্যা করেন। এ হত্যাযজ্ঞ থেকে আত্মরক্ষার জন্য ইয়াহিয়া কর্ডোভা থেকে টলেডোয় পলায়ন করেন। দ্বিতীয় আবদুর রহমানের শাসনামলে ইয়াহিয়ার প্রভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। কারণ প্রথম হিশামের মতো তিনি ফকীহ বা ধর্মবেত্তাদের বিশেষভাবে সমাদর করতেন এবং রাষ্ট্রীয় কাজে তাদের মতামত গ্রহণ করতেন। এভাবে শান্তজ ও ফকীহ ইয়াহিয়া নতুন সুলতানের মনের উপর অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাব ফেলতে সক্ষম হন। মালিকী ধর্মমত স্পেনে একক জনপ্রিয়তা লাভ করলে জনগণ বলাবলি করত যে, "আমরা পবিত্র আল্লাহর গ্রন্থ আল-কুরআন এবং মালিকের মুয়াত্তা ব্যতীত অপর গ্রন্থের নাম জানি না.।" ৮০৮ খ্রিষ্টাব্দে ইয়াহিয়া মৃত্যুবরণ করেন।
জিরিয়াব: দ্বিতীয় আবদুর রহমানের রাজত্বকালে অপর যে ব্যক্তি সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন তিনি হচ্ছেন প্রখ্যাত পারস্য সংগীতজ্ঞ আবুল হাসান আলী ইবন-নাফী ওরফে জিরিয়ার। ৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর জন্ম হয় এবং হিটির ভাষায়, তিনি আব্বাসীয় খলিফা হারুন-অর-রশিদ ও তাঁর একাধারে শিল্প-সাহিত্য বিজ্ঞানের অনুরাগী ছিলেন। তাঁর ওস্তাদ ছিলেন বাগদাদের প্রখ্যাত সংগীত বিশারদ ইসহাক আল-মাউসিলি। শৈল্পিক গুণাবলিতে জিরিয়াব তাঁর ওস্তাদকে অতিক্রম করার উপক্রম হলে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য বাধে। এ অসহনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পাবার জন্য জিরিয়াব বাগদাদ হতে স্পেনে আগমন করেন। কথিত আছে যে, সংগীতজ্ঞ হিসেবে তাঁর যশ ও খ্যাতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যে, তাঁর আগমনের বার্তা শুনে দ্বিতীয় আব্দুর রহমান তাকে স্বয়ং অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন।
জিরিয়াবের জন্য ৪০ হাজার দীনার মূল্যের একটি প্রাসাদোত্তম গৃহ এবং ২০ হাজার মতান্তরে ৩০ হাজার দীনার বাৎসরিক মাসোহারা নির্ধারিত হয়। সুমিষ্ট কণ্ঠ, ছন্দায়িত সুর সংগীত পারদর্শী জিরিয়াব অতি অল্প সময়ে আবদুর রহমানের দরবারের একজন প্রভাবশালী অমাত্য হয়ে পড়েন। তিনি সৃজনশীল শিল্পী ছিলেন এবং অতি অল্প সময়ে ১০ হাজার সংগীত রচনা করেন। স্পেনে তিনি আরব সংগীতের একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রীতি প্রবর্তন করেন। তিনি বিভিন্ন সুর ও বাদ্যযন্ত্রের উদ্ভাবন করেন। তিনিই প্রথম পাঁচতারাবিশিষ্ট বীণা আবিষ্কার করেন। তিনি কাঠের ঠুসির পরিবর্তে ঈগল পাখির নখ ব্যবহারের প্রচলন করেন। তাঁর উদ্ভাবিত বাদ্যযন্ত্রের সুর ছিল মোলায়েম ও গভীরতাসম্পন্ন। তিনি একজন আদর্শ সংগীত শিক্ষক ছিলেন।
খোজা নাসের: দ্বিতীয় আবদুর রহমানের দরবারের তৃতীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন খোজা নাসের। মূক হলেও তাঁর প্রভাব ছিল অসামান্য। একজন আরব হয়েও দ্বিতীয় আব্দুর রহমানের মতো তিনি অসীম ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন। শাসনকার্যে তিনি অপরিসীম দক্ষতার পরিচয় দেন এবং সুলতানের সহচর ছিলেন। তার পারদর্শিতা ও অসামান্য প্রভাব ক্রমশ সুলতানা তারুবকে মুগ্ধ করে এবং সুলতানা খোজা নাসেরকে তাঁর ষড়যন্ত্রে জড়িত করেন। সুলতানা খোজা নাসেরকে দিয়ে-ভাবী উত্তরাধিকারী আমিরজাদা মুহাম্মদকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টা করেন।
সুলতানা তারুব: দ্বিতীয় আবদুর রহমানের স্ত্রী সুলতানা তারুব ছিলেন পরমাসুন্দরী। একাধারে তিনি ছিলেন রূপসী ও বিদুষী। কিন্তু প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে তিনি ছিলেন চতুরা। ধন-সম্পদের প্রতি তাঁর অগাধ মোহ ছিল। উচ্চাভিলাষী ও কুচক্রী সুলতানা স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য খোজা নাসেরকে ব্যবহার করেন। স্বীয়পুত্র আব্দুল্লাহকে মুহাম্মদের স্থলে উত্তরাধিকারী মনোনীত করার জন্য তিনি মুহাম্মদকে হত্যা করার জন্য খোজা নাসেরকে প্ররোচিত করেন।
দ্বিতীয় আব্দুর রহমান শিল্পকলা, সাহিত্য, স্থাপত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় বিশেষ অবদান রাখেন। তাঁর সময়ে কর্ডোভা কৃষ্টি ও সভ্যতার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই অগ্রগতিতে তাঁর দরবারের যে সকল প্রভাবশালী ব্যক্তিগণ অবদান রাখেন তাদের মধ্যে ইয়াহিয়া-বিন-ইয়াহিয়া এবং জিরিয়াব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
স্পেনে উমাইয়া শাসন - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

