• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • আব্বাসি খিলাফত
আব্বাসি খিলাফত

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

আব্বাসীয় আন্দোলন

আব্বাসীয় আন্দোলনের উৎপত্তি (Origin of Abbasid Propaganda)

মুহাম্মদ-বিন-আলী নিজের দাবির সপক্ষে সমর্থক ও অনুচর লাভের জন্য এক ব্যাপক প্রচারকার্য শুরু করলেন। মাওয়ালি, শিয়া, খারিজি এবং আরও অনেকে উমাইয়াদের কার্যকলাপে সন্তুষ্ট ছিল না। তারা উমাইয়া শাসনের সমাপ্তি কামনা করছিল।

এতে মুহাম্মদ-বিন-আলীর কাজ করার সুবিধা হলো। তিনি ভালো করেই জানতেন যে, পূর্বদেশীয় লোকেরা, বিশেষ করে খোরাসানি ও পারস্যের মাওয়ালিরা উমাইয়াদের শাসনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল। এই সময়ে তিনি যে সমস্ত গুপ্ত সমিতি ও দল গঠন করেন, তাদের মধ্যে শিয়া, খারেজি ও আব্বাসীয় দল ছিল সর্বাপেক্ষা সক্রিয়। আব্বাসীয় আন্দোলন বা প্রচারকার্য বিভিন্ন দিকে বিস্তার লাভ করল। 'দাই' নামে প্রচারকের দল বা গুপ্ত প্রতিনিধিরা বণিকের ছদ্মবেশে বা হজযাত্রীর পোশাকে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে প্রচারকার্য চালাতে লাগল। তাদের আন্দোলন ছিল গোপন, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অনুসন্ধানকারী ব্যতীত অপর কারও নিকট তারা কোনো কিছু প্রকাশ করত না। এতদসত্ত্বেও অনেক কিছুই প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং অনেকেই উমাইয়া কর্মচারীদের হস্তে নৃশংসভাবে মৃত্যুবরণ করল। এই সমস্ত এজেন্ট বা প্রতিনিধির কাজ ৭০ জন কর্মকর্তা নিয়ে গঠিত 'সিনেট' (Senate) দেখাশুনা করত।

'নকীব' নামে বারোজন লোকের একটি কাউন্সিল বা পরিষদ দ্বারা সিনেট নিয়ন্ত্রিত হতো। এই বারোজন লোকবিশিষ্ট পরিষদের প্রধান কর্তা ছিলেন ইমাম মুহাম্মদ বিন আলী। আব্বাসীয় আন্দোলন উমাইয়া খলিফা হিশামের রাজত্বকালে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

আব্বাসীয় আন্দোলনের কারণ (Causes of Abbasid Propaganda)

মহানবি (স) নিকটতম আত্মীয়: উমাইয়া ও আব্বাসীয় উভয় গোত্র কুরাইশ বংশসম্ভূত হলেও উমাইয়াদের চেয়ে আব্বাসীয়রা হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর আত্মীয়তার দিক দিয়ে নিকটবর্তী ছিলেন। হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর আপন চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের নামেই এ বংশের নামকরণ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে, উমাইয়াগণ ছিলেন আব্দুশ শামসের বংশধর। এতে প্রতিপন্ন হয় যে, আব্ব্যীয়গণ মহানবি (স.)-এর অধিকতর নিকটবর্তী ছিলেন।

মোহাম্মদ বিন আলী নিজ দাবির সপক্ষে এসকল যুক্তি দিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালান। এতে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলমানের ব্যাপক সমর্থন তার পক্ষে চলে আসে। তাছাড়া ইতোমধ্যে প্রমাণিত মুয়াবিয়ার অগণতান্ত্রিক আচরণ, ইয়াজিদের অযোগ্যতা, কারবালার মর্মান্তিক হত্যাকান্ড সাধারণ মুসলমানের মনে গভীর ক্ষোভের সঞ্চার করে। এভাবেই ধীরে অথচ নিশ্চিত গতিতে আব্বাসীয় আন্দোলন অগ্রসর হতে থাকে।

উমাইয়াদের নির্যাতনমূলক শাসন: হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত উমাইয়া খিলাফত অধিকাংশ সময়ই স্বৈরনীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হত। মহানবি (স.) ও আলী (রা.) এর বংশীয় হাশেমীদের বিরুদ্ধে হত্যাকান্ড ও নিধণ যজ্ঞ চালান। কারবালার প্রান্তরে নবি (স.) দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) সহ তার পরিবার ও সঙ্গীসাথীদের উপর লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এই নিরাপরাধ সাহাবি, তাবেয়ী ও সালাফিদের বিনা অপরাধে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।

উমাইয়া বিরোধী আন্দোলন: উমাইয়া শাসকদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কুট-কৌশল ও যুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনমত ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। সম্রাজ্যব্যাপী ঘন ঘন অসন্তোষ ও বিদ্রোহ দেখা দিতে থাকে। এই ধুমায়িত অসন্তোষ বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্ফোরিত হয়। বেগবান হতে থাকে উমাইয়া বিরোধী আন্দোলন। বিশেষত দ্বিতীয় মারওয়ানের সময় স্কুলন্ত আগ্নেয়গিরির লেলিহানশিখা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আব্বাসী নেতৃবৃন্দ মুসলমানদেরকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন যে, তারা মহানবি (স.) এর আপন বংশের লোক, তাঁরা কোরান-সুন্নাহ অনুযায়ী রাসুলের (স.) পদাঙ্ক অনুসরণ করে দেশ পরিচালনা করবেন, তাদের হাতে আল্লাহর বিধি-বিধান কায়েম হবে। আব্বাসী নেতা আবুল আব্বাস আস্ সাফফাহ বণী উমাইয়াদের অত্যাচার ও অবিচারের বিষয় উল্লেখ করে বলেছিলেন, "আমি আশা করি, যে খান্দান থেকে তোমরা কল্যাণ লাভ করেছ, সে খান্দান হতে তোমাদের ওপর কোন জুলুম নির্যাতন চালানো হবে না। যে খান্দান হতে তোমরা সংশোধনের পথ লাভ করেছ, সে খান্দান তোমাদের উপর কোন ধ্বংস বা বিপর্যয় ডেকে আনবে না।" উল্লেখিত কারণে আব্বাসীয় আন্দোলন ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। উমাইয়াদের বিরুদ্ধে পুঞ্জিভূত ক্ষোভ নিয়ে দলে দলে লোক আব্বাসীয়দের পক্ষ অবলম্বন করে। এভাবে আব্বাসী খেলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চূড়ান্ত পরিনতির দিকে অগ্রসর হয়।

ইব্রাহীমের নেতৃত্ব: মুহাম্মদ-বিন-আলী তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ হবার পূর্বেই মারা যান (হিজরি ১২৫/৭৪৪ খ্রি.)। মৃত্যুর পূর্বে ইব্রাহীম, আবুল আব্বাস (আস-সাফফাহ) ও আবু জাফর (আল-মনসুর) নামে তাঁর তিন পুত্রকে পর্যায়ক্রমে ইসলামের ইমাম (উত্তরাধিকারী) মনোনীত করে যান। এ সময় তিনি তার পুত্র ইব্রাহীমের দেখাশুনার দায়িত্ব আবু মুসলিম নামে একজন লোকের ওপর ন্যস্ত করেন। আবু মুসলিমের বংশ সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তিনি ইস্পাহানের অধিবাসী ছিলেন। মুহাম্মদ-বিন-আলী তাঁকে হজ করার সময় মক্কা হতে ক্রয় করেছিলেন। তাঁর উৎপত্তি যাই হোক না কেন, আবু মুসলিম একজন বিখ্যাত লোক ছিলেন। উমাইয়া বংশের পতনের জন্য তাঁর দান সবচেয়ে বেশি। স্বীয় বুদ্ধি ও ক্ষমতার দ্বারা তিনি খলিফার অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ও বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। যায়েদের বিদ্রোহের পর ইব্রাহীম তাঁকে খোরাসানে আব্বাসীয় সমর্থক সংগ্রহ ও সংগঠনের জন্য প্রেরণ করেন।

আবু মুসলিমের নেতৃত্ব: আবু মুসলিমের নেতৃত্বে আব্বাসীয় আন্দোলন দিন দিন জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। খলিফা হিশামের মৃত্যু এবং রাজ্যের বিশৃঙ্খল অবস্থা তাঁর কাজ সহজ করেছিল। তাঁর প্রাণস্পর্শী বক্তৃতা অনেককেই আকৃষ্ট করল। খারেজি, মাওয়ালি প্রভৃতি দলের লোক তাদের সকল পার্থক্য ভুলে গিয়ে দলে দলে তাঁর পতাকাতলে এসে সমবেত হলো। এরূপে খোরাসান আব্বাসীয় আন্দোলনের কেন্দ্রে পরিণত হলো।

এদিকে খোরাসানের উমাইয়া শাসনকর্তা নাসর-বিন-সাইয়ার যখন কিরমানের খারেজি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন আবু মুসলিম আব্বাসীয়গণের পক্ষে কালো পতাকা উত্তোলন করে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন এবং খোরাসানের রাজধানী মার্ত অধিকার করে নিলেন। এই সময়ে নাসর সাহায্যের জন্য খলিফার নিকট আকুল আবেদন জানালেন। কিন্তু খলিফা অন্যত্র বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত থাকায় তাঁর আবেদনে সময়মতো সাড়া দিতে পারলেন না। তবে এই সময়ে ইব্রাহীম কর্তৃক আবু মুসলিমের নিকট এক যড়যন্ত্রমূলক পত্র হস্তগত হওয়াতে খলিফা মারওয়ান ইব্রাহীমকে বন্দী করার আদেশ দিলেন। ইব্রাহীমকে বন্দী করে হাররানে আনা হলো এবং পরে তাঁকে হত্যা করা হয়। বন্দী হবার পূর্বে ইব্রাহীম তাঁর ভ্রাতা আবুল আব্বাসকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। ইব্রাহীম কন্দী হলে আবুল আব্বাস ও আবু জাফর তাঁদের পরিবারবর্গসহ কুফা নগরে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করে রইলেন।

আবু মুসলিম পূর্বদিকে সাফল্যের সঙ্গে প্রচারকার্য চালিয়ে যেতে লাগলেন। খলিফার নিকট হতে কোনো সাহায্যের সম্ভাবনা নেই দেখে নাসর নিশাপুরে পলায়ন করলেন। কিন্তু আবু মুসলিমের সেনাপতি কাহতাবার সঙ্গে এক সংঘর্ষে তিনি পরাজিত হলেন। ৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে তিনি হামাদানের নিকট পলাতক হিসেবে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে খোরাসানের উমাইয়া শাসন শেষ হলো এবং আবু মুসলিম সমগ্র খোরাসানের উমাইয়া শাসনকর্তা হয়ে বসলেন। এরপর আবু মুসলিমের সেনাপতি কাহতাবা এবং খালিদ-বিন-বার্মাক ইরাকের দিকে অগ্রসর হলেন। ইউফ্রেতিস নদী পার হবার পর ইরাকের শাসনকর্তা ইয়াযিদ-বিন-হুবাইয়ার সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাঁধল। উভয়পক্ষের এক তুমুল যুদ্ধে কাহতাবা সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। হাসান-বিন-কাহতাবা ইরাকের শাসনকর্তাকে পরাজিত করে কুফা অধিকার করলেন। হাসান কর্তৃক কুফা অধিকৃত হলে আবুল আব্বাস তাঁর পরিবারবর্গ ও আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে পলাতক অবস্থা হতে আত্মপ্রকাশ করলেন। অতঃপর কুফার মসজিদে আবু মুসলিম ও তাঁর অনুগামীরা মিলিত হয়ে আবুল আব্বাসকে খলিফা বলে ঘোষণা করলেন ৩০শে অক্টোবর, ৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দে।

এদিকে আবু আয়ান নামে আবু মুসলিমের আর একজন সেনাপতি মারওয়ানের পুত্র আব্দুল্লাহকে পরাজিত করে মেসোপটেমিয়া অধিকার করলেন। মারওয়ান পুত্রের পরাজয়ের কথা শুনে ১,২০,০০০ সৈনাসহ টাইগ্রিস নদী পার হয়ে যাবের নামক স্থানের দিকে অগ্রসর হলেন; কিন্তু যাবের যুদ্ধে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করলেন (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ)।
৭৫০ খ্রিষ্টাব্দের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মারওয়ান মিশরের দিকে পলায়ন করছিলেন, এমন সময় তিনি আব্বাসীয় সৈন্যগণ কর্তৃক ধৃত ও নিহত হলেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে উমাইয়া বংশের শাসনকালের অবসান ঘটল এবং আব্বাসীয় বংশের রাজত্বের সূচনা হলো।

যাব-এর যুদ্ধ এবং আব্বাসীয়দের সাফল্য আব্বাসীয় আন্দোলন বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করে যখন সফলতার দিকে অগ্রসর ঠিক তখন আব্বাসীয় আন্দোলন প্রতিহত এবং খিলাফতকে বিপর্যয়ের হাত হতে রক্ষার জন্য দ্বিতীয়বার মারওয়ান প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। মারওয়ান তাঁর ১,২০,০০০ সৈন্য নিয়ে টাইগ্রিস অতিক্রম করে বড় যাব নদীর দিকে অগ্রসর হয়। আবু আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে আব্বাসীয়গণ অগ্রসর হলে যাব নদীর তীরে ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে উভয়ের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মারওয়ান শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।

উমাইয়া বংশের ধ্বংসস্তূপের ওপর ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে যাব এর যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে আব্বাসীয় বংশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তাদের প্রতিষ্ঠার পিছনে আব্বাসীয় আন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আব্বাসীয় আন্দোলনে ইব্রাহীম, আবু মুসলিম, আবু আবদুল্লাহ এবং আবুল আব্বাস প্রমুখ ব্যক্তিগণের সক্রিয় নেতৃত্বে বিভিন্ন গোষ্ঠী, সম্প্রদায় দলমত ভুলে গিয়ে অংশগ্রহণ করে। ফলে দীর্ঘ নব্বই বছরের স্থায়ী (৬৬১-৭৫০) উমাইয়া শাসনের পতন ঘটে এবং আবুল আব্বাস আব্বাসীয় বংশের প্রথম শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
আব্বাসীয় শাসনের বৈশিষ্ট্য

আব্বাসীয় আন্দোলনের মাধ্যমে উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর আব্বাসীয়দের ক্ষমতা লাভ ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এ ঘটনাকে কেবল বংশগত শাসনের পালা বদল বলা যায় না। এটি ছিল শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনকারী মহান ঘটনা। সেমেটিক ঐতিহাসিক পি.কে. হিট্টি বলেন, "The Abbasid Government called itself 'dawlah' new era, and a new era it was", অর্থাৎ "আব্বাসীয় সরকার নিজেই এটাকে দৌল্লাহ বা নতুন যুগ বলতেন এবং এটি নতুন যুগই ছিল"। খুলাফায়ে রাশেদিন ছিল ইসলামি ধর্মতন্ত্র, উমাইয়া খিলাফত ছিল আরবদের গোত্র ও জাতিগত রাজতন্ত্র। আর আব্বাসীয় খিলাফতের বৈশিষ্ট্য ইসলামি সাম্রাজ্য ও মুসলিম রাজতন্ত্র। আব্বাসীয় খলিফারা ছিলেন স্বঘোষিত ইসলামের রক্ষাকর্তা।

ইসলামি রাজতন্ত্র: আব্বাসীয় বংশের প্রথম খলিফা আবুল আব্বাস আস সাফফাহ কুফার মসজিদে প্রথম খুতবায় ঘোষণা করেন যে, আল্লাহর কেতাব ও রাসূলের সুন্নাহ মোতাবেক তিনি নিজেকে ইমাম অর্থাৎ ধর্মীয় প্রধান হিসেবে উল্লেখ করতে গর্ববোধ করেন। তারা মুসলিম ধর্মবিদ ওলামাদের সহিত সকল রাজনৈতিক ব্যাপারে আলোচনা করতেন। রাজকার্য ও বিচার ব্যবস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদেরকে নিযুক্ত করতেন। এ ব্যাপারে উমাইয়া খলিফারা ধর্মকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্ব প্রদান করতেন। কিন্তু আব্বাসীয়রা ধর্মীয় প্রকৃতি ও কার্যাবলির উপর অধিক জোর দিতেন। খিলাফতের ধর্মীয় প্রকৃতির উপর গুরুত্ব আরোপ করে তারা আরব, পারসিক, তুর্কি ও অন্যান্য মুসলমান প্রজাদের নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও সমর্থন লাভের চেষ্টা করতেন। তাদের শাসনব্যবস্থা ছিল সকল শ্রেণির মুসলমানদের জন্য; গোত্র ও জাতিগত কোনো পার্থক্য ছিল না। এভাবে আব্বাসীয় শাসন একটি আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে তুলে ধরেছিল। অথচ উমাইয়া যুগে এ ধারণা কেবল আরবদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আব্বাসীয় সাম্রাজ্য তখন প্রকৃত অর্থে জাতি, গোত্র নির্বিশেষে সর্বজনীন ইসলামি সাম্রাজ্যে পরিণত হলো। এ প্রসঙ্গে হিটি যথার্থই মন্তব্য করেন, "The Umayyad empire was Arab, the Abbasid was more international."

রাজনৈতিক পরিবেশ: আব্বাসীয় খিলাফতের রাজনৈতিক পরিবেশ উমাইয়া খিলাফত হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। প্রথমে আব্বাসীয়রা উমাইয়াদের মতো সমগ্র সাম্রাজ্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে নি। সিন্ধু, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেন ব্যতীত সমগ্র আরব * সাম্রাজ্যের উপর আব্বাসীয়দের আধিপত্য বিস্তৃত হয়েছিল। কিছু এলাকা হাতছাড়া হওয়ায় রাজনৈতিক পরিবেশের উপর এর প্রভাব পড়ে। পশ্চিম অঞ্চল হতে বিতাড়িত হয়ে আব্বাসীয় শাসন পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার ইরাক হতে খোরাসান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর ফলশ্রুতি হিসেবে আব্বাসীয় খলিফাগণ আরবীয়, অপেক্ষা অধিকতর পারসিক ভাবাপন্ন হয়ে পড়েছিল। আব্বাসীয় শাসনকার্যের কেন্দ্রস্থল হিসেবে ইরাক এক বিশিষ্ট স্থান দখল করে। উমাইয়া আমলে সিরিয়া যে স্থান দখল করেছিল, আব্বাসীয় আমলে ইরাক সেই গৌরবময় স্থান দখল করে। ফলে শাসনকার্যে আরবীয় প্রভাব ক্ষুণ্ণ হয়ে পারসিক প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে।
জাতীয় চেতনার অভাব ও মানসিক শক্তি হ্রাস: আব্বাসীয় যুগে আরব জাতি তাদের সামরিক শক্তি ও জাতীয় চেতনা হারিয়ে ফেলে। উমাইয়া যুগে আরবদের জন্য বিস্তৃত ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল ধর্মীয় চেতনা ও সামরিক বাহিনীর নৈপুণ্য।

আব্বাসীয় যুগে সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি পরিত্যক্ত হওয়ায় আরব জাতির শৌর্যবীর্য হ্রাস পায় এবং সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ খলিফারা বিলাসিতা ও গর্বভরে আমোদ-প্রমোদে মগ্ন হয়ে পড়ে, ফলে সামরিক গুণাবলি বিনষ্ট হয়ে যায়। ধীরে ধীরে উমাইয়াদের গড়ে তোলা সেনাবাহিনী লুপ্ত হতে থাকে। সেনাবাহিনী ধ্বংস হওয়ার পিছনে আরও একটি কারণ হলো জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিকে আব্বাসীয় খলিফাদের ঝুঁকে পড়া।

রাজধানী পরিবর্তন: আব্বাসীয়দের ক্ষমতালাভের পিছনে পারসিকদের অবদান ছিল বেশি। ইরাক ছিল আব্বাসীয় প্রচারণার কেন্দ্রভূমি। আব্বাসীয়রা ক্ষমতা লাভের পর সিরিয়ার দামেস্ক হতে ইরাকের বাগদাদে সাম্রাজ্যের রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। ফলে রাজকার্যে সিরীয়দের তুলনায় ইরানিদের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। সাম্রাজ্যে সিরীয়দের প্রভাব ও প্রতিপত্তি হ্রাস পেতে থাকলে জাতীয় উন্নতির ধারা পশ্চিমদিকের পরিবর্তে পূর্বদিকে প্রবাহিত হতে থাকে।

পারসিক প্রভাব: আব্বাসীয় রাজদরবারে পারসিকদের (ইরানিদের) প্রভাব বিশেষভাবে অনুভূত হয়। পারসিকগণ রাজদরবারে বড় বড় পদ অধিকার করতে থাকে। তাদের রীতিনীতি, চাল-চলন ও আচার-ব্যবহার আব্বাসীয়দের গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ফলে ক্রমে ক্রমে পারসিক উপাধি, পারসিক শরাব, পারসিক পত্নী, উপপত্নী, পারসিক সংগীত ও ভাবধারা আরবদের জাতীয়-জীবনে প্রাধান্য বিস্তার করে। এমনকি খলিফারাও পোশাক-পরিচ্ছদ, রীতিনীতি, কায়দা-কানুন অনুকরণ করতে থাকেন। বাস্তবিকপক্ষে পারসিকরা আব্বাসীয়দের আমলে তাদের লুপ্ত গৌরব ফিরে পায়। অন্যদিকে, আরবরা তাদের অতীত গৌরব হারায়। আরব জাতীয়তাবাদের পতন ঘটল কিন্তু ইসলামি প্রভাব অক্ষুণ্ণ রইল। ঐতিহাসিক ওয়েল হাউসেন বলেন, "আন্তর্জাতিক ইসলামের বাহ্যিক আবরণে ইরানিবাদ আরবদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে।"

এভাবে আরবগণ ক্রমাগত পশ্চাতে অর্থাৎ আদিম মরুজীবনে প্রত্যাবর্তন করছিল এবং পারসিক ও পরে তুর্কিদের আধিপত্য আব্বাসীয় খিলাফতের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পারসিক প্রভাবের ফলে আরবদের জীবনের দুর্বলতা দূরীভূত হয় এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান অনুশীলনের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব জাগরণ আসে।

অনারবীয় পদ্ধতি চালু: আব্বাসীয়রা ক্ষমতায় এসে শাসনব্যবস্থায় অনারবীয় পদ্ধতি চালু করেন। এ সময় গোত্রীয় ভিত্তি ও গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য দুই-ই শাসন কাঠামো হতে অন্তর্হিত হয়। অথচ উমাইয়া আমলে এ সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল না। অন্যদিকে এটি পুরাতন শাসানীয় স্বৈরশাসনে পরিণত হয়। আব্বাসীয় খলিফারা ছিলেন নিরঙ্কুশ এবং পার্থিব ক্ষমতায় বিশ্বাসী। তারা জনসমর্থনের উপর নির্ভর করত না। গণতন্ত্রমনা খলিফাদের স্থান দখল করেছিল স্বৈরাচারী খলিফাগণ। যারা ছিলেন জনগণ হতে বিচ্ছিন্ন এবং পরিষদ ও সেনাবাহিনী দ্বারা পরিবেষ্টিত। খুলাফায়ে রাশেদিনের আমলে খলিফাগণ যেখানে জনগণের সঙ্গে মিশতেন এবং সমতার ভিত্তিতে শাসন করতেন, উমাইয়া খলিফারা তাদের প্রজাদের সাথে ভালো ব্যবহার অনুকরণ করার চেষ্টা করতেন- সেখানে আব্বাসীয়রা ছিলেন জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কম তবে তাঁরা জনকল্যাণকর কাজ করতেন। শাসকগণ রাজকর্মচারী, সেনাবাহিনী ও রাজদরবারের অন্যান্য তোষামোদকারীদের দ্বারা বেষ্টিত। ফলে শাসক ও শাসিতের মধ্যে বিরাট ব্যবধান সৃষ্টি হয়। আব্বাসীয় আমলে শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতিতে জনগণের কোনো ভূমিকা ছিল না। ওয়েল হাউসেন বলেন, "রাষ্ট্র বলতে রাজদরবারকেই বুঝাত।"

নতুন পদের সৃষ্টি: আব্বাসীয় শাসনব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো নতুন পদের সৃষ্টি। পূর্ববর্তী খলিফাগণ শাসনকার্য পরিচালনার জন্য উপদেষ্টা নিয়োগ করতেন। আব্বাসীয় খলিফাগণ রাজকার্যে প্রাচীন আরব আভিজাত্যের অবসান ঘটিয়ে উপদেষ্টার পরিবর্তে পারসিক অনুকরণে উজির পদ সৃষ্টি করেন। ইরানি প্রভাবে জল্লাদ, রাজজ্যোতিষী ও পোস্টমাস্টার পদও আব্বাসীয় আমলে সৃষ্টি হয়।

উমাইয়াদের সাথে আব্বাসীয়দের পার্থক্য ওয়েল হাউসেন বলেন, "আরব শাসনামলে জল্লাদের কথা অজ্ঞাত ছিল, উমাইয়া যুগেও জল্লাদের কোনো পদ ছিল না, কিন্তু আব্বাসীয় শাসনব্যবস্থায় জল্লাদ অপরিহার্য ছিল।

উমাইয়াদের তুলনায় আব্বাসীয়দের দুটি বিষয়ে অগ্রগতি লক্ষ করা যায়। উমাইয়াদের তুলনায় আব্বাসীয় শাসকরা দক্ষ ছিলেন। তারা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও ন্যায়বিচারের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করতেন। ন্যায়বিচার করার জন্য উদগ্রীব থাকতেন এবং তাদের নিকট অন্যায় প্রতিকারের আবেদন করলে তারা তার প্রতিবিধান করতেন।

'উমাইয়া যুগ ছিল রাজ্য বিস্তারের আর আব্বাসীয় যুগ ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের উমাইয়া যুগ ছিল রাজ্য বিস্তারের যুগ, আর আব্বাসীয় যুগ ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগ। এ সম্পর্কে জনৈক ফরাসি ঐতিহাসিক বলেন, "জয়ের যুগ চলে গিয়ে সভ্যতার যুগ আরম্ভ হলো।" আব্বাসীয় আমলে মুসলিম শিক্ষা-সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছিল। আব্বাসীয় খলিফারা সবাই জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তন্মধ্যে হারুন-অর-রশিদ ও মামুনের নাম উল্লেখযোগ্য। তাদের প্রচেষ্টায় মার্ভে জ্ঞানগৃহ নির্মাণের মধ্য দিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে আব্বাসীয় আমল চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। তাই আব্বাসীয় যুগকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণ যুগ বলা হয়।...

আব্বাসীয় যুগ ছিল একনায়কত্বের ভিত্তিতে সুষ্ঠু ও সুন্দর শাসনব্যবস্থা। শাসকরা ছিলেন জনহিতকর। প্রজা মঙ্গলের জন্য তারা সচেষ্ট ছিলেন। আব্বাসীয় শাসকরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য সুখী ও সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।

আব্বাসীয় খলিফাদের তালিকা (৭৫০-১২৫৮ খ্রি.)

পূর্ববর্তী

আব্বাসি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন

আব্বাসীয় আন্দোলনআবুল আব্বাস আস-সাফফাহ (৭৫০-৭৫৪ খ্রি.) খলিফা আবু জাফর আল মনসুর (৭৫৪-৭৭৫ খ্রি.)খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রি.)বার্মাকি বংশখলিফা আল-আমিন (৮০৯-৮১৩ খ্রি.)খলিফা আল-মামুন (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.)আব্বাসীয় খিলাফতের শেষার্ধ খলিফা আল-মুতাসিম (৮৩৩-৮৪২ খ্রি.)বুয়াইয়া বংশ (৯৪৪-১০৫৫ খ্রি.)সেলজুক বংশ (১০৫৫-১১৯৪ খ্রি.)মালিক শাহ সেলজুক (১০৭৩-১০৯২ খ্রি.)ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ (১০৯৫-১২৫৮ খ্রি.)গাজী সালাউদ্দিন আইয়ুবিবাগদাদ ধ্বংস (১২৫৮ খ্রি.)আব্বাসীয় খিলাফতের ক্রমাবনতি ও পতনআব্বাসীয় আমলের আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্যআব্বাসীয় আমলে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চাআব্বাসিদের রাজধানী কোথায় ছিল?বার্মাকি বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে?খায়জুরান কে ছিলেন?বাগদাদ নগরীর প্রতিষ্ঠাতা কে?ক্রুসেড (Crusade) শব্দের অর্থ কী?বুরান কে ছিলেন?আব্বাসি বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কে?'আল-মনসুর' শব্দের অর্থ কী?বায়তুল হিকমা কে প্রতিষ্ঠা করেন?কোন যুদ্ধের মাধ্যমে আব্বাসি রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়?আব্বাসিরা কার বংশধর?কোন সালে জাবের যুদ্ধ সংঘটিত হয়?আবুল আব্বাস কী উপাধি গ্রহণ করেন?'আস-সাফফাহ' শব্দের অর্থ কী?আব্বাসি বংশের প্রথম শাসক কে ছিলেন?সেনাপতি আবু মুসলিমকে কে হত্যা করেন?বায়তুল হিকমাহ (জ্ঞানগৃহ) কত খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করা হয়?'Arabian Joan of Ark' নামে পরিচিতি লাভ করেন কে?ক্রুসেড কী?ক্রুসেড (Crusade) শব্দটি কোন শব্দ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে?আব্বাসি কারা? পরিচয় দাও।নহর-ই জুবাইদা কী? বুঝিয়ে লেখ।বায়তুল হিকমা বলতে কী বোঝায়?আবু মুসলিম খোরাসানি সম্পর্কে যা জান লেখ।কাকে এবং কেন আস-সাফফাহ বলা হয়?খলিফা মনসুর কর্তৃক আলী বংশীয়দের প্রতি দুর্ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা কর।আব্বাসি আন্দোলন বলতে কী বোঝায়?আবু জাফর আল মনসুরকে আব্বাসি বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় কেন?খলিফা আল মামুনের রাজত্বকালকে ইসলামের অগাস্টাস যুগ বলা হয় কেন?ক্রুসেড বলতে কী বোঝায়?

সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ