- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- আব্বাসি খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
আব্বাসীয় আমলের আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্য
আব্বাসীয় খিলাফত মুসলিম শাসন ব্যবস্থার স্বর্ণযুগ। আব্বাসীয় খলিফাগণ উমাইয়াদের রাজ্যবিস্তার নীতি বর্জন করে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা ও সংস্কৃতির চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। ফলে আব্বাসীয় যুগে (৭৫০-১২৫৮ খ্রি.) জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব সাফল্য লাভের ফলে আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে।
আব্বাসীয় আমলের আর্থ-সামাজিক অবস্থা
আব্বাসীয় খলিফাগণ সাম্রাজ্যের মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়নের ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয় এবং সমাজ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নতি হয়। গোত্রপ্রথা প্রাচীন আরব সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। বৈদেশিক প্রভাবের ফলে আব্বাসীয় আমলে সমাজ ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। পারসিক ও তুর্কিদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনের ফলে আব্বাসীয়দের সঙ্গে অনারবদের রক্তের সংমিশ্রণ ঘটে। বহু পারসিক পত্নী যেমন- খায়জুরান বিবি, উলাইয়া ও জুবায়দাকে বিবাহ করে আরব আভিজাত্য লোপ পায়। পারসিক প্রভাবের ফলে সমাজে নারীর প্রভাব বৃদ্ধি পায়। আরব সমাজে বিবাহ, বহু বিবাহ, উপপত্নী রাখা এবং দাস প্রথার ফলে সমাজের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। আব্বাসীয় আমলে ইসলামের বিধান অনুযায়ী নারীরা- স্বামীর সেবা, সন্তান পালন, 'ঘরের কাজকর্ম করার নীতি থেকে দূরে এসে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকে। ফলে নারীসমাজের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। যার সন্ধান পাওয়া যায় আরব্য উপন্যাস হতে।
আব্বাসীয় সমাজের গঠন-প্রকৃতিতে খলিফা ছিলেন সর্বোচ্চ স্তরে, তাঁর পরিবারবর্গ, রাজকর্মচারী, কৃষক, অন্যান্য পেশাজীবী মানুষ এবং সর্বনিম্নে ছিল দাস-দাসীরা। ভৃত্যগণ সাধারণত অমুসলিম এবং যুদ্ধ বন্দীদের মধ্য হতে সংগৃহীত হতো। এদের মধ্যে নিগ্রো, তুর্কি এবং শ্বেতবর্ণের ভৃত্য ছিল। শ্বেতবর্ণের ভৃত্যদের মধ্যে গ্রিক, স্লাভ, আর্মেনীয় এবং বার্বারই প্রধান।
খোজা ভূত্যগণ রাজদরবার ও হেরেমের পরিচর্যায় থাকত। দাসীদের অনেকেই গায়িকা ও উপপত্নী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অনেক দৗসী এভাবে খলিফার উপর প্রভাব বিস্তার করত। দাস-দাসীদের মধ্যে অনেকে উচ্চ শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা ছিল। খলিফা মুকতাদীরের প্রাসাদে ১১,০০০ খোজা ও দাসী ছিল। নবম-দশম শতাব্দীর জনৈক লেখক "কিতাব-উল মুওয়াশসা" গ্রন্থে একজন সাংস্কৃতিক ভদ্রলোকের বর্ণনা করেছেন। তার মতে, নম্র ব্যবহার, পৌরুষ, শিষ্টাচার, সৎসঙ্গ, কৌতুক না করা, গোপন কথা গোপন রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মিতভাষী, কম খাওয়া, আস্তে খাওয়া, গোসলখানায় গোসল করা ইত্যাদি।
মদ্যপান: মদ্যপান সমাজের প্রায় সর্বস্তরে প্রচলিত ছিল। মদ্যপান ইসলামে নিষিদ্ধ হলেও সমাজ কঠোর অনুশাসনের মধ্যে মদ্যপান একেবারেই বন্ধ করা যায় নি। মদের প্রশংসায় বিভিন্ন কবিতা এবং 'কিতাবুল আঘানীতে' ও 'আরব্য উপন্যাসে' মদ্যপান ও মদ্যপানে মাতলামির বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। অনেকে ধর্মীয় অনুশাসন পালন করেও মধ্যপানের উপাদান আঙ্গুরের রস ও বাদাম হতে উৎপন্ন 'নাবিস' নামক মদ্যপান করত। ইবনে খালদুন বলেন, খলিফা হারুন ও মামুন এ নাবিস পান করত। সাময়িক আনন্দমেলা এবং গানের আসরে মদ প্রচলন ছিল। মূলত এ মেলাকে মাতাল মেলা বলা হতো। মেলার গায়িকা বা মদ ও গানের মাধ্যমে মুরদের নৈতিক পদস্খলন ঘটে যা সে যুগের সাহিত্যে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ সত্ত্বেও আরব দেশে সাধারণত গোসলখানা ছিল না, আব্বাসীয় যুগে গোসলখানা শুধু গোসলের প্রয়োজনে তৈরি হয়নি। আমোদ-প্রমোদের ও বিলাসিতার জন্য বাগদাদ নগরীতে অসংখ্য স্নানাগার নির্মাণ করেন। এসকল স্নানাগারে গরম ও শীতল উভয় প্রকার পানিই সরবরাহ করা হতো।
অর্থনৈতিক অবস্থা
আব্বাসীয় আমলের অর্থনৈতিক চিত্র নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
সমাজে শ্রেণিবিভাগের ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি হয়। অর্থনৈতিক দিক থেকে সমাজ দুভাগে বিভক্ত ছিল। অভিজাত শ্রেণিতে ছিল খলিফা, আমির-ওমরাহ, কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, বণিক ও চাকরিজীবী এবং নিম্ন শ্রেণিতে কৃষক, রাখাল ও গ্রামাঞ্চলের অন্যান্য পেশার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়- বাণিজ্যের উন্নতি ঘটে। প্রথমদিকে ব্যবসায়-বাণিজ্যের উন্নতি ইহুদি-খ্রিষ্টানগণের হাতে থাকলেও পরবর্তীতে মুসলমানগণ তাদের অতিক্রম করে। খলিফা আল-মনসুরের আমলে মুসলিম বণিকগণ বাণিজ্যক্ষেত্র পূর্বদিকে চীন পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেছিল। সমুদ্রপথে তাদের বাণিজ্যের প্রধান দ্রব্য ছিল রেশম। এ রেশমই পাশ্চাত্যে প্রাচীন চীনের সর্বশ্রেষ্ঠ দান।
পশ্চিম দিকে মুসলমানগণ মরক্কো ও স্পেন পর্যন্ত তাদের বাণিজ্য সম্প্রসারণ করেছিল। মুসলিম বণিকগণ খেজুর, চিনি, তুলা, পশম ও ইস্পাতের যন্ত্রপাতি প্রভৃতি বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করত। বিভিন্ন ধরনের মসলা, কপূর, রেশম প্রভৃতি দ্রব্যাদি আমদানি করত। বিভিন্ন ধরনের কাঠ ও নিগ্রো দাস আফ্রিকা হতে আমদানি করা হতো।
শিল্প: অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আনয়নে কৃষির উন্নয়নের জন্য শিল্পের উন্নয়ন প্রয়োজন ছিল। আব্বাসীয় আমলে হস্তশিল্প সমগ্র সাম্রাজ্যে প্রসার লাভ করে। পশ্চিম এশিয়ার হস্তশিল্পীরা কম্বল, রঙিন পর্দা, রেশম, তুলা ও পশমের কাপড় এবং আসবাবপত্র ও রন্ধন কার্যের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি তৈরি করত। খলিফা আল মুসতায়ীন ব্যক্তিগত আদেশে ১৩,০০,০০,০০০ দিরহাম ব্যয়ে বিভিন্ন পক্ষীর চিত্র সংবলিত একখানা কম্বল তৈরি করিয়ে ছিলেন।
বয়ন শিল্প। কুফায় বয়ন ও রেশম শিল্প গড়ে ওঠে। তা 'কুফিয়া' শিল্প নামে প্রচলিত ছিল। ফারস প্রদেশে আহওয়াজ এবং অন্যান্য প্রদেশে রাজপরিবারের জন্য কার্পেট ও সূচিশিল্প গড়ে উঠেছিল। সিরাজের পশম শিল্প, বুখারার জায়নামাজ জগদ্বিখ্যাত ছিল।
কাচ ও মোজাইক শিল্প: প্রাচীন ফিনিসীয়দের অনুকরণে স্থাপিত সিরিয়ার সিডন এবং টায়ার শহরে কাচ শিল্প পৃথিবীর প্রাচীনতম কাচ শিল্পগুলোর অন্যতম। দামেস্ক ছিল মোজাইক শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। বিভিন্ন ফলমূল ও লতাপাতার চিত্র সংবলিত বিভিন্ন রঙের মোজাইক শিল্প বিখ্যাত ছিল।
কাগজ ও অলংকার শিল্প: অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগে চীনের অনুকরণে সমরখন্দে কাগজ তৈরি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
বাগদাদ, মরক্কো, মিশর, স্পেনসহ সমগ্র মুসলিম সাম্রাজ্যে কাগজ তৈরি এবং এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। ৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে কাগজে লিখিত আরবি পাণ্ডুলিপি সিডনী বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। আব্বাসীয় আমলে অলংকার শিল্প ব্যাপক সমৃদ্ধি লাভ করে।
আব্বাসীয় আমলে আর্থ-সামাজিক অবস্থার বর্ণনা হতে প্রতীয়মান হয় আব্বাসীয় আমলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চরম উৎকর্ষতা লাভ করে ফলে সামাজিক উন্নয়ন ঘটে।
আব্বাসি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

