- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- আব্বাসি খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
বুয়াইয়া বংশ (৯৪৪-১০৫৫ খ্রি.)
আব্বাসীয় খিলাফতে বুয়াইয়াদের উত্থান মধ্যযুগীয় ইসলামের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। দশম শতাব্দীতে আব্বাসীয় সাম্রাজ্য যখন ধ্বংসপ্রায়, তখন বুয়াইয়াগণ ক্ষমতা লাভ করে ১৪৪ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১০৬৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘকাল রাজত্ব করে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যে শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। আব্বাসীয়দের দুর্বলতার সুযোগে তুর্কিরা যখন খুব শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, ঠিক সে সময় তুর্কিদের হাত হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য আব্বাসীয় খলিফা আল-মুসতাকফি বুয়াইয়াদের সাহায্য প্রার্থনা করেন। বুয়াইয়া বংশের প্রতিষ্ঠাতা আবু সুজা বুয়াইয়া নিজেকে পারস্যের কোনো রাজবংশধর মনে করেন। এই আবু সুজাই বুয়াইয়া বংশের প্রতিষ্ঠাতা।
বুয়াইয়াদের উত্থান, কার্যাবলি ও অবদান
আবু সুজা বুয়াইয়া: আব্বাসীয় খলিফা আল-মুসতাকফি বুয়াইয়াদের সাহায্য প্রার্থনা করেন। আব্বাসীয়দের আমন্ত্রণক্রমে আবু সুজা বুয়াইয়ার তিন পুত্র আহমদ, আলী ও হাসান দক্ষিণ দিকে অভিযান পরিচালনা করে সিরাজ, ইস্পাহান, কিরমান ও খুজিস্তানসহ প্রভৃতি শহর দখল করেন। অধিকৃত অঞ্চল সিরাজে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। আবু সুজা বুয়াইয়া অতঃপর ১৪৫ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদ অভিযান করলে তুর্কি প্রহরীরা পলায়ন করে। তৎকালীন দুর্বল ও বিলাসপ্রিয় আব্বাসীয় খলিফা মুসতাকফি ১৪৪-৪৬ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি বাহিনীর ঔদ্ধত্য এবং দৌরাত্র্যে অতিষ্ঠ হয়ে আহমদকে রাজধানীতে আহবান করেন।
মুইজ-উদ-দৌলা (১৪৫-১৯৬৭ খ্রি.): বুয়াইয়া বংশের প্রতিষ্ঠাতা আহমদ আব্বাসীয় খলিফা কর্তৃক প্রদত্ত মুইজ-উদ-দৌলাহ উপাধিতে ভূষিত হয়ে আমির-উল-উমরাহ পদে অধিষ্ঠিত হলেন। খলিফা তাঁর দ্বিতীয় ভ্রাতা আলীকে ইমাদ-উদ-দ্দৌলা এবং তৃতীয় ভ্রাতা হাসানকেও রুকন উদ্দৌলা উপাধি প্রদান করেন। খলিফা তুর্কিদের নাগপাশ হতে মুক্ত হলেন বটে; কিন্তু বুয়াইয়াদের প্রভাবাধীনে থেকে তাঁর ভাগ্যের পরিবর্তন হলো না- হলো শুধু হাত বদল।
সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী: শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত পারসিক বুয়াইয়াগণ আরব আব্বাসীয় সুন্নি সম্প্রদায়ের উপর কর্তৃত্ব এবং প্রভুত্ব বিস্তার করে। খলিফার দুর্বলতা ও অকর্মণ্যতার সুযোগে মুইজ-উদ-দৌলাহ রাজধানীতে অবস্থান করে সমস্ত ক্ষমতা কেবল গ্রাসই করলেন না বরং খলিফার সার্বভৌমত্বকে খর্ব করে তিনি সুলতান উপাধি গ্রহণ করেন। মুদ্রায় নিজ নাম অঙ্কিত করেন এবং খুতবায় তাঁর নাম উল্লেখ করতে বাধ্য করেন। ক্ষমতালোভী, হৃদয়হীন এবং বিশ্বাসঘাতক আহমদ স্বীয় প্রভুত্ব সম্প্রসারিত করার জন্য খলিফা মুসতাকফিকে ৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে অন্ধ করে মুকতাদির অপর পুত্রকে আল-মৃতি (৯৪৬-৭৪ খ্রি.) উপাধি দান করে সিংহাসনে উপবেশন করলেন। এভাবে তিনি সুন্নিদের সমস্ত ক্ষমতা হস্তগত করে সুন্নিদের প্রাধান্য খর্ব করে শিয়া প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন।
মুইজ-উদ-দৌলাহর কৃতিত্ব শিয়া সম্প্রদায়ের সহানুভূতি লাভের আশায় মুইজ-উদ-দৌলাহ ১০ই মহররমকে শিয়াদের জাতীয় বাৎসরিক শোক দিবসে পরিণত করেন। হিডির মতে, "শিয়া সম্প্রদায়ের হাতে খিলাফতের হীন ও জঘন্য অধ্যায়ের সূচনা হলো এবং ক্ষমতালিপু বুয়াইয়াগণ শতবছরব্যাপী স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করে আব্বাসীয় খলিফাকে সাক্ষী গোপালে (Puppet) পরিণত করল।" আব্বাসীয় খলিফা ৫০০ দিনার বৃত্তি লাভ করে আমির-উল-উমরাহর আশ্রিত হয়ে রইলেন। মুইজ-উদ-দৌলার শাসনামলে বাগদাদ নগরীর হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করা হলো। সিরাজ, গজনী, কায়রো, কর্ডোভা প্রভৃতি নগরী মুসলিম শাসনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়।
বুয়াইয়াদের শাসননীতি: ৯৪৫ হতে ১০৫৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বুয়াইয়া আমিরগণ ক্ষমতার অধিকারী থেকে স্বৈরাচারী নীতি এবং বংশীয় স্বার্থে খেয়ালখুশিমতো আব্বাসীয় খলিফাদের অপসারণ ও নতুন পদে নির্বাচন করেন। বাগদাদে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করে তারা বিভিন্ন সুষমামন্ডিত রাজপ্রাসাদে বাস করেন। এ প্রাসাদগুলোর মধ্যে দার-আল-মামলাকা অথবা আবোদ অভ দ্যা কিংডম (Dar-Al-Mamlakah অথবা Abode of the Kingdom) ছিল অন্যতম। নিষ্ঠুর এবং বিশ্বাসঘাতক হলেও মুইজ বিদ্যানুরাগী ছিলেন। ঐতিহাসিক মাসুদী, দার্শনিক আবু নসর আল-ফারাবী, কবি মুতানাব্বী, কিতাবুল আগানী রচয়িতা আবুল ফারাজ, আবুল কাশিম আত-তানুখী, ভাষাতত্ত্ববিদ আদ-দীনাওয়ারী ও অন্যান্য বড় বড় দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, কবি ও আইনজ্ঞ খলিফা মৃতি বিল্লাহর সমসাময়িক ছিলেন।
ইজ্জুদৌলাহ (১৬৭ খ্রি.) মুইজ-উদ-দৌলার মৃত্যুর পর ৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর পুত্র বখতিয়ার ইজ্জুদৌলাহ উপাধি গ্রহণ করে "আমির উল-উমরাহ" পদে অধিষ্ঠিত হলেন। আব্বাসীয় খলিফা আল-মূতি (৯৪৬-৭৪ খ্রি.) প্রায় ত্রিশ বছর বুয়াইয়াদের কর্তৃত্বাধীনে থেকে রোগগ্রস্ত হয়ে তাঁর পুত্র আত-তাইকে (৯৭৪-৯৯১ খ্রি.) খিলাফত প্রদান করেন। ইজ্জুদৌলাহ্ আল-মৃতির খিলাফতকালে ইরাকে একদল তুর্কি কর্তৃক বিপদগ্রস্ত হলে তার পিতৃব্য পুত্র আজাদ-উদ-দৌলাহ্ সাহসিকতার সঙ্গে তাকে উদ্ধার করেন। পিতা বুকনুদ্দৌলাহর সনির্বন্ধ অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি ইজ্জুদৌলাহকে পদচ্যুত করে হত্যা করেন। ইজ্জুদৌলাহ একজন অপদার্থ শাসক ছিলেন।
আজাদ-উদ-দৌলাহ্ (৯৬৭-৯৮৩ খ্রি.) হিটি বলেন, আজাদ-উদ-দৌলাহর সময়ই বুয়াইয়া শক্তি সর্বোচ্চ শিখরে উপনীত হয়। তিনি ইস্পাহানে জন্মগ্রহণ করেন। স্বীয় অধ্যবসায়, কর্মদক্ষতা এবং বিচক্ষণতায় আজাদ-উদ-দৌলাহ্ কেবলমাত্র শ্রেষ্ঠ বুয়াইয়া আমিরই ছিলেন না সে সময়কার অন্যতম বিখ্যাত শাসকও ছিলেন। বুয়াইয়া আমিরগণ কর্তৃক স্থাপিত ইরাক ও পারস্যের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোকে তিনি সংঘবদ্ধ করে খলিফা হারুনের সাম্রাজ্যের ন্যায় একটি বিস্তৃত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। উচ্চাভিলাষী শাসক আজাদ-উদ-দৌলাহ্ সুলতান এবং শাহানশাহ্ উপাধি গ্রহণ করেন। তিনিই প্রথম বুয়াইয়া সুলতান যিনি শাহানশাহ্ উপাধিতে ভূষিত হন।
খলিফার সঙ্গে আতিথেয়তা বুয়াইয়া রাজপুত্রকে আব্বাসীয় সিংহাসনে বসানোর জন্য আজাদ-উদ-দৌলাহ্ নিজ কন্যার সাথে খলিফা আত-তাইয়ের বিবাহ দেন। তিনি নিজেও খলিফার এক কন্যার পাণি গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিক আরনল্ড বলেন, বুয়াইয়া রাজ্য গৌরবের সর্বোচ্চ শিখরে উপনীত হয়। ৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে আজাদ-উদ-দৌলাহর মৃত্যুর পরে কাম্পিয়ান সাগর হতে পারস্য উপসাগর এবং ইস্পাহান হতে সিরিয়া সীমান্ত পর্যন্ত সমগ্র ভূখন্ডের অধিপতি হন। ক্রমশ তিনি ইরাকে প্রাধান্য কায়েম করলেন এবং বাগদাদের খলিফার প্রভু হলেন।
খিলাফতের অবমাননা ক্ষমতালোভী আজাদ-উদ-দৌলাহ্ মুসলিম জাহানের আধ্যাত্মিক এবং পার্থিব সর্বময় ক্ষমতাধিকারী খলিফাকে অপমান করতে কুণ্ঠাবোধ করেন নি। খিলাফত, মণি-মুক্তা খচিত মুকুট, ব্রেসলেট, তরবারি, দুটি রাষ্ট্রীয় পতাকা - প্রভৃতি প্রদানে খলিফাকে বাধ্য করেন। উপরন্তু, খলিফার রাজপ্রাসাদের ফটকে সকাল, সন্ধ্যা, রাত্রিকালে যেভাবে নহবত "বাজানো হতো অনুরূপভাবে মহিমা প্রকাশের জন্য সুলতানের প্রাসাদে নহবত বাজানো হতো। এ সকল কার্যের ফলে খলিফার চূড়ান্ত অপমান হতো এবং তার সার্বভৌমত্বে চরম আঘাত হানা হয়।
জ্ঞান-বিজ্ঞানে তাঁর অবদান আজাদ-উদ-দৌলাহর রাজত্বকালে বহু জনহিতকর কার্যকলাপ, শিল্প-সাহিত্য চর্চা, শিক্ষা- দীক্ষার সম্প্রসারণ এবং মুসলিম কৃষ্টির উৎকর্ষ সাধিত হয়। আবু-আলী আল-ফরিসী তাঁর সম্মানার্থে কিতাব-উল-ইদাহ রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। বিশ্ববিখ্যাত চিন্তাবিদ ইখওয়া-নুস-সাফাহ্ সম্প্রদায় এ আমলেই জ্ঞান সাধনা করে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। যে সকল বৈজ্ঞানিক তাঁর অনুগ্রহ পেয়েছিলেন তন্মধ্যে ইবনুস্ সালা, আব্দুর রহমান সুধীর নাম বিখ্যাত। ঐতিহাসিক মাসুদী, দার্শনিক আবু নসর, ফারাবী, কবি মুতনাব্বী, কিতাবুল আগানীর রচয়িতা আবুল ফারাজদক তাঁর সময়কার বিখ্যাত মনীষী।
জনহিতকর কার্যাবলি: আজাদ-উদ-দৌলাহ্ একজন প্রজা হিতৈষী আমির হিসেবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। সাম্রাজের মধ্যে মসজিদ-মাদ্রাসা, সরাইখানা ও হাসপাতাল নির্মাণ করে জনসাধারণের কল্যাণসাধন করেন। বাগদাদে 'আল-বিমারিস্তান আল-আযদী' নামে একটি বিখ্যাত হাসপাতাল নির্মাণ করেন। উক্ত হাসপাতালে চব্বিশ জন চিকিৎসক নিয়োজিত ছিলেন। তারা জনসাধারণের মঙ্গলের জন্য বিনামূল্যে ব্যবস্থাপত্র ও ঔষধ দিতেন। ঐতিহাসিক মিসকাওয়ার মতে, "যদিও আজাদ-উদ-দৌলাহ্ এর দরবার সিরাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল, তথাপি বাগদাদ নগরীর অনেক সুরম্য ইমারতরাজি নির্মিত হলে তার সৌন্দর্য শতগুণে বৃদ্ধি পায়।
শামস-উদ-দৌলাহ্ (১৮৩ খ্রি.) আজাদ-উদ-দৌলার মৃত্যুর পর ৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে শামস-উদ-দৌলাহ্ উত্তরাধিকারী সূত্রে আমির-উল-উমরাহ হলেন। তিনি শামস-উল-মিল্লাত বা 'ধর্ম সূর্য' উপাধি গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি তাঁর ভ্রাতা শরাফ-উদ-দৌলাহ্ কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হন।
শরাফ-উদ-দৌলাহ্ (১৮৩-৯৮৯): ভ্রাতা শামস-উদ-দৌলাহকে পরাজিত করে শরাফ-উদ-দৌলাহ্ ৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। তিনি জ্ঞানী এবং বিদ্যোৎসাহী ছিলেন এবং মৃত্যুর এক বছর পূর্বে খলিফা আল-মামুনের ন্যায় একটি মানমন্দির (Observatory) নির্মাণ করেন। বাগদাদ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হলো; বহু শিক্ষাবিদ, গণিতবিদ ও জ্যোতিষশাস্ত্রবিদ তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। ইবন-উস-সালাম, আব্দুর রহমান সৃফি কর্তৃক তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
আবু নসর বাহা-উদ-দৌলাহ্ ভ্রাতা শরাফ-উদ-দৌলাহকে পরাজিত করে ৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ষ্টাব্দে আবু নসর-বাহা-উদ-দৌলাহ্ রাজ্যের আলো উপাধি গ্রহণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। ৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফা আত-তাইকে পদচ্যুত করে বাহা-উদ-দৌলাহ্ তাঁর ভ্রাতা আবুল আব্বাসকে আল-কাদের বিল্লাহ্ উপাধি প্রদান করে বাগদাদের সিংহাসনে অভিষিক্ত করেন। বাহা-উদ-দৌলাহ্ ছিলেন ধর্মপরায়ণ, দয়ালু, ধীশক্তিসম্পন্ন। তাঁর শাসনামলে আব্বাসীয়দের আধ্যাত্মিক প্রতিপত্তি ও সম্মান সুপ্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। তিনি মুতাজিলা মতবাদের বিরোধী ছিলেন। তাঁর প্রখ্যাত পারসিক মন্ত্রী সাবুর-ইবন-আরদাশীর বাগদাদে ১০,০০০ পুস্তক সংবলিত একটি পাঠাগারসহ আকর্ষণীয় একাডেমি নির্মাণ করেন। বিখ্যাত সিরীয় কবি আল-মাবী উক্ত পাঠাগারের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। বুয়াইয়া আমলে প্রখ্যাত পারস্য দার্শনিক আবু সিনা, ঐতিহাসিক মিসকাউই, ভূগোল বিশারদ ইস্তাখারী, অঙ্কশাস্ত্রবিদ না'সাউই জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখেন।
বুয়াইয়াদের পতন
বুয়াইয়া বংশের পতনের কারণগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো: বুয়াইয়া শাসকদের দুর্বলতা: বাহা-উদ-দৌলাহ্-এর সময় হতে বুয়াইয়াদের অধঃপতন শুরু হয়। মিশরীয় ফাতেমি খলিফা আব্দুল-আজিজের সময় এডেসা, হামা, আলেপ্পো এবং মেসোপটেমিয়া দখল করে নেন। দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় খলিফা এবং স্বাধীন ও কপট পরবর্তী বুয়াইয়া আমিরগণ ফাতেমীয়দের আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হন।
পরবর্তী বুয়াইয়া শাসকগণ: বাহা-উদ-দৌলাহর মৃত্যুর পর বুয়াইয়া বংশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। বুয়াইয়াদের গৃহযুদ্ধ ও শিয়া মতবাদের বিশ্বাস তাদের পতনের জন্য দায়ী ছিল। পরবর্তী বুয়াইয়া সুলতান-উদ-দৌলাহ্ ১০১২ হতে ১০২৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এবং ইমাম-উদ-দৌলাহ্ ১০২৪ হতে ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আমির-উল-উমরাহ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এদের অযোগ্যতা ও বিলাসিতার জন্য বুয়াইয়া বংশ দ্রুত পতনের দিকে অগ্রসর হয়।
মালিক আর রহিম: ১০৫৫ খ্রিষ্টাব্দে বুয়াইয়াদের শেষ শাসক মালিক আর রহিম বুয়াইয়াদের আমির হন। ১০৫৫. খ্রিষ্টাব্দে সেলজুক বংশের তুঘ্রীল কো বাগদাদ দখল করলে মালিক আর রহিম তাদের হাতে বন্দী হন। এভাবেই বুয়াইয়াদের পতন ঘটে। বুয়াইয়াদের পতন: বুয়াইয়া আমিররা ৯৪৫ হতে ১০৫৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ১১০ বছর শাসন করেন। বিভিন্ন কারণে তাদের পতন ঘটে।
প্রথমত: ইবনে খালদুনের ঐতিহাসিক মতবাদ অনুযায়ী বুয়াইয়ারা ১০০ বছর কাল অতিক্রম করেন।
দ্বিতীয়ত: বুয়াইয়া আমিরগণ ছিলেন শিয়া।
তৃতীয়ত: পারসিক-আরব দ্বন্দ্ব ছিল বুয়াইয়াদের পতনের অন্যতম কারণ। বুয়াইয়াদের উত্থানকে সাধারণত আরবদের উপর পারসিকদের প্রভুত্ব বলা যায়।
চতুর্থত: বুয়াইয়া আমিরদের নিষ্ঠুরতা, বিশ্বাসঘাতকতা, স্বার্থান্বেষী অভিসন্ধি, হিংসা, দ্বেষ, গোত্রীয় কলহ চরম অরাজকতা সৃষ্টি করে। তাঁরা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো খলিফা নির্বাচন করতেন এবং সিংহাসনে বসাতেন। খিলাফতে তাঁদের অপরিসীম প্রভাব, নিষ্ঠুরতা ও অত্যাচার তাদের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
পঞ্চমত: তুর্কিদের প্রাধান্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সুন্নি সেলজুক বংশ বাগদাদ অভিযান করে এবং শিয়া বুয়াইয়াদের পতন ঘটান। বুয়াইয়াদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে সেলজুক নেতা তুঘ্রীল বেগ ক্ষমতা দখল করেন।
আব্বাসীয় রাজত্বকালে বুয়াইয়া আমিরদের উত্থান ইতিহাসে এক নাটকীয় ঘটনা। আব্বাসীয় খলিফাদের দুর্বলতার সুযোগে ৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে বুয়াইয়া আমির আহমদ সাহায্যের অজুহাতে বাগদাদ দখল করেন এবং আব্বাসীয় খলিফাদের হাতের ক্রীড়নকে পরিণত করেন। দীর্ঘদিন তারা শাসনকালে অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে তারা সবিশেষ অবদান রাখেন।
আব্বাসি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

