• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • আব্বাসি খিলাফত
আব্বাসি খিলাফত

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রি.)

আরব্য উপন্যাসের নায়ক আব্বাসীয়দের মুকুটমণি হারুন-অর-রশিদের রাজত্বকাল ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে। পরিচিত। তিনি ৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দ হতে ৮০১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মাত্র তেইশ বছর শাসন করেন। তাঁর সময় আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে সুখ-শান্তি বিরাজিত ছিল। সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ-নীতি গ্রহণ করার ফলে তাঁর সময়  সাম্রাজ্যের গৌরব বৃদ্ধি পায়। তাই ঐতিহাসিক হিটি বলেন, "নবম শতাব্দীর শুরুতে বিশ্ব পরিক্রমায় দুজন শাসক ভাস্বর হয়ে রয়েছেন। পাশ্চাত্যের শার্লিমেন এবং প্রাচ্যের খলিফা হারুন-অর-রশিদ, উভয়ের মধ্যে নিঃসন্দেহে হারুন-অর-রশিদ আব্বাসীয় খিলাফতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান খলিফাই ছিলেন না বরং সমকালীন পৃথিবীর শাসকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সমরকুশলী, প্রজারঞ্জক, বিদ্যোৎসাহী ও সুযোগ্য শাসক ছিলেন।"

হারুনের সিংহাসনারোহণ ভ্রাতা হাদির মৃত্যুর পর ৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ২৫ বছর বয়সে হারুন সিংহাসনে আরোহণ করেন। সিংহাসনে আরোহণের পর হারুন তাঁর বাল্য শিক্ষক ইয়াহিয়া বার্মাকিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন এবং তার পুত্র ফজল ও জাফর বার্মাকিকে রাজ্যের উচ্চপদে নিযুক্ত করেন।

অভ্যন্তরীণ নীতি/বিদ্রোহ দমন

হারুন-অর-রশিদ সিংহাসনে আরোহণ করে সাম্রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য কতিপয় নীতি গ্রহণ করেন। এ সকল নীতি নিম্নে আলোচনা করা হলো:

খারেজিদের বিদ্রোহ দমন সিংহাসনে আরোহণ করে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি খারেজিদের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণ করেন। ফলে খারেজি নেতা ওয়ালিদ আব্বাসীয়দের হাতে নিহত হয়। অতঃপর ওয়ালিদের ভগ্নী লায়লা খারেজিদের নেতৃত্ব গ্রহণ করে ইরাকে গোলযোগ সৃষ্টি করে। হারুন পর পর কয়েকটি 'অভিযান পরিচালনা করে তাদের সমূলে ধ্বংস করতে না পেরে নেত্রী লায়লাকে কৌশলে সংযত জীবনে ফিরে যেতে বাধ্য করেন। লায়লা "আরবীয় জোয়ান অব আর্ক" নামে পরিচিত। অপরদিকে, পারস্যে খারেজিগণ অরাজকতা সৃষ্টি করলে শাসনকর্তা আলী ইবনে ঈসা খারেজিদের কঠোর হস্তে দমন করেন।

মধ্য এশিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠা: ৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দে সমগ্র কাবুল ও সানবাদ আব্বাসীয় সাম্রাজ্যভুক্ত হয় এবং সাম্রাজ্য সীমানা হিন্দুকুশ পর্বত পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। অতঃপর এশিয়া মাইনরের অঞ্চলগুলো নিয়ে আওয়াসিম নামে নতুন প্রদেশ সৃষ্টি করে একজন সামরিক শাসনকর্তার অধীনে এনে শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপন করেন।

হিমারীয় ও মুদারীয়দের দমন: ৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে সিরিয়া ও সিন্ধুতে হিমারীয় ও মুদারীয়দের মধ্যে গৃহযুদ্ধ সূচনা হয়। হারুনের আদেশে সেনাপতি মুসা সিরিয়াতে এবং সেনাপতি দাউদ সিন্ধুতে অভিযান চালিয়ে তাদের বিদ্রোহ দমন করে প্রদেশদ্বয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

মসূলের বিদ্রোহ দমন: ৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে আতাফের নেতৃত্বে সমগ্র মসূল খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। খলিফা হারুন তাদের বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করে তাদের শাস্তিস্বরূপ মসূলের প্রাচীর ধ্বংস করে দেন।

আর্মেনিয়ার খাজাদের বিদ্রোহ দমন: ৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে গ্রিকদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে উপজাতি খাজাগণ আর্মেনিয়ার উপর অর্পিত হয়। তাদের নিষ্ঠুর ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে বিচলিত হয়ে খলিফা হারুন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুজন সেনাপতিকে পাঠান। সেনাপতিদ্বয় বিদ্রোহীদের কঠোর হস্তে দমন করে আর্মেনিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

আলীর বংশধরদের বিরুদ্ধে তাঁর নীতি: আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠায় আলী বংশের ইমাম হাসানের প্রপৌত্র মুহাম্মদ ও ইব্রাহীম সহযোগিতা করেন। কিন্তু খলিফা মনসুর ৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে তাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তিতে বিচলিত হয়ে কদী করেন। হারুনের রাজত্বকালে আলীপন্থীগণের প্রভাব বৃদ্ধি পেলে হারুন তাদের ভবিষ্যৎ প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে তাদের নেতা জ্ঞানতাপস মুসা আল-কাজিমকে বন্দী করে হত্যা করেন এবং অন্যান্যদের কঠোর হস্তে দমন করেন।

আফ্রিকায় আগলাবী শাসন প্রতিষ্ঠা: আফ্রিকার মরক্কো আব্বাসীয় সাম্রাজ্য হতে স্বাধীন হয়ে পড়ে। তাছাড়াও হাদীর শাসনামলে আলী বংশীয় ইদ্রিস মাগরিব আল-আকসায় তাঁর নামানুসারে ইদ্রিসীয় বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। আব্বাসীয়গণ বহু চেষ্টা করেও পশ্চিম আফ্রিকা পুনরুদ্ধার করতে পারেন নি। হারুনের রাজত্বকালে ইফ্রিকিয়ার শাসনকর্তা হারসামার পরামর্শে বাৎসরিক ৪০,০০০ দিনার বশ্যতামূলক কর প্রদানের বিনিময়ে ইব্রাহীম আগলাবীর উপর ইফ্রিকিয়ার শাসনভার ছেড়ে দেন।

হারুনের বৈদেশিক নীতি/বাইজান্টাইন নীতি

খলিফা হারুন-অর-রশিদের রাজত্বকাল বৈদেশিক নীতির জন্য খ্যাতি অর্জন করে। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা করা হলো:

বাইজান্টাইনদের সঙ্গে হারুনের সম্পর্ক বাইজান্টাইন খ্রিস্টানদের সঙ্গে যুদ্ধ হারুনের রাজত্বকালের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। পূর্ববর্তী খলিফা মাহদীর সময় রোমান সম্রাজ্ঞী আইরিন যে সন্ধি করেছিল তা ভঙ্গ করে রোমানগণ ৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম সাম্রাজ্য আক্রমণ করে মুসলমানদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলেন। মুসলিম সেনাবাহিনী তাদের আক্রমণ প্রতিহত করে 'মাতারা' ও 'আনসিরা' শহর দুটি অধিকার করেন। অতঃপর সাইপ্রাস ও ক্রীট দ্বীপ পুনরাধিকার করে রোমানদেরকে পূর্ব সন্ধি অনুযায়ী কর দানে বাধ্য করেন। ৮০২ খ্রিষ্টাব্দে নাইসিফোরাস সম্রাটের দায়িত্ব গ্রহণ করে মুসলমানদের সঙ্গে পূর্বের সকল সন্ধি ভঙ্গ করেন। রোমান সম্রাট নাইসিফোরাসের নিকট হতে আরবদের খলিফা হারুনের নিকট পত্র প্রেরণ করেন যার ভাষ্য ছিল, "আমার পূর্ববর্তী সম্রাজ্ঞী আপনাকে অনর্থক প্রভুর মর্যাদা দান করেছেন এবং অনেক সম্পদ আপনার নিকট প্রেরণ করেছেন। এটি নারীসুলভ দুর্বলতা মাত্র। সুতরাং আপনি পত্র পাওয়া মাত্র কালবিলম্ব না করে প্রেরিত অর্থের দ্বিগুণ প্রত্যার্পণ করুন; অন্যথায় তরবারিই আপনার ও আমার মধ্যকার মীমাংসা করবে।" ঐতিহাসিকগণ মনে করেন, হারুন এ পত্র হস্তগত হওয়ার পর পাঠ করে ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েন। অতঃপর পত্রের উল্টা পৃষ্ঠায় জবাব দেন-"আমিরুল মুমিনীন হারুনের নিকট হতে রোমান কুকুর নাইসিফোরাসের নিকট", "আমি তোমার পত্র পাঠ করেছি। উত্তর "আমি ৫ চোখে দেখবে না কর্ণে শুনবে।"

তৃতীয়বার বিদ্রোহ ঘোষণা: খলিফা হারুন যখন ট্রান্স অক্সিয়ানের বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত ঠিক তখন সুযোগ বুঝে নাইসিফোরাস সব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে মুসলিম সাম্রাজ্য আক্রমণ করে লুটতরাজ ও অত্যাচার শুরু করেন। এবার বিশ্বাসঘাতক ও সন্ধি ভঙ্গকারী নাইসিফোরাসকে সমুচিত শাস্তি দানের জন্য ১,৩৫,০০০ হাজার সৈন্যসহ হারুন গ্রিকদেশ আক্রমণ করেন। এবারও খলিফার বাহিনীর নিকট গ্রিক সম্রাট পরাজিত হয়ে সন্ধি প্রার্থনা করলে খলিফা তাঁর মহানুভবতার দ্বারা নাইসিফোরাসকে ক্ষমা করেন। তবে এবার বর্ধিত কর ছাড়াও রাজপরিবারের প্রত্যেক সদস্যের উপর কর বসান। এভাবে গ্রিকদের বারবার পরাজিত করে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল নীতি প্রদর্শন ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

ঐতিহাসিক আমীর আলী বলেন, "বাইজান্টাইন শাসনের অবসান ঘটিয়ে সারাসিনগণ তখন কনস্টান্টিনোপল অধিকার করলে পৃথিবীর শান্তি ও সভ্যতার পক্ষে কতই না মঙ্গল হতো।"

বার্মাকিদের প্রতি তাঁর নীতি খলিফা হারুনের রাজত্বকালে কৃতিত্বপূর্ণ কার্য পালন করার পর ইয়াহিয়া বার্মাকের অবসর গ্রহণের পর জাফর বার্মাক আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের প্রধান উজির হন। ফজল, মুসা ও মুহাম্মদ বার্মাক সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। তাদের সততা ও কর্মনিষ্ঠার জন্য আব্বাসীয় সাম্রাজ্য গৌরবের চরম সীমায় পৌঁছে। বার্মাকিদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। তাদের প্রভাব বৃদ্ধির ফলে শঙ্কিত হয়ে হারুন ৮০৩ খ্রিষ্টাব্দে বার্মাকিদের পতন ঘটান। যে বার্মাকিদের জন্য আব্বাসীয়রা গৌরবের শীর্ষে আরোহণ করে তাদের পতন ঘটিয়ে হারুন তাঁর রাজত্বকালকে শুধু স্নান করেননি, ইতিহাসে দুর্নাম কুড়িয়েছেন।

উত্তরাধিকারী মনোনয়ন দান: ৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাজ্ঞী যুবায়দা, তাঁর ভ্রাতা ঈশা এবং সমগ্র আব্বাসি বংশের চাপে পড়ে হারুন তাঁর পাঁচ বছরের পুত্র মুহাম্মদকে 'আল আমীন' উপাধি দান করে সিংহাসনের দাবিদার মনোনীত করেন। অতঃপর জ্যেষ্ঠপুত্র আব্দুল্লাহকে আল-মামুন উপাধি দান এবং তৃতীয় পুত্র কাসিমকে 'মুতামিন' উপাধি প্রদান করে পর পর সিংহাসনের দাবিদার মনোনীত করেন। ৮০২ খ্রিস্টাব্দে হারুন অর রশিদ তাঁর দুই পুত্রের মধ্যে সৌহার্দ সৃষ্টির জন্য মক্কায় হজব্রত পালনের সময় ভ্রাতাদের অবগত করেন ও আনুগত্যশীল হওয়ার জন্য নির্দেশ দান করেন।

হারুন-অর-রশিদ-এর মৃত্যু: ৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে খোরাসানে বিদ্রোহ দেখা দিলে খলিফা স্বয়ং সে বিদ্রোহ দমনের জন্য রওনা হন। কিন্তু পথের মধ্যে তুস নগরীর উপকণ্ঠে 'সানবাদ' নামক স্থানে খলিফা হারুন অসুস্থ হয়ে পড়েন। কয়েকদিন রোগ- ভোগের পর ৪৮ বছর বয়সে হারুন-অর-রশিদ মৃত্যুবরণ করেন।

হারুন অত্যন্ত ধর্মভীরু ও প্রজারঞ্জক শাসক ছিলেন। তেইশ বছরের রাজত্বকালে নয় বছর হজব্রত পালন করেন। সততা, কতর্ব্যনিষ্ঠা, উদারতা ও দানশীলতা তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি ছিলেন বিজ্ঞ, বিচক্ষণ, মহানুভব, সদাপ্রফুল্ল ও নিরহংকার মানুষ। তাঁর চরিত্রের দোষ ছিল তিনি সন্দেহপ্রবণ ছিলেন।

হারুন অর-রশিদ-এর চরিত্র ও কৃতিত্ব

আব্বাসীয় বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক খলিফা হারুন-অর-রশিদ-এর চরিত্র ও কৃতিত্ব নিম্নে আলোচনা করা হলো:

চারিত্রিক মাহাত্ম্য: খলিফা হারুন অর-রশিদ অসামান্য প্রতিভা, অসাধারণ দক্ষতা ও ভুলনীয় চারিত্রিক মাহাত্ম্যের অধিকারী ছিলেন। ঐতিহাসিক মুর বলেন, "Harun was perhaps the ablest ruler of the Abbaside ruce. He is linked to Abu Jafar but without his persimony."

ধর্মভীরুতা: ব্যক্তিগত জীবনে খলিফা ছিলেন ধর্মভীরু সদায় ও দানশীল। তিনি প্রত্যহ নির্ধারিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। তেইশ বছরের শাসনকালে তিনি অন্ততঃ নয়বার হজ্বব্রত পালন করেন।

মহানুভবতা: খলিফা হারুনের চরিত্রে কঠোরতা ও কোমলতার অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছিল। রাজ্যের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার জন্য যতটুকু কঠোরতার প্রয়োজন ছিল তিনি ততটুকু গ্রহণ করেছিলেন। তিনি অন্যায়কারী ও বিদ্রোহীদের প্রতি যেমন কঠোর ও নির্দয় ছিলেন, তেমনি গরীব, দুস্থ ও অসহায়দের প্রতি ছিলেন সদয়।

শাসনব্যবস্থা: হারুন-অর-রশিদের শাসনব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল প্রজাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নিশ্চয়তা বিধান করা। তাঁর শাসন পদ্ধতি ইসলামি শরিয়তের মূলনীতি মোতাবেক পরিচালিত হতো। এমনকি তিনি শাসনব্যবস্থায় পারস্য দেশীয় শাসন নীতির প্রভাব ঘটিয়েছিলেন। তাই ঐতিহাসিক মুলার বলেন, "পারস্য প্রথার ভিত্তিতে পৃথক বিভাগ, বিশেষভাবে সৈন্যবাহিনী, রাজস্ব, আয়কর, ডাক এবং প্রদেশসমূহ নিয়ে একটি সুপরিকল্পিত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা হয় এবং নবম ও দশম শতাব্দীতে তা ক্রমশ সম্প্রসারিত হতে থাকে।" শাসনব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ভার বার্মাকি পরিবারের উপর ন্যস্ত ছিল। সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক: হারুন-অর-রশিদ আব্বাসীয় খলিফাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন। ঐতিহাসিক গীবন তাঁকে আব্বাসীয়
বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান খলিফা বলে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিক খোদাবক্স বলেন, "Both in the east and west Harun-ar-Rashid had acquired an undisputable primacy in history of the Caliphs." অর্থাৎ "পাশ্চাত্য ও প্রতীচ্যের খলিফাদের ইতিহাসে হারুন-অর-রশিদ অপ্রতিদ্বন্দ্বী শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করিয়াছেন।"

হারুনের বৈদেশিক সম্পর্ক: হারুনের সময় মুসলিম সাম্রাজ্য শ্রী সম্পদে ভরে ওঠে। ফলে রাষ্ট্রের মধ্যে ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রসার লাভ করে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে অগ্রগতি সাধিত হয়। ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন শহরের সঙ্গে দূত বিনিময়ের মাধ্যমে হারুনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনের জন্য চীন সম্রাট ফাগফুর ও ফরাসি সম্রাট শার্লিমেন তাঁর দরবারে দূত প্রেরণ করেন। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে হারুনের সময় সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে তাই ব্যবসায়-বাণিজ্য প্রভূত উন্নত হয়। বিভিন্ন দেশ হতে প্রাপ্ত মুদ্রা হতে তাঁর সময়ের এসব তথ্য পাওয়া যায়।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক: জ্ঞান-বিজ্ঞানে আব্বাসীয়রা চরম উৎকর্ষ লাভ করে। তন্মধ্যে হারুনের রাজত্বকাল চির স্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর দরবার ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষণা কেন্দ্র। তিনি বিভিন্ন ভাষার বই-পুস্তক সংগ্রহ করে আরবি ভাষায় অনুবাদ করান। বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ আসমাই ও শফি, চিকিৎসক জিবরাইল, অনুবাদক হাজ্জাজ, ঐতিহাসিক ওয়াকিদি, ইসলামি জ্ঞান বিশারদ ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালিক, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুসা আল-কাজিম তাঁর দরবারকে অলংকৃত করেছেন। খলিফা নিজেও একজন কবি ছিলেন। প্রসিদ্ধ কবি আবু নাওয়াস ও আবুল-আতাহিয়া তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। সাম্রাজ্যের মধ্যে বহু স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি সাধন করেন।

জনহিতকর কার্যাবলি: হারুন-অর-রশিদ ছিলেন তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। তিনি প্রজাদের উন্নয়নের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। প্রজাদের মঙ্গলের জন্য তিনি রাত্রিতে পরিভ্রমণ করে সাম্রাজ্যের সকল সমস্যা স্বচক্ষে দেখতেন। তিনি বাগদাদ নগরীকে সমসাময়িক বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দর নগরীতে পরিণত করেন। সুরম্য রাজপ্রাসাদ, সুসজ্জিত হেরেম, আড়ম্বরপূর্ণ দরবার, নয়নাভিরাম মিলনায়তন দ্বারা তিনি রাজধানীকে সুসজ্জিত করেন। ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, "বাগদাদ সারা বিশ্বের একটি অদ্বিতীয় শহর।" সদাসর্বদা রাজকীয় পোশাক পরিধান করে থাকতেন হারুন-অর-রশিদ। প্রজাদের সুবিধার জন্য রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ, মাদ্রাসা, সরাইখানা, রাস্তাঘাট, সেতু, খাল ও হাসপাতাল নির্মাণ করেন। খলিফার স্ত্রী যুবায়দাও এ ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন। তিনি ফোরাত হতে মক্কা পর্যন্ত নহর-ই-যুবায়দা নামে একটি খাল খনন করে হজ যাত্রীদের পানির কষ্ট দূর করেন। তিনি ইসলামি মূলনীতি অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন।

খলিফা হারুন-অর-রশিদের তেইশ বছরের রাজত্বকাল পর্যালোচনা করলে জানা যায় তাঁর রাজত্বকাল আব্বাসীয় যুগের স্বর্ণযুগ। হারুন-অর-রশিদ এ যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। তাঁর কৃতিত্ব বিচার করে আমীর আলী বলেন, "Weigh him as carefully as you like in the scale of historical criticism, Harun-ar-Rashid will always take rank with greatest soverigns and rulers of the world." অর্থাৎ "ঐতিহাসিক সমালোচনার সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে যাচাই করলেও তিনি সর্বকালের বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ নরপতি ও শাসকগণের অন্যতম বলে বিবেচিত হবেন।" সর্বদিক দিয়ে বিচার করে ঐতিহাসিকগণ হারুন-অর-রশিদকে আব্বাসীয় বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, হারুন-অর-রশিদ এর রাজত্বকাল ইসলামের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তিনি সমসাময়িককালের শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন।

আব্বাসি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন

আব্বাসীয় আন্দোলনআবুল আব্বাস আস-সাফফাহ (৭৫০-৭৫৪ খ্রি.) খলিফা আবু জাফর আল মনসুর (৭৫৪-৭৭৫ খ্রি.)খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রি.)বার্মাকি বংশখলিফা আল-আমিন (৮০৯-৮১৩ খ্রি.)খলিফা আল-মামুন (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.)আব্বাসীয় খিলাফতের শেষার্ধ খলিফা আল-মুতাসিম (৮৩৩-৮৪২ খ্রি.)বুয়াইয়া বংশ (৯৪৪-১০৫৫ খ্রি.)সেলজুক বংশ (১০৫৫-১১৯৪ খ্রি.)মালিক শাহ সেলজুক (১০৭৩-১০৯২ খ্রি.)ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ (১০৯৫-১২৫৮ খ্রি.)গাজী সালাউদ্দিন আইয়ুবিবাগদাদ ধ্বংস (১২৫৮ খ্রি.)আব্বাসীয় খিলাফতের ক্রমাবনতি ও পতনআব্বাসীয় আমলের আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্যআব্বাসীয় আমলে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চাআব্বাসিদের রাজধানী কোথায় ছিল?বার্মাকি বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে?খায়জুরান কে ছিলেন?বাগদাদ নগরীর প্রতিষ্ঠাতা কে?ক্রুসেড (Crusade) শব্দের অর্থ কী?বুরান কে ছিলেন?আব্বাসি বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কে?'আল-মনসুর' শব্দের অর্থ কী?বায়তুল হিকমা কে প্রতিষ্ঠা করেন?কোন যুদ্ধের মাধ্যমে আব্বাসি রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়?আব্বাসিরা কার বংশধর?কোন সালে জাবের যুদ্ধ সংঘটিত হয়?আবুল আব্বাস কী উপাধি গ্রহণ করেন?'আস-সাফফাহ' শব্দের অর্থ কী?আব্বাসি বংশের প্রথম শাসক কে ছিলেন?সেনাপতি আবু মুসলিমকে কে হত্যা করেন?বায়তুল হিকমাহ (জ্ঞানগৃহ) কত খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করা হয়?'Arabian Joan of Ark' নামে পরিচিতি লাভ করেন কে?ক্রুসেড কী?ক্রুসেড (Crusade) শব্দটি কোন শব্দ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে?আব্বাসি কারা? পরিচয় দাও।নহর-ই জুবাইদা কী? বুঝিয়ে লেখ।বায়তুল হিকমা বলতে কী বোঝায়?আবু মুসলিম খোরাসানি সম্পর্কে যা জান লেখ।কাকে এবং কেন আস-সাফফাহ বলা হয়?খলিফা মনসুর কর্তৃক আলী বংশীয়দের প্রতি দুর্ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা কর।আব্বাসি আন্দোলন বলতে কী বোঝায়?আবু জাফর আল মনসুরকে আব্বাসি বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় কেন?খলিফা আল মামুনের রাজত্বকালকে ইসলামের অগাস্টাস যুগ বলা হয় কেন?ক্রুসেড বলতে কী বোঝায়?

সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ