- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- আব্বাসি খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
আব্বাসীয় খিলাফতের ক্রমাবনতি ও পতন
ভাঙা-গড়া ইতিহাসের চিরাচরিত নিয়ম। যে জিনিসের উত্থান আছে তার পতনও আছে। এই অমোঘ নিয়মের হাত হতে কোনো জিনিসই রক্ষা পায় নি। খরস্রোতা নদীতে পানির অভাব দেখা দিলে আস্তে আস্তে ক্ষীণকায়া হয়ে পরে বিলীন হয়ে যায়। জন্ম, বিকাশ ও ধ্বংস এই তিনটি প্রকৃতির নিয়ম। ব্যক্তির জীবনে এটি যেমন সত্য, সাম্রাজ্য বা রাজবংশের ক্ষেত্রেও এটি তেমনি সত্য। তদ্রুপ বড় বড় সাম্রাজ্য ও শাসকদের দুর্বলতা ও অযোগ্যতার কারণে পর্যায়ক্রমে ধ্বংস হতে বাধ্য। আবুল আব্বাস আস-সাফফা কর্তৃক ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া সাম্রাজ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত বিশাল আব্বাসীয় সাম্রাজ্য শাসকদের দুর্বলতা, সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি, সুষ্ঠু উত্তরাধিকার নীতির অভাবে পর্যায়ক্রমে দুর্বল হয়ে যায় এবং পরবর্তী সময় মোঙ্গলীয় নেতা হালাকু খানের ১২৫৮ সালে বাগদাদ ধ্বংসের পরিণতিতে এই ঐতিহ্যবাহী জাতি কালের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায়। আব্বাসীয় বংশের অবক্ষয় ও পতনের কারণ:
আব্বাসীয় বংশের পতনের জন্য দুটি কারণ দায়ী। যথা:
(ক) অভ্যন্তরীণ কারণ ও
(খ) বাহ্যিক কারণ।
(ক) অভ্যন্তরীণ কারণ: আব্বাসীয় সাম্রাজ্য পতনের অভ্যন্তরীণ কারণগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো:
ঐতিহাসিক কারণ: উত্থানের পর পতন, উন্নতির পর অবনতি এটা নিয়মিত খেলা এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন যথার্থই বলেছেন- "সাধারণত কোনো রাজবংশ এক শতাব্দীর অধিক কাল কর্মশক্তি এবং শৌর্য-বীর্য বজায় রাখতে পারে না। তার পরেই শুরু হয় পতনের পালা।" যদিও ৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত যোগ্যতা এবং দক্ষতার সাথে সাম্রাজ্য পরিচালিত হয়েছিল (৭৫০-৮৪৭) খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। আল-মুতাওয়াফকির খিলাফত থেকেই পতনের পালা শুরু হয়। ঐতিহাসিক P.K. Hitti বলেন, আল-মুতাওয়াফকি পতন যুগের প্রথম খলিফা।
উত্তরাধিকারীর ব্যর্থতা ও অকর্মণ্যতা: যে কোনো রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনার সফলতা নির্ভর করে শাসকদের যোগ্যতার উপর। যোগ্য শাসকের অভাবে যে কোনো রাজবংশের পতন বা অবক্ষয় হতে পারে। তেমনি আব্বাসীয় বংশের পতনের অন্যতম কারণ হলো দুর্বল উত্তরাধিকারীদের শাসন। আল-মনসুর, হারুন-অর-রশিদ, আল-মামুন অত্যন্ত যোগ্য শাসক ছিলেন এবং তাদের শাসন ব্যবস্থায় আব্বাসীয় খিলাফতের যথেষ্ট সম্মান ও গৌরব বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই বংশের ৩৭ জন খলিফার মধ্যে সামান্য কয়েকজন ছাড়া অন্যান্য শাসক ছিলেন বিলাসী, অযোগ্য এবং অকর্মণ্য। দুর্বল শাসকদের সময় রাজ্যের ভিতরে বিভিন্ন বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, এমনকি সেনাবাহিনীর ভিতরেও অরাজকতা দেখা দেয়, যার জন্য এই বংশের পতন আর ঠেকানো সম্ভব হয় নি। ঐতিহাসিক সালাবি বলেন, "Of the Abbasid caliphs the opener, was Al-Mansur, The Middler, was All-Mamun and The Closer was Al-Muktadid." অর্থাৎ "আল মনসুর আব্বাসীয় খিলাফতের গৌরবের সূচনা করেন, আল-মামুন তা পরিপূর্ণতা বিধান করেন এবং আল-মুকতাদিরের সময় এর সমাপ্তি ঘটে।"
দুর্বল উত্তরাধিকারীদের শাসন: দুর্বল উত্তরাধিকারীদের শাসনক্ষমতা লাভ আব্বাসীয় খিলাফতের পতনের অন্যতম কারণ। মুতাসিমের পরবর্তী অধিকাংশ খলিফাই অযোগ্য, অকর্মণ্য এবং দুর্বল ছিলেন। শাসনকার্যের প্রতি তাদের উপেক্ষা ও অবহেলা রাজ্যের সর্বত্র অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। ফলে আব্বাসীয় বংশের পতন ত্বরান্বিত হয়।
উত্তরাধিকারী নির্ণয়ে ত্রুটি: আব্বাসীয় খিলাফতে উত্তরাধিকারী নির্ণয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না। কোনো খলিফার ইন্তেকালের পরেই রাজসভায় দেখা দিত আত্মকলহ, দলাদলি, ষড়যন্ত্র এবং গুপ্তহত্যা। এরূপ আত্মঘাতী তৎপরতা সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব ও সংহতির পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায় এবং আব্বাসীয় বংশের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
সাম্রাজ্যের ব্যাপকতা বা বিশালতা: ঐতিহাসিক বার্নার্ড লুইস "আব্বাসীয় সাম্রাজ্যকে বিশাল ইসলামি সাম্রাজ্য বলে অভিহিত করেন"। এই সাম্রাজ্যের ব্যাপকতা পতনকে ত্বরান্বিত করে। কারণ বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায় নি। এই সাম্রাজ্য আটলান্টিক মহাসাগর হতে সিন্ধু এবং কাম্পিয়ান সাগর হতে নীল নদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এ বিশাল সাম্রাজ্যের মধ্যে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। অতি জরুরি সময় সংবাদ প্রেরণ এবং কোনো বিদ্রোহ দেখা দিলে সৈন্যবাহিনী ও রসদ প্রেরণ ছিল সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল ব্যাপার। তা ছাড়া শাসকদের ব্যর্থতার কারণে বিভিন্ন রাজবংশের উৎপত্তি হয়। বিশেষ করে বুয়াইয়া বংশ, ফাতেমি বংশ ও ইদ্রিস বংশ প্রমুখ। এই রাজবংশ রাষ্ট্রের ভিতরে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন, যা পরিণামে পতনের দিকে সাম্রাজ্যকে ঠেলে দেয়।
পি. কে. হিট্টি এ ব্যাপারে যথার্থই মন্তব্য করে বলেন, "The sick man was already on his death bed when the burglars burst open the doors and snatched their share of the imperial heritage." অর্থাৎ "রোগী ইতঃপূর্বেই মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিল, তা টের পেয়ে সিঁদেল চোর দরজা ভেঙে অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং রাজকীয় সম্পত্তি হতে নিজ নিজ অংশ কেড়ে নেয়।" অর্থাৎ এ বংশের অবস্থা শেষ পর্যন্ত এমন হয় যে রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করা তো দূরের কথা, নতুন নতুন রাষ্ট্রের উৎপত্তি পর্যন্ত ঠেকাতে শাসকরা ব্যর্থতার পরিচয় দেয়; যার শেষ পরিণতি আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের বিনাশ।
সামরিক বিভাগের প্রতি অবহেলা: আব্বাসীয় যুগে প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এ বিভাগের প্রতি শাসকগোষ্ঠীর অবজ্ঞা ও উদাসীনতার ফলে সৈন্যগণ শৌর্যবীর্য ও সামরিক দক্ষতা হারিয়ে ফেলে এবং দেশ যখন বহিঃশত্রুর, দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন আব্বাসীয় সৈন্যগণ সে আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়, যার জন্য ইতিহাসের পাতা থেকে বিদায় নেয় আব্বাসীয় সাম্রাজ্য। ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে হালাকু খানের বাহিনীকে পরাজিত করার মতো দক্ষতা আব্বাসীয় সামরিক বাহিনীর ছিল না।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের স্বাধীনতা: আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, কেন্দ্রে অধিকাংশ সময়ই শক্তিশালী শাসক ছিল না। এই কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা, সাম্রাজ্যের ব্যাপকতা, উন্নত যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব, প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের বিলাসিতা, দুর্বল উত্তরাধিকার শাসক থাকার কারণে এ সাম্রাজ্যের ভিতরে বিভিন্ন বিদ্রোহ আর বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। যোগ্য সেনাবাহিনীর অভাব আর শাসকদের দুর্বলতার কারণে বিভিন্ন রাষ্ট্র স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং এ রাষ্ট্রসমূহ স্বাধীনভাবে শাসনকার্য চালাতে থাকে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের জন্মলাভ আব্বাসীয় বংশের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
খলিফাদের নৈতিকতার অভাব চরিত্র হলো মানব জীবনের অমূল্য সম্পদ। কোনো মানুষের চরিত্র যখন নষ্ট হয় তখন ঐ চরিত্রহীন মানুষ ও পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। যে কোনো জাতির ধ্বংস সাধন করতে হলে প্রথমেই ধ্বংস করতে হয় ঐ শাসকদের চরিত্র। তেমনি ইতিহাসের পাতা থেকে আব্বাসীয়দের বিদায় নেয়ার অন্যতম কারণ আব্বাসীয় যুগের শেষ শাসকদের নৈতিক অধঃপতন। কারণ এ বংশের বিশেষ করে খলিফা আল-মনসুর, হারুন-অর-রশিদ এবং মামুন ব্যতীত অধিকাংশ খলিফা মদ্যপান করত। তারা অত্যন্ত আরাম-আয়েশে জীবনযাপন করত। মদ-নারী আর ভোগ-বিলাস নিয়ে ব্যস্ত থাকত। অধিকাংশ শাসকদের উপপত্নীও ছিল। শাসকদের নৈতিকতার অভাবে তারা রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্য কোনো চিন্তা-ভাবনার সুযোগ পায়নি।
প্রাদেশিক সরকারের স্বার্থপরতা: আব্বাসীয় যুগে অনেকগুলো প্রদেশ ছিল। প্রাদেশিক শাসকরা ছিল অত্যন্ত স্বার্থপর। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাসকদের সুসম্পর্কের অভাব ছিল।
প্রাদেশিক সরকারের হাতে রাজস্ব ও সামরিক বিভাগের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল। প্রাদেশিক উচ্চাভিলাষী শাসকগণ সুযোগ বুঝে কেন্দ্রীয় সরকারকে অসহযোগিতা করত। তাছাড়া অধিকাংশ সময়ে কেন্দ্রীয় শাসকদের দুর্বলতার কারণে প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না। এছাড়াও উন্নত যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দক্ষ সেনাবাহিনীর অভাবও প্রাদেশিক সরকারকে নিয়ন্ত্রণ না করার ব্যাপারে অনেকটা দায়ী।
সামন্ত প্রথার প্রবর্তন: আব্বাসীয় যুগে কিছু কিছু শাসক সামন্ত প্রথা প্রবর্তনে সহায়তা করে। সামন্ত প্রথা প্রবর্তন হওয়ায় সামন্ত রাজগণ প্রচুর ক্ষমতার অধিকারী হয়। তারা রাষ্ট্রের মধ্যে সুযোগ বুঝে বিভিন্ন বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। খলিফা হারুন-অর-রশিদ সামন্তরাজাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং উত্তর আফ্রিকার ক্ষমতা ইব্রাহিম-বিন-আগলাবের উপর অর্পণ করেন স্বাধীন আগলাবী বংশের সামন্ত রাজাদের বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা কেন্দ্রীয় সরকার দমন করতে না পারায় এই বংশের পতনের কাজ ক্রমান্বয়ে অগ্রসর হতে থাকে।
দলগত শত্রুতা: আব্বাসীয় খিলাফতে আরব-অনারব, মুসলিম-অমুসলিমদের দলগত বৈষম্য ও শত্রুতা চরম আকার ধারণ করে। প্রাচীন ঐতিহ্য গঠিত পারসিক মুসলমানগণ কোনো দিনই আরবদের প্রভুত্বকে মেনে নেয় নি। আরবগণ আবার অনারব মুসলমানদের পছন্দ করত না। এসব বিরুদ্ধ শক্তি নিজ নিজ মতামতে চলে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে ফেলে।
বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও কলহ আব্বাসীয় শাসনামলে মুতাজিলা, আশারিয়া, কারামাতীয়া, ইসমাইলীয়, গুপ্তঘাতক; জিন্দিক, শিয়া প্রভৃতি বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব ও তাদের বিরোধিতামূলক মতবাদ আব্বাসীয় শাসনকে দুর্বল করে ফেলে। ফলে সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয়।
তুর্কি বাহিনীর প্রাধান্য: আব্বাসীয় বংশের পতনের ক্ষেত্রে খলিফা মুতাসিম কর্তৃক তুর্কি সেনাবাহিনী গঠন করাটাও অনেকাংশে দায়ী। এ তুর্কি বাহিনী ছিল অতি শক্তিশালী। তিনি এই বাহিনীর হাতে অত্যধিক ক্ষমতা প্রদান করেন। তুর্কি সেনাবাহিনীর আশীর্বাদ নিয়ে শাসকদের শাসনকার্য পরিচালিত করতে হতো। এই বাহিনী গঠন করা মুতাসিমের চরম ভুল হয়েছে। কারণ তুর্কি বাহিনী খলিফাকে অপসারণ ও নির্বাচিত করার ক্ষমতা রাখত।
ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি বলেন, "আল-মামুনের প্রশান্তির শহর অরাজকতার শহরে পরিণত হয়।" তুর্কি বাহিনীর অত্যাচারে আর অসহযোগিতার কারণে খলিফা স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতে ব্যর্থ হন। ৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা মুতাদ তুর্কি বাহিনীর বর্বরতার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য পুনরায় রাজধানী বাগদাদে স্থানান্তর করেন। উচ্চাভিলাষী ও ক্ষমতালোভী তুর্কি বাহিনীর হস্তক্ষেপ আব্বাসীয় শক্তি ও শাসনকে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় ফেলে দেয়।
বুয়াইয়া ও সেলজুকদের প্রতিপত্তি ও দৌরাত্ম্য তুর্কিদের কবল হতে রেহাই পাবার লক্ষ্যে আব্বাসীয় খলিফা আল মুসতাকফি বুয়াইয়াদের সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু এতেও খলিফার ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বুয়াইয়াদের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য আব্বাসীয় খলিফা আল-কায়েম বিল্লাহ সেলজুকদের আমন্ত্রণ জানান। দুর্ভাগ্যবশত দুর্বল খলিফারা সেলজুকদের হাতের ক্রীড়নক হয়ে পড়েন। অন্যদিকে, উচ্চাভিলাষী ও ক্ষমতালিপু বুয়াইয়া ও সেলজুক আমিরদের মধ্যে রু ও কলহ শুরু হয়। তাদের এ অনভিপ্রেত দ্বন্দ্ব আব্বাসীয় খিলাফতের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
ফাতেমীয়দের অবমূল্যায়ন উমাইয়া বংশের পতনের আন্দোলনে ফাতেমীয়রা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের উত্থানের কাজকে ত্বরান্বিত করে। অথচ আব্বাসীয়গণ ক্ষমতায় আসার পর তাদেরকে কোনো মূল্যায়ন করা হয় নি। এমনকি কোনো কোনো জায়গায় তাদেরকে বিভিন্নভাবে দমন করা হয়। যার জন্য আব্বাসীয়দের পতনের প্রাক্কালে ফাতেমীয়গণ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ ঘোষণা করে- যার শেষ পরিণতি আব্বাসীয় খিলাফত ধ্বংস।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়: খিলাফতের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও আব্বাসীয় বংশের পতনের অন্যতম কারণ ছিল। শাসক পরিবারের ভোগবিলাসের জন্য নাগরিকরা অনেক ক্ষেত্রে কৃষিকার্য ছেড়ে দিয়েছিল। ভোগলিপ্সা ও সৌখিনতার কারণে রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে। এ অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধ করার শক্তি ও ইচ্ছা পরবর্তী আব্বাসীয় খলিফাদের ছিল না।
গ্রিকদের গোলযোগ সৃষ্টি: গ্রিকরা সর্বদাই ছিল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এবং সামান্য সুযোগ পেলেই মুসলিম রাজ্য লুণ্ঠন করত। তাদের বিরামহীন গোলযোগ সৃষ্টিতে আব্বাসীয় খিলাফত নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
খ্রিষ্টানদের আক্রমণ: পরবর্তী খলিফাদের দুর্বলতার সুযোগে গ্রিকদের অনুরূপ খ্রিষ্টানরা অনবরত গোলমাল সৃষ্টি করতে থাকে। তাদের ক্রমাগত মুসলিম সাম্রাজ্য আক্রমণের ফলে আব্বাসীয়দের বিস্তর শক্তি ক্ষয় হয়।
জনসমর্থনের অভাব: পরবর্তী দুর্বল খলিফাগণ শাসনকার্যে জনসমর্থন হারায়। জনসমর্থনহীন সরকার বেশি দিন টিকে থাকতে পারে না।
জাতীয়তাবোধের অভাব: আব্বাসীয়গণের মধ্যে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব, উপদেষ্টা পরিষদের অভাব এবং সর্বোপরি জাতীয়তাবোধের অভাব হায়ী বংশের পতন ত্বরান্বিত করে।
(খ) বাহ্যিক কারণ: বাহ্যিক যে সকল কারণে আব্বাসীয় খিলাফতের পতন ঘটে তা নিম্নে আলোচনা করা হলো:
বাইজান্টাইনদের আক্রমণ: আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠালাভ বাইজান্টাইনরা মোটেই পছন্দ করে নি। তারা আব্বাসীয় খিলাফত ধ্বংসের জন্য চেষ্টা করত। খলিফা হারুন-অর-রশিদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যকে বাইজান্টাইনদের হাত থেকে রক্ষার জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করেন। খলিফা হারুনের উদারতা আর উঁচু মানসিকতার কারণে তাদের সাথে কয়েকবার সন্ধি হয়। কিন্তু বাইজান্টাইনরা সুযোগ খুঁজতে থাকে কখন আক্রমণ করা যায়। এভাবে সুযোগমতো তারা কয়েকবার এই সাম্রাজ্যকে আক্রমণ করে অসংখ্য জীবন আর প্রচুর সম্পদ ধ্বংস করে। তাদের হিংসাত্মক ও ধ্বংসমূলক কাজে, আব্বাসীয় সাম্রাজ্য ক্রমশ দুর্বল হয়ে থাকে।
হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ আক্রমণ ঐতিহ্যবাহী আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের অবক্ষয় ও পতনের সর্বশেষ এবং প্রত্যক্ষ কারণ হচ্ছে মোঙ্গল নেতা হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ আক্রমণ। হালাকু খান ১২৫৩ খ্রিষ্টাব্দে গুপ্তঘাতক সম্প্রদায়কে চিরতরে ধ্বংস করার জন্য আব্বাসীয় বংশের সর্বশেষ খলিফা মুনতাসিমের নিকট সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য অনুরোধ জানিয়ে পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে খলিফা তার আহ্বানের যথার্থ উত্তর প্রেরণ করেন: নি। কিন্তু হালাকু খান এই কাজটি মেনে নিতে পারেননি এবং ব্যাপারটি তার নিকট অপমানজনক চিন্তা করে ১২৫৩ খ্রিষ্টাব্দে বিশাল বাহিনী নিয়ে গুপ্তঘাতক সম্প্রদায়কে দমন করতে সক্ষম হন। ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে হালাকু খান বাগদাদ আক্রমণ করলে ৪০ দিন অবরোধ করার পর আর প্রতিরোধ করার ক্ষমতা না থাকায় প্রাণ ভিক্ষা চান আব্বাসীয় শেষ খলিফা মুনতাসিম। ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে খলিফা ও তাঁর পরিবারের সবাইকে অতি নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। নিষ্ঠুর হালাকু খানের বাগদাদ আক্রমণের সময়ে সেখানকার অধিবাসী ২০ লক্ষের মধ্যে ১৬ লক্ষই মারা যায়।
পরিশেষে বলা যায়, জাতীয় চরিত্রে যখন অনাচার, অবিচার, দুর্নীতি আর ভোগ-বিলাস প্রবেশ করে, সেই জাতি তখন তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলে। আব্বাসীয় বংশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই দেখা যায় অধিকাংশ খলিফা ভোগ-বিলাস, মদ-নারী আর নিজেদের স্বার্থ নিয়ে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে, তাদের পক্ষে সাধারণ মানুষের কল্যাণ করার মতো মানসিকতা লোপ পায়। ড. ইমামুদ্দিনের মতে, "দুর্নীতি, জনবিচ্ছিন্নতা, ভোগ-বিলাস ও যথেচ্ছাচার আব্বাসীয় বংশের পতনকে নিশ্চিত করে।"
ঐতিহাসিক গিলমান বলেন যে, "বাগদাদ পাঁচশত বছর ধরে শিল্প, বিজ্ঞান এবং সাহিত্যের গৌরবোজ্জ্বল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল তা চিরতরে বিলুপ্ত হলো।" সামরিক বিভাগের অনৈক্য, নতুন নতুন রাষ্ট্রের উদ্ভব, খিলাফতের প্রতি জনগণের অবিশ্বাস, আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সামরিক, ধর্মীয়, নৈতিক ও অভ্যন্তরীণ অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় উপনীত হলে হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ বিজয়ের ফলে এ সাম্রাজ্য ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ইতিহাসের পাতা থেকে বিদায় নেয়।
আব্বাসি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

