- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- আব্বাসি খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ (৭৫০-৭৫৪ খ্রি.)
আব্বাসীয় বংশের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আব্বাস ৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে কুফার মসজিদে নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে যাবের যুদ্ধে উমাইয়া বংশের শেষ খলিফা দ্বিতীয় মারওয়ানকে পরাজিত করে আব্বাসীয় বংশের খলিফা আবুল আব্বাস সিংহাসনে আরোহণ করে আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন। আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠা
খলিফা আবুল আব্বাস আব্বাসীয় আন্দোলনের অন্যতম নেতা আবু সালমার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে কুফা হতে আল-আম্বারে আল-হাশিমিয়া প্রাসাদে গিয়ে বসবাস এবং শাসনকার্য পরিচালনা করেন।
উমাইয়াদের দমন: আবুল আব্বাস উপলব্ধি করেন উমাইয়াদের নিকট হতে সিংহাসন দখল করে নিরাপদে শাসনকার্য পরিচালনা করতে হলে তাদের ধ্বংস করা অপরিহার্য। তাই তিনি পরিকল্পিতভাবে উমাইয়াদের নিধনযজ্ঞের আয়োজন করেন। যেখানে যে অবস্থায় উমাইয়াদের পাওয়া যায় সেখানে হত্যা করেন। আবু ফুট্রস নামক স্থানে ৮০ জন উমাইয়াকে হত্যা করে ইতিহাসে আস-সাফফাহ্ বা রক্তপিপাসু হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। আবুল আব্বাস কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আব্বাসীয় রাজবংশ ইতিহাসের দীর্ঘস্থায়ী ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা করে। নিঃসন্দেহে আবুল আব্বাসকে আব্বাসীয় খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা বলা যায়।
বিভিন্ন বিদ্রোহ দমন: সিংহাসনকে নিষ্কণ্টক করার জন্য আবুল আব্বাস আব্বাসীয় আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় আবু মুসলিমকে খোরাসান ও আব্বাসীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য হিজাজে গভর্নর দাউদকে মোলায়, মানকে বসরায় এবং আব্দুল্লাহকে সিরিয়ার গভর্নর নিয়োগ করেন। সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ায় বিদ্রোহ দেখা দিলে আবুল আব্বাস চাচা আব্দুল্লাহকে বিদ্রোহীদের দমনের জন্য বিশাল বাহিনীসহ প্রেরণ করেন। খলিফার ভাই আবু জাফর এ বিদ্রোহ দমনে অংশগ্রহণ করেন। ওয়াসিতের উমাইয়া শাসনকর্তা ইয়াজিদ ইবন হোরায়রা হযরত আলী (রা.)-এর বংশীয় আব্দুল্লাহ্ ইবন হাসানকে খলিফা ঘোষণা করে বিদ্রোহ করলে আবু জাফর এবং হাসান-বিন-কাহতাবাকে বিদ্রোহ দমনে প্রেরণ করেন। ইয়াজিদ ও তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্রসহ অসংখ্য বিদ্রোহী নিহত হয়। বসরাতেও অনুরূপ দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছিল। তাঁদের হাত হতে রক্ষা পাওয়া বহু উমাইয়া ভীত সন্ত্রস্তভাবে পথে পথে ঘুরে আফ্রিকাসহ উত্তর আফ্রিকা এবং স্পেনে পলায়ন করে আত্মগোপন করেন। আব্বাসীয়দের হাতে উমাইয়া খলিফাদের সমাধি ভূমিগুলো ধূলিসাৎ হয়।
প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস: সাম্রাজ্যে সর্বত্র আব্বাসীয় পতাকা উত্তোলিত হলেও বিভিন্ন এলাকায় বিদ্রোহ সম্পূর্ণভাবে প্রশমিত হয় নি। মুসলমানগণ তাদের শাসনকর্তাকে নীচ বংশীয় বলে বহিষ্কার করলে খলিফা আবুল আব্বাস তাঁর ভ্রাতা ইয়াহ্ইয়াকে সেখানে শাসনকর্তা হিসেবে প্রেরণ করেন। ইয়াহইয়া শান্তি আনয়নের জন্য কঠোর হত্যাকাণ্ড চালালে সাম্রাজ্যে অরাজকতা বৃদ্ধি পায়। ফলে খলিফা তাকে অপসারণ করতে বাধ্য হন। সিন্ধুর শাসনকর্তা আব্বাসীয় শাসনকে অস্বীকার করলে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
খারেজিগণ আব্বাসীয় আন্দোলনে আব্বাসীয়দের পাশে থেকে আব্বাসীয়দের ক্ষমতায় বসান। আব্বাসীয় শাসনে খারেজিগণ বিদ্রোহ করলে আবুল আব্বাস তাদের কঠোর হস্তে দমন করেন। খোরাসানের শাসনকর্তা বিদ্রোহ করলে খলিফার নির্দেশে সমরখন্দের শাসনকর্তা যিয়াদ তা কঠোর হস্তে দমন করেন। বিভিন্ন বিদ্রোহ দমন করে খলিফা আবু সালমার দিকে দৃষ্টিপাত করেন। কৌশলে খলিফা আবু সালমাকে আমন্ত্রণ করে সম্মানের সঙ্গে তাকে দরবারে অভ্যর্থনা জানান। কিন্তু বিদায় গ্রহণ করে বাড়ি ফেরার পথে খলিফার নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয় এবং প্রচার করে দেওয়া হলো যে, খারেজিগণ তাকে হত্যা করেছে।
আবু মুসলিমকে দমন: খলিফা আব্বাসীয় আন্দোলনের অন্যতম নেতা খোরাসানের শাসনকর্তা আবু মুসলিমের মনোভাব যাচাই করার জন্য আবু জাফরকে মাঠে প্রেরণ করেন। আবু মুসলিম খোরাসানে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছে যা আব্বাসীয়দের জন্য হুমকিস্বরূপ। ফলে খলিফা তাকে সন্দেহের চোখে দেখেন। আবু জাফর খলিফাকে এ বিপদ দূর করার পরামর্শ দিলে খলিফা গুপ্তঘাতক প্রেরণ করেন। এ ষড়যন্ত্র প্রকাশিত হলে সমরখন্দের শাসনকর্তা ও উক্ত ঘাতক প্রাণ হারান। ইতোমধ্যে আস-সাফফাহ মৃত্যুবরণ করলে আবু মুসলিম সাময়িককালের জন্য রক্ষা পান।
আবু জাফরকে মনোনয়ন: আবু জাফরকে আব্বাসীয় বংশের পরবর্তী খলিফা মনোনীত করে আব্বাসীয় খিলাফতের স্থায়িত্ব দান করেন।
খলিফা আবুল আব্বাস আস সাফ্ফার মৃত্যু খালিফা আবুল আব্বাস আম্বরের রাজপ্রাসাদে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে (হিজরি ১৩৫) ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৩০ বছর।
আবুল আব্বাস আস সাফ্ফার চরিত্র ও কৃতিত্ব
রক্তপিপাসু খলিফা আবুল আব্বাস প্রায় পাঁচ বছর রাজত্ব করেন। এ সময়ে জনকল্যাণমূলক কার্যের মধ্যে কুফা হতে মক্কা পর্যন্ত রাস্তায় হজ যাত্রীদের জন্য বিশ্রামাগার তৈরি ছিল প্রধান। খালিদ বার্মাককে রাজস্ব বিভাগের প্রধান নিয়োগ করে তাঁর পরিবারবর্গকে উচ্চ মর্যাদা দান করে আব্বাসীয় আন্দোলনে সহযোগিতার প্রতিদান প্রদান করেন।
আবুল আব্বাস কঠোর প্রকৃতির চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তিনি শুধু উমাইয়াদেরই নির্মমভাবে হত্যা করে খান্ত হননি। আব্বাসীয়দের ক্ষমতায় আনায়নে যাদের ভূমিকা আছে তিনি যদি তাকে বিপজ্জনক মনে করতেন তাকেও তিনি হত্যা করতেন। এ প্রসঙ্গে ওয়েল মাউসেন বলেন, "Abul Abbas was no merely a barbarous tyrant, he was a perjureer and an ungreatful traitor." অর্থাৎ আবুল আব্বাস শুধু বর্বর পাষন্ডই ছিলেন না, ভূয়া অঙ্গীকারকারী এবং কৃতঘ্ন ও বিশ্বাসঘাতকও ছিলেন।
নিষ্ঠুরতাসত্ত্বেও তিনি সদাশয় কর্তব্যপরায়ণ ও চারিত্রবান হিসেবেই খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর মাত্র একজন স্ত্রী ছিলেন। তিনি কোন প্রকার উপপত্নী গ্রহণ করেননি। নিজপুত্র থাকা সত্বেও ভ্রাতা আবু জাফরকে সিংহাসনের জন্য উত্তরাধিকারী মনোনয়ন দান করে এক মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, শান্তি ও সংহতি প্রতিষ্ঠায় আপ্রাণ চেষ্টা করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সংযমী, বিচক্ষণ এবং কর্তব্যপরায়ণ। ঐতিহাসিক হিট্রি বলেন, "আবুল আব্বাস ইসলামের সর্বাপেক্ষা গৌরবোজ্জ্বল এবং দীর্ঘতম রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন।"
আব্বাসি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

