- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- আব্বাসি খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
খলিফা আল-আমিন (৮০৯-৮১৩ খ্রি.)
আব্বাসীয় বংশের শ্রেষ্ঠ খলিফা হারুন-অর-রশিদ ৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে খোরাসানের তুস নগরে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর সময় আমিন বাগদাদে, মামুন মার্ভে, কাশিম কিন্নিসিরিনে এবং সম্রাজ্ঞী জুবায়দা রাকায় ছিলেন। ডাকবিভাগের প্রধান হামওয়াইহ খলিফার মৃত্যুর সংবাদ খেলাফতের সর্বত্র প্রেরণ করেন। খলিফা হারুনের মৃত্যুর সংবাদ রাজধানীতে পৌঁছার সাথে সাথে পিতার পূর্ব মনোনয়ন অনুসারে আল-আমিন উত্তরাধিকারসূত্রে আব্বাসীয় খিলাফতে অধিষ্ঠিত হলেন। সিংহাসনে আরোহণ করেই তিনি আমির, উমরাহ, সেনাবাহিনী এবং জনসাধারণের নিকট হতে বশ্যতার শপথ গ্রহণ করেন। আল-মামুনও তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে ভ্রাতাকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়, যা পরিশেষে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত করে।
আল-আমিনের পরিচয়
খলিফা আল-আমিন আব্বাসীয় খলিফা হারুন-অর-রশিদের পুত্র। হারুনের স্ত্রী বেগম যোবায়দার পুত্র আল-আমিন। মক্কায় হজ্জব্রত পালনকালে হারুন-অর-রশিদ আল-আমিনকে তার পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করে যান।
আল-আমিন ও আল-মামুনের গৃহযুদ্ধ
খলিফা হারুন-অর-রশিদের মৃত্যুর পর আমিন খলিফা হলে তার ভ্রাতা মামুনের সঙ্গে তার গৃহযুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধ সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো:
আমিন ও মামুনের মধ্যে গৃহযুদ্ধের পটভূমি: ৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে পিতার মনোনয়ন অনুসারে আমিন সিংহাসনে আরোহণ করলে আল-মামুন ভ্রাতার আনুগত্য স্বীকার করেন। প্রথমে ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। বিলাসব্যসনে মত্ত আমিন অমাত্যবর্গের চক্রান্তে পড়ে মামুনের বিরুদ্ধে এমন কতকগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন যে, মামুনকে বাধ্য হয়ে আমিনের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে হয়। এভাবে আমিন ও মামুনের মধ্যে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে।
গৃহযুদ্ধের কারণ: আমিন ও মামুনের মধ্যকার গৃহযুদ্ধের কতিপয় কারণ নিম্নে আলোচনা করা হলো:
উত্তরাধিকারী নির্বাচনে সুনির্দিষ্ট নীতির অভাব আব্বাসীয় খিলাফতে উত্তরাধিকারী নির্বাচনের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতি না থাকায় আমিন ও মামুনের মধ্যে আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। খলিফা হারুন-অর-রশিদ ৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মুহাম্মদকে 'আল-আমিন' উপাধি দিয়ে সিংহাসনে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। অতঃপর ৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র আব্দুল্লাহকে 'আল-মামুন' উপাধি দিয়ে আল-আমিনের উত্তরাধিকারী নির্বাচন করেন। পরে তিনি তৃতীয় পুত্র কাশিমকে 'মুতামিন' উপাধি দিয়ে মামুনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। হারুন তাঁর জীবদ্দশায় মামুনকে পূর্বাঞ্চলের, আমিনকে পশ্চিম অঞ্চলের এবং কাশিমকে মেসোপটেমিয়ার সীমান্ত অঞ্চলের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন।
খলিফা হারুন একাদিক্রমে তিন পুত্রকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে এবং তাদের অধীনে সাম্রাজ্যকে তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত করে ভ্রাতৃত্ববোধ ও গৃহযুদ্ধের পথকে প্রশস্ত করে যান।
আমিন ও মামুনের মধ্যে চারিত্রিক পার্থক্য: আমিন ও মামুনের চারিত্রিক বৈসাদৃশ্য উত্তরাধিকারী সংগ্রামের অন্যতম কারণ। আমিন চরিত্রহীন, বিলাসী, আমোদপ্রিয় ও চঞ্চল স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। পক্ষান্তরে, মামুন চরিত্রবান, প্রগতিশীল, বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান ও ধার্মিক ছিলেন। ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে এই চরিত্রগত বৈসাদৃশ্য উভয়ের মধ্যে সংঘটিত গৃহযুদ্ধের অনুকূলে কাজ করেছিল। কারণ মামুনের চারিত্রিক গুণাবলি আমিনের মনে ঈর্যার উদ্রেক করে। ঈর্ষান্বিত হয়ে আমিন মামুনের বিরুদ্ধে এমন কতকগুলো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন যা ভ্রাতৃবিরোধের সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করেছিল।
আমিন কর্তৃক পিতার ইচ্ছাপত্র লঙ্ঘন: ৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা হারুন এক বিশাল সেনাবাহিনীসহ খোরাসানের বিদ্রোহ দমনে অগ্রসর হন। পথিমধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর সাথে সৈন্যবাহিনী এবং অর্থভাণ্ডার মামুনকে চুক্তির মাধ্যমে দান করে যান। পূর্বাঞ্চলের রক্ষা ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যেই তিনি এই ব্যবস্থা অবলম্বন করেন। আমিন খিলাফতে অধিষ্ঠিত হয়েই পিতার সাথে সম্পাদিত ভ্রাতা মামুনের চুক্তিপত্র ভঙ্গ করেন। আমিন গুপ্তচর ও প্রতিনিধি পাঠিয়ে মামুনের উল্লিখিত বাহিনীকে বাগদাদে ফিরিয়ে আনেন এবং তাদেরকে প্রচুর উৎকোচ দিয়ে স্বপক্ষে আনয়ন করেন। প্রাসাধ্যাক্ষ ফজল-বিন-রাবিকে আমিন উজির পদ প্রদান করেন। আমিনের এ অন্যায় আচরণে মামুন তাঁর উপর অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন।
আরব আমির ও পারসিক আমিরদের মধ্যে বিদ্বেষ আব্বাসীয় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর হতেই সাম্রাজ্য শাসনের ব্যাপারে প্রভুত্ব ও প্রাধান্য নিয়ে আরব আমির এবং পারসিক আমিরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও রেযারেবি চলছিল। খলিফা আমিন, তাঁর মাতা, সমর্থকগণ ও অমাত্যবর্গ সকলেই আরবীয় ছিলেন। অপরপক্ষে মামুনের মাতা, সমর্থক ও পরামর্শদাতা সকলেই পারসিক ছিলেন। আরব আমির আর পারসিক আমিরগণ নিজ নিজ অভীষ্ট স্বার্থসিদ্ধির জন্য আত্মঘাতী কলহ ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। সুতরাং আরব আমির এবং পারসিক আমিরদের মধ্যে বিদ্যমান কলহ-বিবাদ আমিন ও মামুনের ভ্রাতৃবিরোধকে ত্বরান্বিত করে তোলে।
মামুনের সুশাসনে আমিনের ঈর্ষা: আমিনের উজির ফজল-বিন-রাবির বিশ্বাসঘাতকতায় সেনাবাহিনী এবং অর্থ-সম্পদ হতে বঞ্চিত হয়ে মামুন অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েন। এই সংকটময় মুহূর্তে ফজল-বিন-সাহল নামক জনৈক পারসিক উপদেষ্টা এবং প্রখ্যাত সেনাপতি হারসামা ও তাহির-বিন-হুসাইন মামুনের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন। উদার ও দক্ষ শাসন পরিচালনা করে এবং প্রজাদের কর মওকুফ করে দিয়ে মামুন প্রাচ্য প্রদেশসমূহের জনগণের হৃদয় জয় করতে সমর্থ হন। তারা মামুনকে তাদের 'ভগিনীর পুত্র' মনে করে তাঁর পার্শ্বে সমবেত হলো। প্রাচ্যে সুশাসনের জন্য মামুনের ক্রমবর্ধমান সুখ্যাতি আমিনের মনে ঈর্ষার উদ্রেক করে। ঈর্যান্বিত আমিন মামুনকে প্রাচ্যের শাসনকর্তার পদ হতে অপসারিত করার সুযোগ অন্বেষণ করতে লাগলেন।.
আমিনের আমোদপ্রিয়তা ও রাজকার্যে অবহেলা। মামুন যখন প্রাচ্য প্রদেশসমূহে শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করেন তখন অদূরদর্শী ও উদাসীন খলিফা আমিন বিলাসব্যসনে মত্ত ছিলেন। তিনি রাজ্যের শাসনভার স্বার্থান্বেষী উজির ফজল-বিন-রাবির উপর ন্যস্ত করে অন্দরমহলের বিলাসব্যসনে মগ্ন হলেন। তাঁর রাজ্যসভা গায়িকা ও নর্তকীদের আবাসস্থলে পরিণত হলো। আমিন।
'ব্যালেট' নামক এক নতুন ধরনের নৃত্য প্রবর্তন করলেন, টাইগ্রিস নদীতে জলক্রীড়া এবং আমোদ-আহলাদ করার জন্য তিনি সুসজ্জিত পাঁচটি বজরা নির্মাণ করলেন। এভাবে রাজকার্য উপেক্ষা করে আমিন আমোদ-প্রমোদে সময় অতিবাহিত করতে লাগলেন। খলিফার বিলাসব্যসনে অপরিসীম অর্থ ব্যয় করার ফলে রাজকোষে অর্থ সংকট দেখা দেয়। আমিন ও তাঁর উজির ফজল-বিন-রাবির কুশাসনের ফলে সাম্রাজ্য ধ্বংসের মুখে ধাবিত হচ্ছিল। জনসাধারণ তাঁদের অত্যাচার হতে মুক্তি লাভের জন্য প্রহর গুণছিল।
ফজল-বিন-রাবির খিলাফত লাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা খলিফা আমিনের উজির ফজল-বিন-রাবি অযোগ্য হলেও খিলাফতের সিংহাসনে আরোহণ করার দুরাশা মনে মনে পোষণ করতেন। মামুনকে তিনি সব সময় প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন। সুতরাং মামুনকে ধ্বংস করাই ফজল-বিন-রাবির একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল। তিনি সব সময় খলিফা আমিনকে মামুনের বিরুদ্ধে কুমন্ত্রণা দিয়ে ষড়যন্ত্র পাকাতে লাগলেন। আমিনের চরিত্রগত দুর্বলতায় অবগত হয়ে নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য ফজল-বিন-রাবি খলিফা আমিনের পক্ষ সমর্থন করছিলেন।
আমিন কর্তৃক' চুক্তিপত্রের শর্ত ভঙ্গ আমিন ৮১১ খ্রিষ্টাব্দে মামুনের স্থলে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মুসাকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। কিছুদিন পর তাঁর দ্বিতীয় পুত্রকে তৎপরবর্তী উত্তরাধিকারী নিযুক্ত করেন। এভাবে আমিন পিতা হারুন-অর-রশিদ কর্তৃক নির্ধারিত মনোনয়ন ব্যবস্থার পরিবর্তন করে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেন।
মামুনকে প্রাচ্যের শাসনকর্তার পদ হতে অপসারিত: উজির ফজল-বিন-রাবির কুপরামর্শে পরিচালিত হয়ে খলিফা আমিন ৮১০ খ্রিষ্টাব্দে মামুনকে প্রাচ্যের শাসনকর্তার পদ হতে অপসারিত করে তাঁকে আত্মসমপর্ণ করতে নির্দেশ দেন। এছাড়াও আমিন তার অপর ভ্রাতা কাসিমকেও মেসোপটেমিয়া ও সীমান্ত অঞ্চলের শাসনকর্তার পদ হতে অপসারিত করেন।
তার সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ: খলিফা আমিনের উজির ফজল-বিন-রাবি খলিফা হারুন-অর-রশিদ কর্তৃক দেয় মামুনের ১,০০,০০০ দিরহাম এবং ব্যক্তিগত সকল প্রকারের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন।
পুত্রদ্বয়কে হত্যার ষড়যন্ত্র: উজির ফজল রাজধানীতে অধ্যয়নরত মামুনের দুই পুত্রকে হত্যা করার জন্য খলিফাকে পরামর্শ দেন। অবশ্য খলিফা আমিন এ কাজ করতে অস্বীকৃত হন।
গৃহযুদ্ধের ঘটনা: উপর্যুক্ত কারণের পরিপ্রেক্ষিতে ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে সশস্ত্র যুদ্ধ আরম্ভ হয়। খলিফা আমিন, আলী-বিন ঈশার নেতৃত্বে ভ্রাতা মামুনের বিরুদ্ধে ৫০,০০০ হাজার সৈন্যের একটি বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন। মামুনের সেনাপতি তাহির-বিন-হোসাইন ৮১১ খ্রিষ্টাব্দে রাভী নামক স্থানে সংঘটিত যুদ্ধে আমিনের সৈন্যবাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। যুদ্ধে আমিনের সেনাপতি আলী-বিন-ঈশা নিহত হন।
অতঃপর সেনাপতি আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে প্রেরিত খলিফা আমিনের সেনা দলটিও মামুনের সেনাপতি হারসামা ও জুহাইর নিকট পরাজিত হয়। সেনাপতিদ্বয় একত্রে বাগদাদ অবরোধ করেন। কয়েক মাস পর্যন্ত রাজধানী বাগদাদ অবরুদ্ধ থাকে। দীর্ঘদিন অবরোধের ফলে বাগদাদ নগরীর অপূরণীয় ক্ষতি হয়। বাগদাদবাসী প্রায় সকলেই আমিনের পক্ষ ত্যাগ করতে শুরু করেন।
আমিনের পরাজয়: অবশেষে গত্যন্তর না দেখে খলিফা আমিন তাঁর মাতা ও পরিবারবর্গ নিয়ে দজলার পশ্চিম তীরে অবস্থিত মদিনাতুল মনসুর দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরিশেষে বাধ্য হয়ে খলিফা আমিন মামুনের সেনাপতি হারসামার নিকট আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু রাত্রির অন্ধকারে কতিপয় উগ্রপন্থী পারসিক কর্তৃক হতভাগ্য খলিফা আমিন নিহত হন। এভাবে ৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র চার বছর আট মাস গোলযোগপূর্ণ রাজত্বের পর আমিনের খিলাফতের পরিসমাপ্তি ঘটে। মামুন ভ্রাতার এই মর্মান্তিক জীবনাবসানের সংবাদ পেয়ে শোক বিহ্বল হয়ে পড়েন। তিনি অনতিবিলম্বে হত্যাকারীদের উপযুক্ত শাস্তি বিধান করেন। এছাড়া তিনি আমিনের পুত্রগণকে নিজপুত্র হিসেবে গ্রহণ করে তাদের যাবতীয় সম্পত্তির ভোগ-দখলের অধিকার প্রদান করেন এবং তারা বড় হলে নিজ কন্যাগণের সাথে বিবাহ দিয়ে ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্কের অসামান্য সৌজন্য প্রকাশ করেন। এভাবে আমিন ও মামুনের মধ্যে সংঘটিত গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে।
মামুনের সফলতা ও আমিনের ব্যর্থতার কারণ (Causes of the Success of Mamun and the Failure of Amin)
গৃহযুদ্ধে মামুন বিজয়ী হয় এবং আমিন পরাজিত হয়। এর যতগুলো কারণ রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য: মামুনের সফলতার অন্যতম কারণ হলো তাঁর গুণময় চরিত্র। অন্যদিকে আমিনের ব্যর্থতার কারণ হলো তাঁরই কলঙ্কময় চরিত্র। আমিনের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আমিন-অলস, অকর্মণ্য, দুরাত্ম, কৃতঘ্ন ও লালসাগ্রন্থ। অন্যদিকে, মামুন ছিলেন জ্ঞানী, চরিত্রবান, ন্যায়নিষ্ঠ, ধর্মভীরু, সৎ ও ধৈর্যশীল। আমিন যেমন সুরা ও সঙ্গীতে আকণ্ঠ মা থেকে দেশব্যাপী কুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন, মামুন তেমনি জ্ঞানচর্চায় মগ্ন থেকে দেশব্যাপী শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। রাজ্যকে কেন্দ্র করে আমিনের প্রধান আকর্ষণ ছিল প্রমোদ-বিহার, নৃত্য, মৃগয়া প্রভৃতি। কিন্তু মামুনের প্রিয় বস্তু ছিল জ্ঞানচর্চা। আমিনের অনৈসলামিক কার্যকলাপের জন্য তাঁর আপন গোষ্ঠী সুন্নী জামাত তাঁর প্রতি আস্তা হারিয়ে ফেলেন, অন্যদিকে মামুনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য আপন গোষ্ঠী শিয়া সম্প্রদায়ের চরম শ্রদ্ধাভাজন হন। এভাবে দেখা যায় মামুনের চরিত্র-বলই মামুনের সফলতার গোপন রহস্য ছিল। আমিনের বিশাল সাম্রাজ্য-বল, সেনা-বল, সম্পদ-বল সকল কিছুই মামুনের একমাত্র চরিত্র-বলের নিকট পরাজিত হয়।
মামুনের সেনাপতির দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা: ৮১১ খ্রিষ্টাব্দে আলী বিন ঈসা বিন মাহানের নেতৃত্বে ৫০,০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী রাইয়ে প্রেরিত হয়। মামুনের সেনাপতি তাহির বিন হুসাইনের প্রতিরোধের মুখে আলী বিন ঈসা নিহত ও সৈন্যবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়। আলী বিন ঈসার মৃত্যুতে তাঁর পুত্র হুসাইন খলিফার উপর ক্ষুদ্ধ হন এবং সিরীয় বাহিনীকে উত্তেজিত করে খলিফা ও রাজমাতা জুবাইদাকে বন্দি করেন। পরবর্তীকালে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য হুসাইনকে হত্যা করা হয়। বাগদাদ অবরোধকালে সেনাবাহিনীকে অর্থ প্রদানের ফলে তাদের মাঝে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং খলিফার প্রতি আনুগত্যের অভাব পরিলক্ষিত হয়। মামুনের সেনাপতি হারসামা, তাহির এবং জুহাইর ছিলেন দক্ষ, যোগ্য ও কৌশলী। মামুনের প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধাবোধ ও আন্তরিকতা ছিল। এছাড়া আমীন অন্যায়ের পথে এবং মামুন ন্যায়ের পথে সেনাবাহিনীকে পরিচালনা করেন। এ কারণে মামুনের সেনাবাহিনীর সততা, আন্তরিকতা, উদ্যমতা ইত্যাদির কাছে আমিনের সেনাবাহিনীর পরাজয় ঘটে।
আমিনের মন্ত্রীর অযোগ্যতা: আমিন ছিলেন অপদার্থ, তাই সর্বদা শাসনকার্যে মন্ত্রী ফজল ইবনে রাবীর ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মন্ত্রী ফজল ইবনে রাবীও ছিলেন স্বার্থান্বেষী, অযোগ্য। এভাবে আমিনের শাসনকার্যে অবহেলা, উজির রাবীর ওপর নির্ভরশীলতা, এসবের ওপর উজিরের অপদার্থতা ও বিলাসপ্রিয় আমিনের অধঃপতনকে ত্বরান্বিত করে মামুনের সফলতাকে সহজ করে তোলে।
আমিনের বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি আমিনের সেনাপতি আলি ইবনে ঈসা ছিলেন বিশ্বাসঘাতক। মামুন বাগদাদ অবরোধ করলে ইবনে ঈসা আত্মগোপন করে। পরবর্তীতে রায়ের নিকট আলি ইবনে ঈসা মামুনের সেনাপতি তাহিরের নিকট পরাজিত ও নিহত হয়। এতে তাঁর পুত্র হুসাইন খলিফার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে ষড়যন্ত্র মূলক কার্য কলাপে লিপ্ত হয়ে সিরিয়া বাহিনীকে খলিফার বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে বাগদাদ অভিযান করে খলিফা আমিন ও রাজমাতা জুবাইদাকে কদী করেন। পরবর্তীকালে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তাঁকে হত্যা করা হয়। এক কথায় আমিনের কর্মচারী ও সেনাপতিদের বিশ্বাসঘাতকতাই আমিনকে ক্ষমতচ্যুত করে। অধিকন্তু স্বার্থান্বেষী ও ক্ষমতালিপু মন্ত্রী ফজল ইবনে রাবীও পতনের পূর্বমুহূর্তে গোপনে পলায়ন করে আত্মগোপন করেন। তাই সকল দিক থেকেই খলিফা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হলেন।
খলিফার অমিতব্যয়িতা: চরম অমিতব্যয়িতার ফলে খলিফার রাজকোষ শূন্য হতে থাকে। সঙ্গীতপ্রিয় আমিন আবু নুওয়াসের কবিতার কয়েকটি পংক্তি আবৃত্তি করায় তার পিতৃব্য বিখ্যাত সঙ্গীত বিশারদ ইব্রাহিম ইবনে আল মাহদিকে ৩ লক্ষ দীনার উপহার দেন। এইভাবে বহু নতর্কী ও গায়িকাকে দিনে দিনে প্রচুর উপহার ও উপঢৌকন দিতে থাকেন। এই অধ্যায়ে খলিফা আমিনের সঙ্গে একমাত্র তুলনা করা চলে উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় ইয়েজিদ (৭২০-২৪ খ্রিষ্টাব্দ), যাকে মদ্যপ ও লালসাগ্রস্ত, অমিতব্যয়ী উমাইয়া সন্তান এবং অধার্মিক স্বৈরচারী শাসক উপাধি দেওয়া হয়। যিনি তাঁর প্রিয়তমা প্রণয়িনী গায়িকা হাকাবার মৃত্যু শোকে বিহ্বল হয়ে সপ্তম দিনে মারা যান। নৌ-বহরের জন্য তিনি জনুর আকৃতিতে পাঁচটি বজরা তৈরি করেন, প্রতিটি নির্মাণ খরচ হয় ৩০ লক্ষ দিরহাম। এই সমস্ত অমিতব্যয়িতা আমিনের রাজত্বে একদিন অভিশাপ রূপে দেখা দিয়ে তার পতনকে তরান্বিত করে এবং মামুনের সফলতার সোনার চাবি রূপে ভূমিকা পালন করে।
পারস্যবাসীদের সমর্থন: খলিফা আমিন ছিলেন রাজমাতা জুবাইদার সন্তান। আর মামুন ছিলেন পারস্য-তনয়া পরমাসুন্দরী মারাজিলার সন্তান। পারস্যবাসীগণ অতি স্নেহভরে মামুনকে ভগ্নীর সন্তান ভাগ্নে বলে ডাকতেন। মামুনের প্রতি ছিল তাঁদের অকুণ্ঠ সমর্থন। এই সমর্থনকে মামুন তাঁর আপন চরিত্র-বল দ্বারা বহু গুণে বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। অপরদিকে, আমিন তাঁর আপন চারিত্রিক দুর্বলতার জন্য হারালেন আরববাসীদের অকুণ্ঠ সমর্থন। তাই আমিনের প্রতি আরববাসীদের অসমর্থন ও মামুনের প্রতি পারস্যবাসীদের সমর্থন একজনের জন্য পরাজয় ও অন্যজনের জন্য জয়ের মাল্য বহন করে আনল।
আমিন ও মামুনের যুদ্ধের ফলাফল
আল-আমিন ও মামুনের মধ্যকার গৃহযুদ্ধের ফলাফল নিম্নরূপ:
আরবীয় প্রাধান্য বিলুপ্ত: আল-আমিনের রাজত্বকালে আরবীয়দের প্রাধান্য ছিল। কিন্তু এ যুদ্ধে মামুনের জয়লাভে আরবদের প্রাধান্য বিলুপ্ত হলো। তাদের ধর্ম ও ভাষা কেবল জীবন্ত থাকল এবং আরব জাতীয়তাবাদের মৃত্যু ঘটল। সাম্রাজ্যে পারসিক চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটে। পারসিকদের রাজকার্যের প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়।
অন্যায় ও অত্যাচারের অবসান: আমিনের কুশাসন, অন্যায় ও অত্যাচারে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। মামুনের জয়লাভের ফলে জনগণ অন্যায় ও অত্যাচারের হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভ করে।
শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার উন্মেষ: আল-মামুন ছিলেন একজন জ্ঞানী, সংস্কৃতিমনা, সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক। মামুনের জয়লাভের ফলেই ইসলামি সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটে।
আমিনের বিরুদ্ধে মামুনের সাফল্যের কারণ: আমিনের বিরুদ্ধে মামুনের গৃহযুদ্ধে জয়লাভের কারণগুলো নিম্নে লিপিবদ্ধ করা হলো:
চরিত্রগত পার্থক্য: আমিন অযোগ্য ও বিলাসপ্রিয় ছিলেন। আমিন ও তাঁর উজির ফজল-বিন-রাবির কুশাসনে জনসাধারণ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে; অপরপক্ষে মামুন চরিত্রবান, ধার্মিক, উদার, কর্মঠ, মার্জিত, শিক্ষিত ও প্রতিভাবান ছিলেন। তাঁর সুশাসনে প্রাচ্যদেশে প্রজাগণ সুখ ও শান্তিতে বসবাস করছিল। সুতরাং উভয়ের মধ্যে চরিত্রগত পার্থক্য মামুনের জয়ের পথ প্রশস্ত করেছিল।
যোদ্ধা হিসেবে মামুনের শ্রেষ্ঠত্ব: আমিন ছিলেন অযোগ্য শাসক ও অপরিণামদর্শী রণনায়ক, অপরপক্ষে মামুন ছিলেন সুযোগ্য শাসক ও পারদর্শী রণনায়ক। মামুনের সামরিক প্রতিভার বিরুদ্ধে বিলাসী ও অদক্ষ রণনায়ক আমিনের জয়লাভ করা সম্ভবপর ছিল না।
গণসমর্থনের অভাব: চারিত্রিক দুর্বলতার জন্য আমিনের পেছনে গণসমর্থন ছিল দুর্বল। অন্যদিকে মামুন তার চারিত্রিক মাধুর্য ও দক্ষ শাসনে জনগণের হৃদয় জয় করতে সমর্থ হন।
পারসিকদের শ্রেষ্ঠত্ব: পারসিকগণ আরবদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কৌশলী এবং যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন। আমিন তাঁর সেনাবাহিনীকে অর্থ দ্বারা বশীভূত করেছিলেন। কিন্তু মামুনের অনুসারীরা তাঁকে ভগ্নীর পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নিঃস্বার্থভাবে তাঁর জয়লাভের জন্য যুদ্ধ করেছিল।
আমিনের পরামর্শদাতা ও সেনাপতিদের অযোগ্যতা: আমিনের সমর্থকগণের অযোগ্যতা ও স্বার্থপরতা তাঁর পতনের জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিল। আমিনের উজির ও প্রধান উপদেষ্টা ফজল-বিন-রাবির অপরিণামদর্শিতা এবং কুচক্রান্ত আমিনের পরাজয়ের পিছনে কাজ করেছিল। আলী ইবনে ঈশার দুর্বল সেনাপতিত্ব আমিনের পতনের অন্যতম কারণ।
অপরপক্ষে, মামুনের উপদেষ্টা ফজল-বিন-সাহলের বুদ্ধিমত্তা ও কর্মতৎপরতা এবং তাহির-বিন-হুসাইন, হারসামা ও জুহাইরের সফল সেনাপতিত্ব মামুনের জয়কে ত্বরান্বিত করেছে।.
সংগ্রামের মৌলিক পার্থক্য মামুনকে অপসারিত করার জন্য খলিফা আমিন যে সকল পন্থা অবলম্বন করেছিলেন তা ন্যায়-নীতির দিক থেকে অযৌক্তিক ছিল। আমিন অনুসরণ করেছিলেন অন্যায় পথ এবং মামুন অনুসরণ করেছিলেন ন্যায়ের পথ। ন্যায়ের নিকট অন্যায় পরাজয় বরণ করতে বাধ্য।
অস্তিত্বের প্রশ্ন: আমিন তাঁর ক্ষমতাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মামুনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন। অপরপক্ষে, মামুন স্বীয় অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। মামুনের সেনাপতিগণ মামুনকে রক্ষার জন্য জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে যুদ্ধ করছিল। সুতরাং এক্ষেত্রে মামুনের পক্ষে জয়লাভ করা সহজ ব্যাপার ছিল।
আমিন ও মামুনের মধ্যকার গৃহযুদ্ধ ইসলামের ইতিহাস তথা আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাসে মর্মান্তিক ঘটনা। এ যুদ্ধে জয়লাভের ফলে মামুন মুসলিম সাম্রাজ্যের কর্ণধার হন। তাঁর দীর্ঘ রাজত্বকালে মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি হয়। অযোগ্যতার উপর যোগ্যতার বিজয় হয়। অন্যায়ের উপর ন্যায় প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
আব্বাসি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

