• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • আব্বাসি খিলাফত
আব্বাসি খিলাফত

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

খলিফা আবু জাফর আল মনসুর (৭৫৪-৭৭৫ খ্রি.)

ঐতিহাসিক আমির আলী বলেন, "Although-Suffah is the first sovereign of the Banu Abbas, Abu Jafar must be regarded as the real founder of the dynasty." অর্থাৎ "আস-সাফ্ফাহ্ বনু আব্বাসের প্রথম নৃপতি হলেও আবু জাফর আল-মনসুরকে এ বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকার করতেই হবে।" কারণ আস-সাফফাহ্ যদিও আব্বাসীয় বংশের প্রথম খলিফা ছিলেন কিন্তু তিনি সময়ের অভাবে তাঁর বংশকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে যেতে পারেন নি। সিংহাসনে আরোহণ করে তিনি শুধু উমাইয়াদের উপর প্রতিহিংসাজাত নিষ্ঠুরতাই করেছেন। খিলাফতকে অন্তবিপ্লব ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ হতে রক্ষা করে যেতে পারেন নি। আবু জাফর আল-মনসুর সিংহাসনে এসে অক্লান্ত পরিশ্রম, অদম্য সাহস, দূরদর্শিতা ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞার দ্বারা নব প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যের ভিতর-বাইরের সকল বিদ্রোহ দমন করে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তাই আস-সাফফাহ্ আব্বাসীয় বংশের প্রথম খলিফা হলেও আল-মনসুরকেই আব্বাসীয় বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

সিংহাসনারোহণ: আস-সাফফার মৃত্যুর সময় আবু জাফর মক্কায় হজ রত ছিলেন। আবু জাফরের ভ্রাতুষ্পুত্র ঈসা কুফায় আবু জাফরকে খলিফা বলে স্বীকার করে তাঁর প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে আনুগত্য প্রদর্শন করেন। খলিফার মৃত্যুর সংবাদ শুনে আবু জাফর দ্রুতগতিতে বিজয়ীর বেশে কুফায় এসে মসজিদ প্রান্তরে উদ্বোধনী বক্তৃতা দিয়ে রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হলেন। ৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দে আবু জাফর খিলাফত প্রাপ্ত হয়ে 'আল-মনসুর' (বিজয়ী) উপাধি গ্রহণ করে শাসনকার্যে মনোনিবেশ করেন।

আব্বাসীয় শাসন সুদৃঢ়ীকরণ

অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন: আব্বাসীয় শাসনকে সুদৃঢ়করণের জন্য আবু জাফর অভ্যন্তরীণ গোলযোগ দমনের জন্য যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তা নিম্নরূপ:

আব্দুল্লাহর বিদ্রোহ দমন খলিফা আল-মনসুর খিলাফত লাভের পরেই তাঁর চাচা এবং সিরিয়ার শাসনকর্তা আব্দুল্লাহ-বিন-আলী বিদ্রোহ ঘোষণা করে নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। কারণ আবুল আব্বাস তাকে পরবর্তী খলিফা বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আস-সাফফাহ্ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ভ্রাতা আবু জাফরকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করায় আব্দুল্লাহ্ তাঁর সৈন্যদের নিকট হতে খলিফা হিসেবে আনুগত্য লাভ করে হাররানের দিকে অগ্রসর হন। আল-মনসুরের নির্দেশে খোরাসানের শাসনকর্তা আবু মুসলিম আব্দুল্লাহকে ৭৫৪ খ্রিষ্টাব্দে নাসিবিনের যুদ্ধে পরাজিত করেন। আব্দুল্লাহ্ দীর্ঘ ৭ বছর কারাবরণের পর মৃত্যুবরণ করলে আল-মনসুর বিপদমুক্ত হন।

আবু মুসলিমের বিদ্রোহ দমন: আব্দুল্লাহর পতনের পর আল-মনসুর আবু মুসলিমের দিকে দৃষ্টি দেন। কারণ আবু মুসলিম খোরাসানে এত জনপ্রিয় ছিলেন যে, আল-মনসুর তাঁর ক্ষমতায় শঙ্কিত হন এবং ভবিষ্যৎ প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে তাকে হত্যা করার জন্য পরিকল্পনা করেন। নাসিবিনের যুদ্ধে জয়ের পর খোরাসানে ফেরার পথে খলিফার আমন্ত্রণে আবু মুসলিম খলিফার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আবু মুসলিম খলিফার মনোভাব বুঝতে পেরে প্রথমে নির্দেশ অমান্য করলেও পরবর্তী মুহূর্তে খলিফার প্রতারণাপূর্ণ মুধর বাক্যে বিশ্বাস করে মাদায়নে খলিফার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। খলিফার সঙ্গে আলাপরত অবস্থায় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আবু মুসলিমকে ৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দে হত্যা করা হয়। যে আবু মুসলিম অক্লান্ত পরিশ্রম করে আব্বাসীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই বীর তাঁর প্রতিদানে নিষ্ঠুরভাবে আব্বাসীয়দের হাতেই নিহত হন। বস্তুত আবু মুসলিম যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন মনসুর নিজেকে সিংহাসনে নিরাপদ মনে করেননি।

আবু মুসলিমের পরিচয়

প্রাথমিক পরিচয়: আবু মুসলিম ছিলেন আরব বংশোদ্ভূত ইরানের অধিবাসী। তিনি ইস্পাহানে প্রাথমিক জীবন কাটান। অসাধারণ বাগ্মী হিসেবে তার তুলনা ছিল না। তাঁর ক্ষুরধার ও হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতায় শত্রু-মিত্র সবাই বিমোহিত হয়ে যেত। উমর ইবনে আব্দুল আযিযের খেলাফতকালে আবু মুসলিম হজ্বব্রত পালনের জন্য মক্কায় আগমন করেন। এসময় আব্বাসী আন্দোলনের পূর্ব পুরুষ মোহাম্মদ বিন আনাফিয়্যাহর সাথে যোগাযোগ হয়। তিনি আবু মুসলিমের শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ ও দূরদর্শিতা দেখে তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাকে নিজের কাছে রেখে দেন। পরে তিনি আব্বাসীয় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। আর এখানেই তিনি বিখ্যাত হয়ে পড়েন।

সংগঠক: খোরাসান এলাকায় আবু মুসলিম প্রথমে আব্বাসীয় আন্দোলনের প্রচার কাজ শুরু করেন। ইস্পাহানে এক সাধারণ পরিবারে জন্ম হলেনও স্বীয় প্রতিভাবলে সাম্রাজ্যের একজন রাজস্থাপক (King Maker) হয়ে উঠেন। তাঁর মোহনীয় বক্তৃতায় আলী বংশীয়, ফাতেমীয়, সুন্নি, মাওয়ালি, খারেজি প্রভৃতি দলমতের লোক সকল ভেদাভেদ ভুলে তাঁর পতাকাতলে সমবেত হয়। এভাবে খোরাসান আব্বাসীয় আন্দোলনের শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত হয়। তাঁর অসাধারণ সাহস, প্রতিভা ও যোগ্যতাবলে উমাইয়্যাদের পতন ও আব্বাসীয়দের উত্থান সম্ভব হয়েছিল। ঐতিহাসিক মুর বলেন, "Hardly Thirty five years old, he (Abu Muslim) by this rare wisdom, zeal and generalship change the whole outlook of Islam, and raised the house of Abbas upon the ruins of the house of Umayyad." অর্থাৎ, মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে আবু মুসলিম তাঁর অসাধারণ ধীশক্তি, কর্মতৎপরতা এবং বীরত্ব দ্বারা উমাইয়াদের ধ্বংসস্তুপের উপর আব্বাসীয় বংশকে প্রতিষ্ঠিত করে ইসলামের ধ্যান-ধারণায় অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধন করেন।

চরিত্র ও কৃতিত্ব: আবু মুসলিম আব্বাসীয়গের একজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ছিনে। তিনি ছিলেন নানাগুণে বিভূষিত। তিনি একদিকে যেমন উদার ও অতিথিপরায়ন ছিলেন, অন্যদিকে তেমনি ছিলেন নির্দয় ও নিষ্ঠুর। আরববাসী ও পারস্যের দুর্বলতা সম্বন্ধে তিনি জানতেন। কিন্তু এতগুণ থাকা সত্বেও খোরাসানে আবু মুসলিমের অপরিসীম ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। তাকে প্রতিপক্ষের কারণে জীবন দিতে হলো।

সানবাদের বিদ্রোহ দমন: আবু মুসলিমকে অপ্রত্যাশিত ও বর্বরোচিত হত্যার প্রতিবাদে খোরাসান ও পারস্যবাসীরা মাজুসি দলপতি সানবাদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ করেন এবং পারস্য ও মেসোপটেমিয়াতে বিদ্রোহীরা সন্ত্রাস সৃষ্টি করে। আল-মনসুর বাধ্য হয়ে কঠোর হস্তে তাদের দমন করেন এবং রাজ্যে শান্তি-শৃভালা প্রতিষ্ঠা করেন।

রাওয়ান্দিয়া সম্প্রদায়কে দমন খলিফা আল-মনসুর ধর্মপ্রাণ ছিলেন বলে ৭৫৮ খ্রিষ্টাব্দে রাওয়ান্দিয়া সম্প্রদায় খলিফাকে আল্লাহর অবতার (নাউজুবিল্লাহ) বলে ঘোষণা করেন। তাদের এরূপ ধর্মবিরোধী কার্যের জন্য মনসুর বাধ্য হয়ে তাদের ২০০ জনকে কারারুদ্ধ করেন। ৬০০ রাওয়ান্দিয়ার একটি দল প্রাসাদের সম্মুখে এসে খলিফার সাক্ষাৎ প্রার্থনা করেন, খলিফা তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তারা হঠাৎ খলিফাকে আক্রমণ করে। সৌভাগ্যক্রমে মারওয়ানের বংশধর মারান-বিন-যায়েদা কিছুসংখ্যক সৈন্যসহ ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। খলিফার দুর্গতি দেখে তিনি আক্রমণকারী রাওয়ান্দিয়াদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে খলিফাকে উদ্ধার করেন। এজন্য খলিফা তাকে সিজিস্তানের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে উপযুক্ত পুরষ্কার প্রদান করেন। এছাড়া খলিফার

দুর্গতি দেখে পুত্র আল-মাহদী ও সেনাপতি খোজাইমা বিদ্রোহীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাদের কঠোর হস্তে দমন করেন। খোরাসানের বিদ্রোহ দমন খোরাসানের শাসনকর্তা বিদ্রোহ ঘোষণা করলে রাওয়ান্দিয়া সম্প্রদায়কে পরাজিত করে ৭৫৯ খ্রিষ্টাব্দে আল-মাহদী ও সেনাপতি খোজাইমা সসৈন্যে খোরাসান আক্রমণ করেন। রাজ্যপাল পরাজিত ও নিহত হলে বিদ্রোহীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করে এবং সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে উস্তাদ-শিষ্যের নেতৃত্বে খোরাসানে পুনরায় বিদ্রোহ দেখা দেয়। মনসুর উস্তাদ-শিষ্যকে পরিবারবর্গসহ বন্দী করে বাগদাদে নিয়ে এলে খোরাসানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

আলী বংশীয়দের প্রতি তাঁর দুর্ব্যবহার আলী ও ফাতেমীয় বংশের লোকেরা আব্বাসীয় বংশের উত্থানের সময় পূর্ণ সমর্থন ও সাহায্য করলেও আল-মনসুর তাদের ভবিষ্যতের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং খিলাফতের সম্ভাব্য দাবিদার মনে করেন। আলীপন্থীদের ধ্বংস করার জন্য পর্যায়ক্রমে নির্যাতন চালান। ক্ষমতাসীনদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে হযরত হাসানের প্রপৌত্র মুহাম্মদ ও ইব্রাহীম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। খলিফার ভ্রাতুষ্পুত্র ঈশা মুহাম্মদকে মদিনায় ও ইব্রাহীমকে বসরায় আক্রমণ করে পরাজিত করেন। খলিফা মদিনায় বসবাসরত ইমাম হাসান ও হ্রসেনের পরিবারবর্গের সকল সম্পদ বাতিল বলে ঘোষণা করেন এবং তাদের উপর কঠোর নির্যাতন চালান, এমনকি ইমাম জাফর সাদিক (র.), ইমাম আবু হানিফা (র.) ও ইমাম মালিক (র.)-এর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। শেষে দুই ব্যক্তিকে কারারুদ্ধ করেন।

ইফরিকিয়াতে শান্তি স্থাপন: ইফরিকিয়ার বার্বারগণ এবং খারেজি সম্প্রদায় আব্বাসীয় শাসন মেনে নেন নি। তারা মনসুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠলে মনসুর তাদের কঠোর হস্তে দমনের জন্য পর পর কয়েকটি ব্যর্থ অভিযান প্রেরণ করেন। অতঃপর ৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে ইয়াজিদ ইবনে মুহাল্লিবের নেতৃত্বে ৬০,০০০ সৈন্যের এক বাহিনী আফ্রিকায় প্রেরণ করেন। নতুন সৈন্যরা খারেজিদের দমন করে তাদের নেতাকে হত্যা করেন। কয়েক মাসের মধ্যে আফ্রিকায় শান্তি স্থাপন করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত পনের বছর ইয়াজিদ-বিন-মুহাল্লিব আফ্রিকায় শাসন করেন।

কুর্দিস্তানের বিদ্রোহ দমন এশিয়া মাইনরের জর্জিয়া, মসুল এবং কুর্দিস্তানের বিভিন্ন এলাকার কুর্দিগণ আব্বাসীয় শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠলে আল মনসুর তাদের কঠোর হস্তে দমন করেন। খলিফা মসুলবাসীর প্রতি রাগান্বিত হয়ে তা ধ্বংস করার জন্য বদ্ধপরিকর কিন্তু ইমাম আবু হানিফার পরামর্শে মসুল ধ্বংস হতে বিরত থাকেন।

বিজয় অভিযান প্রেরণ: খলিফা মনসুর বিদ্রোহ দমন করে রাজ্য বিস্তারে বিভিন্ন অভিযান প্রেরণ করেন। তা নিম্নরূপ:

রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযান অভ্যন্তরীণ গোলযোগ দমনে ব্যস্ত থাকায় রোমানগণ আব্বাসীয় সাম্রাজ্য আক্রমণ করে বসে এবং সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের মালাসিয়া দুর্গ অধিকার করে নেয়। ৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা রোমানদের বিরুদ্ধে সালেহ্ এবং আব্বাসের নেতৃত্বে এক শক্তিশালী মুসলিম বাহিনী প্রেরণ করেন। যুদ্ধে রোমান সম্রাট চতুর্থ কনস্টাস্টাইন পরাজিত হয়ে বার্ষিক বশ্যতামূলক কর দানে বাধ্য হন। খলিফা মালাসিয়া দুর্গটি পুনরুদ্ধার করেন। সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য মনসুর গ্রিক সীমান্তে কয়েকটি দুর্গ নির্মাণ করেন।
তাবারিস্তান ও গিলান অধিকার কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ ও পশ্চিমে অবস্থিত তাবারিস্তানবাসী হঠাৎ করে ৭৫৯-৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁদের যুবরাজ ইস্পাহান্দের নেতৃত্বে মুসলমানদের উপর আক্রমণ চালিয়ে বহু মুসলিমকে হত্যা করে। খলিফা-একটি অভিযান প্রেরণ করে তাবারিস্তান ও গিলান জয় করে সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।

স্পেনে ব্যর্থ অভিযান: উমাইয়াদের পতন ঘটানোর পর আব্বাসীয় খলিফাগণ সমগ্র সাম্রাজ্য দখল করলেও স্পেন সাম্রাজ্যভুক্ত করতে ব্যর্থ হন। আস-সাফফাহর হাত হতে রক্ষাপ্রাপ্ত হিশামের পৌত্র আব্দুর রহমান স্পেনে স্বাধীনভাবে শাসন করছিল। আল-মনসুর আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে সৈনাবাহিনী প্রেরণ করেন। আব্দুর রহমান আব্বাসীয় বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন এবং সেনাপতিকে হত্যা করে আল-মনসুরের নিকট পাঠিয়ে দেন। আব্দুর রহমানের বীরত্বপূর্ণ কার্যের জন্য আল-মনসুর তাকে 'আরবদের বাজপাখি' বলে আখ্যায়িত করেন। আল-মনসুর স্পেন পুনরুদ্ধারের কথা চিরতরে ভুলে যান।

বাগদাদ নগরীর প্রতিষ্ঠাতা টাইগ্রিস নদীর ডান তীরে আল-মনসুর একটি সুন্দর নগরী প্রতিষ্ঠা করে তার নাম রাখেন বাগদাদ। অপূর্ব কলাকৌশলে আরব্যোপন্যাসের প্রাণকেন্দ্র মুসলিম স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন গোলাকৃত বাগদাদ নগরীর নির্মাণ কার্য শেষ হলে তথায় রাজধানী স্থাপন করেন। এ নগরীর আর এক নামকরণ হয় 'দারুস-সালাম' (শান্তি নিবাস)। খলিফার নামানুসারে এর আর একটি নাম দেওয়া হলো মনসুরীয়। ১,০০,০০০ শ্রমিক ও শিল্পী সুদীর্ঘ ৪ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে ৪৮,৮৩,০০০ দিরহাম ব্যয়ে এই নতুন রাজধানীর নির্মাণ কার্য শেষ করেন। বাগদাদের অনুরূপ আর একটি শহর যুবরাজ মাহদীর তত্ত্বাবধানে দজলা নদীর পূর্বতীরে নির্মিত হয়। যুবরাজের নামানুসারে উক্ত শহরটির মাহদীয়া নামকরণ করা হয়।
উত্তরাধিকারী মনোনয়ন: খলিফা আল-মনসুর ৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে ভ্রাতা আস-সাফফাহ কর্তৃক মনোনীত ভ্রাতুষ্পুত্র ঈশা-বিন-মুসাবের মনোনয়ন বাতিল করে নিজ পুত্র মুহাম্মদকে 'আল-মাহদী' উপাধি দান করে উত্তরাধিকারী মনোনয়ন করেন। অবশ্য এ নিয়োগ জনসাধারণের মনঃপুত হয়েছিল এবং তারা মাহদীর আনুগত্য স্বীকার করেন।.

প্রশাসনিক সংস্কার: খলিফা মনসুর সেনা, নৌ ও গুপ্তচর বাহিনী পুনর্গঠিত করেন। তাঁর সেনাবাহিনী ছিল নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল। কেন্দ্রীয় শাসন সুদৃঢ় করার জন্য বাগদাদে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। কর্মচারী নিয়োগ ও বদলির মাধ্যমে খলিফা রাজকার্য নিয়ন্ত্রিত করেন। পারসিক অনুকরণে খলিফার পরই উজির পদের সৃষ্টি করেন। হিট্টি বলেন, "খিলাফত আর শেখতন্ত্রের পরিবর্তে ইরানি স্বৈরতন্ত্রের রূপ পরিগ্রহ করে।" খালিদ বার্মাক ছিলেন তাঁর প্রথম উজির। প্রজাদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য তিনি মুহতাসিব নামে পুলিশ বাহিনী গঠন করেন। ফলে প্রজারা শান্তিতে বসবাস করে।

বিচার সংস্কার: আল-মনসুর বিচারকার্যে ন্যায়নিষ্ঠ ও সততার পরিচয় দেন। তাঁর আমলে মুহাম্মদ আব্দুর রহমান দীর্ঘ বিশ বছর বাগদাদের কাজি নিযুক্ত ছিলেন। খলিফা প্রাদেশিক রাজধানীতে কাজি নিয়োগ করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করেন।

ধর্মীয় সংস্কার: ধর্মীয় সংস্কারের স্থায়িত্ব বিধানের জন্য খলিফা মনসুর পার্থিব ক্ষমতার সঙ্গে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার সমন্বয় সাধনের জন্য হানাফী ও মালেকী মাযহাবের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ঐতিহাসিক মুইর বলেন, "আল-মনসুরের বিশ্বাসঘাতকতার দিকটি যদি ভুলে যাই তাহলে মনসুর সম্বন্ধে আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা হবে।"

জনহিতকর কার্য: সমগ্র সাম্রাজ্যে জনগণের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ বাহিনী গঠন করেন। জমি জরিপ করে ভূমির পরিমাণ ও রাজস্ব নির্ধারণ করার ফলে রাজস্ব ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। খলিফা নিজে রাষ্ট্রের হিসাব নিরীক্ষা করতেন। এ. কারণে তাঁকে 'আদ-দাওয়ানিকী' বা হিসাবরক্ষক বলা হতো। মনসুর জনকল্যাণের জন্য দেশের মধ্যে রাস্তাঘাট, পয়ঃপ্রণালি, সরাইখানা, মসজিদ ও হাসপাতাল নির্মাণ করেন। ফলে প্রজারা সুখ ও শান্তিতে বসবাস করেন।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক: আল-মনসুর সাহিত্য, ইতিহাস, গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতিষ ও হাদিসশাস্তের উন্নয়নের জন্য গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সময় বিভিন্ন ভাষার বই আরবিতে অনুবাদের ব্যবস্থা করেন। আব্বাসীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের গোড়াপত্তন করেন আল-মনসুর। ভারতীয় সংস্কৃতি গ্রন্থ 'সিদ্ধান্ত' এবং আরবিতে লিখিত 'কালীলা ওয়াদীমনা' তাঁর সময় অনূদিত হয়।
খলিফার মৃত্যু: ৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা আবু জাফর আল মনসুর বার্ষিক হজ সম্পন্ন করার জন্য মক্কা অভিমুখে রওনা হলে মক্কার সন্নিকটে বীর মায়মুনায় পৌঁছালে ৬৫ বছর বয়সে অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করেন।

খলিফা মনসুরের চরিত্র ও কৃতিত্ব

আল-মনসুর অদ্ভুত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। মিত্রের প্রতি তিনি যেমন ছিলেন কোমল, শত্রুর প্রতি ছিলেন তেমনি কঠোর। পিতা হিসেবে সন্তানবৎসল হলেও মানুষ হিসেবে তিনি বিশ্বাসঘাতক ও নৃশংস হত্যাকারী ছিলেন। ঐতিহাসিক মুইর বলেন,

"With all his good qualities nervertheless, the verdici-must be against Mansur as a treacherous and cruel man." অর্থাৎ "তাঁর সব সদ্‌গুণ থাকা সত্ত্বেও বিশ্বাসঘাতক এবং নিষ্ঠুর হিসেবে ইতিহাসের রায় তাঁর বিরুদ্ধে যাবেই।" আমির আলী বলেন, "নিষ্ঠুর স্বার্থপর এবং অবিবেকী মনসুর কোনো ব্যক্তিকে নিজের বা নিজ বংশের পক্ষে সামান্যতম বিপজ্জনক বলে মনে করলে তার প্রাণনাশ করতে ছাড়তেন না।" তবে তাঁর চরিত্রে দোষ ও গুণের সংমিশ্রণ ছিল।

আল-মনসুর ধর্মপরায়ণ ও ন্যায়বান শাসক ছিলেন। তিনি অভ্যন্তরীণ গোলযোগ দমন ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ হতে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যকে রক্ষা করেন। তাই আমির আলী মন্তব্য করেন, "আস-সাফফাহ্ আব্বাসীয় বংশের প্রথম খলিফা হলেও আবু জাফরকেই এ রাজবংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা যায়।" আমির আলীর এ মন্তব্য তাঁর কার্যাবলি পর্যালোচনা করলে সঠিক ও সত্য বলে প্রমাণিত হয়।

আল-মনসুর তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম, অদম্য সাহস, দূরদর্শিতা ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞার বলে নব প্রতিষ্ঠিত আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের ভিত মজবুত করেন। শান্তি-শৃঙ্খলা বিধান, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, শিল্প-সাহিত্য, সমৃদ্ধি ও সৃষ্টির ক্ষেত্রে আল-মনসুরের অবদান হতে এটা পরিষ্কার যে তিনি আব্বাসীয় বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

খালিফা আল-মাহদী (৭৭৫-৭৮৫ খ্রি.) (Khalifa Al-Mahdi, 775-785 AD)

প্রাথমিক জীবন: আল-মাহদীর প্রকৃত নাম মুহাম্মদ কুনিয়াত আবু-আব্দুল্লাহ। তাঁর উপাধি আল মাহদী। ১২৬ হিজরীতে মাহদী জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবুজাফর আল মনসুর আব্বাসীয় বংশের দ্বিতীয় খলিফা। খালিদ বার্মাকের তত্ত্বাবধানে তার শিক্ষা ও বাল্য জীবন গড়ে উঠে। পিতা মনসুরের শাসনকালে তিনি রায় এলাকার প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। বার্মাকী তরুণী খায়জুরান বানুকে বিবাহ করেন।

সিংহাসনারোহণ: পিতার মৃত্যুর পর মুহাম্মদ আল্-মাহ্দী ৭৭৫ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ৩২ বছর বয়সে সিংহাসন লাভ করেন। মাতা উম্মে সালমার দিক হতে তিনি ইয়ামনের প্রাচীন হিমারীয় রাজবংশোদ্ভূত ছিলেন। খলিফা মনসুর পুত্রের জন্য কোষাগার পরিপূর্ণ রেখে যান। তাঁর দশ বছর ব্যয় নির্বাহের পক্ষে ঐ কোষাগারের অর্থরাশি যথেষ্ট ছিল। ঐতিহাসিক উইলিয়াম মুরের মতে, খলিফা মাহদীর খিলাফতকাল প্রথম আব্বাসীয় খলিফা আস-সাফফাহ এবং মনসুরের কঠোর শাসন এবং পরবর্তী আব্বাসীয় খলিফাগণের সুশাসনের সেতুস্বরূপ ছিল। শাসন ও সহনশীল নীতি: তাঁর শাসননীতি পিতার শাসননীতি হতে সম্পূর্ণ পৃথক ছিল।

উদারনীতি: খলিফা মনসুরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আল-মাহদী সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন মহানুভব, প্রজাবৎসল ও নম্র স্বভাবের মানুষ। তাই পিতার কঠোর ও নির্মম নীতি পরিত্যাগ করে উদার ও শান্তিপূর্ণ নীতি গ্রহণ করে অতীতের সকল কারারুদ্ধ ব্যক্তিদের মুক্তি দান করে আপন মহানুভবতার চিরপরিচয় রেখে গেছেন। বিশেষ করে ইমাম হাসানের বংশধর ইব্রাহিমের পুত্র হাসানকে কারাগার হতে মুক্তি দান ও তাঁকে উপযুক্ত ভাতা প্রধান করা তাঁর উদারতারই চরম পরিচয়।

জনহিতকর কার্যাবলি: রাজকোষের সঞ্চিত অর্থ থেকে তিনি সকল প্রকার দ্বেষ-বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে আরোহণ করে বুহ জনহিতকর ও মহৎ কাজের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যান। বহু জ্ঞানী-গুণী ও অভাবগ্রস্তকে সাহায্য দান করেন। তিনি বহু মাদ্রাসা ও মসজিদ নির্মাণ করে গুণগ্রাহী বাদশাহর পরিচয় দেন। সঙ্গে সঙ্গে মক্কা ও মদিনার মসজিদকে সংস্কার ও সুশোভন করে তোলেন। প্রতি বছর কাবা শরীফে খলিফার পক্ষ হতে একটি মূল্যবান গেলাফ পাঠাবার ব্যবস্থা করেন, পরবর্তীকালে যা সকল খলিফার অনুশীলনের বস্তুতে পরিণত হয়। ৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে হজের সময় খলিফা হেজাজের দীন-দুঃখী মানুষের মধ্যে তিন কোটি দিরহাম মুক্ত হস্তে দান করে কালজয়ী দাতার গৌরব অর্জন করে গেছেন এবং একমাত্র মক্কার গরিব মানুষের মধ্যে। ১,৫০,০০০ জামা বিতরণ করেন। কাসেদীয়া হতে জাবালা পর্যন্ত রাস্তার উভয় পার্শ্বে সরাইখানা নির্মাণ করে তিনি প্রজাবৎসল। খলিফার পরিচয় দেন। এবং ঐ রাস্তার পথচারীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থাকেও সুদৃঢ় করেন। তিনি ঐ সমস্ত রাস্তাগুলোর মাধ্যমে দূর-দূরাঞ্চলের সংবাদ সংগ্রহ করতেন। তিনি মদিনা হতে ৫০০ জন আনসারকে বাগদাদে আনয়ন করে আপন দেহরক্ষীর বিভাগে নিযুক্ত করে আনসারদের যথাযোগ্য সম্মান দান করেন। বৃদ্ধ, অসহায় শ্রেণির মানুষের প্রতি তাঁর তীক্ষ্ম দৃষ্টি ছিল।। তিনি একদিকে যেমন দাতা ছিলেন, অন্যদিকে বড়ই সহিষ্ণুও ছিলেন। সৎ মানুষদের প্রতি যেমন তিনি সদয় ছিলেন, দুরাচারদের প্রতি তেমনি কঠোরও ছিলেন। খলিফা হারুন আর রশিদের সময় বাগদাদে সাহিত্য-দর্শন-ব্যবসায়-বাণিজ্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে চরম উন্নতি লক্ষ্য করা যায়, তার শুভসূচনা পিতা আল-মাহদীর সময়। খলিফা হারুণ-আর রশিদের সময়ের উন্নতির চরম উৎকর্ষের মূলটা পূর্বতন বীজ রূপে যদি পিতা আল-মাহদীর সময় না হতো, তাহলে খলিফা হারুণ-আর-রশিদ ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এতখানি স্থান পেতেন কি না তা কে জানে।

মুকান্নার বিদ্রোহ দমন: খলিফা আল-মাহদীর খেলাফতে কয়েকটি বিদ্রোহ দেখা যায়। খলিফা কঠোর হস্তে সেগুলোকে দমন করতে সক্ষম হন। কদাকার, খর্বাকৃতি ও অতি কৃৎসিত চেহারার অধিকারী হাশিম বিন হাকিম সর্বদা একটি সোনালি মুখোশ পরে থাকত বলে তাঁর নাম দেওয়া হয়- 'মুকান্না বা আবৃত। তিনি নিজেকে আল্লাহর অবতার বলে ঘোষণা করে সমাজে অবতারবাদ প্রচার করতেন। তিনি মানুষদের শিক্ষা দিতেন বিশ্বস্রষ্টা মানুষের মধ্যে আদম-নূহ ও আবু মুসলিমের রূপ ধরে আবির্ভূত হন। তিনি তাঁর শিষ্যদের বহু গর্হিত কাজে উৎসাহিত করতে থাকায় মানুষ দলে দলে তাঁর ছত্রচ্ছায়ায় যোগদান করে তাঁর হাতকে শক্তিশালী করে। ফলে তিনি বহুবার খলিফার ছোট ছোট সেনাদলকেও পরাজিত করেন। অবশেষে খলিফা একটি সুগঠিত বিশাল সেনাবাহিনী প্রেরণ করে তাঁর সম্প্রদায়ের মূলোৎপাটন করেন। পরিশেষে হাশিমী পরাজয়কে নিশ্চিত ভেবে কীশ নামক শহরে দলবদল-সহ এক অগ্নিকুণ্ডে আত্মহুতি দেন। তাঁর অনুচরবৃন্দ সাদা পোশাক পরিধান করতো বলে তাদের মুবাইয়েক্তা বা মুবাইয়ী অর্থাৎ শ্বেতাম্বর বলা হতো।

প্রাচীনপারস্যে দু'জন নেতা ছিলেন মাজদীক ও মনী। প্রথম জন ছিলেন বল্লাহীন জীবনযাত্রার পক্ষপাতী ও দ্বিতীয়জন ছিলেন নাস্তিকবাদী দার্শনিক। তাদের নেতৃত্বে মানুষের নীচ কামনা-বাসনা ও হীন প্রবৃত্তি অত্যন্ত ত্বরান্বিত হয়ে উঠেছিল। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতকে সম্রাট খসরুর নওসিরওয়ানের রাজত্বকালে মাজদাকের আবির্ভাব হয়। পারস্য সম্রাট তাঁকে কঠোর হস্তে দমন করলেও তাঁর দলবল প্রাচীন নাস্তিকবাদী দার্শনিক মনীর চিন্তাধারার সাথে মিশে যায়। খলিফা আল-মাহদীর সময় জিন্দিক দল প্রাচীন মাজদীক ও মনীর মতাবলম্বী হয়ে উঠলে খলিফার একজন বিচক্ষণ রাজকর্মচারীর অধীনে সাহিবুজ-জানদিকা নামক একটি বলিষ্ঠ বিভাগ প্রবর্তন করে ঐ দলকে চিরতরে প্রদমিত করেন। পরবর্তীকালে আধুনিক যুগের কার্লমার্কস, মাও, লেলিন-স্ট্যালিন প্রমুখ সমাজবিশারদ ও রাজনীতিবিদদেরও প্রাচীন পারস্যের ঐ নাস্তিকতাবাদী দার্শনিক মনীর নাস্তিকবাদী-সাম্যবাদে প্রভাবান্বিত হতে দেখা যায়।

'বাইজান্টাইন বিদ্রোহ দমন খলিফা আল-মাহদীর রাজত্বকাল বাইজান্টাইনদের সাথে বহু সংঘর্ষের সফলতার সাক্ষী। বাইজান্টাইনগণ স্বাক্ষরিত চুক্তিভঙ্গ করে বারবার মুসলিম রাজ্য আক্রমণ ও লুঠতরাজ আরম্ভ করলে খলিফা স্বয়ং সেই আক্রমণকে প্রতিরোধ করার জন্য এক লক্ষ সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী-সহ ফুরাত নদী অতিক্রম করে আলেপ্পো শহরে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেন। ৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে সেখান হতে খলিফা আপন পুত্র হারুনকে বসফোরাসের দিকে প্রেরণ করে অভিজ্ঞ খালিদ বার্মেকিকে তাঁর অভিভাবক নিযুক্ত করেন। এর সঙ্গে ছিলেন বহু বিশ্বস্ত আব্বাসীয় সেনাপতি। বসফোরাসের তীরে বাইজান্টাইন বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হলো। সেই সময় রানী আইবিন তাঁর পুত্র ষষ্ঠ কনস্টান্টাইনের অভিভাবক রূপে সাম্রাজ্য পরিচালনা করছিলেন। বিজয়ী আরব শিবিরের দিনের উদ্যম ও রাতের আলোকমালা রানী মাতার মনে ভীতির সঞ্চার করে সন্ধির মনোবাসনা জাগিয়ে তোলে। ইতিমধ্যে- আরব-বাহিনী কনস্ট্যান্টি নোপলের প্রাচীন প্রান্ত হতে দুয়ারে হাজির। ৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে বাইজান্টইন সম্রাজ্ঞী আইরিন বার্ষিক বিপুল কর প্রদানে স্বীকৃত হয়ে সন্ধির প্রস্তাব দেন। এই যুদ্ধে খলিফা তাঁর পুত্র হারুনের সাফল্যের ও কৃতিত্বের পুরস্কার স্বরূপ তাঁকে 'আর-রশিদ' (ন্যায়নিষ্ঠ) উপাধি দান করেন।

রাজমাতা খায়জুরান: খলিফা আল-মাহদীর রাজরানী খায়জুরান তাঁর স্বামীর ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। এমনকি খলিফার রাজদরবারও রাজ-মহিষীর প্রভাবে অনেকখানি প্রভাবান্বিত হয়ে উঠেছিল। এই মহীয়সী মহিলাই শেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ানের স্ত্রী মাজুনাকে রাজপ্রাসাদের মধ্যে তার পদমর্যাদার উপযোগী বাসস্থান নির্ধারিত করে শুধু সৌজন্যমূলক চাকরবাকরই পরিবেষ্টিতা করে রাখেননি। বরং রাজ-মহিষী তাঁর প্রতি এমন ব্যবহার করতেন, যার ফলে সমগ্র রাজপরিবারটিই ছিলের তাঁর প্রতি একান্ত শ্রদ্ধাশীল। এটা ছিল রাজমাতা খায়জুরানের বংশগত রাজ-পরিচয়। তিনি রাজকার্য পরিচালনায় খলিফাকে যথেষ্ট সাহায্য করে প্রকৃত বিদুষী মহিলার পরিচয় রেখে গেছেন।

উত্তরাধিকারী মনোনায়ন খলিফা আল-মাহদীর পর খেলাফতের পরবর্তী দাবিদার ছিলেন খলিফার আপন, ভ্রাতুষ্পুত্র ঈসা। কিন্তু রাজরানী আপন পুত্রদ্বয় মুসা ও হারুনের অনুকূলে ঈসার খেলাফতের দাবিকে প্রত্যাহার করার জন্য বিশেষ চাপ সৃষ্টি করেন। তাঁর কূটনীতি কার্যকরী হয়েছিল। অতঃপর খলিফা বিনাদ্বিধায় পুত্র মুসা ও হারুনকে খেলাফতের ভাবী উত্তরাধিকারী মনোনয়ন করেন।

যুবরাজ হারুন পিতা-মাতা উভয়েরই খুবই প্রিয় ছিলেন। তাই মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে খলিফা আল-মাহদী হারুনকেই উত্তরাধিকার মনোনয়ন করার নিমিত্তে গুর্গাওয়ে যুদ্ধরত পুত্র মুসাকে (হাদী) রাজদরবারে আনয়ন করে হারুনের পক্ষে তাঁর খেলাফতের দাবিকে প্রত্যাহার করতে বলায় মুসা পিতার ঐ নির্দেশের প্রতি কোনো আগ্রহ প্রকাশ না করেই নীরব থেকে যান। ফলে অমীমাংসিত অবস্থায় মুসার খেলাফতের দাবি অপরিবর্তিতই থেকে গেল। খলিফা আল-মাহদীর দশ বছরের শাসনকাল আব্বাসীয় যুগের শুধু সুসংহত ও সমৃদ্ধিই বৃদ্ধি করেনি, বরং সূচনা করে স্বর্ণযুগেরও।

মাহদীর মৃত্যু ও চরিত্র: ৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩রা আগস্ট জুরজানের মাসান্দান নামক স্থানে শিকার করবার সময় হঠাৎ একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদের দ্বারে আঘাত পেয়ে তিনি ৪৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি দীর্ঘাকৃতি, সুদর্শন ও সুঠাম পুরুষ এবং অমায়িক চেহারাবিশিষ্ট ছিলেন। তাঁর দশ বছরকাল শাসনামলে দেশে শান্তি ও সমৃদ্ধি বিরাজ করছিল। তিনি একজন শক্তিশালী এবং প্রজারঞ্জক শাসক ছিলেন। তিনি ধার্মিক ও উদার ছিলেন। পিতা মনসুরের ন্যায় তিনিও কয়েকবার হজ উদ্যাপন করেন। চীন সম্রাট, তিব্বতরাজ, এমনকি ভারতীয় রাজন্যবর্গ তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছিলেন। জীবনের শেষদিকে মাহদী তাঁর প্রথম পুত্র হাদীর মনোনয়ন বাতিল করতে মনস্থ করেছিলেন। তাঁর এই কার্যক্রমে সাম্রাজ্ঞী খায়জুরানেরও পূর্ণ সমর্থন ছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে ইহা করা সম্ভবপর হয়ে উঠেনি।

খালিফা আল-হাদী (৭৮৫-৭৮৬ খ্রি.) (Khalifa Al-Hadi, 785-786 AD)

সিংহাসন লাভ: পিতা-মাতার ইচ্ছাবিরুদ্ধ মনোনয়ক্রমে মুসা ২৪ বছর বয়সে আল-হাদী (পদ-প্রদর্শক) উপাধি ধারণ করে ৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। ভ্রাতা হারুণ তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে পিতার সিলমোহর ও রাজদণ্ড মুসার নিকট গুর্গাওয়ে পাঠিয়ে দেন।

বিদ্রোহ দমন: আল-হাদীর স্বল্পকালীন খেলাফতে সাম্রাজ্যের সর্বত্র বিদ্রোহ দেখা দিল। মেসোপটেমিয়ার খারেজীগণ এবং মক্কা ও মদিনার আলী-পন্থীগণও বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। মদিনার বিদ্রোহ দমনকালে ইমাম হাসানের প্রপৌত্র ইব্রাহিম ও মুহাম্মদের এক ভ্রাতা জনৈক ইদ্রিস যুদ্ধক্ষেত্র হতে প্রাণভয়ে তানজিয়ারে পলায়ন করেন। সেখানে দূর পশ্চিম আফ্রিকার (মাগরির-উল-আক্সা) ইদ্রিস বংশীয় রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই আলাবীদের প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র নামে পরিচিত। ধর্মদ্রোহী মনীরপন্থী বিদ্রোহী হলে তাদেরও খলিফা কঠোর হস্তে দমন করেন।

হাদী ও মাতা খায়জুরান: মাতা খায়জুরান পূর্বমতো রাজকার্যে ও রাজদরবারে প্রভাব বিস্তার করতে চাইলে পুত্র আল-হাদী সেটাকে অন্য নজরে দেখতেন। হাদী মাতার এই অনধিকার চর্চা পছন্দ করতেন না। এমনকি রাজ-দরবারে আমীর-'ওমরাহদের ওপর মাতার প্রভাবকে যথেষ্ট খর্ব করে দেন। এভাবে রাজমাতা রাজদরবারের সংস্পর্শে থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্ষোভে; দুঃখে ও অনুশোচনায় জীবনের বাকি কয়েকটি দিন কাটাতে থাকেন। পুত্র হাদী শুধু মাতার প্রতি এই আচরণ করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি ভ্রাতা হারুনকে ভাবী খেলাফতের দাবিদার থেকে বঞ্চিত করে পুত্র জাফরকে খলিফা মনোয়ন করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে হারুনের উস্তাদ ও উপদেষ্টা ইয়াহিয়া ইবনে খালিদ বার্মেকিকে ও অন্যান্য বহু রাজকর্মচারীকে বন্দি করে এক নিদারুণ পরিবেশের সৃষ্টি করেন। এই সময় রাজমাতার সঙ্গে পুত্র হাদীর যথেষ্ট মনোমালিন্য দেখা যায়। এই তিক্ত পরিবেশে হারুন নিজেকে টেকাতে না পেরে দরবার ছেড়ে চলে যান। কিছুদিনের মধ্যেই হাদী দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে অন্তিম হয়ে অন্তিম শয়নে কৃত অপরাধের জন্য মাতার নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করেন এবং পিতা-মাতার ইচ্ছানুসারেই ভ্রাতা -হারুনকে ভাবী খলিফা মনোনীত করেন। এভাবে ৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে হাদী পরলোকগমন করলে হারুন স্বাভাবিকভাবেই মনোনীত হয়ে খলিফার পদ বরণ করেন।

আব্বাসি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন

আব্বাসীয় আন্দোলনআবুল আব্বাস আস-সাফফাহ (৭৫০-৭৫৪ খ্রি.) খলিফা আবু জাফর আল মনসুর (৭৫৪-৭৭৫ খ্রি.)খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রি.)বার্মাকি বংশখলিফা আল-আমিন (৮০৯-৮১৩ খ্রি.)খলিফা আল-মামুন (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.)আব্বাসীয় খিলাফতের শেষার্ধ খলিফা আল-মুতাসিম (৮৩৩-৮৪২ খ্রি.)বুয়াইয়া বংশ (৯৪৪-১০৫৫ খ্রি.)সেলজুক বংশ (১০৫৫-১১৯৪ খ্রি.)মালিক শাহ সেলজুক (১০৭৩-১০৯২ খ্রি.)ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ (১০৯৫-১২৫৮ খ্রি.)গাজী সালাউদ্দিন আইয়ুবিবাগদাদ ধ্বংস (১২৫৮ খ্রি.)আব্বাসীয় খিলাফতের ক্রমাবনতি ও পতনআব্বাসীয় আমলের আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্যআব্বাসীয় আমলে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চাআব্বাসিদের রাজধানী কোথায় ছিল?বার্মাকি বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে?খায়জুরান কে ছিলেন?বাগদাদ নগরীর প্রতিষ্ঠাতা কে?ক্রুসেড (Crusade) শব্দের অর্থ কী?বুরান কে ছিলেন?আব্বাসি বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কে?'আল-মনসুর' শব্দের অর্থ কী?বায়তুল হিকমা কে প্রতিষ্ঠা করেন?কোন যুদ্ধের মাধ্যমে আব্বাসি রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়?আব্বাসিরা কার বংশধর?কোন সালে জাবের যুদ্ধ সংঘটিত হয়?আবুল আব্বাস কী উপাধি গ্রহণ করেন?'আস-সাফফাহ' শব্দের অর্থ কী?আব্বাসি বংশের প্রথম শাসক কে ছিলেন?সেনাপতি আবু মুসলিমকে কে হত্যা করেন?বায়তুল হিকমাহ (জ্ঞানগৃহ) কত খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করা হয়?'Arabian Joan of Ark' নামে পরিচিতি লাভ করেন কে?ক্রুসেড কী?ক্রুসেড (Crusade) শব্দটি কোন শব্দ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে?আব্বাসি কারা? পরিচয় দাও।নহর-ই জুবাইদা কী? বুঝিয়ে লেখ।বায়তুল হিকমা বলতে কী বোঝায়?আবু মুসলিম খোরাসানি সম্পর্কে যা জান লেখ।কাকে এবং কেন আস-সাফফাহ বলা হয়?খলিফা মনসুর কর্তৃক আলী বংশীয়দের প্রতি দুর্ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা কর।আব্বাসি আন্দোলন বলতে কী বোঝায়?আবু জাফর আল মনসুরকে আব্বাসি বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় কেন?খলিফা আল মামুনের রাজত্বকালকে ইসলামের অগাস্টাস যুগ বলা হয় কেন?ক্রুসেড বলতে কী বোঝায়?

সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ