- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- আব্বাসি খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
বার্মাকি বংশ
আব্বাসীয় যুগ ইসলামের ইতিহাস তথা-বিশ্বের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন রাজবংশের গৌরবের মূলে রয়েছে প্রসিদ্ধ উজির বংশের অবদান। তদরূপ আব্বাসীয়দের গৌরবের মূলে রয়েছে বিখ্যাত উজির পরিবার বার্মাকিদের অবদান। বার্মাকি বংশের অক্লান্ত পরিশ্রম ও কর্মকুশলতার জন্য আব্বাসীয় সাম্রাজ্য শ্রী-সম্পদে ভরে ওঠে।
বার্মাকিদের পরিচয়: বার্মাকি বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন খালিদ বার্মাক নামক একজন পারসিক। খালিদের পিতা জাফর বার্মাক ছিলেন বলখের বৌদ্ধ মন্দিরের পুরোহিত বা বার্মাক। ৭০৫ খ্রিষ্টাব্দে ওয়ালিদের রাজত্বকালে কুতায়বা মধ্য এশিয়া বিজয়ের সময় জাফর বার্মাক স্ত্রী এবং পুত্র খালিদসহ যুদ্ধবন্দী রূপে ধৃত হন। পরবর্তীতে তারা ইসলাম ধর্মের নিয়ামত গ্রহণ করেন এবং বন্দীদশা হতে মুক্তি লাভ করেন। খালিদ বার্মাক বাল্যকাল হতে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ছিলেন। তিনি বাল্যকালে উপযুক্ত শিক্ষালাভ করে আব্বাসীয় বংশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
আব্বাসীয় খিলাফতে বার্মাকিদের উত্থান ও অবদান
আব্বাসীয় খিলাফতে বার্মাকী পরিবারের অবদান সবচেয়ে বেশি। তাদের অবদান সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো:
খালিদ বার্মাক: আব্বাসীয় আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানের ফলে আব্বাসীয় খলিফা আবুল আব্বাস পুরস্কারস্বরূপ খালিদকে প্রধান কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করেন। খলিফা আল-মনসুরের সময়ও তিনি উক্ত পদে নিযুক্ত থেকে আব্বাসীয় বংশের প্রতিষ্ঠায়-অবদান রাখেন। এ সময়ে খালিদ বাগদাদ নগরী এবং 'আল-মাহদীয়া নগরী' নির্মাণ কার্য তদারক করেন। ৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে মসুলের শিয়া বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করলে খলিফা আল-মনসুর তাঁকে তাবারিস্তানের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। পরবর্তীকালে এক অভিযানে তিনি যুবরাজ হারুনের সাথে রোমান সম্রাজ্ঞী আইরিনকে পরাজিত করেন। মাহদী খুশি হয়ে খালিদকে প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত করেন। এ কথা অনস্বীকার্য তিনি প্রখ্যাত বার্মাকি উজির পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
ইয়াহিয়া বার্মাক: খালিদের পুত্র ইয়াহিয়াও পিতার ন্যায় শাসনকার্যে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। ইতঃপূর্বে তিনি আর্মেনিয়ার শাসক ছিলেন। মাহদী তাকে হারুনের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন। কথিত আছে হারুন ইয়াহিয়াকে পিতা এবং তাঁর স্ত্রীকে মাতা বলে ডাকতেন। হারুন সর্বদা ইয়াহিয়ার উপদেশ ও পরামর্শ শ্রদ্ধাভরে গ্রহণ করতেন। খলিফা হাদী হারুনকে উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত করলে ইয়াহিয়া এর প্রতিবাদ করেন, ফলে হাদী তাকে কারারুদ্ধ করেন। খলিফা হয়ে হারুন ইয়াহিয়াকে কারামুক্ত করে প্রধান উজির পদে নিয়োগ করেন।
ইয়াহিয়া বিচক্ষণ শাসক এবং প্রজাহিতৈষী ছিলেন। প্রজাদের মঙ্গলের জন্য তিনি হারুনকে উপদেশ দিতেন। ইয়াহিয়ার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন হারুনের মাতা খায়জুরান। ৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দে খায়জুরান মারা গেলে ইয়াহিয়ার মনোবল ভেঙে যায় এবং খলিফার নিকট রাজকীয় সিলমোহরাদি জমা দিয়ে অবসর গ্রহণ করেন। ৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে ইয়াহিয়া বার্মাকের মৃত্যু ঘটে। ইয়াহিয়া বার্মাক একজন ন্যায়বান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর সহযোগিতায় আব্বাসীয় সাম্রাজ্য গৌরবের উচ্চ শিখরে আরোহণ করে।
ফজল বার্মাক: ইয়াহিয়া বার্মাকের চার পুত্র ফজল, জাফর, মুসা ও মুহাম্মদ। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কার্যে নিয়োজিত থেকে আব্বাসীয়দের গৌরব বৃদ্ধি করেন। ফজল বার্মাক হারুনের খেলার সাথী ছিলেন। তারা উভয়ে উভয়কে ভাই বলে সম্বোধন করতেন। ফজল যথাক্রমে খোরাসান ও মিশরের শাসনকর্তা থেকে আব্বাসীয়দের সহযোগিতা করেন। আলী বংশের লোকদের বিদ্রোহ তিনি দমন করেন। পিতার অবসর গ্রহণের পর তিনি প্রধান উজিরের পদ গ্রহণ করেন এবং সাফল্যের সঙ্গে কর্তব্য পালন করেন।
জাফর বার্মাক: জাফর ছিলেন খলিফা হারুনের পুত্র মামুনের গৃহশিক্ষক। তিনিও বিভিন্ন প্রদেশের শাসনকর্তা হয়ে যোগ্যতার সঙ্গে শাসন করেন। সিরিয়ায় হিমারীয় ও মুদারীয় দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করলে জাফর তাদের কঠোর হস্তে দমন করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন শিক্ষাদীক্ষার উন্নয়ন ও জনমঙ্গলকর কার্য করেন। ইউফ্রেটিস নদীর তীরে 'আল-জাফরী' প্রাসাদ তৈরি করেন। আব্বাসীয় ঐতিহাসিকদের মতে তিনি ছিলেন "লেখক গোষ্ঠীর জনক"।
মুসা ও মুহাম্মদ মুসা ও মুহাম্মদ হারুন-অর-রশিদ এর রাজত্বকালে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যে নিযুক্ত থেকে রাজ্য শাসন ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে খলিফাকে সর্বাত্মকভাবে সহায়তা দান করেন। ফলে বার্মাকিরা অল্পদিনের মধ্যে অধিক সম্পদশালী হয় ও জনপ্রিয়তা লাভ করে।
বার্মাকি বংশের কৃতিত্ব: বার্মাকি বংশের উজিরগণ দীর্ঘ সতের বছর আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন দায়িত্বে থেকে শাসনকার্যে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের একনিষ্ঠ সেবা এবং চেষ্টার ফলেই হারুনের গৌরব দিক-দিগন্তে পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক গিলম্যান বার্মাকিদের এরূপ সাফল্য সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, "বার্মাকিরা শিল্প, সাহিত্য এবং বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিদের রাজধানীতে বসবাসের জন্য উৎসাহিত করেন।" এত গৌরব অর্জন করার পরও হারুনের আদেশে ৮০৩ খ্রিষ্টাব্দে বার্মাকি বংশের পতন ঘটে।
বার্মাকিদের পতনের কারণ
বার্মাকিদের অতিরিক্ত প্রভাব প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খালদুনের মতে, "বার্মাকিদের অপরিমিত প্রভাব, তাদের সুখ্যাতি এবং অগণিত ধনরত্ন তাদের পতনের অন্যতম কারণ।" খলিফা হারুনের ন্যায় শাসককেও অর্থের জন্য তাদের মুখাপেক্ষী হতে হতো। ফলে খলিফা তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন এবং তাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর হন। ঐতিহাসিক জুরজী জায়দান বলেন, "বার্মাকীরা শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত ছিল এবং আলীর ন্যায়সংগত উত্তরাধিকারী নীতিতে আস্থা স্থাপন করে। অপরদিকে আব্বাসীয় খলিফা ও আমিরগণ সকলে সুন্নি মুসলমান ছিলেন। শিয়াদের সঙ্গে আল-জাফরী প্রাসাদে তাদের গোপন আলাপ হারুনের দৃষ্টিগোচর হলে তাদের পতন ঘটান।
আরব আমিরদের ঈর্ষাকাতর মনোভাব পারসিক বার্মাকিদের সৌভাগ্য দর্শনে আরব আমিরগণ সদা ঈর্যান্বিত ছিলেন। রাজদরবারে বার্মাকিদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি খর্ব করার জন্য আরববাসী ফজল-বিন-রাবী হারুনকে নানাভাবে প্ররোচিত করেন। তিনি হারুনকে বুঝাতে সক্ষম হন যে বার্মাকিদের ক্ষমতা খর্ব না করলে তারা হারুনের পতন ঘটিয়ে আলীপন্থীদের ক্ষমতায় বসাবে।
খলিফার ভগ্নীর সঙ্গে গোপন বিবাহ: কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, হারুনের ভগ্নী আব্বাসার সঙ্গে জাফরের গোপন সম্পর্ক বার্মাকিদের পতনের অন্যতম কারণ। কিন্তু ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন উক্ত ঘটনাকে নিছক ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেন।
খলিফার সন্দেহপরায়ণতা সন্দেহপরায়ণ খলিফা এমনিতে বার্মাকিদের উপর ক্ষিপ্ত। অপরদিকে ফজল-বিন-রাবীর কুপরামর্শ খলিফাকে আরও সন্দেহপরায়ণ করে তোলে। তাদের অনৈসলামিক কার্যকলাপও তাদের পতনের জন্য দায়ী।
বার্মাকিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ৮০৩ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা হারুন বৃদ্ধ ইয়াহিয়া, ফজল, মুসা ও মুহাম্মদকে বন্দী করেন। জাফরকে হত্যা করেন। তাদের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন। ৮০৫ খ্রিষ্টাব্দে বৃদ্ধ ইয়াহিয়া ও ৮০৯ খ্রিস্টাব্দে ফজল বন্দীশালায় প্রাণত্যাগ করেন। পরবর্তী আব্বাসীয় খলিফা মুসা ও মুহাম্মদকে মুক্তিদান করেন। ঐতিহাসিক আমীর আলীর ভাষায় "এ ঘটনা হারুনের রাজত্বকালের গৌরব জ্যোতিকেই স্নান করেনি তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকেও অনুশোচনা ও তমসাচ্ছন্ন করেছে।"
বার্মাকি বংশ দীর্ঘ (৭৮৭-৮০৩ খ্রি.) সতের বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের গৌরব বৃদ্ধি করেন। তাদের কৃতিত্ব বিচার করলে এ কথা সত্য যে বার্মাকিদের দান অপরিসীম। কিন্তু তাদের পতন ইতিহাসের গতিকে স্তথ করেছে। ঐতিহাসিক পি. কে. হিট্টি বলেন, "Thus the celebrated house founded by Khalid Al-Barmaki fell never rise again." অর্থাৎ "খালিদ বার্মাকি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত খ্যাতিমান বংশের পতন হয় যার আর কখনো উত্থান হয়নি।"
আব্বাসি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

