- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- আব্বাসি খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
খলিফা আল-মামুন (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.)
সিংহাসন লাভ: আমিন ও মামুনের মধ্যে গৃহযুদ্ধে মামুন জয়লাভ করে ৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে আব্বাসীয় খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মামুন-এর রাজত্বকাল মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত। তিনি সাম্রাজ্যের বিদ্রোহ দমন করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
আল-মামুনের শাসননীতি
খলিফা আল-মামুন একজন মহানুভব শাসক ছিলেন। প্রাণে । প্রাণের শত্রুকেও ক্ষমা করে যে আদর্শ তিনি স্থাপন করে গেছেন, তা শুধু ইসলামের ইতিহাসে নয় বরং বিশ্ব ইতিহাসেও দুর্লভ। সকল ধর্মের প্রতি তিনি ছিলেন দারুণ সহিষ্ণু। জাতি ও সম্প্রদায়গত কোনো বৈষম্য তিনি স্বীকার করতেন না। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল প্রজাকে খলিফা সমান চোখে দেখতেন। সকল শ্রেণির প্রজাকে তিনি যোগ্যতার নিরিখে রাজকার্যে নিযুক্ত করতেন। সকল সম্প্রদায়ের লোকের প্রতি উদার ব্যবহার করে তিনি যে মহান আদর্শ স্থাপন করে গেছেন, তা যুগে যুগে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নরপতিদের ধর্মান্ধতা ও সংস্কারমুক্ত হতে সহায়ক হবে। তার শাসন ব্যবস্থার সুফল সকল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্য প্রধান উজির ছাড়া একটি রাষ্ট্র পরিষদ গঠন করেন। এটি সকল ধর্মের মানুষের সমন্বয়ে গঠন করেন। তাঁর সময় বাক-স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা অবারিত ছিল। খিলাফতে শান্তি স্থাপন করাই মামুনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। তিনি এ লক্ষ্যে এমন সহনশীল নীতি গ্রহণ করেন যে, তাঁর সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করার পর অভ্যন্তরীণ কোনো গোলযোগ সংঘটিত হয়নি। দুর্ধর্ষ খারেজিগণও তাঁর খিলাফতে বিদ্রোহ করেননি। প্রজাসাধারণের মঙ্গল বিধান করাই ছিল মামুনের শাসনের প্রধান লক্ষ্য। তাঁর শাসনামলে খিলাফতের মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বিরাজমান ছিল। এ সময় শিল্প, কৃষিকাজ, ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়।
বিদ্রোহ দমন
সিংহাসনে আরোহণ করে সাম্রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন স্থানের বিদ্রোহ দমনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। নিম্নে এ অভিযানগুলো আলোচনা করা হলো।
ইয়েমেন ও খোরাসানে বিদ্রোহদমন: মামুনের আমলে ইয়ামেন ও খোরাসানে বিদ্রোহ দেখা দেয়। ইবরাহীম ইয়েমেনে এবং আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে খারিজীবগণ খোরাসানে বিদ্রোহ ঘোষণা করে অরাজকতা সৃষ্টি করে। ইয়ামেনের বিদ্রোহ সহজেই বশীভূত হয়। কিন্তু খোরাসানের বিদ্রোহ প্রবল আকার ধারণ করলে আব্দুল্লাহ বিন তাহির এ বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
মেসোপটেমিয়া ও মিশরের বিদ্রোহ দমন খলিফা মামুন আব্দুল্লাহ বিন তাহিরকে সিরিয়া ও মিশরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। নসর উকায়ণী মেসোপটেমিয়ায় বিদ্রোহী হলে আব্দুল্লাহ তাঁকে পরাজিত ও বন্দি করে খলিফার নিকট প্রেরণ করেন। মেসোপটেমিয়ায় শান্তি স্থাপন করে আব্দুল্লাহ বিন তাহির মিশরের দিকে রওনা হন। সেখানেও বিদ্রোহীদের পরাভূত করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
দস্যু বাবেক ও রোমানদের পরাজয়: মামুনের রাজত্বের প্রথমদিকে মাজেন্দ্রানে বাবেক নামে এক দস্যু সরদার অনুচরসহ আজারবাইজানে একটি ঘাটি তৈরি করে রাজ্যের উল্টাংশে ব্যাপক লুটতরাজ আরম্ভ করে। বাবেক আত্মার স্থানান্তর গমনে (Transmission of soul) বিশ্বাস করত এবং মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের ধর্মের কোন নৈতিক অনুশাসনই স্বীকার করত না। সে কয়েকবার রাজকীয় বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল এবং রোমান সম্রাট থিউফিলাসকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করত। এই মিলিত শক্তিকে জব্দ করার জন্য মামুন স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে অবর্তীণ হলেন। এর উপর্যুপরি তিনটি অভিযান পরিচালনা করে শত্রুর ক্ষমতা নস্যাৎ করে দেন। রোমানরা সন্ধি করতে বাধ্য হন। পরবর্তী রোমান আক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্যে এশিয়ামাইনরের তারামাতে একটি সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলেন।
তাহিরী বংশ: ৮২১ খ্রিষ্টাব্দে তাহির পূর্বাঞ্চলের শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়ে প্রায় স্বাধীনভাবে রাজ্য পরিচালনা করতে থাকে। কৌশলগত কারণে তিনি তাহিরের সাথে কোন প্রতিযোগিতায় না নামানো তার গভীর কুটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক। বাফার স্টেটস হিসেবে বিবেচ্য তাহিরী খলিফার নামে খুৎবা পাঠ না করলেও সার্বিক আনুগত্য প্রদর্শনে ঘাটতি ছিল না।
রাজ্য বিস্তার: খলিফা মামুন রাজ্যবিস্তার অপেক্ষা শান্তি স্থাপনেই বেশি পক্ষপাথি ছিলেন। তিনি একান্ত প্রয়োজনের তাগিদে কয়েকটি অভিযান প্রেরণ করেন। ৮৩২ খ্রিষ্টাব্দে আফ্রিকার শাসনকর্তা জিয়াদাতুল্লাহ আগলাব সিসিলি দ্বীপ অধিকার করেন। এসময়ে স্পেনের উমাইয়া খলিফা দ্বিতীয় আব্দুর রহমান স্পেন হতে বহু আরব বিদ্রোহীকে বিতারিত করেন। এ বিদ্রোহীগণ মিশরে এসে বসতি স্থাপন করেন। কিন্তু তারা সেখানকার শাসনকর্তার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মিশরের শাসনকর্তা আব্দুল্লাহ বিন তাহির তাদেরকে চলে যাবার নির্দেশ দিলে তারা ক্রীটদ্বীপে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন এবং তাদের আবেদন মঞ্জুর করা হয়। প্রত্যাগমনের সময় যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম দিয়ে তাদের সাহায্য করেন। এ সাহায্য পেয়ে তাঁরা ক্রীট দ্বীপ জয় করে সেখানে বসতি স্থাপন করে। এ সময়ে পূর্বদিকে আফগানিস্থান অঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তার করেন তাঁর এক সেনাপতির দাওয়াতে তদানিন্তন কাবুলের সম্রাট ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়।
বুরানের সাথে মামুনের বিবাহ: ৮২৫ খ্রিষ্টাব্দে মামুন তাঁর প্রতিভাধর জহির হাসান বিন সহলের বিদুষী কন্যা বুরানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ বিবাহোৎসব অত্যন্ত জাঁকজমক ও শান-শওকতের সাথে সম্পন্ন হয়। কথিত আছে, এ বিবাহ উপলক্ষে বরযাত্রিগণকে আপ্যায়ন করতে জহিরের পাঁচ কোটি দিরহাম ব্যয় হয়েছিল। অর্থের পরিমাণ অতিরিক্ত মনে হলেও তদানিন্তন সৌখিন পরিবারে এমনটি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। রাজকীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য খলিফা-হাসানকে ফারস ও আহওয়াজেব এক বছরের রাজস্ব প্রদান করেন। খলিফার উপর মহিয়সী বুরানের যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। তার প্রচেষ্টায় রাজ্যে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। পরোপকারিতা ও বদন্যতায় তাঁর তুলনা মেলা ভার।
মামুনের ধর্মমত: খলিফা মামুন ধর্ম সম্বন্ধে অত্যন্ত উদারমত পোষণ করতেন। তিনি ধর্মান্ধতা ও প্রাচীন পন্থিদের প্রতিক্রিয়াথশীল মতবাদকে খেলাফতের সার্বিক উন্নতির অন্তরায় মনে করতেন। খেলাফতের শুরুতে অত্যন্ত দুটি বছর পারস্য ও খোরাসানে জ্ঞান চর্চায় নিমগ্ন ছিলেন। নিজে শিয়া মতাবলম্বী হয়েও তাতে সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি। মামুন নিজে ছিলেন দার্শনিক এবং যুক্তিবাদে তার প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিল।
মনোনয়ন: খলিফা মামুন মৃত্যুর পূর্বে ভ্রাতা কাশিম এবং পুত্র আব্বাসকে খিলাফত হতে বঞ্চিত করে তিনি তার অপরযোগ্য এবং কর্মঠ ভ্রাতা আবু ইসহাক মুহম্মদকে 'মুতাসিম বিল্লাহ' উপাধি দান করে তাঁরই উল্টরাধিকার মনোনয়ন দেন। খেলাফতের স্বার্থে যোগ্যকে নির্বাচন ও মনোনয়ন তাঁর ধীশক্তি ও নির্মোহ মানসিকতারই প্রতিফলন।
মৃত্যু: রোমান আক্রমণ প্রতিহত করে মামুন টুরসাসের উত্তরে তায়ানা নামক স্থানে একটি সুরক্ষিত দুর্গ নির্মাণের আদেশ দেন। এশিয়ামাইনরে অবস্থানকালে তিনি বিদানদুন নদীর তীরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।
মামুনের চরিত্র: খলিফা আব্দুল্লাহ আল মামুন দীর্ঘ সুঠাম দেহ, সুশ্রী এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ চেহারার অধিকারী অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃপতি বললেও অত্যুক্তি হবে না। একাধারে তিনি কবি, সাহিত্যিক আইনজ্ঞ ও দার্শনিক ছিলেন। বাল্যকালে তিনি ব্যাকরণ বিশারদ খলিল বসরীর নিকট ভাষাতত্ত্বসহ নানা বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি কোরানে হাফেজ ছিলেন। তার রাজোচিত গুণাবলি, পান্ডিত্যপূর্ণ মনোভাব, কর্মস্পৃহা বিচক্ষণতা উপাকৃত কুছি ব্যক্তিত্বের অধিকারী মামুন ছিলেন উন্নত কবিদের প্রতীক। শাসক হিসেবে কৃতিত্ব: একজন খলিফার কৃতিত্ব বিচারে শাসন, লালন, সংরক্ষণসহ নানাবিযয় চলে আসে। অসাধারণ গুণের অধিকারী খলিফা আল-মামুন অব্বাসী তথাসমগ্র মুসলিম জাহানের শ্রেষ্ঠ নৃপতি ছিলেন। তিনি শুধু রাজ্য জয়কে প্রাধান্য দেননি; এর সহজকরণ ও সৌন্দর্য বর্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জাত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তার সদাচারণ ও প্রজানুরাকতা ঐতিহাসিকদের অভিভূত না করে পারে না।
ন্যায় বিচার, প্রজাপালন ধর্মনিষ্ঠ মামুনের ব্রত ছিল মহানুভব শাসক হিসেবে তাঁর সময়কাল 'অগাষ্ঠানযুগ' হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সৈয়দ আমীর আলী খলিফা আল-মামুনের যুগকে সর্বপেক্ষা গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় বলে অভিমত দেন।
রাষ্ট্রীয় পরিষদ: সদাশয় খলিফা আল মামুন সকল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি নিয়ে একটি রাষ্ট্র পরিষদ গঠন করেছিলেন। এতে মুসলমান, ইহুদি, খ্রিষ্টান, সাবেয়ী ও জরোষ্ট্রারগণ স্থান পেয়েছিল। শাসন কার্য পরিচালনার ব্যাপরে এ পরিষদ খলিফাকে সাহায্য করত। খলিফা আল মামুন সকল সম্প্রদায়কে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করে ছিলেন। কথিত আছে, ১১,০০০ খ্রিষ্টান গীর্জা ও ইহুদিদের সিনাগগ এবং পৌত্তলিক মন্দির তাঁর সাম্রাজ্যের সর্বত্র বিদ্যমান ছিল।
বায়তুল হিকমা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা
আব্বাসীয় যুগ ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে স্বর্ণযুগ। আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুনের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে চরম উৎকর্ষ সাধিত হয় এবং এর প্রভাব তৎকালীন বিশ্বে পরিলক্ষিত হয়। খলিফা আল-মনসুর শিক্ষা ও সংস্কৃতির যে বীজ বপন করেন, হারুনের রাজত্বে তা অঙ্কুরিত হয়; আল-মামুনের রাজত্বকালে ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়। তাই ঐতিহাসিক আমির আলী বলেন, "মামুনের রাজত্বকাল সন্দেহাতীতরূপে ইসলামের ইতিহাসে অগাস্টান যুগ বলে পরিচিত।"
জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা: খলিফা আল-মামুন ছিলেন স্বয়ং একজন পণ্ডিত। তিনি শিক্ষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এই পৃষ্ঠপোষকতার ফলে তাঁর রাজত্বকালে সাম্রাজ্যের মধ্যে স্কুল, কলেজ, গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে চরম উন্নতি সাধিত হয়। 'জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মামুনের রাজত্বকালকে দুভাগে ভাগ করা যায়। যথা: (১) অনুবাদের যুগ ও (২) মৌলিক প্রতিভা বিকাশের যুগ। তাই ঐতিহাসিক ওয়েলসনার বলেন, "A religious and despotic government allied to philosophy, preparing and partaking in its triumphs." অর্থাৎ "একটি ধর্মীয় স্বৈরাচার শাসনব্যবস্থা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে একই সূত্রে আবদ্ধ হয়ে উন্নতি বিধানে যাবতীয় প্রস্তুতি ও অংশগ্রহণ করেছেন।"
অনুবাদের যুগ: জ্ঞান-বিজ্ঞানের উদার পৃষ্ঠাপোষক মামুন ৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে "মার্ভে বায়তুল হিকমা" (Bayt-ul-Hikma) প্রতিষ্ঠা করেন। বায়তুল হিকমা অনুবাদ ব্যুরো, শিক্ষায়তন ও লাইব্রেরি এ তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রখ্যাত মনীষী হুনায়ন ইবনে ইসহাককে এ প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক নিযুক্ত করেন। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লোক প্রেরণ করে। যেমন- গ্রিস, স্পেন, সিরিয়া, মিশর, ভারত হতে গ্যালেন, ইউক্লিড, টলেমি, এরিস্টটল, সক্রেটিস, প্লেটো প্রমুখ মনীষীর দুর্লভ গ্রন্থাবলি সংগ্রহ করেন এবং বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের ব্যবস্থা করেন। বিশেষ করে ফার্সি, গ্রিক ও সিরীয় ভাষায় বহু বই আরবিতে অনুবাদ করা হয়। বহু পন্ডিত ব্যক্তি তাঁর এ অনুবাদ কাজে সহযোগিতা করেন। তাদের মধ্যে ঈসা-বিন-ইয়াহিয়া, মুসা-বিন-খালিদ, কোষ্টা, মানকাহ্ এবং দুবান নামক ব্যক্তিবর্গ অনুবাদ কার্য পরিচালনা করেন। অনুবাদের পারিশ্রমিক হিসেবে পুস্তকের ওজনে স্বর্ণ দেয়া হতো। ঐতিহাসিক উইলিয়াম মুইর বলেন, "এ সকল মনীষীর পরিশ্রমের ফলে মধ্যযুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন ইউরোপীয় জাতিগুলো তাদের নিজস্ব অথচ হারানো ধন প্রাচীন গ্রিসের বিজ্ঞান ও দর্শনের সঙ্গে পুনরায় পরিচিত হয়।
মৌলিক গবেষণা: বিদেশি বহু পুস্তক অনুবাদের পর মামুন সেগুলোর উপর মৌলিক গবেষণার জন্য বিভিন্ন মনীষীকে নিয়োগ করেন। ফলে বিদেশি ভাবধারায় আরবি ভাষায় এক সৃজনশীল গবেষণার আত্মপ্রকাশ ঘটে। তাদের এ গবেষণা জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ছড়িয়ে পড়ে।
ইতিহাস বিদ্যায়: খলিফা আল-মামুনের রাজত্বকালে ইতিহাস বিদ্যায় বিশেষ খ্যাতি অর্জিত হয়। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ হাশিম আল-কালবী, আল-ওয়াকীদি, ইবনে সাদ প্রমুখ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ তাবাকাত এ রাসূল (স.) ও তাঁর সাহাবিগণের জীবনী লিপিবদ্ধ করে এ অমূল্য ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেন।
ধর্ম, দর্শন, হাদিস, ভাষাতত্ত্ব খলিফা মামুনের রাজত্বকালে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, হাদিসশাস্ত্র, ভাষাতত্ত্ব প্রভৃতির চর্চা অবিরাম গতিতে চলতে থাকে। খলিফা নিজেও একজন হাফেজ ছিলেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতি মঙ্গলবারে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হতো। স্বাধীন চিন্তার পথিকৃৎ হিসেবে তিনি মুতাজিলা মতবাদকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিলেও কুরআন ও হাদিসে তাঁর প্রগাঢ় ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিল। তাঁর সময় ইমাম বুখারী যোল বছর ধরে মুসলিম বিশ্ব পরিভ্রমণ করে যাট লক্ষ হাদিস হতে মাত্র ৭,২৭৫টি হাদিসকে নির্ভুল বলে গ্রহণ করেন। মৃতপ্রায় ফারসি সাহিত্য মামুনের পৃষ্ঠপোষকতায় নবজীবন লাভ করে। আধুনিক ফরাসি কবিতার স্রষ্টা কবি আব্বাস তাঁর সভা অলংকৃত করেন। দার্শনিক আল-কিন্দি তাঁর রাজত্বের একজন বিখ্যাত পণ্ডিত। বিখ্যাত ইমাম শাফেয়ী (৭৬৭-৮২০খ্রি.), ইমাম আহম্মদ ইবনে হাম্বল (৭৮০-৮৫৫খ্রি.), মামুনের রাজত্বকালে ইসলাম ধর্মের গবেষণা করেন।
জ্যোতির্বিজ্ঞান: খলিফা মামুনের সময় জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা পুরোমাত্রায় চলছিল। তিনি নিজেও জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধে খুবই উৎসাহী ছিলেন এবং চর্চা করতেন। তাই তিনি জ্যোতিষশাস্ত্রের উৎকর্ষ সাধনের জন্য বাগদাদের সন্নিকটে শামাসিয়া নামক স্থানে জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণার জন্য একটি মানমন্দির নির্মাণ করেন। এটি ছিল মুসলিম জগতের সর্বপ্রথম মানমন্দির। মানমন্দির নির্মাণ করেই তাঁর জানার আগ্রহ ঝিমিয়ে পড়েনি বরং অন্যান্য বৈজ্ঞানিকদের সঙ্গে তিনি সাধারণ বৈজ্ঞানিকদের মতো নিজেও মানমন্দিরে বসে গ্রহ-নক্ষত্রাদির গতিবিধি নিরীক্ষণ করতেন। ঐতিহাসিক ড্রাপার বলেন, "The Arabs have left unfading traces of their fingers on the sky which everyone can see who reads the names of the stars on an ordinary celestrial globe." অর্থাৎ "আরবগণ নভোমন্ডলে যে অম্লান হস্ত ছাপ রেখে গিয়েছেন তা যেকোনো ব্যক্তি ভূমন্ডলের নক্ষত্র সম্বন্ধীয় জ্ঞান আহরণকালে উপলব্ধি করতে পারবেন।" মামুনের অধীনে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। 'মুসলিম মনীষীগণ খলিফা মামুনের আদেশে গবেষণা কার্যের মাধ্যমে বিষুবরেখা, পৃথিবীর আকৃতি, আয়নমন্ডলের সংযোগস্থল, চন্দ্র, গ্রহ, ধূমকেতুর ছায়া, সূর্যঘড়ি, পৃথিবীর ব্যাস, গ্রহ-নক্ষত্রগুলোর ব্যাস প্রভৃতি মূল্যবান তথ্য আবিষ্কার করেন।
মানমন্দিরের নিরীক্ষা ফল থেকেই আল-মামুনের আদেশ অনুসারে পরীক্ষিত তালিকা 'আলজিজ আসলমুমতাহান' বা আল-মামুন তালিকা (Al-Mamun's tables) নামক বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞান তালিকা তৈরি' হয়। দামাস্কাস এবং বাগদাদের মানমন্দিরে গবেষণা চালানোর সঙ্গে সফো বৈজ্ঞানিকদের কার্য, ফলাফল বিজ্ঞানসম্মতভাবে টুকে রাখার ব্যবস্থা করেন। তাঁর সময় পর্দাথবিদ আবুল হাসান দূরবীণ যন্ত্র এবং বৈজ্ঞানিক আলবেরুনি অতীব সুকৌশলে পৃথিবীর পরিধি নিরূপণ করেন। তাঁর সময় বিজ্ঞানী হারুন-ইবনে-আলী জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় নানা যন্ত্রপাতি নির্মাণ করেন। জ্যোতির্বিদদের দিয়ে "Astronomia Elaborate Compluribus- DD Jussus Regis Maimun." নামক বইটি সংকলন করান। এ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি এখনো অনেক লাইব্রেরিতে পাওয়া যায়।
গণিত, বীজগণিত, জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতি: জ্যোতির্বিজ্ঞানে এ সমস্ত অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন ছাড়াও আল-মামুনের সময়কার মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের গণিতশাস্ত্রের দান সম্যকভাবে উপলব্ধি করা যায় আল-খাওয়ারিজমীর বিস্ময়কর প্রতিভার অবদানে। যতদূর জানা যায় তিনি খলিফা আল-মামুনের লাইব্রেরিয়ান ছিলেন। হয়তো এ লাইব্রেরির সংস্পর্শে এসেই তিনি বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং তিনি গণিতশাস্ত্রে শূন্য (০) প্রবর্তন করে এর উৎকর্ষ বিধান করেন। পাটিগণিতের দশমিক প্রথা সম্বন্দ্বেও জ্ঞান লাভ করেন। এছাড়াও সম ও অসম এবং মৌলিক সংখ্যা, বর্গমূল, ঘনমূল, অসংখ্য উপাদানগুলোর মৌলনীতি ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ "হিসাবুলজাবর ও আল মুকাবেলাহ্" সব বিষয়েই বীজগণিতের সর্বপ্রথম ও মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ বলে ধরে নেয়া যায়। তাছাড়া জ্যামিতির সাহায্যে বীজগণিতে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শক্তি সমীকরণের উন্নতমানের সমাধান করেন। ত্রিকোণমিতিতে সাইন ও কোসাইন, কোট্যানজেন্ট ব্যবহার আরবগণ সর্বপ্রথম প্রবর্তন করেন। আল-খাওয়ারিজমী, ছাবেত, আলফ্রগানাস প্রভৃতি পাশ্চাত্য জগতের সুপরিচিত অঙ্কশাস্ত্রবিদ ছাড়া আরও অনেক বৈজ্ঞানিক নবম শতাব্দীর শেষ ভাগে 'অঙ্ক' শাস্ত্রের আলোচনারত ছিলেন।
ভূগোল শাস্ত্র: টলেমির ভূগোল বিষয়ক গ্রন্থগুলোর উপর ভিত্তি করে আল-খাওয়ারিজমী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "সুরাত আল-আরদ" রচনা করেন। মামুনের পৃষ্ঠপোষকতায় ৬৯ জন পণ্ডিত ব্যক্তির সহায়তায় এ গ্রন্থে পৃথিবীর মানচিত্র সংযুক্ত হয়। ইয়াহিয়া বিন-আল-মনসুর, সিন্দি-বিন-আলী, খালিদ-বিন-আব্দুল মালিক প্রমুখ খ্যাতনামা ব্যক্তিরা পৃথিবীর আকৃতি, গ্রহ, বিষুবরেখা, ধূমকেতু ও ছায়াপথ সম্বন্ধীয় বহু মূল্যবান তথ্য আবিষ্কার করেন। আবুল হাসান নামক একজন বৈজ্ঞানিক দূরবীক্ষণ ও নৌ-কম্পাস আবিষ্কার করেন।
সাহিত্য: মামুনের শাসনামলে বাগদাদের নতুন পরিবেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যের চরম উন্নতি সাধিত হয়। একটি আন্তর্জাতিক বিশ্বসভ্যতার ধারক ও বাহক হিসেবে আরবি ভাষা পুনরায় নতুনরূপে পল্লবিত ও পুষ্পিত হয়। আবুল আতাহিয়া ও তাম্মাম ছিলেন সে যুগের দুজন খ্যাতিমান কবি। মামুনের সভাকবি তাম্মাম "দীওয়ান হাসামা" নামে জাহিলিয়া ও প্রাথমিক ইসলামি যুগের কাব্য সংকলন প্রস্তুত করেন। আল-বুহতুরী নামক আর একজন সভাকবি 'হাসামা' নামে আর একটি সংকলন প্রকাশ করেন। তাঁর সময় খ্যাতনামা ফার্সি কবি আব্বাস আবির্ভূত হন। মামুনের পৃষ্ঠপোষকতায় মৃতপ্রায় ফার্সি সাহিত্যও নবজীবন লাভ করে। ফার্সি সাহিত্যের উন্নতির সাথে সাথে ফার্সি ভাষায় ইতিহাস চর্চাও আরম্ভ হয়।
চিকিৎসা শাস্ত্র: প্রখ্যাত পণ্ডিত হুনায়ুন ইবনে ইসহাক শতাধিক মৌলিক গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন। তাঁর অধিকাংশ গ্রন্থ ছিল চিকিৎসা বিষয়ক। চক্ষু চিকিৎসার উপর তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করেন। চক্ষুর বিভিন্ন রোগ ও তার প্রতিকার সম্বন্ধে তিনি বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে চিকিৎসাশাস্ত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। উহান্ন-বিন-মাসওয়াহ ছিলেন সে যুগের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক। তার আমলে শরীরে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা শুরু হয়।
হস্তলিপি: সুকুমার শিল্প চর্চায়ও মামুনের যুগের মনীষীগণ মৌলিক অবদান রাখেন। এ সময় ইমাম হাম্বলীর (র) বাণীগুলো সুন্দর এবং পরিষ্কারভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়। মুসলমানগণ হস্তলিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। মামুনের সময় হস্তলিপি বিশারদদের মধ্যে আল-রায়হানী ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর নামানুসারে একটি লিখন পদ্ধতির নামকরণ হয় 'রায়হানী লিপি।'
অন্যান্য শাখা: রসায়ন, পদার্থ ও অন্যান্য শাখায় মামুনের রাজত্বকালে মুসলিম মনীষীগণ অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেন। তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন পুস্তক রচিত হয়, যা ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হিসেবে প্রচলিত থাকে। তার সময় শুধুমাত্র মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতিই ঘটেনি বরং সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ক্ষেত্রে মুসলমানদের উন্নতি সাধিত হয়। তাই ঐতিহাসিকগণ যথার্থই বলেছেন, "The Reign of Al-Mamun is the golden age of Islamic Civilization.
সকল দিক বিবেচনা করে ঐতিহাসিকগণ মামুনের রাজত্বকালকে মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগ অর্থাৎ "The Golden age of Islamic civilization" বলে অভিহিত করেন। তাঁর জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা সম্পর্কে জনৈক ঐতিহাসিক বলেন, "শুধু ইসলামের ইতিহাসে নয় বিশ্বের ইতিহাসে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন অভূতপূর্ব জাগরণ ও উন্নতি আর দেখা যায় নি।" তাই জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশের কথা বিবেচনা করে মামুনের রাজত্বকালকে স্বর্ণযুগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
আব্বাসি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

