• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
  • আব্বাসি খিলাফত
আব্বাসি খিলাফত

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

মালিক শাহ সেলজুক (১০৭৩-১০৯২ খ্রি.)

আলপ আরসলানের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মালিক শাহ 'জালাল-উদ-দ্দৌলা (সাম্রাজ্যের গৌরব) উপাধি নিয়ে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি সুলতানদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। সেলজুকদের ইতিহাসে মালিক শাহের রাজত্বকাল এক নতুন যুগের সূচনা করে। তাঁর রাজত্বকালে সাম্রাজ্যের সর্বত্র শান্তি ও সমৃদ্ধি বিরাজ করত। মালিক শাহের রাজত্বের প্রথমদিকে কয়েকটি বিদ্রোহ হয়। এদের একটি তাঁর ভ্রাতার নেতৃত্বে সংঘটিত হয়।

বিদ্রোহ দমন ও শান্তি স্থাপন মালিক শাহ্ এই সমস্ত বিদ্রোহ দমন করে দেশে শান্তি স্থাপন করেন। ১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা আল-কাইমের মৃত্যু হলে তাঁর দৌহিত্র মুকতাদি খলিফা হন। তিনি ধার্মিক ও দানশীল ছিলেন।

মালিক শাহ রাজধানী ইস্পাহান হতে বাগদাদে স্থানান্তরিত করেন। তিনি খাজা হাসান নিজাম-উল-মূলককে উজির পদে বহাল রাখেন এবং তাঁর উপয় রাজ্য শাসনের সকল ক্ষমতা অর্পণ করেন।

শাসনব্যবস্থা: মালিক শাহের রাজত্বকালে সেলজুক সাম্রাজ্য চীনের সীমান্ত হতে পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর এবং উত্তরে জর্জিয়া হতে দক্ষিণে ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। তিনি রাজ্যজয় অপেক্ষা শাসন-সংস্কারের জন্য অধিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। মালিক শাহ দ্বাদশ বার বিশাল সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত পরিভ্রমণ করে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক প্রদেশের অবস্থা ও অভাব-অভিযোগ স্বচক্ষে দেখতেন।

জনহিতকর কার্যাবলি: খলিফা হারুন-অর-রশিদ ও মামুনের ন্যায় তিনি বণিক, হজযাত্রী ও পথিকদের নিরাপত্তা ও সুবিধার জন্য পথের পার্শ্বে বিশ্রামাগার ও প্রহরী-গৃহ নির্মাণ করেন। তাঁর সময়ে কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের প্রভূত উন্নতি ঘটে। তিনি বিভিন্ন স্থানে মসজিদ ও রাস্তা নির্মাণ করেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় রাজ্যে বহু স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। আড়ম্বর, ঐশ্বর্য ও জনসাধারণের সমৃদ্ধিতে মালিক শাহের রাজত্বকাল রোমান অথবা আরব শাসনের শ্রেষ্ঠ যুগের সমকক্ষ ছিল।

জালালী পঞ্জিকা: জালালী পঞ্জিকার প্রবর্তন মালিক শাহের রাজত্বকালের একটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি। সুলতান অথবা তাঁর উজিরের পরামর্শে ১০৭৪-৭৫ খ্রিষ্টাব্দে নিশাপুরে নবনির্মিত মানমন্দিরে জ্যোতির্বিদগণের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এখানে উমর খৈয়ামের মতো প্রসিদ্ধ কবি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও ছিলেন। জ্যোতির্বিদগণের উপর পারসিক পঞ্জিকার সংস্কারের দায়িত্ব দেয়া হয়। তাঁরা প্রচলিত গণনা পদ্ধতির ভুল সংশোধন করে চন্দ্রমাসের পরিবর্তে সৌরমাস অনুযায়ী গণনার প্রথা প্রবর্তন করেন। মালিক শাহ জালাল উদ্দৌলার নামানুসারে এই নতুন সনের নাম হয় 'জালাল সন' বা জালালী পঞ্জিকা (Jalali Calendar)। এই পঞ্জিকা সম্বন্দ্বে পি. কে. হিট্টি বলেন, "এটি আমাদের পঞ্জিকার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে নির্ভুল।"

জ্ঞান-বিজ্ঞানে মালিক শাহ: মালিক শাহ একজন জ্ঞানী, বিদ্যোৎসাহী ও ন্যায়পরায়ণ সুলতান ছিলেন। বহু জ্ঞানী ও গুণী লোক তাঁর দরবার অলংকৃত করেছিলেন। তাঁর উদার পৃষ্ঠপোষকতার ফলে সাহিত্য ও ললিতকলা সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। মালিক শাহের কৃতিত্ব সম্বন্ধে ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, "মালিক শাহের শাসনামলে সেলজুক ক্ষমতা সর্বোচ্চ শিখরে উপনীত হয়েছিল।" মালিক শাহ সেলজুক সুলতানদের মধ্যে শুধু সর্বশ্রেষ্ঠই ছিলেন না, তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নরপতিগণের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।।

মন্ত্রী নিযাম-উল-মূলক এর অবদান মালিক শাহের রাজত্বকালের গৌরবের জন্য তাঁর প্রধানমন্ত্রী নিজাম-উল-মূলকের দান ছিল অপরিসীম। নিজাম-উল-মূলকের প্রকৃত নাম হাসান ইবনে আলী। তিনি তুস জেলার অন্তর্গত রাধকাল পল্লীর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। হাদিস ও ফেকাহ্ শাস্ত্রে তাঁর অগাধ পান্ডিত্য ছিল। নিজাম-উল-মূলকের বিচক্ষণতার জন্যই মালিক শাহ সিংহাসন অধিকার করতে পেরেছিলেন। তাঁর অকৃত্রিম খেদমতের জন্য মালিক শাহ্ তাঁকে 'আতাবেগ' (শ্রেষ্ঠ শাসক) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। তাঁর সম্বন্ধে আমীর আলী বলেন, "সম্ভবত ইয়াহইয়া বার্মাকির পর নিজাম-উল-মূলক ছিলেন এশিয়ার একমাত্র যোগ্যতম মন্ত্রী ও শাসনকর্তা। ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিজাম-উল-মূলক একটি অলংকারস্বরূণ ছিলেন। নিজাম-উল-মূলকের কর্মকুশলতা ও বিচক্ষণতার জন্যই মালিক শাহের রাজত্বকাল গৌরবের উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল।" তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে গিয়ে ইবনে খালিকান বলেন, "মালিক শাহের বিশ বছরের রাজত্বকালে নিজাম-উল-মূলক স্বীয় হতে সমস্ত ক্ষমতা এরূপভাবে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন যে, সুলতানের সিংহাসনে উপবিষ্ট থাকা অথবা মৃগয়ায় যাওয়া ছাড়া আর কোনো কিছুই করার ছিল না।" তাঁর শাসনব্যবস্থা পুরাতন পারসিক পদ্ধতির উপর গড়ে উঠেছিল। তিনি সৈন্যদের মধ্যে ভূমি বণ্টন করে তাদের নিকট হতে কর আদায় করতেন।

সাহিত্যে মালিক শাহের অবদান নিজাম-উল-মূলক একজন সংস্কৃতিবান পণ্ডিত এবং প্রতিভাবান রাজনীতিক ছিলেন। মালিক শাহের অনুরোধে তিনি রাজনীতির উপর 'সিয়াসতনামা' নামে ফার্সি ভাষায় একটি বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে ইসলামি সাহিত্যে এটি একটি উৎকৃষ্ট গ্রন্থ। এই গ্রন্থ সম্বন্ধে ঐতিহাসিক আরনল্ড বলেন, "রাজনৈতিক নীতিমালা সংবলিত এটি শুধু দার্শনিক নিবন্ধই ছিল না, বরং এতে শাসনপ্রণালি, দরবার, বিচারকার্য, সামরিক পদ্ধতি এবং অর্থনৈতিক কার্যাবলির উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ প্রভৃতি বিষয়ে ব্যবহারিক উপদেশ প্রদান করা হয়। এতে তিনি রাজতন্ত্রের ব্যাখ্যা দেন।"।

নিযামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা: ১০৬৫-৬৭ খ্রিষ্টাব্দে নিজাম-উল-মূলকের নামানুসারে নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ছিল শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্রস্থল। এখানকার বিভিন্ন শিক্ষাবিদগণের মধ্যে প্রসিদ্ধ দার্শনিক ইমাম গাজ্জালীর নাম সবিশেষ স্মরণীয়। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরেই এখানে অধ্যাপনার কাজে যোগদান করেন। শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারে নিজাম-উল-মূলকের দান ছিল অপরিসীম। প্রসিদ্ধ নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও তিনি মুসলিম জাহানের সর্বত্র মক্তব ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এই মহান উজির ১০৯১ খ্রিষ্টাব্দে ইসমাঈলীয়া আততায়ী হাসান-বিন-সাবাহ কর্তৃক নিহত হন।

মালিক শাহের মৃত্যু: নিজাম-উল-মূলকের মৃত্যুর এক বছর পরে তাঁর প্রভু মালিক শাহ্ও ইনতিকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেলজুক যুগের গৌরব রবি অস্তমিত হয়। মালিক শাহের পুত্রদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ দেখা দেয় এবং সেলজুক সাম্রাজ্য বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

গুপ্তঘাতক সম্প্রদায়কে দমন সেলজুক সুলতান মালিক. শাহের রাজত্বকালের শেষাংশে পারস্যে একটি নতুন ইসমাঈলীয় সম্প্রদায় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। তারা নিজেদেরকে 'বাতেনীয়া' হিসেবে পরিচয় দেয়, কিন্তু তারা 'হাশিশিন' (Hashishin) নামে অধিক পরিচিত ছিল। 'হাশিশ নামক এক প্রকার মদ তৈরি ও পানে অভ্যস্ত ছিল বলে তারা এই নামে অভিহিত হয়।

ধর্মযুদ্ধকারীরা (Crusaders) আরবি শব্দের (হাশিশিন) অপব্যাখ্যা করে তাদেরকে 'এসাসিনস' (Assassins) (Assa বা গুপ্তঘাতক নামে অভিহিত করে। 'হাশিশিনরা' তাদের শত্রু নিধনের জন্য যে সকল পদ্ধতি ব্যবহার করত তারই একটি পদ্ধতি ইউরোপীয় ভাষায় 'এসাসিনস' নামে পরিচিত হয়েছে। হাশিশিনদের সন্ত্রাসমূলক কার্যাবলি পারস্য, ইরাক ও সিরিয়ায় প্রায় তিন শতাব্দী (একাদশ হতে ত্রয়োদশ শতাব্দী) ধরে অব্যাহত ছিল। ইসমাঈলীয় সম্প্রদায়ের জনৈক হাসান-বিন-সাবা এই গুপ্তঘাতক দলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। গুপ্তঘাতক সম্প্রদায় বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন- ফাতেমীয়; কারণ তারা কায়রোর প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতেমীয় খলিফার অনুসারী ছিল। তাদেরকে, 'সাবী' বা সপ্তমপন্থী (Seveners) বলা হতো। কখনো 'কখনো তাদের 'মালাহিদ' বা অপবিত্র বিধর্মীও বলা হতো।

পর্বতের বৃদ্ধ লোক: হাসান-বিন-সাবার আসল নাম হাসান-বিন-আলী বিন মুহম্মদ বিন জাফর বিন হুসাইন বিন আস-সাবাহ আল-হিমায়রী। সংক্ষেপে তাকে হাসান-বিন-সাবাহ বলা হয়। ইতিহাসে তিনি 'পর্বতের বৃদ্ধ লোক' (Old man of the Mountain) নামেও পরিচিত। কারণ তিনি পর্বত শিখরে একটি সংরক্ষিত দুর্গে বাস করতেন এবং সেখান হতে তার সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ পরিচালিত হতো। পারস্যের কুম (Qum)-এ হাসান-বিন-সাবার জন্ম হয়। তাঁর পিতা কুফা হতে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেন। হাসান-বিন-সাবাহ নিজেকে দক্ষিণ আরবের হিমারীয় রাজাদের বংশধর বলে দাবি করতেন। শৈশব হতে যৌবন পর্যন্ত তিনি নিরলস পড়াশুনায় কাল কাটান। মাত্র সতের বছর বয়সেই তিনি অগাধ পান্ডিত্য লাভ করেন। তিনি সেলজুক সুলতান আলপ আরসলানের রাজত্বকালে সমরাস্ত বিভাগের কর্মকর্তা (mace-bearer) হিসেবে কাজ করেন। মালিক শাহের অধীনেও তিনি চাকরি করেন। কথিত আছে যে, সেলজুক রাজদরবারে উচ্চ রাজপদ না পাওয়ায় এবং নিজাম-উল-মূলকের উন্নতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে হাসান ফাতেমীয় আন্দোলনে যোগদান করেন। তিনি প্রথম জীবনে দ্বাদশপন্থি (Twelvers) শিয়া দলের (ইন্না আশারিয়া) অনুসারী ছিলেন। পরে তিনি ইসমাঈলীয় দাই বা প্রচারকের প্রভাবে পড়ে সপ্তমপন্থি শিয়া দলে যোগ দেন এবং এর প্রচারকার্যে আত্মনিয়োগ করেন।

হাসান কর্তৃক গুপ্তঘাতক প্রতিষ্ঠা তিনি ফাতেমীয়দের প্রতিনিধি নিযুক্ত হয়ে গুপ্তসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। সমস্ত রাজসরকার বিপর্যন্ত করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। ১০৭৮-৮০ সালে তিনি ফাতেমীয় রাজধানী কায়রো সফর করেন। এই সময় আল-মুসতানসিরের দরবারের ফাতেমীয় প্রধান প্রচারক তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। তখন হতেই তিনি ফাতেমীয় খলিফা আল-মুসতানসিরের জ্যেষ্ঠ পুত্র নিযামের অনুসারী হন। এজন্য ফাতেমীয় বিরোধী খলিফার ষড়যন্ত্রের ফলে তাঁকে পারস্যে যেতে বাধ্য করা হয়। এখান হতে হাসানের অনুসারীরা 'নিযানিয়া' হিসেবে পরিচিত হতে থাকে। নিযাম-উল-মূলক তাকে গ্রেপ্তার করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি কোনো রকমে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হন এবং পারস্যের উত্তরাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। ১০৯০-৯১ সালে তিনি ও তাঁর অনুসারীরা বিখ্যাত আলামুত দুর্গ দখল করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পারস্যের আরও অনেক দুর্গ দখল করেন। তাঁর রাজ্যসীমা মাজেন্দ্রান (উত্তর পারস্য) ফারস, কুর্দিস্তান ও খুজিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

উদ্দেশ্য সাধনে তরবারি ব্যবহার: স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য হাসানের অনুসারীরা তরবারি ব্যবহার ও বিষ প্রয়োগের আশ্রয় গ্রহণ করত। ১০৯২ খ্রিষ্টাব্দে হাসানের জনৈক গুপ্তচর বা ফেদাই সুলতান মালিক শাহের উজির ও তাঁর স্কুলের সহপাঠী নিজাম-উল-মূলককে হত্যা করেন। এ দলের হত্যা পরিকল্পনার প্রথম শিকার ছিলেন নিজাম-উল-মূলক। এই সময় হতে মোঙ্গলগণ ফর্তৃক বিধ্বস্ত হওয়ার পূর্ববর্তী তিন শতাব্দী পর্যন্ত গুপ্তঘাতক সম্প্রদায়ের নাম ইসলামি দুনিয়ার সর্বত্র দারুণ ভীতির সঞ্চার করে।

ইসলামি দুনিয়ায় সন্ত্রাসের সৃষ্টি: ডেমোকেল্ল্স (Democales)-এর তরবারির ন্যায় গুপ্তঘাতকদের খড়গ ইসমাঈলীয় সম্প্রদায়ের শত্রু বিশেষত শাসকগোষ্ঠী অথবা সুন্নি ধর্মতত্ত্ব ও আইনশাস্ত্রের শিক্ষকদের মাথার উপর সর্বদা উদ্যত ছিল। সেলজুক সুলতান মালিক শাহ্ তাদের বিরুদ্ধে অনেকগুলো অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু এই সংঘের ধ্বংস সাধনের পূর্বেই তিনি মারা যান (১০৯২ খ্রি.)।

সেলজুকদের পতন: নিজামূল মূলক আততায়ী হাসান-বিন-সাবাহ কর্তৃক ১০৯১ খ্রিষ্টাব্দে নিহত হন। তাঁর নিহতের এক বছর পর প্রভু মালিক শাহ নিহত হয়। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেলজুকদের গৌরব রবি অস্তমিত হয়। মালিক শাহের মৃত্যুর পর গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং পরবর্তীকালে দুর্বল শাসকদের অযোগ্যতার ফলে সেলজুক বংশের পতন ঘটে।

পরবর্তী সেলজুকগণ: মালিক শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পত্নী তুর খানের অনুরোধক্রমে খলিফা তাঁর শিশুপুত্র মাহমুদকে (১০৯২-১৪ খ্রি.) নাসির-উদ-দুনিয়া ওয়াদ্দীন উপাধি দান-করে সুলতান পদে অধিষ্ঠিত করান। কিন্তু তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বরকিয়ারুক

তাকে পদচ্যুত করেন এবং রুকুনুদ্দিন উপাধি গ্রহণ করে সিংহাসনে বসেন। এ বংশের সর্বশেষ সুলতান ছিলেন তুঘ্রীল।

ক্ষয়িষ্ণু আব্বাসী সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখা ও গৌরব বৃদ্ধিতে সেলজুক শাসকদের দান অপরিসীম। তাদের দীর্ঘ সেবায় আব্বাসীয় সাম্রাজ্য ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা পায়।

মালিক শাহের মৃত্যুর পর সেলজুক সাম্রাজ্য গৃহবিবাদের ফলে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দ্রুত ধ্বংসের পথে ধাবিত হয়। সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন আমির ও সেনাপতি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সেলজুক সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে সজোই ইসলামি জগতে এক দুর্দিন ঘনিয়ে আসে। ইউরোপের রাজন্যবর্গ ও জনসাধারণ তাঁদের তীর্থভূমি জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের জন্য মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ (ক্রুসেড) ঘোষণা করে।

পতনের কবল হতে সাম্রাজ্যকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে না পারলেও সেলজুক সুলতানদের প্রায় সকলেই সাহিত্য ও বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। শিক্ষা ও সংস্কৃতির অগ্রগতিতে তাঁদের দান ছিল অপরিসীম। সেলজুক সুলতান মালিক শাহের উজির নিজাম-উল-মূলক ছিলেন একজন মহান বিদ্যোৎসাহী।

সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে সেলজুকদের অবদান সেলজুকদের পৃষ্ঠপোষকতায় সাম্রাজ্যের সর্বত্র স্কুল-কলেজ স্থাপিত হয়।

বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক ইমাম গাজ্জালী, মরমি কবি ফরিদউদ্দিন আত্তার, সাহিত্যিক নিজামী, কবি নাসির-ই-খসরু, প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ উমর খৈয়াম প্রমুখ মনীষী মালিক শাহের দরবার অলংকৃত করেছিলেন। এ যুগে স্থাপত্যশিল্পেরও যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হয়। রায়ের তুঘ্রীলের সমাধি, ইস্পাহানের জামে মসজিদ এবং এর অনুকরণে জাওয়ারা ও গুলপাইজানের জামে মসজিদ এই আমলের স্থাপত্যশিল্পের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ।

সেলজুক বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন মালিক শাহ। তিনি শাসনকার্যে যেমন পারদর্শী ছিলেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানেও তাঁর অবদান অপরিসীম। তিনি ১০৭৩-১০৯২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘদিন শাসনকার্য পরিচালনা করে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন।

আব্বাসি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন

আব্বাসীয় আন্দোলনআবুল আব্বাস আস-সাফফাহ (৭৫০-৭৫৪ খ্রি.) খলিফা আবু জাফর আল মনসুর (৭৫৪-৭৭৫ খ্রি.)খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রি.)বার্মাকি বংশখলিফা আল-আমিন (৮০৯-৮১৩ খ্রি.)খলিফা আল-মামুন (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.)আব্বাসীয় খিলাফতের শেষার্ধ খলিফা আল-মুতাসিম (৮৩৩-৮৪২ খ্রি.)বুয়াইয়া বংশ (৯৪৪-১০৫৫ খ্রি.)সেলজুক বংশ (১০৫৫-১১৯৪ খ্রি.)মালিক শাহ সেলজুক (১০৭৩-১০৯২ খ্রি.)ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ (১০৯৫-১২৫৮ খ্রি.)গাজী সালাউদ্দিন আইয়ুবিবাগদাদ ধ্বংস (১২৫৮ খ্রি.)আব্বাসীয় খিলাফতের ক্রমাবনতি ও পতনআব্বাসীয় আমলের আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্যআব্বাসীয় আমলে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চাআব্বাসিদের রাজধানী কোথায় ছিল?বার্মাকি বংশের প্রতিষ্ঠাতা কে?খায়জুরান কে ছিলেন?বাগদাদ নগরীর প্রতিষ্ঠাতা কে?ক্রুসেড (Crusade) শব্দের অর্থ কী?বুরান কে ছিলেন?আব্বাসি বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা কে?'আল-মনসুর' শব্দের অর্থ কী?বায়তুল হিকমা কে প্রতিষ্ঠা করেন?কোন যুদ্ধের মাধ্যমে আব্বাসি রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়?আব্বাসিরা কার বংশধর?কোন সালে জাবের যুদ্ধ সংঘটিত হয়?আবুল আব্বাস কী উপাধি গ্রহণ করেন?'আস-সাফফাহ' শব্দের অর্থ কী?আব্বাসি বংশের প্রথম শাসক কে ছিলেন?সেনাপতি আবু মুসলিমকে কে হত্যা করেন?বায়তুল হিকমাহ (জ্ঞানগৃহ) কত খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করা হয়?'Arabian Joan of Ark' নামে পরিচিতি লাভ করেন কে?ক্রুসেড কী?ক্রুসেড (Crusade) শব্দটি কোন শব্দ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে?আব্বাসি কারা? পরিচয় দাও।নহর-ই জুবাইদা কী? বুঝিয়ে লেখ।বায়তুল হিকমা বলতে কী বোঝায়?আবু মুসলিম খোরাসানি সম্পর্কে যা জান লেখ।কাকে এবং কেন আস-সাফফাহ বলা হয়?খলিফা মনসুর কর্তৃক আলী বংশীয়দের প্রতি দুর্ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা কর।আব্বাসি আন্দোলন বলতে কী বোঝায়?আবু জাফর আল মনসুরকে আব্বাসি বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় কেন?খলিফা আল মামুনের রাজত্বকালকে ইসলামের অগাস্টাস যুগ বলা হয় কেন?ক্রুসেড বলতে কী বোঝায়?

সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ