- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- আব্বাসি খিলাফত
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
বাগদাদ ধ্বংস (১২৫৮ খ্রি.)
উত্থান-পতন বিশ্ব প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম। এই নিয়মের জালে বহু নগর, জনপদ বিলীন হয়ে গিয়েছে কালের গর্তে। কিন্তু হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ ধ্বংস ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক ঘটনা। এই সম্পর্কে ব্রাউনী বলেন, "I never probable. was so great and splendid a civilization so swiftly consumed with fire and quenched with blood." অর্থাৎ "সম্ভবত কখনই এতবড় ও সমৃদ্ধিশালী একটি সভ্যতা এত দ্রুত অগ্নিশিখায় বিধ্বস্ত ও রক্তধারায় নিশ্চিহ্ন হয় নি।" তাদের হাতে 'আরব্য স্বপ্নপুরী' বাগদাদ তার সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে প্রতিপক্ষের জিঘাংসার পরিতৃপ্তি ঘটাল। হালাকু খান এই ধ্বংস দ্বারা মোঙ্গল বীভৎস হত্যালীলা ও অত্যাচারের একটি নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেন।
বাগদাদ আক্রমণের কারণ
হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো নিম্নে আলো আলোচনা করা হলো:
গুপ্তঘাতক দলকে দমনে সাহায্য পাঠাতে অবহেলা: পারস্যে গুপ্তঘাতকদের দমনের জন্য হালাকু খান খলিফা মুনতাসিম বিল্লাহর নিকট সাহায্য চান, কিন্তু মুনতাসিম বিল্লাহ হালাকু খানকে সাহায্য দানে বিরত থাকেন। ফলে হালাকু খান ক্রুদ্ধ হয়ে বাগদাদ আক্রমণ করেন।
রাজনৈতিক অরাজকতা আব্বাসীয় খলিফা মুনতাসিমের সময় সাম্রাজ্যে রাজনৈতিক অরাজকতা দেখা দিলে হালাকু খান বাগদাদ আক্রমণ করেন।
মন্ত্রী মুযাইদ উদ্দিনের আমন্ত্রণ: খলিফা মুনতাসিম বিল্লাহর সময় শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করলে খলিফা শিয়াদের কঠোর হস্তে দমন করেন। শিয়া মন্ত্রী মুযাইদ উদ্দিন মর্মাহত হয়ে খলিফাকে জব্দ করার লক্ষ্যে হালাকু খানকে বাগদাদ আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানায়।
বাগদাদ ধ্বংসের ঘটনা
উপর্যুক্ত কারণগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে হালাকু খান কুদ্ধ হয়ে এক চরমপত্রের মাধ্যমে খলিফাকে বাগদাদের বহিঃদেওয়াল উৎপাটন করে তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করার জন্য নির্দেশ দেন। খলিফা এতে কর্ণপাত না করলে হালাকু খান ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদ নগরী অবরোধ করেন। খলিফার বাহিনী নগরী রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে খলিফা পরিবার-পরিজন নিয়ে আত্মসমর্পণ করে প্রাণভিক্ষা চান। এমনও ভবিষ্যৎ বাণী করা হয়েছিল যে, "যদি খলিফাকে হত্যা করা হয় তাহলে সমগ্র বিশ্বে অরাজকতা সৃষ্টি হবে, সূর্য উদিত হবে না, খরা দেখা দিবে, ফসল হবে না।"
এতেও বাগদাদ নগরী ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা পেল না বরং চল্লিশ দিন নির্বিচারে নগরী বিধ্বস্ত, জনসাধারণের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হলো। হালাকু খান খলিফাসহ রাজপরিবারের সবাইকে হত্যা করেন। কথিত আছে প্রায় ২০ লক্ষ লোকের মধ্যে ১৬ লক্ষ লোককে হত্যা করা হয়। ফলে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ইউফ্রেটিস নদীর পানিও রক্তে লাল হয়েছিল। বাগদাদে যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত মুসলিম সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির বিলুপ্তি ঘটে। মুসলিম জ্ঞানভান্ডার বাগদাদ নগরী মহাশ্মশানে পরিণত হয়। এভাবে মোক্তালদের দ্বারা অসংখ্য মসজিদ-মাদ্রাসা, প্রাসাদ-অট্টালিকা নিশ্চিহ্ন হলো।
বাগদাদ ধ্বংসের প্রত্যক্ষ ফল
হালাকু খান কর্তৃক ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদ ধ্বংস পৃথিবীর ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। বাগদাদ ধ্বংসের ফলাফল নিম্নে আলোচনা করা হলো:
হত্যা ও বাগদাদ ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যেক চূড়ান্ত অভিযানের সাথে তিনটি বিধ্বংসকারী শক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। হালাকু খানের বাগদাদ আক্রমণের পরিণতিতে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুনের মতে, বাগদাদ ধ্বংসের পূর্বে এর লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ২০ লক্ষের উপর। ছয় সপ্তাহের ধ্বংসযজ্ঞে প্রায় ১৬ লক্ষ লোক প্রাণ হারায়। তারিখ আল-খামিরেস এর মতে, এই হত্যাযজ্ঞ ৩৪ দিন ধরে চলে। এই সময় ১৮ লক্ষ লোক তরবারির সামনে আত্মাহুতি দেয়। তিন দিন যাবৎ রাজপথে রক্তের বন্যা বয়ে যায় এবং টাইগ্রিস নদীর পানি মাইলের পর মাইল শোণিত ধারায় লালে লাল হয়ে যায়। এমনকি হাসপাতালের রোগী ও বিদ্যানিকেতনের অধ্যাপক ও ছাত্ররাও এই ধ্বংসলীলা হতে রেহাই পায়নি।
বাগদাদ মহাশশ্মানে পরিণত হালাকু বাহিনীর এই পাশবিক আক্রমণের ফলে বৈষয়িক ক্ষতি হয়েছিল অপরিমেয়। 'তারিখ-ই-ওয়াসফ' রচয়িতা আবদুল্লাহ ইবনে ফজলুল্লাহ বলেন, বাগদাদে ধ্বংসযজ্ঞ ৪০ দিন ধরে চলে। এই সময়ে অবরোধকালে বাগদাদ নগরী মহাশ্মশানে পরিণত হয়েছিল। মোঙ্গলদের লুণ্ঠন তৎপরতায় বাগদাদ নগরী একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায়। তদুপরি প্রাসাদ, মসজিদ, সমাধিসৌধ ও ঘর-বাড়ি ধূলিসাৎ হওয়ায় বাগদাদের উপর এক করুণ ছায়া নেমে আসে।
নারী নির্যাতন: দুর্বর্যতা ও নৃশংসতা মোজাল সেনাবাহিনীর একক বৈশিষ্ট্য। রণর্দম মোঙ্গল বাহিনীর আক্রমণের বিভীষিকা অতিক্রান্ত হলে নারী নির্যাতন ও নিধনযজ্ঞে তারা তৎপর হয়। যে সমস্ত নারী ও শিশু মোঙ্গল আক্রমণের প্রচণ্ডতায় হতবুদ্ধি হয়ে তাদের একমাত্র ভরসাস্থল কুরআন শরিফ হাতে করে মোঙ্গলদের করুণা প্রার্থনা করেছিল, তারাও মোঙ্গলদের হাত হতে রেহাই পায়নি। তদুপরি অভিজাত সম্প্রদায়ের সম্ভ্রান্ত মহিলাগণকেও পর্দার আড়াল হতে টেনে এনে প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তায় লাঞ্ছিত ও অপমানিত করে তাদের সতীত্বহানি করতে তারা কুণ্ঠিত হয়নি।
কৃষ্টি-সভ্যতার বিনাশ: সবচেয়ে মারাত্মক আঘাত আসে কৃষ্টি ও সভ্যতার উপর। ঐতিহাসিক আমীর আলী বলেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বাগদাদ, কৃষ্টিসভ্যতার লীলাভূমি বাগদাদ, আরব্য রজনীর প্রাণকেন্দ্র এবং খলিফা হারুন-অর-রশিদের স্বপ্নপুরী বাগদাদ নগরী ধ্বংস হয়ে যায়। এই ধ্বংসের ফল এত ব্যাপক ছিল যে, ব্রাউন সাহেব আক্ষেপ করে বলেন, পূর্বে সম্ভবত আর কখনো এত বড় মহান কোনো সভ্যতা এত তাড়াতাড়ি এভাবে দখীভূত হয়নি এবং শোণিত ধারায় নিবৃত্তি লাভ করেনি। গুলিস্তাঁ ও বোঁন্তার সাধক শায়খ সাদী মোঙ্গল আক্রমণকে কিয়ামতের সাথে তুলনা করেছেন। ঐতিহাসিক ইবনে আসির বলেন, তাতারদের আক্রমণ সাধারণভাবে সমগ্র বিশ্বের ওপর, বিশেষভাবে মুসলমানদের ওপর আপতিত সর্বশ্রেষ্ঠ বিপর্যয় এবং সবচেয়ে ভীতিপ্রদ বিভীষিকাসমূহের অন্যতম যার নজির পরবর্তী যুগের ইতিহাসে আর নেই। যদি কেউ উল্লেখ করেন যে, আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্টি হবার পর আজ পর্যন্ত বিশ্বের আর কোথাও এত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, তবে তিনি সত্যই বলবেন, কেননা ইতিহাসে এমন কোনো ঘটনা নেই যা এর নিকটবর্তী হতে পারে। তাই আবদুল লতিফ একে এমন একটি ভাগ্য বিড়ম্বনা বলে বর্ণনা করেছেন যা যাবতীয় ভাগ্য বিপর্যয়কে স্নান করে দিয়েছে। 'তারিখ-ই-জাহান গুসার' লেখক আতা মালিক জাওয়াইনী একে বিজ্ঞানী ও গুণবত্তার দুর্ভিক্ষের যুগ বলে বর্ণনা করেছেন। স্যার পারসী সাইকসের মতে, প্রলয়ের ভীতিপ্রদ প্রকৃতি মুসলিম রাষ্ট্রের এবং পরোক্ষভাবে সারা বিশ্বের অগ্রগতি ব্যাহত করেছিল। এর বিভীষিকা অনুধাবন করা কষ্টকর ও অতিরঞ্জিত করা অসম্ভব।
একটি চূড়ান্ত বিপর্যয়: বাগদাদ ধ্বংস ইসলামি বিশ্বের এক চূড়ান্ত বিপর্যয়। এতে আরবি-পারসিক কৃষ্টি ও সভ্যতার পতন ঘটে। এই পর্যন্ত ইসলামি বিশ্বে যে স্বাধীন চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি, অনুসন্ধিৎসার উদ্দীপনা, সৃজনশীল প্রতিভা ও মৌলিক গবেষণা আরবি জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে স্পষ্টভাবে জড়িত ছিল তা কার্যত তিরোহিত হয়ে গেল। আবদুল শাকুর আহসানের মতে, দুটি জাতি, আরব ও ইরানি একযোগে মধ্যযুগীয় বিশ্বের উচ্চতর সাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিক কৃষ্টির অবদান রেখে গিয়েছিল, তারা তখন হতে দুটি পৃথক পন্থা অনুসরণ করতে লাগল। বাগদাদ পতনের সাথে সাথে আরবি ভাষারও পতন ঘটে। এতদিন পর্যন্ত আরবি ভাষা বিশ্বের 'লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা' হিসেবে পরিচিত ছিল। বহু শতাব্দী যাবৎ আরবি ভাষা ইরানে বিজ্ঞানের ও দর্শনের ভাষা হিসেবে পরিগণিত ছিল এবং সমস্ত চিন্তাবিদ ও বৈজ্ঞানিকগণ তাঁদের মননশীলতা প্রকাশের বাহন হিসেবে আরবিকে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তখন হতে আরবি জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা হিসেবে তার স্বকীয় প্রাধান্য হারিয়ে ফেলল এবং ধর্ম ও ধর্মভিত্তিক জ্ঞান সাধনায় এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল। আরব সভ্যতার পতনের সাথে সাথে ইসলামের ইতিহাসে সেমিটিক আরব জাতির হলে পীতবর্ণ মোঙ্গল জাতির প্রাধান্য প্রোজ্জ্বল হয়ে দেখা দিল।
রাজনৈতিক শূন্যতা: বাগদাদ আক্রমণের ফলে ইতিহাসে রাজনীতিতে বিরাট শূন্যতা সূচিত হয়। অধ্যাপক হিটি বলেন, ইসলামের ইতিহাসে মুসলিম বিশ্ব এই প্রথম খলিফাবিহীন থেকে যায়- যার নাম জুমার খুতবায় পঠিত হতো। তাই এই ঘটনাটি শুধু রাজনীতি এবং কৃষ্টির পতনই সূচিত করেনি, এই বিয়োগান্ত নাটকের মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য আরও গভীরতর স্তরে নিহিত আছে। মুসলিম বিশ্বে এতদিন পর্যন্ত বাগদাদ মুসলিম ঐক্যের প্রতীকস্বরূপ বিবেচিত হচ্ছিল। আব্বাসীয় খিলাফতের পতনের যুগেও বাগদাদ আন্তঃআঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইসলামের কিব্লাহ স্বরূপ বিবেচিত হতো। বাগদাদ পতনের ফলে মুসলমানেরা সাময়িকভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল।
বাগদাদ ধ্বংসের পরোক্ষ ফল
উপরে বাগদাদ ধ্বংসের প্রত্যক্ষ ফলাফলগুলো আলোচনা করা হয়েছে। নিম্নে পরোক্ষ ফলাফল আলোচনা করা হলো:
প্রথমত, আবদুল শাকুর আহসানের মতে, এই বিভীষিকায় ধ্বংস যাই হোক, শোচনীয় পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারে নি। এই সভ্যতার আবার পুনর্বিকাশ ঘটে এবং পরবর্তী আড়াই শতকের মধ্যে এ বিশ্বে তিনটি বৃহত্তম সাম্রাজ্যের জন্মদান করে।
দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক হেল এবং মুনের মতে, বাগদাদের খিলাফত অদৃশ্য হয় এবং ইসলামি কৃষ্টির কেন্দ্র টাইগ্রিস হতে নীলনদ, বাগদাদ হতে কায়রোতে স্থানান্তরিত করা হয়। তখন হতে কায়রো ইসলামি কৃষ্টির লীলাভূমিতে পরিণত হয়। মিশরে পাশ্চাত্য মুসলিম এবং প্রাচ্য দেশীয় খ্রিষ্টানদের মধ্যে সংযোগসূত্র স্থাপিত হয়।
তৃতীয়ত, বার্নার্ড লুইসের মতে, মোঙ্গল বিজয় প্রথমত একটি বংশের অধীনে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া এবং দূর প্রাচ্যের সভ্যতা একত্র করে এবং এইরূপে ঐ সমস্ত সমাজসমূহের মধ্যে সামাজিক ও কৃষ্টির সংযোগ সূচিত হয়। যারা পূর্বে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বাধার দ্বারা পৃথক হয়ে পড়েছিল এই সময়ে তারা ইউরোপের সাথে নব সংযোগসূত্রের দ্বার উদ্ঘাটন করে। কেননা মুসলিম প্রাচ্যে অমুসলমান শাসকদের উপস্থিতিতে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়, কতকসংখ্যক ইউরোপীয় তার সদ্ব্যবহার করে চীন দেশে যাবার স্থলপথ অনুসন্ধান করতে তৎপর হয়।
চতুর্থত, ১২৫৮-১২৬০ সালের মধ্যে মোঙ্গল আক্রমণ বিভীষিকা সৃষ্টি করলেও তাদের পূর্বসূরি সেলজুকদের মতো তারা পারসিকদের শাসনতান্ত্রিক প্রতিভা সম্বন্ধে সম্যক অবগত হয়ে তা কাজে লাগাতে আরম্ভ করে এবং আলাউদ্দিন যুবাইনী, রশীদ উদ্দিন সিনান, ফজলুল্লাহ্ প্রমুখ কীর্তিমান পন্ডিতদের দ্বারা তাদের রাজসভা অলংকৃত হতে থাকে। ১২৯৫ সাল হতে মুসলিম বিশ্বের অবস্থা আশাতীতভাবে পরিবর্তিত হয়, কেননা ঐ সময়ের মধ্যে সপ্তম ইলখান গাযান মাহমুদ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্মে পরিণত করেন। অধ্যাপক হিটির কথায়, মুহম্মদ (স.)-এর ধর্মের পক্ষে তা একটি অত্যুজ্জ্বল বিজয় বটে, যেমনটি সেলজুকদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। মুসলমানদের অস্ত্রশস্ত্র যেখানে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল, সেখানে তাদের ধর্ম বিজয়লাভে সমর্থ হয়েছিল। ইসলামি কৃষ্টির ধ্বংস সাধনে হালাকু খানের নির্দয় প্রচেষ্টার পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের কম সময়ের মধ্যে ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসেবে তাঁর প্রপৌত্র গাযান ঐ একই কৃষ্টি পুনর্জীবিতকরণে বহু সময় ও উদ্যম উৎসর্গ করেছিলেন।
পঞ্চমত, ঐতিহাসিক হেস এবং মুনের ভাষায় এই সে সময় সেলজুক সালতানাতের রাজনৈতিক এবং সামরিক শক্তি ভেঙে পড়ে এবং তাদের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে প্রত্যেক মুসলমান গোত্র এবং জাতি আরব, পারসিক, কুর্দি, তুর্কি এবং মোঙ্গল এর প্রতিবেশীর সাথে যুদ্ধে ব্যাপৃত হয়। এই বিশৃঙ্খলার ফল হতে তুর্কি জাতি ক্রমে ক্রমে নেতৃত্বের অবস্থায় উন্নীত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এই ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই উপর্যুক্ত বর্ণনার প্রেক্ষিতে এরূপ মনে করা অযৌক্তিক নয় যে, নিকট, মধ্য ও দূরপ্রাচ্যে এরূপ একটি ওলট-পালটের প্রয়োজন ছিল।
ষষ্ঠত, ঐতিহাসিক ই. জি ব্রাউনীর ভাষায় বলা যায়, "সম্ভবত কখনই এতবড় সমৃদ্ধিশীল একটি সভ্যতা এত দ্রুত অগ্নিশিখায় বিধ্বস্ত ও রক্তধারায় নিশ্চিহ্ন হয় নি।" বাগদাদ ধ্বংসের ফলে মুসলিম বিশ্বের অপূরণীয় ক্ষতি হয়।
১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে হালাকু খান কর্তৃক বাগদাদ ধ্বংস সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। হালাকু খানের আক্রমণে ইসলামি খিলাফত ধ্বংস হয়। তাই বাগদাদ ধ্বংস পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক ঘটনা।
আব্বাসি খিলাফত - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

